কে আসছেন, হিলারী না ডোনাল্ড ট্রাম্প !

।।ফকির ইলিয়াস।।hillary-trump
নিউইয়র্কে বড় দুই দলের প্রাইমারী ইলেকশন হয়ে গেল গত ১৯ এপ্রিল ২০১৬। বার্ণি
স্যান্ডার্স হেরে গেলেন হিলারী ক্লিনটনের সাথে। বেশ বড় ভোটের ব্যবধানে রিপাবলিকান থেকে জিতে গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
৯৮.৪ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর ডেমোক্র্যাটিক দলের শীর্ষ প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ৫৭.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন। তার প্রতিপক্ষ বার্নি স্যান্ডার্স পেয়েছেন ৪২.১ শতাংশ। অন্যদিকে রিপাবলিকান দলে ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ৬০.৫ শতাংশ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যাসিচ পেয়েছেন ২৫.১ শতাংশ ভোট। ১৪.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন টেড ক্রুজ।
বেশ জমে উঠেছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। গেল আটবছর ধরে ডোমেক্র্যাটরা বিশ্বকে শাসাচ্ছেন। রিপাবলিকানদের আর তর সইছে না। তাদের ক্ষমতা চাই। এজন্য তারা এনেছেন ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে।
এটা সকলের জানা রিপাবলিকান হলো ধনীদের দল। কিছু গরীবও যে সমর্থন করেন না- তা নয়।বুঝে- না বুঝে অনেকেই আমেরিকার ভোটার। কেউ প্রবাহের সাথে তাল মিলিয়ে।
ট্রাম্প যা বলেছেন- তাতে মাইনরিটি প্রায় সকল এথনিক-রাই তার উপর নাখোশ।
কারণ তার বক্তব্য ছিল বিদ্বেষপূর্ণ।ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম-বিদ্বেষী বক্তব্য মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা দুর্বল করে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছে পেন্টাগন বেশ আগেই।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের মুখপাত্র পিটার কুক গেল
ডিসেম্বরে(২০১৫))বলেছেন, এ ধরনের কথা-বার্তা ইসলামিক স্টেটের কর্মকান্ডকে আরও জোরদার করতে পারে। অর্থাৎ বিশ্বে মৌলবাদ আরও মাথাচাড় দিয়ে উঠতে পারে।
এই ঘটনায় হোয়াইট হাউজের একজন মুখপাত্র বলেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বলেছেন তার মাধ্যমে তিনি প্রেসিডেন্ট হবার যোগ্যতা হারিয়েছেন।
হোয়্ইাট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি জোস আর্নেস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, হোয়াইট হাউজ প্রশাসনের জন্য এমন এক ব্যক্তিকে বিরোধী দলের প্রতিদ্বন্দ্বী মনোনয়ন করা একটি অস্বাভাবিক পদক্ষেপ।
তিনি আরও বলেছিলেন, প্রত্যেক প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই মার্কিন সংবিধানের সংরক্ষণ ও সুরক্ষার শপথ নিতে হবে। আর এ কারণেই ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার অযোগ্য। সিএনএন এর এই সংবাদটি গত বছরের শেষ মাসটিতে আলোড়ন তুলেছিল বিশ্বব্যাপি।
দেখার বিষয় হলো- তারপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রাইমারীতে
জিতে যাচ্ছেন ! তাহলে আমেরিকানরা আসলে কি ছাইছেন ?
একটা বিষয় মনে রাখা দরকার- ইরাক,আফগানিস্তান,লিবিয়া,লাদেন,নাইন ইলেভেন-
বিভিন্ন ইস্যুর পর ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় আসেন। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন- উই নিড এ চেন্জ ! তরুণরা তার ডাকে সাড়া দেয়। ফলে তিনি পরপর দুইবার নির্বাচিত হন। আমেরিকায় আমার গেল তিন দশকেরও বেশি অভিবাসী জীবনে যে কথাটি জেনে আসছি, একজন কৃষ্ণাঙ্গের পরেই একজন নারী
প্রেসিডেন্ট দেখতে চায় আমেরিকানরা। সেটাই কি হতে যাচ্ছে ? এই প্রশ্ন এখন খুব কাছাকাছি।
অন্য দিকে রিপাবলিকানরা বলছেন- তাদের অনেক কাজ বকেয়া পড়ে আছে। এর অন্যতম হচ্ছে ইমিগ্রেশন রিফর্ম আইন। অর্থাৎ এদেশে বহিরাগত অভিবাসী নেবার একটা মোটা দাগের সীমারেখা তারা টানতে চান। সেজন্যই ট্রাম্পকে দিয়ে বেশ কিছু
অর্বাচীন কথাবার্তা বলানো হচ্ছে বলেও মন্তব্য করছেন সমাজ বিশেষজ্ঞরা।
জনগণের প্রাইমারী ভোট শেষ হলে ডেলিগেটরাই নির্বাচন করবেন দলের প্রার্থী।
সেই রেসে কি হতে পারে ? তার একটি হিসেব করা যাক।
নিউইয়র্ক প্রাইমারিতে এ পর্যন্তহিলারি ডেলিগেট ভোট পেয়েছেন ১৩৫টি। স্যান্ডার্স পেয়েছেন ১০৪টি। সব মিলিয়ে হিলারির ডেলিগেট ভোটের সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৩। অন্যদিকে স্যান্ডার্সের সংগ্রহ ১ হাজার ১৮০। ডেমোক্রেট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেতে এখন হিলারির প্রয়োজন আরো ৪৯০ জন ডেলিগেটের সমর্থন, যেখানে স্যান্ডার্সের দরকার আরো ১ হাজার ২০৩ ডেলিগেটের সমর্থন। তাই হিলারীই প্রাইমারীতে জিতে আসবেন-এটা প্রায় নিশ্চিত।
নিউইয়র্কে রিপাবলিকান দলে, ৮৯ টি ডেলিগেট ভোট পেয়েছেন ট্রাম্প। ক্যাসিচ ৩টি ডেলিগেট ভোট পেলেও এ প্রাইমারি থেকে ক্রুজ একটি ডেলিগেট ভোট আদায় করতে পারেননি। সব মিলিয়ে এখন ৮৪৫ জন ডেলিগেটের সমর্থন রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। অপরদিকে, টেড ক্রুজের রয়েছে ৫৫৯ জন ডেলিগেটের সমর্থন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ক্যাসিচের রয়েছে ১৪৭ জন ডেলিগেটের সমর্থন। প্রার্থী হতে ট্রাম্পের আরো ৩৯২ ও ক্রুজের আরো ৬৭৮ ডেলিগেট ভোটের প্রয়োজন।
জানা দরকার কারা এই ডেলিগেট । ডেলিগেট তারাই যারা মূলত আমেরিকান রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন। যারা প্রকৃতপক্ষে নিয়ন্ত্রিত হন বড় বড় ধনকুবেরদের দ্বারা।
রিপাবলিকানরা যুদ্ধবাজ দল। এরাই অস্ত্রব্যবসার নামে মিসাইল ফেলে যত্রতত্র। তা আমরা অতীতেও দেখেছি। তাই এসব অস্ত্রব্যবসায়ীরা কি মরিয়া হয়ে উঠেছেন ?
