প্রবাসীর কহতব্য যাহা

।। আহমেদ মূসা ।।

আজ থেকে ১৬২ বছর আগে, আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সিয়াটলে বসবাসরত আদিবাসীদের নির্দেশ দেন তারা যেন তাদের নিজেদের বসতি সিয়াটল ছেড়ে ছেড়ে চলে যায়। কেননা সেখানে তৈরি হবে আধুনিক সভ্য শহর। তখন সিয়াটলের আদিবাসীদের সর্দার আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে একটি চিঠিটি লিখে ছিলেন যার ঐতিহাসিক মূল্য আজো অপরিসীম। চিঠির একাংশে লেখা হয় :
‘একথা আমরা জানি যে পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি। মানুষই পৃথিবীর। আমরা একথা জানি। প্রতিটি জিনিসই একে অন্যের সাথে

আহমেদ মূসা, উপদেষ্টা সম্পাদক সাপ্তাহিক বর্ণমালার
আহমেদ মূসা, উপদেষ্টা সম্পাদক সাপ্তাহিক বর্ণমালার, নিউইয়র্ক

বাঁধা, যেমন রক্তের সম্পর্ক একটা পরিবারের লোকদের বেঁধে রাখে। সবকিছুই একে অন্যের সাথে বাঁধা।’
আদিবাসী শব্দটি শুনলেই আমরা আদিমতার গন্ধ খুঁজি। কিন্তু সিয়াটলের সেই রেড-ইন্ডিয়ানের মন্তব্যে এমন কিছু ছিল যা আজকের অনেক বড় লেখক-দার্শনিকের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। চিঠির আরেকটি অংশ তুলে ধরছি ঃ
‘আমরা জানি শাদা মানুষেরা আমাদের ধরন-ধারণ বোঝে না। তাদের কাছে পৃথিবীর এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের কোন তফাৎ নেই। কেননা সে ভিনদেশী। রাত্রির অন্ধকারে আসে, নিজের যা দরকার মাটির কাছ থেকে কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে যায়। এই ধরিত্রী তার আত্মীয় নয়, তার শত্রু। সে একে জয় করে, তারপর ফেলে দিয়ে যায়। সে পিছনে ফেলে দিয়ে যায় তার নিজের পিতার কবর, কিছুই মনে করে না। নিজের সন্তানদের কাছ থেকে পৃথিবীকে সে চুরি করে, কিছুই তার মনে হয়না। আমরা তোমাদের দিয়ে যাব আমাদের জমি, আমাদের বাতাস। মনে রেখো, এই বাতাস, এই জমি আমাদের কাছে মূল্যবান, কেননা জন্তু-গাছ-মানুষ, সবার নিঃশ্বাস এই একই বাতাসের মধ্যে ধরা আছে। যে বাতাস আমাদের পূর্ব-পুরুষের বুকে তার প্রথম বাতাসটি দিয়েছিল, সেই তার শেষ নিঃশ্বাসটিকে ধরে রেখেছে।’
পড়ে খুবই আলোড়িত হয়েছিলাম। একই ধরনের আলোড়ন অনুভব করেছিলাম রুটস, আঙ্কেল টমস কেবিন, বিউরি মাই হার্টস ইন দ্য ওন্ডেড নি-র মতো বইগুলি পড়ে। আমেরিকা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান দেশ। এরা জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কতো কিছুই না দিয়েছে বিশ্বকে। নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে স্বপ্নের দেশে। প্রতিটি উত্থান-স্পন্দনের পেছনেই থাকে কতো না অশ্রু, কতো দীর্ঘশ্বাস। কে মনে রাখে তাদের কথা।
বিপ্রদাস বড়–য়ার অনুবাদ করা এই চিঠিটি আমি পড়েছি তিন বছর আগে। কিন্তু তারও দুই যুগ আগে ঢাকা প্রেস ক্লাবের সামনে একটি ‘অনশন’ আমাকে খুবই আলোড়িত করেছিল। তখন ও পি ওয়ানের যুগ। কিছু তরুণ ও পি ওয়ানের কোনো এক ত্রুটির কারণে আমেরিকার ভিসা না পাওয়ায় ভিসার দাবিতে এই অনশন করছিলেন। মূলত তারা দেশ ছাড়ার জন্য অনশন করছিলেন। কারণ জীবিকার জন্য অন্যান্য দেশে যাওয়া আর ইউরোপ-আমেরিকায় যাওয়া এক কথা নয়। অল্প ব্যতিক্রম ছাড়া ইউরোপ-আমেরিকায় সবাই আসেন বসবাসের জন্য। অবশ্য অন্যদেশগুলি, বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর দাবিদাররা অন্যদেশের মুসলমানদেরও নাগরিকত্ব দিতে আগ্রহী নয়। (তাদের কেউ কেউ গরীব দেশের মুসলমানদের মিসকিন বলতেও কসুর করেন না।)
