খোলা চোখে, ভিন্নমতের লক্ষ্য পরিবর্তন

0
212

ed956487df6b0fac96b3ef8f6d235667-P-10_3রুশ লেখক ইভগেনি জামিয়াতিন তাঁর মি(আমরা) উপন্যাস লিখে শেষ করেন ১৯১৯ সালে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে সদ্য আবির্ভূত সোভিয়েত ইউনিয়নে সে বই ছাপা হয়নি। ১৯২১ সালে বইটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সমানাধিকারের বৈপ্লবিক মন্ত্র নিয়ে যে রাষ্ট্রের পত্তন, তার মতের সঙ্গে মিল না হওয়ায় সে বই আলোর মুখ দেখতে পায়নি। বস্তুত, জামিয়াতিনের এই উপন্যাসই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে নিষিদ্ধ প্রথম গ্রন্থ।
কী এমন কথা ছিল জামিয়াতিনের বইতে, যা বিপ্লবী সোভিয়েত ইউনিয়নকে এমন ভীত করেছিল? বস্তুত, এমন কিছুই নয়, সাদামাটা এক রূপকথা। জামিয়াতিন এক কাল্পনিক রাষ্ট্রের ছবি এঁকেছিলেন, যেখানে সব ক্ষমতা এক ‘ওয়ান গভর্নমেন্ট’-এর হাতে ন্যস্ত। সেখানে সবাই একই পোশাক পরে, একই রকম চিন্তা করে, তাদের নিজস্ব কোনো নাম পর্যন্ত নেই, শুধু আছে নম্বর। এ এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে কে কী করবে, কে কী খাবে, কী ভাববে—সবই সেই রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে সরকার ঠিক করে দেয়। দেশটা কাচ দিয়ে ঢাকা, ফলে কে কী করছে, তার সবই দেখা যায়। কাচের বাইরে থেকে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর চৌপ্রহর রয়েছে এক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর খবরদারি। সামান্য এদিক-সেদিক হলে নির্ঘাত মৃত্যু।

মি রচনার প্রায় ৩০ বছর পর, ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় জর্জ অরওয়েলের ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস ১৯৮৪। সেখানেও এক কাল্পনিক রাষ্ট্রের চিত্র রয়েছে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক কী করে, কী ভাবে, তা তদারকির জন্য রয়েছে ‘বিগ ব্রাদার’, যার নজর এড়িয়ে নিশ্বাস নেওয়ার জো পর্যন্ত নেই।

কাল্পনিক কাহিনি, কিন্তু মোটেই অবাস্তব নয়। জামিয়াতিনের কল্পনার ‘ওয়ান গভর্নমেন্ট’-এর সঙ্গে একদলীয় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তর মিল। সেখানেও সবাই কমবেশি একই রকমের পোশাক পরত, একই খাবার খেত, একই রকম ভাবত। এমনকি ‘চিন্তাপুলিশ’ও চৌপ্রহর সবার ওপর নজরদারি করত। কেউ ভিন্নমতে ভিন্নভাবে চললেই তাকে ‘বড় ভাই’ খপ করে ধরে সোজা পাঠিয়ে দিত সাইবেরিয়ায়।

রাষ্ট্রের হাতে পুলিশ আছে, গোয়েন্দা আছে, সেনাবাহিনী আছে, নিজস্ব প্রচারযন্ত্র আছে। তারপরও ভয়, পাছে কেউ ভিন্ন কথা বলে ঘোঁট পাকায়, ক্ষমতার ওপর ভাগ দাবি করে। পৃথিবীর প্রায় সব ‘বিপ্লবী’ রাষ্ট্রে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম যে কাজটা করে, তা হলো স্বাধীন চিন্তার ওপর তালা লাগানো। ইসলামি ইরানের কথা ভাবুন। শাহের বিরুদ্ধে ভিন্নমত ব্যবহার করে যে বিপ্লবের উত্থান, ক্ষমতা গ্রহণের এক মাসের মধ্যে সেখানে পুরোনো গোয়েন্দা পুলিশ সাভাক-এর নাম বদলিয়ে নতুন করে গঠিত হলো গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়। এর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে পুণ্য ও পাপবিষয়ক পুলিশ, মুতাওয়াভি, যার কাজ গন্ধ শুঁকে শুঁকে বের করা সরকারিভাবে অনুমোদিত নয় কে এমন ভিন্ন কথা ভাবছে, ভিন্ন গান শুনছে, ভিন্ন বই পড়ছে।

