যৌনতা কখনোই সীমা মানেনি

0
719

harem cover2বৈচিত্র্য আর রহস্যে ভরা অতীতের কাঁধে ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের আধুনিক সভ্যতা।ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আগের দিনের রাজা-বাদশাদের নানা কীর্তিকলাপ এখনো মানুষের মুখে মুখে। এসবের অনেক কিছু যেমন ঐতিহাসিক প্রমাণে ভাস্বর, আবার অনেক কিছুই নেহায়েত মানুষের কল্পনাপ্রসূত। কোনো কোনো রীতি আবার স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পাল্টেছে নিজের রঙ। হারেমের কথাই ধরা যাক। অন্তঃপুরের নারীদের থাকার জায়গা হিসেবে যার শুরু, এর বিবর্তন কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য। সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে ‘হারেম’ সব সময়ই ছিল মানুষের চিরন্তন আগ্রহের কারণ। প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে গোপন সেই অধ্যায় তুলে ধরছেন রণক ইকরাম। এবার থাকলো সিরিজের দ্বিতীয় খণ্ড।

প্রথম খণ্ডের লিংক
[হারেম সিক্রেটস-১]

পূর্ব প্রকাশের পর

মুসলিম হারেম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় ১৪শ শতাব্দী থেকে। দক্ষিণাত্যের গুলবর্গ রাজ্যের অধিপতি ফিরোজ শাহ বাহমিনি ১৩৯৬-৯৭ অব্দে ভীমা নদীর তীরে গড়ে তোলেন এক পাথরের দুর্গ। এর ভেতরে ছিল কয়েকটি মনোরম আঙিনা। খাল কেটে নদী থেকে পানি এনে তা সরবরাহ করা হতো পরস্পর বিচ্ছিন্ন ওই আঙিনাগুলোতে। প্রতিটি আঙিনা তিনি নির্ধারিত করেছিলেন তার হারেমের প্রিয় রমনীদের জন্য। বিভ্রান্তি দূর করার জন্য ওই রমনীদের ব্যাপারে বিশেষ নিয়ম কানুন প্রণয়ন করেছিল ফিরোজশাহ। যতদিন বেঁচেছিলেন ওই নিয়মাবলি তিনি পালন করে গেছেন অক্ষরে-অক্ষরে।

মহাভারতে রয়েছে অবাধ যৌনতার উল্লেখ
মুঘল আমলে হারেম প্রথা পূর্ণাঙ্গ রাজকীয় পারিবারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকাশ লাভ করে। আইন-ই-আকবরী এবং আকবরনামার লেখক  আবুল ফজল হারেমের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। মুঘল আমলে শাহী পরিবারের নারীাদের আবাসস্থলগুলি (female apartments) ‘মহল’ নামে পরিচিত ছিল। আবুল ফজল একে ‘শাবিস্তান-ই-খাস’ নামে অভিহিত করেছেন। রাজপ্রাসাদের এক বিশাল অংশ জুড়ে নারীদের বাস ছিল। তাদের প্রত্যেকের আলাদা মহল ছিল। এছাড়া আরও তিনটি প্রাসাদে সম্রাটের উপপত্মীগণ বাস করতেন। এগুলিকে বলা হতো ‘লেথেবার’ (রবিবার), ‘মঙ্গল’ (মঙ্গলবার) এবং ‘জেনিসার’ (শনিবার) মহল। এই নির্ধারিত দিনগুলিতে সম্রাট নির্দিষ্ট প্রাসাদে যেতেন। এছাড়া সম্রাটের বিদেশী উপপত্মীদের জন্য ‘বাঙালি মহল’ নামে একটি পৃথক মহল ছিল।

হারেমের ব্যবস্থাপনা ছিল সুসংগঠিত। এর  দারোগা ও তত্ত্বাবধায়করূপে নিয়োগ পেতেন সচ্চরিত্র মহিলাগণ। তারা হারেমের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেন। এর শৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতা রক্ষার দায়িত্বে থাকতেন মহিলা দারোগা। ‘তহবিলদার’ বা কোষাধ্যক্ষের নিকট থেকে উচ্চ মাসোহারাভোগী এ সকল মহিলা তাদের স্ব স্ব বেতন নিতেন। হারেমের সর্বোচ্চ পদাধিকারী মহিলা কর্মচারী ছিলেন ‘মহলদার’। এরা সম্রাটের গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করতেন। মহলদারের হস্তক্ষেপের কারণে প্রায়ঃশই রাজকুমারদের সাথে তার তিক্ততা সৃষ্টি হতো। মহলদারের তীক্ষ্ম নজরদারী রাজকুমারগণ পছন্দ করতেন না।

