নিজামীর রায় কার্যকরে জাতি স্বস্তি পেয়েছে

 

সুব্রত বিশ্বাস
সুব্রত বিশ্বাস

।। সুব্রত বিশ্বাস ।।
নিজামীর নামের আগে মৌলানা উপাধি লেখা নিতান্তই অসঙ্গতিপূর্ণ অন্যায় ও অযৌক্তিক। একজন কুখ্যাত নরঘাতকের নামের আগে এ উপাধি কলঙ্কজনকও বটে। তাছাড়া আদৌ নিজামী মৌলানা কিনা সে প্রশ্নেরও অবকাশ আছে। মুক্তিযুদ্ধে পাক সামরিক বাহিনীর দ্বিতীয় সহযোগী বাহিনী ছিল আলবদর বাহিনী। নিজামী ছিল তখন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি। তাকে প্রধান করে গঠিত হয় আলবদর বাহিনী। তারই নির্দেশে ও পরিকল্পনায় বাঙালিদের ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত হয়।
স্বাধীনতার মাত্র দু’দিন আগে শুরু হয় হত্যায়েজ্ঞর চুড়ান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ। জাতির বিবেক ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পী সাহিত্যিক এসব সূর্য সন্তানদের ধরে ধরে এনে হত্যা করা হয়। তাদের এ হত্যাযজ্ঞ হিটলারের আইকম্যানের নৃশংস ঘটনাকেও হার মানিয়েছে। একজন হার্টের ডাক্তারকে ধরে নিয়ে তার হার্ট বের করে হত্যা করা হয়েছে। চোখের ডাক্তরের চোখ উপড়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। শিল্পী আলতাফ মাহমুদকে ফুটন্ত পানির মাঝে সমস্ত শরীর চুবানো হয়। এতে তাঁর শরীরে ফুস্কা উঠে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। তাঁর সহযোগী শিল্পী জাহিদের চোখ উপড়ে ফেলা হয়। আজাদকে যে ঘরে রাখা হয়েছিল সে ঘর থেকে দেড়শো জোড়া চোখ উদ্ধার করা হয়। এভাবেই নিজামীর আলবদর বাহিনী তার নির্দেশ পালন ও বাস্তবায়ন করে।
নিজামীর নিজ এলাকা পাবনার সাথিয়ায় নিজে উপস্থিত থেকে গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে হত্যাকান্ড চালিয়েছে। একটি গ্রামেই সাড়ে চারশোজনকে সে হত্যা করে। সম্ভবত ধুবলি নামক স্থানে চল্লিশজনকে গরু জবাইয়ের মতো গলা কেটে কেটে হত্যা করে। সেই চল্লিশজনের মধ্য থেকে অর্ধ গ146961_112591লাা কাটা একজন কল্পনাতীতভাবে বেঁচে যান। সৌভাগ্যবশত তার শ^াসনালী কাটে নাই বলে। তাঁকে ফেলে দিলে সেখান থেকে কোন ভাবে উঠে পাশ^বর্তী গ্রামে আশ্রয় নেন। গ্রামের লোজন তাকে চিকিৎসা দেন। হাসপাতালে নেয়ার সুযোগ ছিলনা। কাথা সেলাইয়ের সুইসূতো দিয়ে তার গলা সেলাই করে বাঁচিয়ে তোলা হয়। নির্ঘাত মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়া সেই ব্যক্তির সাক্ষাৎকার ধারণ করে রেখেছেন খুনী-ঘাতকদের নিয়ে নির্মিত শাহরিয়ার কবীরের ডকুমেন্টারী ছবিতে। মৃত্যুর আগে নিজামীর বিচার দেখে যাবার তার ভীষণ ইচ্ছা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বছর দু’য়েক আগে তাঁর মৃত্যু হয়। ট্রাইব্যুনালের একজন সাক্ষী বলেছেন, এক ব্যক্তিকে জলন্ত সিগারেট দিয়ে তার সমস্ত শরীরে ছেকা দেওয়া হয়। আর নিজামী বসে বসে উপভোগ করেছে। অন্য একটি গ্রামে লোকদের হত্যা করে করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। সেই ফেলে দেওয়া বস্তাবন্দী এক ব্যক্তি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এগুলো নিজামীর হত্যায়েজ্ঞর খন্ড চিত্র মাত্র। সমগ্র বাংলাদেশে সে ও তার বাহিনী এভাবেই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।

দুর্ভাগ্যজনক পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশকে পাকিস্তানী ধারায় চালিত করার অপপ্রয়াস চলে। স্বাভাবিকভাবে চক্রান্তকারীরা খুনীদের হত্যাযজ্ঞ ও অপকর্ম চাপিয়ে রাখার অপকৌশল হিসেবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস প্রচার করে। ফলে নতুন প্রজন্ম তাদের অপকর্ম ও হত্যাকান্ডের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেনি। কিছুটা হলেও জানার এবং উপলব্দি করার সুযোগ হয়েছে যুদ্ধাপরাধী বিচার শুরুর মাধ্যমে। তদন্ত কর্মকর্তাদের সংগৃহীত বিচ্ছিন্ন ও খন্ড খন্ড ঘটনাগুলো তাদেরকে ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী করে তুলেছে। যার বহিপ্রকাশ কাদের মোল্লার রায়ের প্রতিবাদে শাহবাগ চত্বরে গড়ে ওঠে স্মরণকালের গণজমায়েত। সে জমায়েত নতুন করে আরেকবার জাতিকে এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বোদ্ধ করেছে। যেমনটি করেছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের অকৃত্রিম অপসহীন আন্দোলন।

