হানিফ রাশেদীন-এর একগুচ্ছ কবিতা

0
194

hanif rashedinআজ পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো হানিফ রাশেদীন-এর একগুচ্ছ কবিতা।

স্বপ্ন মাথা নোয়াতে জানে না

কারো ভেতরে আমরা হৃৎপিণ্ড দেখতে পাই না,
মগজ দেখতে পাই না, কবিতা দেখতে পাই না;
যে-দিকেই তাকাই চারদিকে অন্ধকার
না তাকালেও দেখতে পাই অন্ধকারের রাজত্ব।

অন্ধকারে আমাদের ভাইকে চিনতে পারি না
অতি সহজেই তার বক্ষদেশে ঢুকিয়ে দিই ছোরা;
আমরা আমাদের বোনকে চিনতে পারি না
এসিড ছুঁড়ে তাকে রূপান্তরিত করি দুঃস্বপ্নে;
পাবলিক লাইব্রেরিতে যাব বলে
প্রতিদিন হাঁটতে থাকি আমরা পাটশালার দিকে;
প্রিয়তমার মধু হয়ে যায় আফিম আর আফিম মধু;
গোলাপে লাশের গন্ধ আর লাশে গোলাপের।

কোথাও আমরা সুন্দর উদ্যান দেখতে পাই না;
সুন্দর ও সবুজের বীজ বুনলে, শকূন এসে
মাটি খুঁড়ে সেখানে অন্ধকারের নিঃশ্বাস ফেলে;
সুন্দর ও সবুজের বীজ থেকে আর চারা গজায় না।

কিন্তু না, এ-পৃথিবীতে আর অন্ধকার থাকবে না
অন্ধকার রঙে পালে পালে শকুন থাকবে না;
আমরা সুন্দরের স্বপ্ন দেখি, সবুজের স্বপ্ন দেখি,
স্বপ্ন দেখি মানুষের বাসযোগ্য নতুন সভ্যতার কুঁড়ি।

আকাশে লাল নীল রঙিন বেলুন দেখতে পাই না
আকাশ সমান উঁচু অন্ধকার দেয়াল দেখতে পাই
মানুষ এখন দেয়ালের একপাশ থেকে
আরেক পাশের মানুষ শিকার করে অবলীলায়
আগেকার দিনে যেমন পাখি শিকার করতেন রাজারা;
কিন্তু না, পৃথিবীতে কোনো দেয়াল থাকবে না,
আমরা স্বপ্ন দেখি মানুষের মাঝে দেয়াল থাকবে না।
আমরা সুন্দরের স্বপ্ন দেখি, সবুজের স্বপ্ন দেখি,
স্বপ্ন দেখি মানুষের বাসযোগ্য নতুন সভ্যতার কুঁড়ি।

আমাদের ভেতরে কোনো সুর ঢোকে না
চারদিকে অন্ধকারের হিংস্র নির্মম চিৎকার;
এই সভ্যতা পথ দেখানোর ছলে
আমাদের পৌঁছে দেয় ভয়াবহ অন্ধকার খাদে।

এই সভ্যতা আমাদের উপহার দিয়েছে
শোষণের কারখানা, ক্ষুধা ও শীতে ধুকে ধুকে
নির্মম মৃত্যু, আমাদেরই বুক বিদ্ধ করার
মারণাস্ত্র উপহার দিয়েছে আমাদের;
কিন্তু না, পৃথিবীতে কোনো শোষণ থাকবে না,
নির্মম মৃত্যু থাকবে না, মরণাস্ত্র থাকবে না।

আমরা সুন্দরের স্বপ্ন দেখি, সবুজের স্বপ্ন দেখি,
স্বপ্ন দেখি মানুষের বাসযোগ্য নতুন সভ্যতার কুঁড়ি।

কুৎসিত অন্ধকার জ্বালিয়ে দেব আলোর মশালে;
আমরা জানি, হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হবে না
জগতে আপনা আপনি কিছু হয় না
দিন মানুষেই বদলায়, গড়ে তোলে নতুন যুগ।

নিশ্চয়ই আসবে আমাদের দিন
গান গাইতে পারব আমরা আমাদের মতো
ভালোবাসতে পারব আমরা আমাদের মতো
হাসতে পারব আমরা আমাদের মতো
কাঁদতে পারব আমরা আমাদের মতো
যে-দিকেই চাই তাকাতে পারব আমরা।

স্বপ্ন মাথা নোয়াতে জানে না, স্বপ্ন তো আলো;
অন্ধকার দেয়াল তার পথ রুখতে পারে না।

 

পথের গান

দিন কী রাত, আরো, আরো অন্ধকার হয়ে আসে;
পথে পথে তুমি জ্বালিয়েছ আলো, তা আমি জানি।

এই তুমি এই আমি, আমাদের নিয়ে পরিহাস করে
না বদলানো তথাকথিত আলোকময় দিন ও রাত।

আশাহত বন্ধুরা গেছে তোমায় ছেড়ে, এই দুঃখের দিনে
দু’একটা প্রদীপ, দেখ, জগৎব্যাপী আলো ছড়িয়ে যায়।