কৈলাস রাজের আঁকা মুঘল হারেম

হারেমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল বেশ সুদঢ়। সম্রাটের ভবনের নিকট বিশ্বস্ত নারীরক্ষীগণ নিয়োজিত থাকত। হারেমের বহির্প্রান্তে খোজাগণ (eunuch) এবং তাদের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে একদল অনুগত রাজপুত বাহিনি পাহারায় নিয়োজিত থাকত। হারেমের নিরাপত্তারক্ষী খোজাগণ ‘নাজির’ নামেও অভিহিত হতো। মুঘল হারেমে প্রবেশ করা রীতিমতো দুঃসাধ্য ছিল। সূর্যাস্তের সময় হারেমের দরজা বন্ধ করে আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। প্রত্যেক মহিলারক্ষী হারেমের সকল কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ‘নাজির’কে অবহিত করতে বাধ্য ছিলেন। হারেমের সব ক্রিয়াকলাপের লিখিত বিবরণ সম্রাটের নিকট প্রেরিত হতো। সাম্রাজ্যের কোন অভিজাতের স্ত্রী যদি হারেম দর্শনে অভিলাষী হতেন তাহলে তাকে প্রথমে হারেমের কর্মচারীদের অবহিত করতে হতো। কর্মচারীগণ প্রাসাদ কর্মকর্তাদের কাছে এরূপ আকাঙক্ষার কথা জানাত। এরপর যদি তিনি হারেমে প্রবেশের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হতেন তবেই তাকে প্রবেশাধিকার দেয়া হতো। প্রত্যেক রাজকুমারীর একজন করে নাজির থাকত যার উপর তিনি গভীর আস্থা স্থাপন করতেন। সম্রাট  প্রাসাদের অভ্যন্তরে ঘুরে বেড়ানোর  ‘কানিজ’ (নারী কর্মচারী)-দের দল তার অনুগমন করত।

অন্তঃপুরের প্রহরীরা বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। আগুন লাগার ঝুঁকি এড়াতে ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। বজ্রপাতে দগ্ধ বস্তু ও ছাইয়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টিতে কর্দমাক্ত মাটি মিশিয়ে তৈরি করা হতো এর দেয়াল। ডান থেকে বাঁয়ে তিন বার প্রদক্ষিণ করে বিশেষ মন্ত্র পাঠ করা হতো তখন। হারেমের ভেতরে বাইরে লাগানো হতো জীবন্তী, শ্বেতা মুস্কক ও বন্দক লতার গাছ। ওই লতা তুলে দেয়া হতো পেজাত ও অশ্বথ গাছের ডালে। এসব লতা ও গাছের জন্য নাকি বিষধর সাপ ভেতরে ঢুকতে পারতো না। আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পোষা হতো বিড়াল, ময়ূর, বেজি ও চিত্রল হরিণ। এসব প্রাণী সাপ দেখলে আক্রমণ করতো, তারপর খেয়েও ফেলতো।

হারেমের ভেতরে সাপের বিষ নির্ণয় করার জন্য পোষা হতো টিয়া, সারিকা ও ভৃঙ্গরাজ পাখি। সাপের বিষের গন্ধ পেলেই এসব পাখি ছটফট শুরু করতো। খাদ্যে বিষ নির্ণয়ের জন্য আরও পোষা হতো ক্রৌঞ্চ, জীবঙ্গ-জীবক, মত্ত কোকিল ও চকোর পাখি। আশপাশে বিষ থাকলে নানারকম প্রতিক্রিয়া হতো এসব পাখির মধ্যে। ক্রৌঞ্চ মূর্ছা যেতো, জীবাঙ্গ-জীবক অবসন্ন হয়ে পড়তো, মত্ত কোকিল মারা যেতো, আর রক্তবর্ণ ধারণ করতো চকোরের চোখ। বস্তুত সেকালের শাসকরা বিষ প্রয়োগের ব্যাপারে আতঙ্কিত থাকতেন সবসময়।

