কারা খেলছে, কারা বাঁশি বাজাচ্ছে

।। ফকির ইলিয়াস।।

 

ফকির ইলয়াস
ফকির ইলয়াস

একটি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, তার নিজ রাষ্ট্র নিয়ে কেউ খেলছে, তখন আমাদের না ভেবে উপায় থাকে না। কারা এই খেলোয়াড় ? কি তাদের পরিচয়?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এমনটিই বলেছেন। তিনি জানাচ্ছেন-
“অনেকে চাইবে, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস আছে দেখিয়ে দেশটাকে নিয়ে খেলতে। আমি বেঁচে থাকতে এই দেশকে নিয়ে কাউকে খেলতে দেব না,”।
একটা বিষয় বুঝা গেল- এই ‘অনেকে’ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবগত। যদি তাই হয়, তবে তিনি ও তার সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন ? কেন এদের তথ্য জানাচ্ছেন না দেশের মানুষকে।
দেশে এখন একটি স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে গণমানুষের অংশগ্রহণ নেই। তাহলে কারা এই যুদ্ধ করছে ? করছেন রাজনীতিকরা। জনগণ শুধুই সকল ঘটনার শিকার বড় নির্মমভাবে।
দেশের সচেতন লেখকরা এসব বিষয় নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই লিখছেন।কেউ কি তােেদর কথা শুনছে? না শুনছে না। বরং ক্ষমতাসীন সরকারের কোনো কোনো নীতিনির্ধারক বলছেন- অনলাইনের সুবিধা নিয়ে যে কেউ যা ইচ্ছে লিখছে। তা আমাদের পড়তে হবে কেন ?
একটি বিষয় সামান্য বলি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আসছে নভেম্বরে। এ সময়ে বদলে যাবে হোয়াইট হাউসের চেয়ার। এ নিয়ে এদেশের সাংবাদিকরা প্রায় প্রতিদিনই লিখছেন বিভিন্ন মিডিয়ায়। কারো লেখা রিপাবলিকানদের পক্ষে যাচ্ছে। কারো লেখা ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাচ্ছে। মজার কথা হচ্ছে- দুই দলের নীতি নির্ধারকরা কিন্তু এসব কথাকে ‘কী ওয়ার্ড’ হিসেবে নিচ্ছেন। ডেলিগেটরা সাত-পাঁচ ভাবছেন এসব লেখাকে ঘিরেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি লেখকদের গুরুত্ব আছে ? হয়তো আছে। কিন্তু তা খুবই ক্ষীণ।
দেশে এখন যে সামাজিক অরাজকতা চলছে- সেই সুযোগে একটি মহল নিজেদের হীন স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত আছে। কেউ পুরনো শত্রুতার জেরে খুনের ইন্ধ দিচ্ছে। কেউ দল পাল্টে আর্থিক সুবিধার জাল বিস্তার করছে। কেউ ক্ষমতাসীনদের আভ্যন্তরিন কোন্দলকে উসকে দিচ্ছে।
একটি মহল জাতি,ধর্ম,গোত্রের বিরুদ্ধে লেখালেখি,পেশী,অর্থের প্রভাব খাটিয়ে নিজ স্বার্থ হাসিল করছে। দেখা যাচ্ছে, জীবনে ভালো একটি কলামও লেখেনি- অথচ বিদেশে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইছে কেউ কেউ। যারা দেশের, সরকারের, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই সাক্ষী দিচ্ছে বিদেশে। আসলে কি এরা ভুক্তভোগী- সে প্রশ্ন তার নিজ সতীর্থরাই রাখছেন মিডিয়ায়।
বাংলাদেশে মুক্তমনা লেখক, ব্লগার ও প্রকাশক হত্যাকান্ডে জাতিসংঘের তদন্ত দাবি করেছে ষোলোটি মানবাধিকার সংগঠন।এগুলো হলো- পেন আমেরিকা, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিশার্স ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিডম টু পাবলিশ কমিটি, কানাডিয়ান জার্নালিস্ট ফর ফ্রি এক্সপ্রেশন, সেন্টার ফর এনকোয়ারি, সিটি অব এসাইলাম পিটসবুর্গ, আইকর্ন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট, ইংলিশ পেন, ইউরোপিয়ান হিউম্যানিস্ট ফেডারেশন, ফ্রিডম হাউস, ফ্রিমিউজ, হেগ পিস প্রোজেক্ট, হিউম্যান রাইটস ফার্স্ট, ইনডেক্স অন সেন্সরশিপ, ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিস্ট অ্যান্ড এথিকাল ইউনিয়ন, ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস) ও পেন বাংলাদেশ।
যে বিষয়টি না বললেই নয়, তা হলো বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ইমেল,ফোন,ফ্যাক্স আসছে বিদেশে বাংলাদেশের না না বিষয় সম্বলিত। এর অধিকাংশই বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সরকারের ভালো করেই জানার কথা- তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বসে নেই। তারা একই বাঁশি প্রতিদিনই বাজাচ্ছে। যা দেশের উন্নয়ন,সামাজিক শান্তি, ধর্মীয় অনুশাসন,সম্প্রীতি-সবকিছুরই বিপক্ষে যাচ্ছে। ফলে, মাঝে মাঝেই বিদেশ থেকে ‘বড়কর্তা’রা বাংলাদেশে গিয়ে না না বিষয়ে নাক গলাবার সুযোগ খুঁজছেন।
