পুত্রের চোখে পিতা, দরজায় কড়া নাড়ছে শওকত জন্ম শতবার্ষিকী

0
169

photo-1463206081আগামী ২০১৭ সালের ২ জানুয়ারি পালিত হবে শওকত ওসমান জন্ম শতবার্ষিকী। আমার জন্ম থেকে মাঝে মাঝে সামান্য বিচ্ছেদ ছাড়া প্রায় সারা জীবন কাটিয়েছি বাবার সঙ্গে। একেবারে বিরোধ যে হয়নি তা নয়, তবে তা সাংসারিক অতি সামান্য ব্যাপার নিয়ে। ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব তেমন একটা ছিল না। কারণ শওকত ওসমান প্রায়ই উচ্চারণ করতেন ছাত্র ও পুত্রের কাছে পরাজিত হওয়ার মধ্যে কোনো গ্লানি নেই। প্রথম সন্তান হিসেবে একটু বেশি আদর পেয়েছি মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। আমরা পাঁচ ভাই আর বোন মাত্র একজন, তাই ছোটবোন লাইলী বা আনফিসা কখনো কখনো বেশি বাৎসল্য অর্জন করেছে। লাইলীকে তিনি ডাকতেন, ‘লেলমা’ বলে। ছোট সন্তান জাঁনেসার ছিল জেনবাবা। সন্তানদের সবাইকে তিনি সমানভাবে স্নেহ করতেন, তত্ত্বগতভাবে মেনে নেওয়া যায়।

পুত্রকন্যাদের নিয়ে তাঁর গর্ববোধ ছিল। তবে আমাদের আলস্যকে তিনি বরদাস্ত করতেন না। অন্তত আমার ব্যাপারে জানি, তিনি নেপথ্যে বলতেন যে আমি খুব আলসে হয়ে গেছি। ভাষণটি অসত্য নয়। বাবা হিসেবে তিনি শুধু যে নিজ সন্তানদের স্নেহ করতেন তা নয়, বন্ধুবান্ধবদের সবার সন্তানকেই তিনি একইভাবে আদর করতেন। তার ছাত্ররা সবাই তার কাছ থেকে পিতৃস্নেহ পেয়েছেন। ভালোমন্দ খোঁজ নিতেন সবার। স্নেহপ্রবণতা তার চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট ছিল। তেমনি ছিল বন্ধুঅন্তপ্রাণ। বিশেষ করে যারা শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাঁদের সব সময় খোঁজ নিতেন সৃষ্টিধর্মী কাজ কেমন চলছে। ছিলেন পাঁড়পাঠক। সুতরাং তরুণদের লেখা পড়ে প্রশংসা করতে কার্পণ্য করতেন না। আবার বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে উপদেশও দিতেন। যেমন আমার সামনেই তিনি একদিন কবি শামসুর রাহমানকে বললেন, তুমি লিরিক লেখ। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের পর ভালো লিরিক কারো হাতে বেরোয়নি।

আজ মনে পড়ছে সবলসিংহপুরের বাসিন্দা দাদা শেখ মহম্মদ এহিয়া ও দাদি গুলেজান বেগমের কথা। কৃতী পুত্রের জনক-জননী হিসেবে ইতিহাস তাঁদের মনে রাখবে। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার অখ্যাত গ্রাম সবলসিংহপুর ভূমিপত্র শওকত ওসমানকে বক্ষে ধারণ করে অবস্থান করবে আরো সবলভাবে পুরো গ্রামবাসী শওকত শতবার্ষিকী পালনের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে।

বাবার জীবন গঠনে একজন নিকট আত্মীয়র কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়, তিনি আমার বড়দাদা শেখ ইমশাদ আলী। কলকাতায় তাঁর অতি ক্ষুদ্র মূলধনের এক কামরার একটা লন্ড্রি ছিল। সবলসিংহপুর জুনিয়র মাদ্রাসা পাস করে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার পড়ার সব খরচ, থাকা-খাওয়া, দিনে এক পয়সা আর টিফিনের পয়সা জোগানো- সবই তিনি করেছেন। ওই একটি কামরায় কাপড়ের স্তূপের পাশে বসে লেখাপড়া ও পরবর্তীকালে সাহিত্যচর্চা করে গেছেন। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে চাচাকে মেমো লিখে সাহায্য করেছেন। করেছেন দু’একটা টিউশনি। তা থেকে মা-বাবাকে সামান্য টাকাও পাঠিয়েছেন। দাদা ছিলেন সংসারবিমুখ হতদরিদ্র এক ব্যক্তি। ১৯৪৮ সালে আমার দুই দাদাই ম্যালেরিয়ায় মারা যান। শেষ জীবনে দাদাকে ছুতোরমিস্ত্রির কাজও করতে দেখেছি।

প্রলেটারিয়েট পরিবারের সন্তান শওকতের ছিল নজরুলবাদি সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক। তাঁর সাহিত্যের কুশীলবরা বেশির ভাগই দরিদ্র। তিনি নজরুলের দারিদ্র্য কবিতাকে মোটেই অ্যাপ্রিসিয়েট করেননি। প্রায়ই বলতেন, দারিদ্র্য শুধু নজরুলকেই মহান করেছে। আর কাউকে নয়। সমাজতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে বুঝি, শওকত ওসমান ছিলেন স্বভাব সমাজতাত্ত্বিক। দারিদ্র্য আসলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীজীবনের জন্য অভিশাপ।