হারেম-রমণীদের জন্য থাকতেন নির্ধারিত চিকিৎসক। হারেমের এক প্রান্তে, বিশেষ করে পেছন দিকে, থকতো ধাত্রীবিদ্যা ও বিভিন্ন ব্যধিতে ব্যবহহৃত ওষুধ-পথ্যের ভাঁড়ার। মুসলিম ও হিন্দু শাসনামলে হারেম-রমণীদের জন্য আলাদা চিকিৎসালয় স্থাপন গণ্য হতো অত্যাবশ্যক বলে।

হারেমে সর্বাধিক গুরুত্ব পেতো আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা। অন্তঃপুরের একাংশে থাকতো বাদ্যযন্ত্র এবং হাতি, ঘোড়া ও রথের সাজসজ্জা। এগুলোর বিশেষ প্রয়োজন পড়তো পুরনারীদের বিহারকালে।

১৭১২ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট প্রথম শাহ আলমের মৃত্যুর পর প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে মুঘল সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ে এবং বাংলা, হায়দ্রাবাদ ও লক্ষ্মৌতে স্বাধীন প্রাদেশিক রাজবংশের উদ্ভব হয়। বাংলার স্বাধীন নওয়াবগণ মুগল ঐতিহ্য অনুসারে হারেম প্রথা প্রবর্তন করেন। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীতে নওয়াব  সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পরও হারেম ব্যবস্থা অপরিবর্তিত ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ কর্মকর্তা ও ইংরেজ বণিকগণ নওয়াবদের মতো হারেম রীতি অনুসরণ করে। তাদের হারেমে আর্মেনীয়,  পর্তুগিজ, বাঙালি, এমনকি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের নারীদের সমাবেশ ঘটত।

শিল্পীর চোখে মুঘল হারেম
সাধারণত বাংলার নওয়াবগণ দুই বা ততোধিক বিয়ে করতেন। সর্বজ্যেষ্ঠা বেগম ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বিশেষ সম্মানের অধিকারী। হারেমের সমগ্র ব্যবস্থাপনা নওয়াবের প্রত্যক্ষ তত্ত্ববাবধানে পরিচালিত হতো। নির্দিষ্ট দিনে নওয়াব নির্দিষ্ট পত্মীর সেবা গ্রহণ করতেন। ‘কানিজ’গণ নওয়াবদের জন্য সবরকম আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করত। বাইরে যাওয়ার সময় শুধু নওয়াবের প্রিয় পত্মী তাঁর সঙ্গী হতে পারতেন। অন্য পত্মীগণ খোজাদের তত্ত্বাবধানে থাকতেন। হারেমের নারীদের পোশাক ছিল অতি মূল্যবান, তারা দামী খাদ্য গ্রহণ করতেন এবং সর্ব প্রকার পার্থিব সুখ উপভোগ করতেন। নওয়াবদের সুদৃষ্টি লাভের জন্য তারা প্রায়ই পরস্পরের প্রতি বিদ্বিষ্ট মনোভাব পোষণ করতেন। নওয়াব ব্যতীত অন্য কোন পুরুষ যাতে কোন বেগমের দর্শনলাভ না করে সেজন্য প্রত্যেক বেগমের প্রহরায় খোজা ও ক্রীতদাসীদের নিয়োজিত করা হতো। অন্যান্য সম্ভ্রান্ত মহিলারাও (আমীর পত্মী) বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্থ ছিলেন।

বাংলার নওয়াাবদের প্রত্যেক পত্মী প্রাসাদের পৃথক পৃথক ভবনে বাস করতেন। তাঁদেরকে নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসিক ভাতা দেয়া হতো। তাদের সেবায় বহু দাস-দাসী নিয়োজিত থাকত। নওয়াবের উপর প্রভাবের ভিত্তিতে একজন বেগমের শানশওকত নির্ভর করত। বেগমদের ভবনগুলি সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল। প্রাচীরের অভ্যন্তরে সুদৃশ্য বাগানে বেগমগণ আনন্দময় সময় কাটাতেন। মুঘলদের মতো বাংলার নওয়াবদেরও উপপত্মী থাকতেন। সঙ্গীতের আসরে তারা নওয়াবকে আফিম ও উত্তেজক পানীয় গ্রহণে উৎসাহিত করতেন। প্রত্যেক উপপত্মী নিজস্ব ভবনে বাস করতেন।

