চেতনায় চির ভাস্বর রবীন্দ্র-নজরুল

।। জীবন চৌধুরী ।।
রবীন্দ্র কিংবা নজরুল সম্পর্কে লিখতে গেলেই কেন জানি আমার প্রথমে বিখ্যাত কোন ব্যক্তির বক্তব্য মনে আসে না, মনে পড়ে অতি সাধারণ অথচ অতি উঁচুমানের একজন গীতিকবির অভিমানের কথা, যে আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। আমি নজরুল ইসলাম বাবুর কথা বলছি। অত্যন্ত সাদাসিদে এই মানুষটি একদিন রবীন্দ্র-নজরুল প্রসঙ্গে অভিমানের সুরে বলেছিলেনঃ জানেন, ওই দাড়ি আর বাবরি ওয়ালার জন্যে ভাল কিছু লেখা হdownloadয়ে ওঠে না, যাই লিখি পড়তে গিয়ে কেন জানি মনে হয়-ওসব এই দুজন অনেক আগেই লিখে গেছেন, নতুন কি আর রচনা করব? তারপরও বাবুর কলম থেমে যায়নি। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কালোত্তীর্ণ-বসোত্তীর্ণ বেশ কিছু গান উপহার দিয়েছেন আমাদের। ‘সব কটা জানালা খুলে দাওনা’র মতো আরো কিছু গান মানুষের স্পর্শ করে।
‘সেই বাবুর মতো রবীন্দ্রনাথ-নজরুল সম্পর্কে আমার কোন অভিমান নেই তবে ক্ষোভ আছে একজন গীতিকার হিসেবে। সে ক্ষোভ অবশ্য নিজেকে নিয়েই: আমি বা আমাদের মতো কেউ কেন গানের মতো গান লিখতে পারি না? এই যে গানের কথা বললাম সেখানেও এই দুজন মানে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল ইসলাম বাদ সেধে বসে আছেন মনে হয়। মনে হয় গানের ওপর গান লিখতে দিতে ওঁরা নারাজ, অন্য বিষয়ে লেখা তো পরের কথা। যেমন, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী আমি অবাক হয়ে শুনি কিংবা কী গাব কি শোনাব আজি আনন্দ ধামে, নজরুল লিখে গেছেন-ভরিয়া পরান শুনিতেছি গান, আসিবে আজি বন্ধু মোর এবং এমন আরো কিছু যার সোজা সরল অর্থ দাঁড়ায় এই-গান লিখে ওদের প্রাণে মারব। ওদের মানে আমাদের মতো যারা রবীন্দ্র-নজরুলের উত্তরসূরি হয়ে আসছেন কাব্যভুবনে গান রচনার কাজে। সত্যি বেজায় মুসিবত-এহেন বিষয় নেই যে, যার ওপর নজরুল ইসলাম বাবুর ভাষায় ওই দাড়িওয়ালা আর বাবরিওয়ালা গান লিখেননি। আর সে সব গান কেবল সংখ্যার দিক দিয়ে নয়-গুণের দিক দিয়ে সৃষ্টি করেছে সন্দেহাতীত বিস্ময়। এই দুজন ক্ষণজন্মা পুরুষ আমাদের ভেতরে-বাইরে প্রবেশ করেছেন, কখনো বা প্রাকৃতিক প্রেমকে টেনে এনেছেন প্রাণেরে গভীরে- প্রেমে-বিরহে- বেদনায় দিয়েছেন দুর্নিবার গতি, সিঞ্চন করেছেন অমিয়ধারা। অন্যদিকে আমাদের সংকটে ক্রান্তিতে ও মুক্তিতে রবীন্দ্র-নজরুল যেন বিমূর্ত অমর-অজেয় এবং অনির্বাণ শিখা।
আমি এ সম্পর্কে আগের সংখ্যায় কবি-গীতিকার রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আলোচনা করেছি। এবার আলোকপাতের লক্ষ্য কবি নজরুল।
আগেই বলেছি মাথায় একরাশ বাবরি চুল, উজ্জ্বল আঁখির অধিকারী আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি আছেন আমাদের প্রতিদিনের কর্মে, চেতনায় চিরভাস্বর। চিরতারুণ্যের প্রতীক নজরুল যেন চিরজীবনেরই বাণীবদ্ধ করেছেন তাঁর সংগীতে। সাহিত্যের তো বটেই, সংগীতের সব কটি ধারায় ছিল তার অবাধ বিচরণ।