একটি বিষয় জানিয়ে রাখি, বাংলাদেশের কোনো ইস্যু নিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে ফোন করলে যে উত্তর আসে- তা হলো, বাংলাদেশের সকল সমস্যা বাংলাদেশের গণমানুষকেই সমাধান করতে হবে।কথা হচ্ছে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের চৌকস মন্ত্রী-উপমন্ত্রীরা বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছেন কেন?
সম্প্রতি আবারও সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।
সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে সহায়তার জন্য নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তাদের বিশেষজ্ঞ রয়েছে। সন্ত্রাস মোকাবেলায় অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সহায়তা দেয়ার কথাও বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে এই সফরকে ঘিরে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দলতো অনেক কথাই বলছে। তাদের কেউ কেউ এটাও বলতে চাইছেন-‘আমেরিকা খুব সহসাই তাদের হাতে তুলে দেবে !’ আবার কেউ কেউ বলছেন- আমেরিকার সাথে আঁতাত করেই এই সরকার টিকে আছে !
বিদেশে যড়য়েন্ত্রর কথা বললে আবারও যে কথাটি আসবে তা হলো- সিঙ্গাপুরে জঙ্গী সন্দেহে আটকদের বিষয়টির কথা। এবছরের জানুয়ারিতে সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ জন বাংলাদেশীকে জঙ্গী সন্দেহে গ্রেফতার করে দেশে পাঠানো হয়। প্রকাশিত সংবাদ থেকে না যায়- তারা আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) এর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গোপন বৈঠকে মিলিত হতেন । জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে জঙ্গী হামলার পরিকল্পনা ছাড়াও আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জন্য জঙ্গী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সিঙ্গাপুরে গোপন বৈঠকে মিলিত হতেন সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশের নাগরিক জঙ্গী সন্দেহে আটককৃতরা। এসবও বেরিয়ে আসে পুলিশি তদন্তে।
গত ৩ মে ২০১৬ সিঙ্গাপুরে জঙ্গী সন্দেহে তেরো বাংলাদেশীকে আটক করা হয়েছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে তথ্য জানানো হয়।একই সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে গেল এপ্রিলে আটক হওয়া বাংলাদেশীদের নাম পরিচয়ও।
ঐ ওয়েবসাইটে বলা হয়-আইএসবির এই সদস্যরা বিদেশী যোদ্ধা হিসেবে আইসিসে যোগ দিতে ইচ্ছুক ছিল।কিন্তু সিরিয়ায় যাওয়া কঠিন হবে বলে তারা পরিকল্পনা করে যে তারা বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে় সেখানকার নির্বাচিত সরকারকে সশস্ত্র পন্থায় উৎখাত করে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং তাকে আইসিসের খেলাফতের অধীনে নিয়ে় আসবে, এমন অঙ্গীকার করেছিল।
এতে দাবি করা হয়, দেশে ফিরে আইএসের খেলাফত প্রতিষ্ঠায় সন্ত্রাসী হামলা, গুপ্তহত্যার মাধ্যমে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা ছিলো তাদের। এদিকে, জঙ্গী সন্দেহে এর আগে সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত পাঠানো, আরও পাঁচজনকে রাজধানী থেকে আটক করেছে পুলিশ।
সব হিসেব মিলিয়ে দেখলে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়- এসবের নেপথ্য কলকাঠি কেউ না কেউ নাড়ছে ? এরা কারা ? সরকার কি ওদের তালাশ করতে তৎপর ? কতটা তৎপর ?
রাষ্ট্রের চারদিকে অশনি সংকেত। এই সংকেত কি রাষ্ট্রপ্রধানের চোখে আলো ফেলছে? এ প্রশ্ন আপামর শান্তিকামী মানুষের। কারণ মানুষ যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে
একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন- সেই ছটা থেকে দেশ যেন সরে যাচ্ছে।
কেন সরে যাচ্ছে, এর দায় কে নেবে- সেই প্রশ্নটিও থাকছে পাশাপাশি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here