তা দেখার জন্য নভেম্বর পর্যন্তঅপেক্ষা করতে হবে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলোও বেশ বিতর্কিত। তিনি তার পরিকল্পনায় জানিয়েছেন-মেক্সিকো এবং আমেরিকার মাঝখানে উঁচু প্রাচীর তোলা হবে। তার মতে, মেক্সিকোর যারা আমেরিকায় আসে তারা হয় ড্রাগ ডিলার নয়ত ধর্ষক এবং ক্রিমিনাল।
জটল বিতর্ক আছে ট্রাম্পের ‘মুসলিম-নীতি’ নিয়ে। ট্রাম্প মুসলিমদের আমেরিকায় প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ৯/১১-এ টুইন টাওয়ার আক্রান্তহওয়ার পর আরব-আমেরিকানরা উল্লাস প্রকাশ করেছে। অবশ্য তার কথার প্রমাণ তিনি দিতে পারেননি। আমেরিকার কোনো সংবাদমাধ্যম এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তিনি বলেছেন, আমেরিকায় বসবাসকারী সকল মুসলমানদের নজরদারিতে রাখা হবে। এমনকি মসজিদগুলোকেও ছাড় দেয়া হবে না। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নয়; বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে জঙ্গি বা উগ্রপন্থীরা আছে সেখানে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে।
তিনি বলেছেন, অবৈধ অধিবাসীদের ফেরত পাঠানো হবে। কেবলমাত্র তারাই আমেরিকার পরিচয়পত্র পাবে, যাদের জন্ম সে দেশে। চীনের বাণিজ্যিক নীতি পরিবর্তনে তিনি কাজ করবেন। তিনি বলেছেন – চীনের কাজের পরিবেশ সৃষ্টি ও মজুরি বৃদ্ধিতে চাপ প্রয়োগ করবেন।
আমেরিকানদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন- যারা বছরে ২৫ হাজার ডলারের নিচে আয় করেন, তাদের কর দিতে হবে না। সেই সঙ্গে তিনি বাণিজ্য-কর ১৫% এ নামিয়ে আনবেন।
হিলারীর রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়েও কথা হচ্ছে মার্কিনী সমাজে। অনেকে মনে করছেন- হিলারী মানেই বিল ক্লিনটনের শাসন। নবরূপে আসবেন বিল ক্লিনটনই আবার হোয়াইট হাউসে।
তবে হিলারীকে যে বিষয়টি নিয়ে এখনও কাটখড় পোহাতে হচ্ছে তা হলো তার ইমেল কেলেংকারি। হিলারি সেক্রেটারি অব স্টেটের দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তিগত ইমেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সমালোচনার মুখে পড়েন।বিরোধী রিপাবলিকানরা বিষয়টি লুফে নেন। তার ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহারের বিষয়ে তীব্র সমালোচনামুখর হন রিপাবলিকান দল। বিতর্কের কারণে তার ব্যক্তিগত সার্ভার থেকে ইমেইল নিয়ে এ পর্যন্তমোট ৫২ হাজার পৃষ্ঠা প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ প্রকাশ করা হয় ৩ হাজার ৮০০ পৃষ্ঠা। হিলারির ব্যক্তিগত ইমেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি তৈরি করেছে কিনা, কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা তা খতিয়ে দেখেন। সেই ঘোর এখনও কেটে যায় নি।
তবে ডেমোক্র্যাটরা এসব পেছনে গেলে শান্তিখুঁজছেন। তারা চান- আমেরিকা যুদ্ধবিহীন কাল যাপণ করুক। সে কারণেই শেষ পর্যন্তআবারও ডেমোক্র্যটদের জয়ের বিষয়ে তারা আশাবাদি।
আমাদের মনে আছে, আল গোর অনেক গণভোট বেশি পেয়েও জিততে পারেন নিজর্জ বুশ জুনিয়রের সাথে। কারণ ইলেট্রোরাল ভূতগুলোতে থেকেই যাচ্ছে ! তাই সেই অদৃশ্য শক্তি কা’কে ক্ষমতায় বসায় তা দেখার জন্য নভেম্বর পর্যন্তআমাদের অপেক্ষা
করতেই হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here