বাংলার নওয়াবদের মধ্যে অবশ্য ব্যতিক্রমও ছিল। নওয়াব আলীবর্দী খান ছিলেন ধর্মভীরু। তার সমসাময়িক ইউরোপীয়গণ তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন। তিনি মদ ও নারীতে আসক্ত ছিলেন না। পূর্বাহ্নে খবর না দিয়ে তিনি কখনও হারেমে যেতেন না। পরাজিত ও নিহত বিদ্রোহীদের স্ত্রী-কন্যাগণ আলীবর্দীর হারেমে আশ্রয় পেতেন। তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার এবং হারেমের অভ্যন্তরে তাদের জন্য ভবন নির্দিষ্ট করা হতো। যখনই তিনি উপহার হিসেবে কোন ফল বা কোন বিশেষ উপঢৌকন পেতেন তখনই তিনি তার বেগমের মাধ্যমে অন্তঃপুরের নারীদের জন্য তা পাঠিয়ে দিতেন। সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতিতে বাংলার নওয়াবদের হারেমের কোন কোন মহিলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। এদের মধ্যে ঘসেটি বেগম,  লুৎফুন্নেসা বেগম ও  মুন্নী বেগম এর নাম উল্লেখযোগ্য।

হারেম সংস্কৃতির প্রথম দিকে প্রাসাদের অভ্যন্তরেই আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা থাকতো। পরবর্তীতে নারীদের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণের রীতি শুরু হয়। কোথাও কোথাও পরিবারের নারীদের জন্য একটি ভবন ও দাসীদের জন্য কাছাকাছি আলাদা ভবন নির্মাণেরও প্রমাণ মেলে। হারেমের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দিক দিয়ে সুবিধাজনক স্থানে হারেম ভবন নির্মাণের রীতি ছিল। একটি হারেম বা অন্তঃপুরে অনেক কক্ষের ব্যবস্থা থাকতো। আলাদা রন্ধনশালা, আলাদা প্রহরী, আলাদা গোসলখানাসহ সব ধরনের ব্যবস্থা থাকতো। তাই একটি হারেমে প্রচুর কক্ষ রাখতে হতো। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি কক্ষের মধ্যে থাকতো আরো একাধিক কক্ষ, এক কক্ষের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করা যেতো একাধিক কক্ষের প্রবেশমুখে। হারেমের চারদিক প্রহরী ও প্রাচীর বেষ্টিত থাকতো। এতোসব কক্ষ ও আয়োজনের মূল দরজা কিন্তু থাকতো কেবলমাত্র একটিই।

মুঘল সম্রাট এবং বাংলার রাজকীয় হারেম যখন বিবর্তিত হচ্ছিল ঠিক তখনই তুরষ্কে অটোমান বা উসমানীয় সম্রাজ্যে চালু ছিল রাজকীয় হারেম প্রথা। দ্য ইম্পেরিয়াল হারেম বা তুর্কী ভাষায় হারেম ই হুমায়ূন ১২৯৯ সালের দিকে শুরু হওয়া একই ধরনের প্রথা। অটোমান হারেমেও তার স্ত্রী, পরিবার, উপপত্মী, কঙ্কুবাইন ও দাসীদের বসবাস ছিল। ইউরোপ ও আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা হতো খোজাদের। নিরাপত্তরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন এরা। অটোমান সাম্রাজ্যে শাসন থেকে শুরু করে রাজনীতি ও সমাজনীতিতে দারুণ ভূমিকা ছিল হারেম বা অন্তঃপুরের নারীদের। অটোমান শাসনামলের দীর্ঘ সময়জুড়ে হারেমের নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই সময়ে তারা প্রমাণ করেছেন, কেবল সুলতানের যৌনদাসী বা মনোরঞ্জনের সঙ্গী হয়ে নয়, অন্যভাবেও তারা সমান পারদর্শীতা দেখাতে পারেন। হাসেকই সুলতান, বালিদ সুলতানসহ বিভিন্ন রাজকীয় পদে থেকে সুলতানের কাছাকাছি অবস্থানে থেকে রাজ্যপরিচালনায় ভূমিকা রেখেছেন এরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পদে অধিষ্ঠিত নারীরা কখনো না কখনো সাধারণ দাসী হিসেবেই হারেমে প্রবেশ করতেন। আর সাধারণ দাসী থেকে সাম্রাজ্যের শীর্ষ শাসনকর্ত্রী হয়ে ওঠার সেইসব গল্প যেন রূপকথার কাহিনিকেও হার মানায়। এসব কারণে অটোমান শাসনের অনেকটা অংশকে নারীশাসনের যুগ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