ভাবি কী আশ্চর্য আর অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে আর্বিভুত হয়েছিলেন কবি নজরুল, যেন সাক্ষাৎ ধুমকেতু, কখনো তাই তাঁকে বিপ্লবে পেয়েছি আমরা, পেয়েছি জাগরণ, মেহনতি জনতার কাতারে, অনশন বন্দিদের ব্যাথীরূপে, আবার মানুষ নজরুলকে প্রত্যক্ষ করেছি প্রেমিক হিসেবে। নিখুঁত চিত্রকরের মতো তিনি গেয়ে ওঠেছেন নাকি ছবি এঁকেছেন প্রিয়ার কে জানে-তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ, কিংবা কত কথা কিগো কহিতে জানে তোমার সুন্দর আঁখি। চির সুন্দরের উপাসক সেই নজরুলকে আবার বিরহে কান্না ঝরাতে শুনি-পথহারা পাখি কেঁদে ফিরে একা। অভিমানে যখন কণ্ঠ সোচ্চার তখন শোনা যায়-আমায় নহে গো ভালবাস শুধু, ভালবাস মোর গান, বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান..। অন্যদিকে নৈসর্গিক সৌন্দর্যবোধে আপ্লুত নজরুলের হৃদয় থেকে ধ্বনিত হয়েছে নদীর সঙ্গে মিতালী মনের ভাব বিনিময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেতুবন্ধনের চিত্র-পদ্মার ঢেউরে, মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা যারে–। আবার দুঃখ- বেদনায় ভরাক্রান্ত নজরুল গেয়ে ওঠেন-হাসি মুখে, বাসি ফুল, ফেলে দাও ভোরে, মোর মন নিয়ে ফেলে দিলে তেমনি করে..। এমন আশ্চর্য আর ঐশ্বরিক ক্ষমতা নিয়ে এসেছিলেন নজরুল। সোনার চামচ ছিল না তাঁর মুখে। জীবনের পথ বেশির ভাগ কণ্টকাকীর্ণ, তবুও কুসুম চয়নেই সারাটা জীবন তিনি তাঁর সৃষ্টিকে লালন করেছেন কখনো নীরবে কখUntitled-11441780758নো বা সরবে, দুঃখ-দারিদ্য পীড়িত চুরুলিয়ার একটি পরিবারের দুখু মিয়া খ্যাত নজরুল। জীবন সংগ্র্মাী নজরুল, সৈনিক নজরুল অবর্ণনীয় জ্বালা-যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে দুঃখ-দারিদ্র্য জয়ের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। শত্রুর সাথে কোলাকুলি আর পাঞ্জা লড়েছেন মৃত্যুর সঙ্গে। তার মধ্যেও আশার বনফুল হয়ে ছন্দে ছন্দে আনন্দে দোল খাওয়া কিশোর নজরুল মিশেছেন ল্যাটোর দলের সঙ্গে, যৌবনের প্রারম্ভে যুদ্ধে গেছেন। এমন ঘটনাবহুল জীবনের সঙ্গী কাজী নজরুল ইসলাম এক পর্যায়ে আধ্যাত্মিক চেতনার মূল স্রোতধারা সঙ্গে মিশতে গিয়ে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখিও কম হননি। কথা ওঠেছে ব্যাটা আস্ত কাফের। বিশেষ করে, কা-ারী কবিতায় বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উদ্বুদ্ধ নজরুল যখন বলেনঃ ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোনজনে, কান্ডারী ডুবিয়াছে মানুষ সন্তান মোর মার-’ তখন কট্টরপন্থীদের অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে তাঁকে। আবার হিন্দুর দেব- দেবী নিয়ে গীত রচনাকালে তাঁকে দাঁড় করানো হয়েছে সমালোচনার কাঠগড়াতে। এক পর্যায়ে ইসলামী গান রচনায় মনোনিবেশ করাকালে হিন্দুদের পক্ষ থেকে বিভ্রান্তির জাল বিস্তার হয়। জড়িয়ে পড়েন কট্টর সমালোচনার মুখে। অর্থাৎ শাকের করাত আর উভয় সংকট এই দুই প্রবাদের সঙ্গে নজরুলের মতো আর কোন কবির এমন নিবিড় পরিচিতি হয়েছে বলে মনে হয় না।
তাই বলতে দ্বিধা নেই, নজরুল সামাজিক বঞ্চনার ভেতর পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা হতে পেরেছেন। মানুষ হিসেবে দেখতে গেলে নজরুল পরিপূর্ণভাবে ছিলেন মানবতার পূজারী, সবার উপরে মানুষ সত্য-এই চেতনাই ছিল সদা জাগ্রত তাঁর লেখনিতে চিন্তায় এবং বিশ্বাসের মর্মমূলে, অন্যদিকে সমাজে অবহেলিত নারীকে তিনি দেখেছেন শ্রদ্ধার চোখে, সমাজের কেবল জননীরূপেই নয়, কল্যাণী হিসেবেও। ফলে-জাগো নারী জাগো বহ্নি শিখা-এর মতো উদ্দীপ্ত উক্তির প্রকাশ ঘটেছে নজরুলের নারী জাগরণমূলক কাব্যে।
