হুমায়ূন নেই, হুমায়ূন আছেন…

0
196

2016_07_19_20_07_38_WDMpd17eWL4Z9unrOySDQ75uuFFWsF_originalহুমায়ূনের কাল কি শেষ হয়ে গেল? তাঁর বই-এর কাটতি কি আগের মতো রয়েছে? জনপ্রিয়তাই কি হুমায়ূনের মূল শক্তি? তাঁর স্বাতন্ত্র্য বা প্রাতিস্বিকতা কোথায়? মৃত্যুর পরও কি তিনি আগের মতো জনপ্রিয় বা পাঠকপ্রিয় আছেন? বিজ্ঞান আর বৃষ্টির মায়া তাঁকে আঁকড়ে ধরেছিল সেই শৈশবে। সেই টানে তিনি ভেসে বেড়িয়েছেন সারাজীবন। আমার এক ছাত্র- হুমায়ূনভক্ত আবীরের কথা দিয়ে আজকের নিবন্ধটি শুরু করতে চাই। বছর সাতেক আগের কথা। ধনীর দুলাল আবির, লেখাপড়ায় প্রায় উচ্ছন্নে গেছে বলে তার অভিভাবকদের এমনকি কিছু শিক্ষকেরও ধারণা, একদিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ধানমন্ডী থেকে আমার উত্তরার বাসায় একটি অনুরোধ নিয়ে এসে হাজির হলো। সে শুধু একবারের জন্য হুমায়ূন স্যারের সাথে দেখা করতে চায়। তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করতে চায়। আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি কিনা, জানতে চায় আবীর। এই এক বাসনা বুকে নিয়ে আবীর ঘুরছে অনেকদিন ধরে। ওর বাবা-মা ভেবেছিল- ছেলের মাথায় পাগলামি চেপেছে। ‘হিমু’ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে তাদের ধারণা। ছেলের এই ‘নষ্ট’ হবার ঘটনায় তারা যার পর নাই আতঙ্কগ্রস্ত। হুমায়ূন আহমেদের সাথে আমার কখনো কথা হয়নি। যদিও ১৯৯৮ সাল থেকে টানা প্রায় ১৪ বছর বাংলা একাডেমির বইমেলায় বহুবার তাঁকে দেখেছি অটোগ্রাফ শিকারীদের ভিড়ের ফাঁকে। আবীরকে আমি তাঁর কাছে নিয়ে যেতে পারিনি। অবশ্য কেন যেন তেমন চেষ্টাও করিনি। সেটা হয়তো আমার অপারগতা কিংবা অক্ষমতা ছিল।

হুমায়ূন প্রকৃতপক্ষে কী বলতে চেয়েছেন তাঁর সাহিত্যে ও শিল্পে? নতুন কিছু কি রয়েছে তাঁর লেখায়, পরিবেশনায় ও প্রযোজনায়? নাকি তিনি চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির এক অনবদ্য ভাষ্যকার? বঙ্কিম মাইকেল- বিদ্যাসাগররা যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলেছেন, হুমায়ূন কি সেই পথেরই অনুসন্ধান করে গেছেন আমৃত্যু? লালন রবীন্দ্রনাথ যে বাউল বাঙালির চরিত্র ও কাহিনি এঁকেছেন, হুমায়ূন কি তার বাইরে কিছু করেছেন? কিংবা রস, রসায়ন ও সাহিত্য পরিবেশনে তিনি কতোটা অতিক্রম করেছেন শরৎচন্দ্রকে? তিনি কি ভিন্ন কোনো পথ নির্মাণ করেছেন, নাকি পুরনো পথটাকেই ঘষে-মেজে প্রজন্মের কাছে নতুন করে হাজির করেছেন? ‘হিমু’ রবিঠাকুরের ‘তারাপদ’র বর্ধিত সংস্করণ কিনা, তাও ভেবে দেখা যেতে পারে। রবিবাবু কিংবা শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তাকে হুমায়ূন স্পর্শ করতে পেরেছিলেন কিনা, জানি না। তবে বাঙালির প্রায় ফুরিয়ে আসা পাঠ প্রবণতা ও পুস্তকপ্রেম তিনি পুনরুদ্ধার করেছেন। যে বাঙালি বই পড়তে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, তাদেরকে তিনি নতুন করে টেনে এনেছেন পাঠের জগতে।

কিছু কবিতা লিখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। লিখেছেন গল্প উপন্যাস নাটক চিত্রনাট্য ভ্রমণকাহিনি। ছবিও এঁকেছেন। বাঙালির সংস্কৃতির চিরায়ত ধারায় রচনা করেছেন কিছু গানও। পরিচালনা করেছেন চলচ্চিত্র। গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখেছেন, তেমন শুনিনি। তবে তাঁর মননের প্রকাশ সৃজনশীলতাকে আশ্রয় করেই। সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন নিজের একটা বলয়। প্রকাশনায়, পাঠকসমাজে, কলাকুশলীর কাছে নিজের একটা জগৎ তিনি নির্মাণ করেছিলেন বটে। কিছু শিল্পী তিনি খুঁজে বের করেছেন এবং তারা প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে। এই ক্ষেত্রে হুমায়ূনের কৃতিত্ব আছে। সমকালকে হুমায়ূন যাপন ও উদযাপন করেছেন। উত্তরকালে তাঁর স্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নির্ধারণের সময় এখনও আসেনি। হিমু, মিসির আলী কিংবা ইরিনারা তাঁদের স্রষ্টাকে কতদূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে তার মীমাংসা হবে সময়ের প্রবল প্রবাহের ভেতর দিয়ে।