আজকে অনেকেই বলতে শোনা যায় বিচার নিরপেক্ষ হচ্ছেনা। বিচার আন্তর্জাতিক মানের নয়। বিচারে নিরপেক্ষ সুযোগ সুবিধা নেই। অথচ বিচার হচ্ছে স্বাভাবিক বিচারিক নিয়মে। সাক্ষীসাবুদ ও আইনজীবি সবই দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আপিল করার সুযোগ আছে। শাস্তি হলে প্রাণভিক্ষা চাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। রাজার হালে জেলে থাকা হচ্ছে। ইচ্ছেমত জেলের এবং বাড়ীর খাবার খেয়েছে এবং খাচ্ছে। অসুখ হলে নামীদামী হাসপাতালে চিকিৎসা পেয়েছে। এমনকি মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আগে আত্মীয়স্বজন ও পরিবার পরিজন মিলে দেখা সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছে। যদি প্রশ্ন করি যখন আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, সিরাজউদ্দিন হোসেনদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়, মৃত্যুর আগে তাদের মনেও নিশ্চয় ইচ্ছে হয়েছে একটিবার স্ত্রী-পুত্র পরিজনকে দেখার। এক গ্লাস পানি খাবার। যারা সুযোগ সুবিধার প্রশ্ন তুলেন তাদেরকে যদি প্রশ্ন করি, নিজামীরা সেই মৃত্যুপথযাত্রীদের সে সুযোগ দিয়েছিল। তাদেরকে কোথায় কিভাবে হত্যা করা হয়েছে পরিবার জানতে পেরেছিল। না নিজামীরা সে সুযোগ কাউকে দেয়নি। সুতরাং এসব যারা বলেন তারা তাদের হয়েই বলেন। বিচারকে খাটো করতে, ঘটনাকে গুরুত্বহীন করতে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই তাদের এ পক্ষাবলম্বন। দুর্ভাগ্য যে, ৪৫ বছর পর বিচার হচ্ছে বলে আজ একথা তারা বলার সুযোগ ও সাহস পাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, এই কুলাঙ্গার বাহিনী ও তাদেরকে দলকে জাতে তোলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান। জামায়াতের তৎকালীন আমীর গোলাম আযমকে পাকিস্তানী পাশপোর্টে এদেশে নিয়ে আসেন। তাদেরকে ও তাদের দলকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করেন। তাঁর স্ত্রী বেগম জিয়া গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব প্রদান করেন। এখানেই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি। তাদের সাথে জোট করে সরকার গঠন করেছেন। খুনী ও ঘাতক মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদদের মন্ত্রী বানিয়েছেন। জিয়া-খালেদা এবং বিএনপিই তাদের দুধ কলা খাইয়ে, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে পুষ্ট করেছে। শক্তি সঞ্চয় করতে সকল প্রকার সহায়তা দিয়েছে।

আজকে সময় এসেছে যারা এই কুলাঙ্গারদের সযোগী তাদেরকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর। এই কুলাঙ্গারদের যখন শাস্তি কার্যকর হয়েছে তারা তখন নীরব থেকেছে অথবা দুঃখ প্রকাশ করে সহমর্মিতা জানিয়েছে। পাকিস্তানও সে কাজ করেছে। এবারও পাকিস্তান এবং তুরস্ক খুনীদের পক্ষাবলম্বন করে তাদের অবস্থানের জানান দিয়েছে। বাংলাদেশে বিএনপিসহ যারা মাঝে মধ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন তাদেরকেও আজ তাদের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে। বাংলাদেশে আর স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ নেই। রাজনীতি করতে হলে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ পরিত্যাগ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বোদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেই রাজনীতি করতে হবে।

পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। ৪৫ বছর পর বিচারে শাস্তি হলেও এই রায়ের ফলে শহীদ পরিবার অবশ্যই স্বস্তি পেয়েছে। সমগ্র জাতি দায়মক্ত হয়েছে। পরিপূর্ণ দায়মুক্ত হতে হলে শুধু শীর্ষ পর্যায়ের খুনীদের বিচার হলেই হবেনা। দেশব্যাপী ছোট বড় যেসব খুনীরা রয়েছে তাদের বিচার সম্পন্ন করতে পারলেই সমগ্র জাতি দায়মুক্ত হবে। তাদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। নিজামীর শাস্তি হয়েছে বলে আত্মতৃপ্তির অবকাশ দেখিনা। কারণ শাস্তির পর দেশব্যাপী যেভাবে গায়বানা জানাজা হয়েছে তার ইঙ্গিত মোটেই সুখের নয়। সুতরাং আশা করি সরকার এসব বিবেচনায় নিয়ে খুনীদের শেকড় উৎপাটনে আরো কঠোর ভূমিকায় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here