গন্তব্য যত দূরে থাক, আমি সঙ্গে আছি, প্রেমের পথের
পথিক মাত্রই জানে আলোকবিন্দুর মাঝে যে আনন্দ।

তোমার হাত আমার হাত, পথে পথে জ্বালিয়ে যাওয়া
প্রদীপের আলো পথ দেখাবে পিছে পড়ে থাকা বন্ধুদের।

যত দুঃখ আলিঙ্গন করে নিয়েছি, ওরা কি জানে না
একদিন আমাদের ভালোবাসায় সিক্ত হবে এই দিনরাত।

আমাদের হৃদয় এখন সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত
দেখব, এই আপদ কালো মেঘের ছায়া কত শক্তিধর!

 

প্রেম ও সৌন্দর্যে

মানুষের পৃথিবী খুঁজেছি আমি; বলতে চেয়েছি
ভালোবাসার কথা, সৌন্দর্যের কথা, প্রেমের কথা,
ফুল ফোটাতে চেয়েছি এই পৃথিবীতে।

এই যে জঞ্জাল, দেখ, অন্ধকার, দূষিত বাতাস;
কী হবে আমাদের ভালোবাসা, প্রেম ও সৌন্দর্যে?
যদি না এই পৃথিবী-এই মরুভূমিতে ফুটল ফুল।

আমি ভালোবাসি মানুষকে
তুমি ভালোবাস মানুষকে

এসো, বর্ণা, টুকরো টুকরো মেঘ হয়ে যাই আমরা
তারপর দু’জন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ি এই পৃথিবীতে;
ফুটবে ফুল আমাদের ভালোবাসা, প্রেম ও সৌন্দর্যে।

ভেঙে যাবে সমস্ত বিপরীত প্রাচীর, ভাঙনের রাজত্ব;
এই বৃত্তের মর্মস্থলে বেজে উঠবে প্রাণের স্পন্দন।

পরম্পরা

কেউ ভালোবেসেছে
এই আমাকে
কেউ খারাপবেসেছে
আমিও।
কেউ হারিয়ে গেছে
পথ হারিয়ে
কেউ আবার অকারণে
আমিও।

এভাবেই
জীবনের চক্রযানে
কোন একদিন
হয়ত
আমি হারিয়ে যাব
তুমি হারিয়ে যাবে
আমাদের
পড়ে থাকা পথে
বাজবে বিরহের বাঁশি
একদিন হবে
চিরকাল ছাড়াছাড়ি
পৃথিবীর সাথে।

তবে বিলীন হব না
আমি জানি
সময়ের আবর্তে
কেউ একজন গাইবে
আমাদের গান
কোন এক সুজন।

মানুষকে ছুঁতে পারা

ভালোবাসার গান, ছড়িয়ে দেয়া যেত বাতাসে
তাহলে হয়ত আমাদের নিঃশ্বাসের সাথে-
ঋতু পরিবর্তনের সাথে যে আমাদের মুখের পরিসর
বদলে যায় ভিন্ন রঙে; প্রত্যেকে অনুভব করতাম
জীবনের মানে, এবং হৃদয়ের অনুভবের অনুশীলনে
ধীরে ধীরে আয়ত্ত হত স্বর্গীয় মানুষের মন।

আমাদের কন্ঠস্বরে সারাক্ষণ প্রেমে আকুল বন্দনা
মহৎ আবেগে; তাই কি-প্রতিটি রঙের মাঝখানে
দেয়াল গড়তেই যে কেটে যায় অসংখ্য জীবন;
অতিক্রম করে এই প্রাচীর, পেছনে ফিরে অবজ্ঞায়
‘শুভবিদায়’ বলে আমরা সম্মুখে তাকাতে পারি না?
চোখ মেললে দেখব-সুন্দর ও সবুজের সমারোহ।

দূর-আকাশ নয়, ভালোবাসার মানুষজন জানে-
যাদের রক্তের ধমনীতে খেলা করে মহত্তম প্রেরণা;
কেবল আমিই যে বলছি তা নয়, যারা ছিন্ন করেছে
এই বন্ধন-দৃষ্টির আড়ালে ঝলমলে আহ্বান;
অবশ্য মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, কে না জানে-
মানুষকে ছুঁতে পারার মধ্যেই জীবনের তাৎপর্য।

পৃথিবীর পথে

নিশ্চিন্তে  ঘুমোচ্ছে সবাই অন্ধকারে
কয়েক পা সামনে এগুলো সে।

একবার পেছনে, মেলে চোখ, দৃশ্যময়-
প্রাত্যহিক জীবনের ঘোলাটে আকাশ।

ছেড়ে ঘর ধীরে ধীরে রাস্তায়
বুকের পাঁজর ভেঙ্গে বেরোল দীর্ঘশ্বাস।

বিষাদমাখা চোখে হাঁটছে পৃথিবীর পথে
মনের প্রাসাদে টালমাটাল স্বচ্ছ, সুন্দর সকাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here