তখন আমেরিকায় আসার চিন্তাও আমার মাথায় ছিল না। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এরপর থেকেই আমাকে তাড়িত করেছে, যে, তাহলে মানুষের দেশ আসলে কোনটি? যে ভূ-খন্ডে মানুষ জন্ম নেয়? যে ভূ-খন্ডে বসবাসের স্বপ্ন দেখে? কিংবা যে ভূ-খন্ডের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক চৈতন্যের সাযুজ্য বেশি? এ প্রশ্নের উত্তর খুবই জটিল। কিন্তু গড়পরতা হিসেবে আমার সবসময়ই মনে হয়েছে যে, এই পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি মাটিতে প্রতিটি মানুষের অধিকার থাকা উচিত। ‘তাহলে বর্ডারগুলির কি হবে,’ এই প্রশ্ন কেউ আমাকে করলে আমি বলবো, ‘বর্ডারতো আমি বানাই নি; যারা বানিয়েছেন তারা এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে পরামর্শও করেন নি, করলে আমি বারণ করতাম।’
যা হোক, একদিন হয়তো পৃথিবীর তাবৎ সংগ্রাম বর্ডারবিহীন দুনিয়ার লক্ষ্যেই পরিচালিত হবে। অনশনের সেই তরুণরাও সেদিন সেই আওয়াজই তুলেছিলেন। আজ আমরা ‘ডাক্তার উইদআউট বর্ডার’ বা ‘জার্নালিস্ট উইদআউট বর্ডার’ প্রভৃতি সংগঠন দেখতে পাচ্ছি। এগুলিই একদিন আরো সম্প্রসারিত হবে। যুদ্ধ-বিরোধী সংগঠন ‘কোড-পিঙ্ক’-এর আয়োজনে ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পৃথিবীর প্রায় ৬০০ নগরের ১২ মিলিয়ন মানুষ যুদ্ধ-বিরোধী অভিন্ন স্লোগানসহ রাস্তায় নেমে এসেছিল। মানুষের এই ঐক্য আরো নিরেট-মহৎ রূপ নিবে একদিন। তখন হয়তো আজকের আমরা থাকছি না। নাই বা রইলাম। আমরা যখন ছিলাম না, এই জীবন-জগতের কোনো অসুবিধাতো হয়নি। আজকে বরং আজকের কথাই বেশি করে বলি না কেন? একজন প্রবাসীর জমাখরচের খাতায় ডলারের সাথে-সাথে অনেক কথাও থাকে। কিছু কথা ‘কহতব্য’; কিছু কথা ‘কহতব্য নহে।’ আবার একটি ছেলে বা মেয়ে ভাই-বোনের কাছে যে সত্যটি বলে সেটি আড়াল করে বাবা-মায়ের কাছে। মধুর মিথ্যায় সুখে রাখতে চায় জনক-জননীদের।
আমেরিকা অভিবাসীদের দেশ। ল্যান্ড অব ইমিগ্র্যান্টস। কেউ হয়তো এক দশক আগে এসেছেন, অন্যরা হয়তো এক-দেড়শ, কেউ বা এসেছেন তিন-চারশ বছর আগে । এটাই পার্থক্য। কিন্তু আমাদের এটাও ভুলে যাওয়া উচিত নয়, পৃথিবীতে আমেরিকাই একমাত্র ইমিগ্র্যান্টদের দেশ নয়। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ইমিগ্র্যান্টদের হাতেই গড়া। ভারতবর্ষে ক্রমান্বয়ে এসেছে আর্য, গ্রিক, হুন, আবির, কুষাণ এবং তুর্কি-পাঠান-মোগল-ইংরেজ। এটাকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘এই ভারতের মহামানবের তীরে’। তিনি ভারতবর্ষকে ভালোবাসতেন এজন্যই, নিছক জন্মস্থান হিসেবে নয়। সবাইকে নিয়েই সে সভ্যতা।