আবার ফিরে আসা যাক কবি রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুলের সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু দিক উন্মোচনে। এঁরা দুজনই আমাদের সম আদৃত, বন্দিত এবং নন্দিত। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” আমাদের জাতীয় সংগীত এবং কবি নজরুল স্বীকৃত জাতীয় কবি হিসেবে। তাছাড়া বয়সের দিক দিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ রবি ঠাকুরের জন্মদিন ২৫ বৈশাখ এবং নজরুলের কনিষ্ঠ হিসেবে জন্মদিন এরপরে ১১ জৈষ্ঠ্য। আবার এঁরা দুজনের কেউ-ই রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে বিশেষ কোন মতাদর্শী নন তবুও এঁদের নিয়ে রাজনীতি হয়। অতীতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। স্বাধীনতা-পূর্বকালে এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথকে বিজাতীয় গন্য করে তাঁর কবিতা ও গান বিলকূল বন্ধ করার সুগভীর চক্রান্ত হয়েছে। তদানীন্তন গভর্ণর মোনায়েম খাঁ এদেশের বিশেষ একজন কবিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন- তোমরা খালি রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ কর, আমি বুঝি না কী পেয়েছো ওর মধ্যে-আচ্ছা তোমরা রবীন্দ্র সংগীত লিখতে পার না? একজন গভর্ণরের এমন উদ্ভট উক্তি সেদিন রবীন্দ্র সপক্ষে আন্দোলনকে স্তিমিত করার পরিবর্তে বরং দুর্বার গতিসম্পন্নই করেছিল।
আজকের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন বাংলাদেশের মুক্ত পরিবেশে রবীন্দ্র-নজরুল চর্চার দ্বার উন্মুক্ত ও অবারিত কিন্তু মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয় যেমন- কেনইবা নজরুলের সব গানের সমান প্রচার নেই? বিশেষ করে তাঁর রচিত অসংখ্য কীর্তন আঙ্গিকের বা ভজনধর্মী গান প্রচারের টুটি চেপে ধরে আছে কারা? তবে কি ভাবতে হবে- মোনায়েম খাঁর বংশধররা এখনো বহাল তবিয়তে?
আমরা বর্তমান সময়ে ঘোর সংকটাপন্ন। স্মরণ করছি রবি ঠাকুরকে- হে কবি, আমাদের জীবন আজ শুকিয়ে কাণ্ঠসম, তাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলতে বার বার ইচ্ছে করছে-জীবন যখন শুকিয়ে যায়, করুণাধারায় এসো।’ কবি নজরুলকে উদ্দেশ্য করে কী আর বলি, মনে পড়ে তাঁর সেই বিখ্যাত বয়ান-করি শত্রুর সাথে কোলাকুলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা। কিন্তু হায়, হে কবি-আজ দিকভ্রান্ত আমরা শত্রু-মিত্র ঠিক চিহ্নিত করতে পারছি না। তাছাড়া তো দেখলাম স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর ক্ষমা সুন্দর মনোভাবের কল্যাণে যারা সাধারণ ক্ষমার আওতায় কারাগার থেকে বেরিয়ে এলো তাদের দ্বারা আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করার সে কী নিমর্ম পরিণতি! তারপরও কি তুমি বলতে চাও সেই শত্রুদের সাথেই তোমার মতো কোলাকুলি করতে? নাকি মৃত্যুর বদলে চিহ্নিত সেই শত্রুদের সঙ্গে পাঞ্জা ধরাই হবে আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্যে স্বস্তিকর? যদি অনুমতি দাও তবে একটু ঘুরিয়ে কি বলা যায়-করি শত্রুর সাথে যুদ্ধ, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা?
Ñনিউইয়র্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here