সেই সময়ে হারেমে নারীদের অধিকার ছিল বটে, তবে সবক্ষেত্রেই সুলতানের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। হারেমে নারী দাসী ও বন্দীরা সুলতানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে বিবেচিত হতেন। তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। তাদের জন্য ছিল পড়াশোনা, সঙ্গীত-নৃত্য শেখাসহ সব ধরনের ব্যবস্থা। অটোমান হারেমের নারীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসতেন। আসতেন বলার চেয়ে নিয়ে আসা হতো বলাটাই বরং বেশি শ্রেয়। সেই সময়ে দাসপ্রথার প্রচলন ছিল। বিভিন্ন হাট থেকে দাসী হিসেবে এদের নিয়ে আসা হতো। সেখান থেকে বাছাই করা নারীদেরকে সুলতানের হারেমের জন্য বাছাই করা হতো। কখনো কখনো পার্শ্বরাজ্য থেকে সুলতানের জন্য বাছাই করে উপঢৌকন হিসেবে মেয়েদেরকে পাঠানো হতো। হারেমের প্রধান রক্ষী খোজা, সুলতানের খাস খামরা প্রধান মিলে ঠিক করতেন কে যাবে সুলতানের কামরায়। হারেমের দাসীদের মধ্যে অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত সুলতানের সঙ্গী হওয়ার জন্য। তখনকার অটোমানদের মধ্যে নিয়ম ছিল হারেমের কোনো নারী যদি সুলতানের সন্তানের মা হতে পারেন, তাহলে সুলতান তাকে পত্মী হিসেবে গ্রহণ করবেন। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কোনো কঙ্কুবাইন বা হারেমের দাসী যদি পুত্রসন্তানের মা হতেন তাহলে তিনি শাহজাদার মা হিসেবে আলাদা সম্মাণের পাত্রী হতেন। ফলে হারেমের অধিকাংশ দাসীই সুলতানের সন্তানের মা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকতেন। এই নিয়মের কারণেই সাধারণ দাসী হয়ে দশম অটোমান সুলতান সুলেমানের হারেমে আসা আলেকজান্দ্রার ভাগ্য পাল্টে যায়। সুলতানের প্রিয় হুররেম খাতুন হয়ে শাহজাদার জন্ম দিয়ে তিনিই পরিণত হন সুলতানের সবচেয়ে প্রিয় পত্মীতে। ইউরোপীয়দের কাছে সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টখ্যাত সুলেমানের আমলে আলেকজান্দ্রার এমন উত্থান পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

যৌনতা কখনোই সীমা মানেনি

প্রাচীন বর্বর যুগের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে তখন পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কিছুই ছিল না। পেশী শক্তির দাপটেই চলতো সবকিছু। মানুষ পশুর মতো বনে-জঙ্গলে জীবনযাপন করত। পশুর সঙ্গে লড়াই করতো। কাঁচা মাংস, ফলমূল খেয়ে জীবনধারণ করতো। তখনও কিন্তু মানুষের মধ্যে যৌনতা ছিল। পুরুষের মধ্যে কামনার তীব্রতা ছিল। তখন পুরুষরা যে যেভাবে পেরেছে নারীকে ভোগ করে চলে  গেছে। নারী দেহ তখন ছিল কেবলই ভোগের বস্তু। ভালোবাসা, পারষ্পরিক সম্মাণ অধিকার কিংবা বৈবাহিক প্রথা এসেছে তারও বহু বছর পর।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুরাণগ্রন্থ মহাভারতের সেই আমলেও যৌনতা ছিল উদ্দাম। মহাভারতেও এমন অনেক যৌনতার কাহিনি রয়েছে, যা এ যুগের শালীনতার মানদণ্ডে যথেষ্ট অনাচার। মহাভারতের পুরোটা খেয়াল করলেই দেখা যাবে, যৌনতা প্রসঙ্গে তখনকার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দারুণ খোলামেলা। বিবাহ-পূর্ব বা বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতা, প্রকাশ্য যৌনতাতো বটেই, এমন কি পশুসঙ্গমেরও উল্লেখ রয়েছে সেখানে। বিবাহপূর্ব বা বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্পর্ক আধুনিক সমাজে বহুল প্রচলিত হলেও তা নিন্দনীয় এবং ঘৃণিত বলে মানা হয়। কিন্তু ইতিহাসে এমন প্রমাণ রয়েছে ভুড়ি ভুড়ি। মহাভারতে এক পরুষের একাধিক স্ত্রী থাকাটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। পঞ্চপাণ্ডব সহ প্রায় প্রত্যেকেরই ছিল। অর্জুনের  দ্রৌপদী ছাড়াও কৃষ্ণের বোন সুভদ্রা, নাগকন্যা উলূপী, চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি অনেক স্ত্রীর কথা সুবিদিত। স্ত্রী ছাড়াও রাজাদের দাসীসঙ্গমের উল্লেখ রয়েছে ভুরি ভুরি। প্রকাশ্যেই দাসদাসী হিসাবে নারী-পুরুষ-শিশু  কেনাবেচা হতো।

