পত্রিকা প্রকাশনা অব্যহত রাখতে গিয়ে সাংবাদিকতা বিসর্জন দেবার উপক্রম হয়

|| মাহফুজুর রহমান ||
মাহফুজুর রহমান, প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা, নিউইয়র্ক
মাহফুজুর রহমান,
প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা, নিউইয়র্ক
আশির দশকে সাংবাদিকতার শুরুতে কখনো ভাবিনি পত্রিকার মালিক হবো। কিন্তু ঘটনাচক্রে তা হতেই হলো। সাংবাদিকতার দায়-দায়িত্ব ও পত্রিকার মালিকানার ভার একসাথে বহন করা সত্যিই এক জটিল ব্যাপার। পেশাদার সাংবাদিকতা ও পত্রিকার পরিচালনা করতে গিয়ে কখনও কখনও সাংবাদিকতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবার যোগাড় হয়। এখানে পত্রিকা পরিচালনা অর্থ্যাৎ প্রকাশনা অব্যহত রাখতে গিয়ে সাংবাদিকতা বিসর্জন দেবার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় এই নিউইয়র্কে। কিন্তু সাংবাদিকতা পেশা অব্যহত রাখাটাই জরুরী আমার কাছে। এই আপ্তবাক্য পালন করতে গিয়ে ভীষন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ‘সাপ্তাহিক বর্ণামালা‘কে নিয়ে সাতটি বছর পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু আগামীর আরো কঠিনতর সময়কে বিবেচনায় নিয়ে সাপ্তাহিক বর্ণমালা‘কে চলতি বছর থেকেই প্রিন্ট কপির সাথে সাথে পূর্ণাঙ্গরূপে অনলাইন পত্রিকা হিসাবে চালু করেছি, আর তাই পাঠকদের দীর্ঘ সাতদিনের প্রতীক্ষাকে বিলীন করে দিয়ে প্রতিদিন, এমনকি প্রতি ঘন্টায় কমিউনিটি ও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের পাশাপাশি বিশ্বের খবরা খবর দিয়ে আপডেট করা হচ্ছে সাপ্তাহিক কর্ণমালা অন লাইন (ww.weeklybornomala.com )।
বিশ্বব্যাপী প্রিন্ট মিডিয়ার বিপর্যয়ের মধ্যেও নিউইয়র্কে একের পর এক বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকার আত্মপ্রকাশ বিস্ময়কর ঘটনা না। আসলে এখন নিউইয়র্ক থেকে একটি পত্রিকা প্রকাশই বোধহয় সবচেয়ে সহজ কাজ। আর তা না হলে সারাদিন অন্য পেশায় হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে অনেকেই কেন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করছেন? অবশ্য পত্রিকা বের করা যত সহজ কাজ তাকে টিকিয়ে রাখা তত সহজ না- যদি তা মান সম্পন্নভাবে প্রকাশ করার মনোবৃত্তি থাকে। কিন্তু এখানে মান কি এবং মান যাচাইর মাত্রা কি তারও কোন মানদন্ড নেই। আর তাই যে যার নিজের মান নিজেই তৈরী করে তা নিজের ঢোলের মত করে পিটাতে থাকেন। আর এই আওয়াজে অনেকেই আকৃষ্ট হন। অবশ্য যারা আকৃষ্ট হন তাদেরও মান কি পাঠক হিসাবে তাও ভেবে দেখার বিষয়। কারন এখানকার বেশীর ভাগই পাঠকই পত্রিকা পড়েন না, পত্রিকা দেখেন অর্থাৎ পত্রিকায় তার বা তাদের ছবি ছাপা হলো কিনা তাই দেখতে উন্মুখ তারা। আর যারা ঢোল পিটান তারা সংবাদের চেয়ে দেখার জিনিস (ছবি) বেশী বেশী করে দিয়ে নিজেদের ‘ঢোল’কে প্রকট করেন।

বলছিলাম যে নিউইয়র্কে এখন যে কেউ চাইলেই হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর অথবা ট্রাভেল-টেলিফোন ব্যবসা, চিকিৎসা পেশা অথবা নাম না জানা কোন পেশায় থেকেও পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশক অথবা প্রধান বা উপদেষ্ঠা সম্পাদক বনে যেতে পারেন। এরজন্য কোন যোগ্যতার মাপকাঠির প্রয়োজন নেই।
আর ঠিক এমন পরিস্থিতিতে গত সাত বছর ধরে সাপ্তাহিক বর্ণমালা প্রকাশ করতে গিয়ে যতটা না আর্থিক সমস্যায় পড়েছি তার চেয়ে বেশী পেশাগত সম্মান রক্ষার সমস্যায় পড়েছি। কিন্তু কিছু করার নেই মুক্তবাজারের দেশ আমেরিকায় যার যা খুশি করার (ব্যবসা) অধিকার রয়েছে এবং সেই অধিকারকে কে করবে ক্ষুন্ন? অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন করতে না পারলেও নিজের সম্মান অনেকখানি ক্ষুন্ন করে এই পেশায় এবং পাশাপাশি ব্যবসায় টিকে আছি যে তার তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি হাতে গোণা কিছু বিজ্ঞাপনদাতা-পৃষ্ঠপোষকের সমর্থনে। কিন্তু এর চেয়েও ভাল থাকার কথা ছিলো সাপ্তাহিক বর্ণমালার। কারন এই নিউইয়র্কে যারা পত্রিকা বা সংবাদ মাধ্যমকে সমর্থন বা আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করছেন দীর্ঘকাল ধরে তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সাথে হুবহু মিলে যায় বর্ণমালার বিশ্বাস ও বোধের। কিন্তু দৃশ্যমান এই স্বমিলের কথা তারা তারা সব সময় বলেন এবং বর্ণমালা যে তাদের পত্রিকা তা উচ্চকণ্ঠে বলেন। কিন্তু অদৃশ্যমান বিষয়টি হলো এই সমস্ত মানুষ কিছের কি টানে তাদের বিশ্বাসের বিপরীত ও মূল্যবোধের উল্টো স্রোতের পত্রিকাগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তারা শুধু নিজেই নন তাদের পরিচিত এবং দূর পরিচিতদেরও তা করতে বলেন। এই বৈপরিত্যের মাঝে বর্ণমালা টিকে আছে সাত বছর ধরে। আর এর পেছনে সুস্থ্যধারার বিপরীত রাজনীতিতে বিশ্বাসীরাই বলতে গেলে প্রকাশ্যে বর্ণমালাকে সমর্থন করেন এর পেশাদারিত্বের জন্য। এবং তারা একে পৃষ্ঠপোষকতাও করেন নিরপেক্ষভাবে। আমিও এইধারার মানুষগুলোর কাছে বেশী কৃতজ্ঞ। কারন তারাই সংখ্যায় বেশী যারা বর্ণমালাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
পরিশেষে সবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা প্রকাশ করে বর্ণমালা‘কে আগামীতেও তাদের প্রিয় পত্রিকা হিসাবে অব্যহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।

-মাহফুজুর রহমান,

প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা, নিউইয়র্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here