আয়করদাতার সংখ্যা বাড়ে না, কর ফাঁকি বন্ধের কৌশল বের করুন

0
150

235206sompa-1স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে করদাতার সংখ্যা মাত্র ১২ লাখে পৌঁছেছে। দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক গতিশীল হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার বেড়েছে, শুধু বাড়ছে না করদাতার সংখ্যা। গত একযুগে দেশে করদাতার সংখ্যা বেড়েছে মাত্র তিন লাখ—এই হিসাব থেকেই স্পষ্ট আমাদের অর্থব্যবস্থায় বড় গলদ রয়ে গেছে। করযোগ্য আয় করে থাকে এমন লাখ লাখ মানুষকে করের জালে আটকানো যাচ্ছে না।

প্রতিবছর বাজেট বক্তৃতায় করদাতার সংখ্যা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাফল্য কম। এনবিআর করদাতার সংখ্যা বাড়াতে না পারলেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ঠিকই। আর এই বর্ধিত করের খড়্গ পড়ছে মূলত পুরনো করদাতাদের ওপরই। কর দেওয়ার সঙ্গে তা আদায়ে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও ব্যক্তির সততা দুটিই সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্রকে করের আওতা নির্ধারণ করে দিলেই হবে না, কারা কারা এই আওতায় পড়ে তাদের শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এই জায়গাটিতে আমরা অনেক অনেক পথ পিছিয়ে আছি।

এই পশ্চাত্পদতা রয়েছে ব্যক্তিগত সততার প্রশ্নেও। একবার তালিকাভুক্ত হয়ে গেলেই প্রতিবছর আয়ের রিটার্ন দাখিল করতে হয়। তাই একশ্রেণির মানুষ নানা কৌশলে তালিকাভুক্তি এড়িয়ে যাচ্ছে। রিটার্ন দাখিলকারীদেরও অনেকে তথ্য গোপন করে কম কর দিয়ে বলে থাকেন, জোর অভিযোগ রয়েছে। ফলে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বর্তমান অঙ্কের চেয়ে বহুগুণ বেশি কর আদায়ের সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। ‘বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ’ পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ব্যবসায়িক পরামর্শ সংস্থা।

তাদের সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৭ শতাংশ মানুষ তথা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ বার্ষিক ছয় হাজার ডলার বা চার লাখ ৭০ হাজার টাকার বেশি আয় করে। এই স্তরের আয় আমাদের আয়কর আইন অনুযায়ী করযোগ্য। কিন্তু আদায়ব্যবস্থায় ত্রুটির সুযোগ নিয়ে মানুষ বছরের পর বছর রাষ্ট্রকে ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। এবারও বাজেট গতানুগতিক হয়েছে বলে অনেকে সমালোচনা করেছেন। তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বাস্তবায়ন কাঠামো এবং বাজেট অর্থায়ন ব্যবস্থায় বেশ পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাঁদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি সব চাকরিজীবীর আয়ের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার ফলে করের জাল দ্রুত বিস্তৃত হতে পারে। অবশ্য বেসরকারি চাকরিজীবী মহলে এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

করযোগ্য আয়ের সীমা না বাড়ারও সমালোচনা রয়েছে। করদাতারা বলছেন, বিগত কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতির কারণে চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় (ক্রয়ক্ষমতা) হ্রাস পেয়েছে। আয় যেটুকু বেড়েছে তা নিছকই অঙ্কের হিসাব। সরকারের আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব। আর রাজস্বের প্রধান একটি উৎস আয়কর। তিন কোটি পরিবারের এই দেশে আয়কর দেয় মাত্র ১২ লাখ মানুষ।

সংখ্যাটা নিঃসন্দেহে অবিশ্বাস্য রকম কম। এই শুভঙ্করের ফাঁকিটি ধরতে হবে। সরকারকে সৃজনশীল কৌশল ব্যবহার করে আয়কর আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয় সামলাতে করের জালে আটকেপড়া চুনোপুঁটিদের ওপর বোঝা বাড়ানো, আর জালবহির্ভূত রাঘব বোয়ালদের ছাড় দিয়ে যাওয়া—এ ব্যবস্থা যেকোনো অর্থনীতির জন্যই ভয়ংকর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here