বুদ্ধের আবির্ভাবের আগে, পূর্বাব্দের পঞ্চম শতকে, পুরুষদের বহুগামিতা প্রচলিত ছিল বিশেষভাবে। ‘মহাপদ্মজাতক;- এ ১৬ হাজার রমণী-অধ্যুষিত এক রাজকীয় ‘সেরালিয়োর উল্লেখ আছে। সংখ্যাটি হয়তো অতিরঞ্জিত, কিন্তু এই উল্লেখ প্রাকবৌদ্ধ যুগে উদ্দাম যৌনতার একটা বড় প্রমাণ।

মুঘল হারেমে সম্রাটের মনোরঞ্জনের জন্য গান বাজনার ব্যবস্থা থাকত।

আবার মুসলমানদের ইতিহাসে মানুষের অবাধ যৌনাচারের কথা বর্ণণা রয়েছে। সেখান থেকে উত্তরণের জন্যই ইসলামের নবীদের পাঠানো হয়েছে। করে দেয়া হয়েছে নানা নিয়ম। ইসলামের আবির্ভাবের আগ থেকেই ক্রীতদাসি আর যুদ্ধবন্দিনীদের যথেচ্ছ, অমানবিক ও অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার চলে আসছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ইসলাম সেটিকে সীমিত, মানবিক ও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে আনার পাশাপাশি তাদেরকে জৈবিক চাহিদা পূরণের একটি বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ প্রদান করেছে। যার ফলে একদিক দিয়ে তাদের সন্তান জন্মগতভাবে স্বাধীন ও পিতার সম্পদের উত্তারিকারী হয়, অন্যদিক সন্তান গর্ভধারণের মাধ্যমে ক্রীতদাসিটি ক্রমান্বয়ে মুক্তি লাভ করে। বোঝাই যাচ্ছে এসব নিয়ম তৈরি হয়েছিল কেবল অবাধ যৌনাচারের লাগাম টানার জন্য।

তাই পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সেই আদিকাল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সমাজব্যবস্থাতেও যৌনতা কখনোই সীমা মানেনি। স্বকীয় প্রয়োজনে গোপনীয়তা মেনেই আদিম মনোবাসনা পূরনের অভিপ্রায়ে ব্যস্ত থাকে সংশ্লিষ্ট সবাই।

তথ্যসূত্র:
আইন ই আকবরী- আবুল ফজল ভলিউম-১, ট্রান্সলেটেড বাই এইচ ব্লচম্যান
দি অটোমান সেঞ্চুরিজ- লর্ড কিনারস
মহাভারতে যৌনতা- শামিম আহমেদ, গাঙচিল প্রকাশনী, কলকাতা
দি হিস্টোরি অব বেঙ্গল- শাহরিয়ার ইকবাল
অটোমান হারেমের নারীরা- আশরাফ উল ময়েজ
হারেম- লাভ টু নো ১৯১১ এনসাইক্লোপেডিয়া
দ্য প্রাইভেট ওয়ার্ল্ড অব অটোমান ওমেন- গুডউইন গডফ্রে
হারেম- জন দেলপ্ল্যাটো
ইনসাইড দ্য সেরাগেলিও- প্রাইভেট লাইভস অব সুলতানস ইন ইস্তাম্বুল
হারেম- শ্রীপান্থ
উইকিপিডিয়া ও রিলেটেড ওয়েবসাইটস

    [চলবে]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here