ভিন্নভাবে কথা বলা বা ভাবার এক অর্থ প্রতিবাদ করা। রাস্তায় নেমে মিছিল করা একরকম প্রতিবাদ, বই লিখে বা ইন্টারনেটে নিজের ভিন্নমত প্রকাশ, সে-ও একধরনের প্রতিবাদ। ঠিক যেমন জামিয়াতিনের বই ছিল সোভিয়েত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। সব প্রতিবাদের লক্ষ্য পরিবর্তন—পুরোনো ধ্যানধারণা বা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো বদলে সময়োপযোগী কাঠামো নির্মাণ। বস্তুত, পৃথিবীর প্রায় সব মৌল পরিবর্তন অর্জিত হয়েছে প্রতিবাদের মাধ্যমে, যার শুরু নতুন ভাবনাচিন্তার উদ্ভাবনের মাধ্যমে। এর জন্য অগ্রবর্তী চিন্তাশীল মানুষদের ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। কোপেরনিকাস বা গ্যালিলিওর কথা ভাবুন। চার্চের চোখ রাঙানি সত্ত্বেও তাঁরা নতুন সত্যের অনুসন্ধান ত্যাগ করেননি, চাপের মুখে বা মৃত্যুর হুমকিতেও নিজেদের ভিন্নমত বদলাননি। ভাবুন নেলসন ম্যান্ডেলার কথা। জীবনের ২৭টি বছর তাঁকে কারান্তরালে কাটাতে হয়েছে, কিন্তু পরিবর্তনের সম্ভাবনায় তিনি আস্থা হারাননি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা ভাবুন। পাকিস্তানি শাসকদের ভাবনাচিন্তা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিলে আজও হয়তো আমাদের নব্য উপনিবেশবাদের কাছে নতজানু হয়ে থাকতে হতো। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, সে তো ভিন্নমতের এক ঐতিহাসিক ইশতেহার, যার ভিত্তিতে অর্জিত হয়েছিল রাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন। একইভাবে এরশাদের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তার ভিত্তিতেও ছিল ভিন্নমত ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। সে সময় ভিন্নভাবে ভাবার সাহস পেয়েছিলাম বলেই না আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ক্ষমতার নতুন সমীকরণ নির্মাণ, গুণগতভাবে ভিন্ন প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা অর্জন।

মোদ্দা কথা হলো, পরিবর্তন চাইতে হলে আগে চাই ভিন্নমত প্রকাশের সাহস। খুব ছোট ছোট ব্যাপার থেকেও টের পাওয়া যায় ভিন্নমতের শক্তি। প্রতিবাদ থেকে কীভাবে পরিবর্তন আসে, তার অনেক উদাহরণ বাংলাদেশেও আছে।

তবে বাংলাদেশের সরকারি মহলে ভিন্নমতের কোনো কদর নেই। সেখানে এখন রাজনীতির যে সমীকরণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে সরকারের সমর্থন নেই এমন প্রায় সবকিছুই সরকারবিরোধী, এমন একটি ধারণা রয়েছে। যেকোনো সমালোচনাকেই সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, ক্ষমতাসীন মহলের কেউ কেউ এমন কথা নির্দ্বিধায় বলে থাকে। অথচ পরিবর্তনের দাবি তথা ভিন্নমত অন্তর্গতভাবে সরকারবিরোধী নয়। আমরা পরিবর্তন চাই, কারণ আমরা সামাজিক বিচারহীনতার অবসান চাই, অধিক ন্যায়বিচারসম্পন্ন সমাজব্যবস্থার পত্তন চাই। ক্ষমতাসীন মহল যে সর্বদা ন্যায়বিচারের বিপক্ষে তা নয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা শুধু নিজের শর্তে কোনো পরিবর্তনের পক্ষে সম্মতি দেয়। কিন্তু অবস্থাটা যদি এমন হয় যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই লক্ষ্যের ব্যাপারে সরকার ও নাগরিক গোষ্ঠীসমূহের বৃহদাংশের মধ্যে একধরনের অলিখিত সম্মতি-চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হলো? তাহলে পরিবর্তন অর্জনের লক্ষ্য যেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া অর্জন সম্ভব, তেমনি সম্ভব পরিবর্তনের সে প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা।

আমার বিশ্বাস, একটি ন্যায়বিচারসম্পন্ন ও সুশাসননির্ভর প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বাংলাদেশের ভেতরে ব্যাপক সম্মতি রয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রশ্নে ক্ষমতাসীন মহল ও নাগরিক গোষ্ঠীসমূহ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সম্পূরক। তা না হলে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধগুলোর বিচারের প্রক্রিয়া এত নির্বিঘ্নে অব্যাহত রয়েছে কীভাবে? তবে খামতি যা রয়েছে তা হলো পারস্পরিক আস্থার। এই আস্থাহীনতা থেকেই মুখ ফুটে ভিন্ন কথা বলার ওপর সেফটিপিন সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন আইন হচ্ছে, অদৃশ্য বিধিমালা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার লক্ষ্য সরকারের বলা কথার বাইরে কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া।

পরিবর্তনের দাবির ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ভিন্নমত ছিল যার প্রাণভোমরা। পরিবর্তনের এই অব্যাহত প্রক্রিয়াকে নানা রকমের কূটকৌশলে সেঁটে থামানো যাবে বলে যাঁরা ভাবেন, তাঁরা বোধ হয় সব সময় ইতিহাসের শিক্ষা মাথায় রাখেন না।

২৮ মে ২০১৬, নিউইয়র্ক

হাসান ফেরদৌস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here