আমাদের আজকের যে বাংলাদেশ, তারও রয়েছে অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়ার সুমহান ঐতিহ্য। অহিংস ধর্মের অনুসারী বৌদ্ধদের ওপর প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন স্থানে যখন হত্যাযজ্ঞ ও আক্রমণ শুরু হয় তখন বৌদ্ধদের বিরাট অংশ আশ্রয় নেয় পুন্ড্র-গৌড়-বরেন্দ্র,-বঙ্গ-সমতট-হরিকলে, যার সমন্বিত রূপ এখনকার বাংলাদেশ। অহিংস বৌদ্ধ ধর্ম প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে যখন বিলুপ্ত-প্রায় তখন ভারতবর্ষের পূর্ব প্রান্তের আমাদের অঞ্চলে সগৌরবে বিরাজিত ছিল। শাসক হিসেবে পাল-খড়গদের কথা সুবিদিত। পরবর্তীকালের তুর্কি-পার্সী-পাঠান-মোগলদের আশ্রয় নেওয়ার পরিসংখ্যানও কম নয়। অন্যদিকে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে আজকের উপজাতিরা বিতাড়িত হয়ে এসেছিল থাইল্যান্ড, বার্মা ও আরাকান থেকে। বাংলাদেশের আদিবাসী বলতে যাদের বোঝায় তারাও ভারতের নানা প্রান্ত থেকে আসা। মূলত বাংলাদেশে বাঙালীরাই হচ্ছে প্রকৃত আদিবাসী ।
আমরা মূলত সেই ইমিগ্র্যান্ট ঐতিহ্য থেকেই আরেকটি ইমিগ্র্যান্ট ঐতিহ্যে এসেছি। এ যাত্রা শুধু একটি দেশ থেকে আরেকটি দেশে নয়, একটি ঐতিহ্য থেকে আরেকটি ঐতিহ্যে যাত্রা। বাংলাদেশের দারিদ্র্যের ইতিহাস দেড়-দু’ শ’ বছরের মাত্র। এর আগের হাজার-হাজার বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধি ও অভিবাসী-বাৎসল্যের। বরং শাদা চামড়ার লোকেরা ভাগ্য গড়তে যেতো আমাদের ভূ-ন্ডে। আমাদের সভ্যতা যদি কারো জন্য বুক বিছিয়ে দিতে পারে, অন্য সভ্যতা কেন আমাদের জন্য বুক বিছিয়ে দেবে না?
আড়াই থেকে চার-সাড়ে চার হাজার বছর আগের পর্বে ভারতবর্ষ ও চীন ছিল উচ্চতর সভ্যতার জনপদ। আমেরিকার তখন খবরই নেই; ইউরোপ তখন মেয়েদের ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারে। আরবরা মেয়েদের জ্যান্ত করব দেয়। ভারতবর্ষেই সে-সময় গৌতম বুদ্ধ সভ্যতার প্রথম রক্তপাত-বিরোধী মানুষ হিসেবে আবির্ভুত হন, অহিংস ধর্ম নিয়ে। জৈনরা একটি পিঁপড়াকেও হত্যা করতেন না। সম্রাট অশোক এমনকি পশু-পাখির চিকিৎসার জন্যও হাসপাতাল করেছিলেন। সেই সভ্যতার উত্তরাধিকার-অংশীদারদের এখন শরীরের কালো বা শ্যামল রঙ এবং পাসপোর্টের সবুজ রঙের জন্য কতোই না বিড়ম্বনা পোহাতে হয়, বিশ্বদরবারের ঘাটে-ঘাটে।
আমেরিকার সঙ্গে আমাদের আরেকটি ক্ষেত্রেও মিল আছে। এরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে, আমাদেরকেও একসময় বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে স্বাধীনতার জন্য। পরে লড়তে হয়েছে পাকিস্তান নামক একটি নিকৃষ্ট দেশের বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। দু’বারই আমরা বিজয় লাভ করেছি।
আমেরিকায় জীবন ঠাসা খাদ্যে, বিনোদনে, বিজ্ঞাপণে আর উদ্বেগে। যুক্তরাষ্ট্র দরিদ্র নয়, কিন্তু দেশের ভেতর দরিদ্র অসংখ্য। এখানকার দরিদ্রদের কষ্ট আমাদের দরিদ্রদের চেয়ে কম নয়। কষ্টের আলাদা কোনো মাতৃভাষা নেই। প্রবল তুষার ঝড়ের সময়ও, প্রচন্ড শীত ও বাতাসে যখন হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেয়, তখনো বাসের জন্য মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। দুর্যোগ যতো বাড়ে বাসের সংখ্যা কমে যায়। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও অনুযোগ নেই। বাসস্ট্যান্ডে ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখা গেল এক সঙ্গে দু’টো তিনটে বাস এসে গেছে। এ নিয়েও প্রশ্ন নেই, হৈ চৈ নেই। সিস্টেম নামের কলের ধম দেওয়া পুতুল যেন এক একজন।