শওকত ওসমান জ্ঞানচর্চায় ছিলেন নিরলস। ফিকশন সাহিত্যের চেয়ে ইতিহাস, অর্থনীতি, নৃতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব ও সমাজতত্ত্বের বই ছিল তাঁর কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪১ সালে এমএ পাস করে সরকারি কমার্স কলেজে বাংলার প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এখানে অভিনেতা উত্তম কুমারকে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন। খুব গর্ব করতেন এই কিংবদন্তি নায়ক নিয়ে। তাঁর অকাল মৃত্যু শওকত ওমানকে খুব ব্যথিত করে।

জয়নুল, কামরুল, সাফিউদ্দীনের মতো শিল্পীরা ছিলেন শওকতের বন্ধু। তিনি কিছু কিছু শিল্পচর্চাও করেছিলেন। বিশেষ করে কালি ও কলমে তাঁর ড্রইং বেশ জোরাল ছিল। প্রচুর পড়াশোনা ছিল শিল্পকলার ইতিহাস ও নন্দনতত্ত্বে। কান্ট, হেগেল, টলস্টয় প্রমুখের শিল্পতত্ত্বের আলোচনা করতেন। বার্ট্র্যান্ড রাসেল ছিল তাঁর প্রিয় দার্শনিক। কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলসের কথা আর নাই বা বললাম।

রুশ সাহিত্য তাঁর খুব প্রিয় ছিল। যেমন ছিল ইরানের কাব্য ও কাহিনী। ফরাসি আর ইংলিশ সাহিত্য তো ছিল ঘরের ব্যাপার।

মাদ্রাসায় লেখাপড়ার পটভূমির দরুণ তাঁর সাহিত্যে আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার প্রচুর। কাজী নজরুল ইসলাম ও সৈয়দ মুজতবা আলীর পর শওকত ওসমান এই ধারার অন্যতম প্রধান ধারক। ভাষা নিয়ে প্রচুর পরীক্ষণ করেছেন। আর্তনাদ উপন্যাসে যতিচিহ্ন ব্যবহারই করেননি।

শওকত ওসমান ছিলেন একজন নির্লোভ ব্যক্তিত্ব। তাঁর অল্প আয়ের মধ্যেও যা পেরেছেন তা মানুষকে দান করেছেন। আর তা করতেন অতি নিঃশব্দে।

মুক্তিযুদ্ধে শওকতের অবদান প্রচুর। এমন কি তিনি ‘চৌ এন লাই-কে’ খোলা চিঠি লেখেন। অর্থাৎ চীন যাতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে। ফলে নকশালদের টার্গেটে পরিণত হন তিনি।

দরিদ্র ঘরের মানুষ হলে কি হবে, শওকত ছিলেন খুব সৌখিন। ছোটবেলায় মামাবাড়িতে দেখেছি সাদা বড় টার্কিশ টাওয়াল ব্যবহার করছেন। সিগারেটও দামি। টিন ভরা-ফাইভ ফিফটি ফাইভ ও জন প্লেয়ার। তা না হলে ক্যাপস্টেন।

গ্রামের চাষি-মজুর ছিল একেবারে বন্ধুর মতো। সিগারেটের টিন এক সিটিংয়ে খালি হয়ে যেত। কম নয়, ৫০টা সিগারেট বলে কথা। অন্তরে ছিলেন ভোলানাথ। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ কি লেখেননি। ছোটদের জন্য ‘কথা রচনার কথা’ আসলে বড়রা বেশি উপকৃত হবে কীভাবে লেখা তৈরি করতে হয় তা জানতে।

দেশভাগের পর শওকত চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। চট্টগ্রামকে তিনি বলতেন, ‘সেকেন্ড হোম’, এতটাই ভালোবেসেছিলেন ওই অঞ্চলটিকে। সংস্কৃতি জগতে চট্টগ্রামে তিনি ছিলেন প্রধান প্রাণপুরুষ।

১৯৫৮ সালে ঢাকায় ঢাকা কলেজে বদলি হয়ে রাজারবাগে বাড়ি করেন শওকত ওসমান। এখানেই কাটিয়েছেন শেষ জীবন পর্যন্ত। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে কলকাতায় কাটিয়েছেন সাত মাস। আবার ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে প্রায় ছয় বছর নির্বাসনে ছিলেন কলকাতায়।

গাড়ি চড়তে খুব ভালোবাসতেন, কিন্তু সারা জীবন গাড়ি কেনার সামর্থ লাভ করেননি। আর হবেই বা কী করে, সামান্য যা রোজগার ছিল দরিদ্র নারায়ণদের দান করে গেছেন। স্বভাবে ছিল না টাকা জমানো।

অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ছিলেন। সামাজিক অবিচারের প্রতি ছিলেন খড়গহস্ত। তাঁর সাহিত্যের মূল সুর ছিল ‘সমাজকে দরিদ্রদের বসবাসযোগ্য করা’। পক্ষপাতিত্ব ছিল নিম্নবিত্তের প্রতি। তবে বিশ্বাস করতেন ধনী-গরিব সব ব্যক্তিমানুষের দুঃখ আছে, ধরন হয়তো ভিন্ন। আর্ট ফর আর্ট’স স্যাকের বিপরীতে ছিল তাঁর অবস্থান।

১৯৯৮ সালের ২৭ মার্চ সেরিব্রাল অ্যাটাকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তা থেকে আর মুক্ত হতে পারেননি। ১৪ মে ১৯৯৮ ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মীরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়ে সমাহিত করা হয়। দেশের প্রায় সব জাতীয় পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন। দেশের সামাজিক ক্রাইসিসে আজ থাঁর মতো ব্যক্তিত্বের বড় প্রয়োজন ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here