অনেক মানুষেরই বিশ্রামের সময় যেটুকু, তার বেশির ভাগ চলে যায় বিজ্ঞাপণ দেখতে-দেখতে ও পড়তে- পড়তে। ঘরে ঘরে আসে বিজ্ঞাপণের বান্ডিল, মূল্যহ্রাসের বান্ডিল। গরীবেরও জীবনযাপনে এতো বেশি দ্রব্য লাগে যে, বিজ্ঞাপণ তাদের বিশ্রাম ও সৃজনীশক্তি মুড়িয়ে ফেলে। এর থেকে নিস্তার নেই। সবাই ছুটছে আর ছুটছে। আবার এরাই বেশি পড়ছে, জীবন-জগৎকে দিচ্ছে নানা মহার্ঘ আবিষ্কার।
মাঝে-মাঝে মনে হয় বৈষম্যই যেন মানবগ্রহের নিয়তি। আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্যে ধনী ও গরিবের ব্যবধান বেড়ে চলেছে। ১৯৮৯ সালের পর এত ব্যাপক মাত্রার অসমতা আর দেখা যায়নি। ৪৩টি অঙ্গরাজ্যে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। নেভাদায় এ হার বাড়ছে হু হু করে। সবচেয়ে বেশি মাত্রার অসমতা দেখা দিয়েছে নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, সিকি শতাব্দী আগে ধনী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অর্জন ব্যবধান যা ছিল, তা এখন বেড়ে গেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়, ভালো শিক্ষার্থীদের আয়ও হয় ভালো। তাই গরিবরা আরও গরিব হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ৮৫ ব্যক্তির কাছে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যার সম্পদের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে। এর পমিাণ ১ দশমিক ৭০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার । ‘ওয়ার্কিং ফর দ্য ফিউ’ শিরোনামের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একটি দ্বিতল বাসে খুব সহজে ধরবে এমনসংখ্যক মানুষের সম্পদের পরিমাণ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, এটা একুশ শতকের বিস্ময়।’
বৈষম্য থেকে মানুষের মুক্তি কবে আসবে? বর্তমান আমেরিকার মূল সুর অসাম্য-বিরোধী। ওয়ালস্ট্রীট অকুপাই আন্দোলনের জনপ্রিয়তা এর প্রমাণ। আপাতত এরা সরে গেলেও একটা হেস্তনেস্ত না হওয়া পর্যন্ত এই শক্তি ঘুরে-ফিরে আসবে বলেই আমার অনুমান ।
আমেরিকা আইন তৈরি করে অনেক চিন্তা করে এবং প্রয়োগ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমেরিকার ভেতরে আইনগত অধিকারের দিক থেকে একজন সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে দেশের প্রেসিডেন্টের পার্থক্য নেই। আমেরিকা প্রতিষ্ঠা করেছে ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব যা গণতন্ত্রের মর্মবাণী। এখানে ভোট মানেই গণতন্ত্র নয়, গণতন্ত্রের একটি উপাদান মাত্র। তাই ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যেতে রাষ্ট্র খুবই তোয়াজ করে। তারপরও কাস্টিংভোটের হার খুবই কম। এ ধরনের গণতন্ত্র বিলাসিতা এদেরই মানায়। এখানে যার কিছুই নেই তাকেও পেটের অন্ন, বসবাসের আচ্ছাদন, শীতে উষ্ণতা, গরমে শীতলতা, রোগের পথ্য জোগানের দায় সরকারের। সে কারণে সরকার আইন-মাণ্যতা জোর করেও আদায় করতে পারে। সমাজতন্ত্রকে এরা পছন্দ করে না, কমিউনিস্ট শব্দটি শুনলেও আঁৎকে ওঠে। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার কল্যাণরাষ্ট্রের চিন্তাই প্রমাণ করে, অন্তর্গত ভাবে হলেও সমাজতন্ত্রের সঙ্গে এদের একটা লেনদেন হয়ে গেছ্।ে দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি, অভিবাসন-বান্ধব চিন্তা ও স্বাস্থ্যনীতিসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ওবামাকে প্রতিপক্ষরা সমাজতন্ত্রী বলে খোটা দিতেও ছাড়ে না। ওবামার যুদ্ধ এড়াবার চেষ্টাটাও লক্ষণীয়। কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পুনস্থাপন সাহসের প্রমাণ বটে। মানুষের কৃতকর্মের চেয়ে তার ব্যাসিক-এটিচ্যুড কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাঝ-মাঝে আমার এ কথাও মনে হয়, ওবামা আসলে ভবিষ্যতের মানুষ। আমেরিকার গড়পড়তা চিন্তায় ওবামা অনেক বড় ব্যতিক্রম, যদিও পুঁজিবাদের মূল সুরেই তাকে গান গাইতে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমেরিকা আরেকজন ওবামা পেতে কত সময় নেবে বলা কঠিন।
১৬১৯ সালে আফ্রিকা থেকে ধরে আনা প্রথম নিগ্রো দাস আসে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায়। সে সময় থেকে ১৮৩০ পর্যন্ত পাঁচ লাখ আফ্রিকানকে জোর করে দাস বানিয়ে আনা হয় এখানে। আমেরিকার বিনির্মাণে এদের অবদান অতুলনীয়। কি বিভীষিকার জীবনই না গেছে তাদের। এই দাস নিয়েই ১৮৬১ থেকে ৬৫ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে ঘটে রক্তাক্ত সিভিল ওয়ার। প্রাণ যায় ৬ লাখ ১৮ হাজার মানুষের। প্রেসিডেন্ট লিংকন বিদ্রোহী অঙ্গরাজ্যগুলির দাসদের মুক্ত ঘোষণা করেন। কিন্তু আচরণগত বৈষম্য রয়েই যায়। সেই বৈষম্যের অবসান ঘটে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের দীর্ঘ দিনের অহিংস আন্দোলনে। পাশ হয় নাগরিক অধিকার বিল, ১৯৬৪ সালে। ১৯৬৮ সালে হত্যা করা হয় এই মহামানবকে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীকে। এই দুই জনের জীবন ও সংগ্রামে মিল প্রচুর। কি নির্মমই না ছিল দাস প্রথা। রোমের উত্থান এবং পতন দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ছিল এই দাস প্রথার। মানব সভ্যতার দাস-বিরোধী প্রথম মহত্তম সংগ্রামটি ছিল স্পার্টাকাসের।
আর্যরা ভারতবর্ষে দাস প্রথার প্রচলন না করলেও তারচেয়েও জঘন্য ব্যবস্থার প্রচলন করেছিল, যার নাম জাত-পাত। দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও জাত-পাতের বর্বরতা রয়েই গেল ভারতে।
যে দেশে একদিন দাসদের জোর করে ধরে আনা হয়েছিল সেই আমেরিকায় এখন এক কোটি দশ লাখ লোক পালিয়ে এসেছে। এখানে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। তাদের বাস্তব অবস্থাতো একদিক থেকে আলেক্স হেলির কুন্টা কিন্টেদের চেয়েও খারাপ। যে দেশ জোর করে মানুষ ধরে এনেছে সে দেশই এখন আবার কাগজপত্রহীনদের জোর করে বের করে দিচ্ছে। সাত বছরে ২০ লাখেরও বেশি মানুষকে ডিপোর্ট করা হয়েছে আমেরিকা থেকে। অথচ উনিশ শতকের শেষ ভাগেও অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর জন্য এই নিউইয়র্কে আলাদা বন্দর খোলা হয়েছিল।
সম্পন্ন মানুষেরাও কত কারণে হঠাৎ করে হয়ে পড়ে উন্মূল-উদ্বাস্তু। মানুষের অভিবাসনের শেষ নেই, ঠাঁইনাড়ারও ইতি নেই। যুদ্ধ, জীবিকা, নদী ভাঙ্গন, ক্ষুধা ও নয়া স্বপ্নসহ কত কারণেই না মানুষ পরিত্যাগ করে তার পুরোনো ঠাঁই। যদিও মানুষ একটি ঠাঁই থেকে আরেকটিতে যায় মাত্র, আগেরটিকে ছেড়ে নয়, সেটি গেথে থাকে তার বুকে। প্রায়ই কোদাল পড়ে সেখানে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেটি স্বপ্ন দেখে উপজেলা শহরের বাসিন্দা হওয়ার। উপজেলায় যে আছে সে স্বপ্ন দেখে তার জেলা শহরে গিয়ে থাকার। জেলা শহরের বাসিন্দা চলে যেতে চায় রাজধানী ঢাকা শহরে। ঢাকা শহরের মানুষ আসতে চায় আমেরিকায়। আর আমেরিকায় যারা আছে তারা যেতে চায় চাঁদে-মঙ্গলে। একদিন চাঁদে যারা বসবাস করবে তারা ছড়িয়ে পড়তে চাইবে গ্রহ-গ্রহান্তরে। তারায়-তারায় গড়ে উঠবে মিতালী। স্টার-ট্রেক সিরিজটি আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখি। কল্পনার এই জগতকে মানুষ একদিন বাস্তবে টেনে আনবে সন্দেহ নেই। মানুষ এক অনন্ত সম্ভাবনাময় জীব।
২.
একদিন, ১৯৬৪ সালের মধ্য আগস্টের এক ঘুঘু ডাকা বিষণœ দুপুরে দুর্গম এক চর থেকে রওয়ানা হয়েছিলাম ঢাকা শহরে। পেছনে পড়েছিল কাশবন আর ধু ধু বালুর চর। সাথে ছিল দুর্দমনীয় স্বপ্ন আর বিভ্রম। কি ঘোরই না লেগেছিল চোখে। আরও ছিল সজীব তরতাজা একটি ফুসফুস। হায়, কিছুই আর আগের মতো নেই। ছোট্ট কোশায় মেঘনায় সাত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বৈদ্যেরবাজার থেকে লঞ্চে উঠেছিলাম। সে-ই প্রথম যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ। ঘোর লাগা চোখে বুঝতে পারিনি, সেই যন্ত্র চিরকালের জন্য নিয়ে যাবে অন্য জগতে। প্রকৃতির কাছে আর ফিরে যাওয়া হয়নি। গ্রামে গেছি বহুবার, যন্ত্র আর যন্ত্রণা কবলিত হয়ে, কিন্তু সেই আগের ভূমিপুত্র হয়ে আর নয়। যদি ফিরে পেতাম সে ছোট্ট কোশা নৌকাটি, সেই টাইম মেশিনের মতো, প্রকৃতির কাছে আবার ফিরে যাওয়ার জন্য! তাতো হবার নয়, গোটা সভ্যতায় নাড়া দিলেও নয়। আর প্রকৃতিই বা আগের মতো আছে কি? নেই। যন্ত্র তার হৃদপিন্ডে ঘুরছে প্রতিদিন, গাড়ল শব্দসহ।
দুই হাজার দশ সালের উনিশ অক্টোবর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে সহধর্মীনির ডিভি পাওয়ার সুবাদে যখন নিউইয়র্কে আসি, তখনো চোখে ছিল আরেক বিভ্রম। আসার সময় ‘এই ফিরে আসব’ বলে রিটার্ন টিকেট কিনে এনেছিলাম । টিকেট তখন খোলা ছিল। কিন্তু তখন আমি নিজে আর খোলা নই, মুক্ত নই। কত বন্ধন জড়িয়ে গেছে চারদিকে, কতো না ভাবে। সব রিটার্ন টিকেট সবসময় ক্যাশ করা যায় না। এখানকার যন্ত্র আরো শক্তিশালী, আরো নিপুণ। আবার বিভ্রম, আবার সমর্পণ। প্রতিদিন আতিপাতি করে খুঁজি সেই ছোট্ট কোশাটি, যে প্রকৃতির হৃদপিন্ড ছিঁড়ে আমাকে তুলে দিয়েছিল যন্ত্রের পিঠে। গাঁও গেরামের মহাকাব্যিক হাহাকার এখন নস্টালজিয়া মাত্র। এই হাহাকারতাড়িত হয়েই মধুসূদন হয়তো মিনতি করেছিলেন, ‘রেখো মা দাসেরে মনে —-।
আমেরিকা আসার পর কেউ কেউ বলেন, ‘আপনারাও দেশ ছেড়ে দিলে কিভাবে হবে?’ তখন নিজে নিজেই প্রশ্ন করি, আমরা কারা? আমিই বা তেমন কি? কি প্রয়োজনেই বা আসব আর? দেহ ঘড়ি বড় উল্টাপাল্টা টাইম দিচ্ছে যে!
কেউ কেউ বলেন, দেশে যা ছিলেন ভুলে যান। এখন মানিয়ে নিন। যে দেশে যে বাও —-। মনে মনে বলি, দেশেও কেউকেটা কিছু ছিলাম না। ছিলাম সাধারণ মানুষ। কৃষিকাজ, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি করেছি। করেছি চুক্তিভিত্তিক আমলাপনাও। কিন্তু সব কিছুই সাধারণ মানুষের কাতারে থেকে। অসাধারণ কখনো হতে চাইনি, এখনো চাই না।
আমরা এসেছি বিশ্বের দরিদ্র দেশের একটি থেকে, এসেছি বিশ্বের সমৃদ্ধ ও সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে। এই আগমন ধারাবাহিক বিকাশ নয়, উল্লস্ফন। তাল মেলানো তাই হয়ে ওঠে না।
আমাদের দেশটাকে যারা সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যেতে পারতেন সেই নেতাদের আমরা খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছি, আমাদের বীরদের মেরে সাফ করেছি। এখন আছে ‘নেতৃত্ব ও বীরত্বের’ অবশিষ্ট সমূহ – সামন্ত অবশেষের মতো। তাই গণতন্ত্র ফাই-ফরমাস খাটে অবশিষ্টসমূহের।
প্রবাসে এক-একজন বাংলাদেশী মানে এক-একখন্ড বাংলাদেশ। তার হৃদয় কাদামাটির জমিন। তার উচ্ছ্বাস বাংলাদেশের পতাকা, তার উচ্চারণ মহান একুশে ফেব্রুয়ারী।
আর প্রবাসে বাংলাদেশিদের দলাদলি-রেষারেষি? সেও তো বাংলাদেশেরই প্রতিবিম্ব। বাংলাদেশ বদলালে তারাও বদলাবে। বাংলাদেশ বদলাচ্ছে, তারাও বদলাবে। সে আশায় বসে থাকা আর কি! একসাথে বসবাস করতে গেলে দ্বিমত, বিতন্ডা, দলাদলি থাকবেই। কিন্তু মাঝে মাঝে বড্ড মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগপন্থী ও আওয়ামী লীগ বিরোধীদের মধ্যেই সব ধরনের দ্বন্দ্ব। হয় মারামারিও। এটা আবার একই দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যেও হয়ে থাকে। পুলিশ এসে নিরস্ত করে তাদের। আর কোনো দেশের প্রবাসীদের মধ্যে এই লজ্জাজনক ঘটনা ঘটতে দেখা যায় না। বাংলাদেশের সরকার প্রধানরা এখানে এলে সদর দরজা দিয়ে বের হতে পারেন না। তাদের আসা-যাওয়া করতে হয় পেছনের দরজা দিয়ে, পুলিশের সাহায্য নিয়ে। বড়ই বিচিত্র!
(আমার বিভিন্ন লেখার অংশবিশেষের ঘষামাজাকৃত রূপের লেখাটি ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির ‘বাউল শাহ আব্দুল করিম উৎসব ও সিতারা বৈশাখী মেলা’র ‘বসন্ত বাতাসে’ স্মারক গ্রন্থ থেকে নেয়া। পুনর্মুদ্রণ, আমাদের (নিউইয়র্ক, ১৮ এপ্রিল ২০১৬)
লেখক সাপ্তাহিক বর্ণমালা‘র উপদেষ্টা সম্পাদক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here