দেশভাগের পরের বছর, ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর ৩ টুকরো হওয়ার ভারতবর্ষের ছোট্ট ভূমি পূর্বপাকিস্তানের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের শেখবাড়িতে জন্মেছিলেন কাজল। মা আয়েশা ফয়েজ আদর করে বলতেন ‘সোনার পুতলা’। পরে তিনি হুমায়ূন আহমেদ হয়ে বিচিত্র সম্মান ও বৈভব কুড়িয়ে পারি জমিয়েছেন নূহাশপল্লীর নিঃশেষ নির্জনতায়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক আবহ নিশ্চয় তাঁর সাহিত্যিক পরিসর কিংবা শিল্পমানস তৈরিতে সহায়কের ভূমিকা পালন করেছে। শৈশবে ঘরে দেখেছেন বাবার আয়োজনে ‘সাহিত্য বাসর’। বাবা ফয়জুর রহমান গল্পও লিখতেন। প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠেছেন হুমায়ূন। গাছপালার নীরব অটলতা, জোছনারাত, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ তার প্রিয় প্রসঙ্গ। শহরের ইট-পাথরের খাঁচার চেয়ে তিনি বেশি পছন্দ করতেন প্রকৃতিকানন। বাঙালি মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনা, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য, জীবনের বৈচিত্র্য ও জটিলতা হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত সরল ভাষায় পাঠক-দর্শকের সামনে পরিবেশন করেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ সত্তর দশকের গোড়ার দিকে একটি মাসিক পত্রিকায় ছাপা হয়। তারপর তিনি লেখেন ‘শঙ্খনীল কারাগার’। অতঃপর ‘এইসব দিনরাত্রি’ ও ‘বহুব্রীহি’ আশির দশকে বিটিভিতে ধারাবাহিক নাটক হিসেবে প্রচার হতে শুরু করলে তাঁর জনপ্রিয়তার শুরু। ‘নক্ষত্রের রাত’ এবং ‘অয়োময়’ তাঁর জনপ্রিয়তার সুতোকে আরো লম্বা করেছে। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’, ‘দেয়াল’ এবং হিমু ও মিসির আলী-বিষয়ক রচনাবলী পাঠকপ্রিয় দর্শকপ্রিয় সৃষ্টি। আমৃত্যু সেই গ্রহণযোগ্যতা তিনি ধরে রেখেছেন এবং ক্রমাগত তা সম্প্রসারিতই হয়েছে বলা চলে।

কৃষিভিত্তিক বাংলার লোকভাষা, আচার-আচরণ, ভঙ্গি প্রভৃতি তাঁর সাহিত্যের উপাদান হয়ে উঠেছে অনায়াসে। আর তাঁর প্রকৃতিপ্রেমের বিরাট তাজমহল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাজীপুরের বৃক্ষঘেরা সবুজ সতেজ ‘নূহাশপল্লী’। কেবল গাছপালা-চাঁদ-বৃষ্টি নয়- ‘সমুদ্রবিলাস’ও তাঁর অনন্য বাসনার বহিঃপ্রকাশ। তিনি সমুদ্রকে, দ্বীপকে, দ্বীপের মানুষের সংগ্রামময় জীবনকে ভালোবেসেছেন। তাদেরকে সম্মানের জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেন্ট মার্টিনকে তিনি ‘রূপালি দ্বীপ’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ নামে ডেকে ডেকে আমাদের প্রাণের স্পর্শকে নতুন করে অনুভব করতে শিখিয়েছেন। দ্বীপের জীবনে আধুনিকতা ছোঁয়া লাগাতে তাঁর যে চেষ্টা, তার জাতির জন্য এক বিরাট শিক্ষাও বটে। নাটক-চলচ্চিত্রে গানের প্রয়োগে তাঁর প্রাতিস্বিতা সহজেই নজরে আসে। হুমায়ূনের কাহিনি মানেই গানে গানে সাজানো কথামালা। তাঁর নায়ক নায়িকারা প্রায় সবাই গায়ক। নতুন নতুন শিল্পীও আবিষ্কার করেছেন তিনি। বাউল গান, হালকা যিকির, মারফতি, দেহতত্ত্ব, লোককাহিনি, লোকছড়া, লোকপ্রবাদ প্রভৃতি প্রসঙ্গ তাঁর সাহিত্যের পরতে পরতে সাজানো।

অবিরামভাবে লিখে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল হুমায়ূন আহমেদের। এমনটা অনেকেরই থাকে না। মানুষ সমাজ জীবনবোধ মুক্তিযুদ্ধ রাজনীতি তাঁর লেখার বিষয় আশয়। তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’ (২০১৩, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা) সমকালীন দেশীয় রাজনৈতিক বিষয়াবলি এবং ব্যক্তির সিদ্ধান্তহীনতার ইঙ্গিত-আবরণে আঁকা ‘দেয়াল’ হুমায়ূনের মৃত্যুর পর প্রথম বইমেলায় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ায় (আগে পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল) পাঠক এবং প্রচারমাধ্যমের বিশেষ ও বাড়তি দৃষ্টি কেড়েছে। তবে কেন্দ্রীয় চরিত্র শফিক অবন্তির সম্পর্ক, অবন্তিদের পরিবারের ভেতরের ও বাইরের ব্যাপারাদি, ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক জটিলতা, প্রেসিডেন্ট মুজিব হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার আবির্ভাব ও তিরোধানের রহস্য, শেষপর্যন্ত পাঠককে কোনো উপসংহারের দিকে যেতে সহায়তা করে না। কিছু প্রশ্ন, কিছু বিতর্ক যেন সমাধানহীন ও বিতর্কিতই রয়ে যায়। সম্ভবত উপন্যাসটি রচনা, এর বিন্যাস এবং প্রকাশের বিষয়ে লেখক কোনো দোলাচলতা অনুভব করেছিলেন।

প্রসঙ্গত, কাহিনিটির আরম্ভাংশের খানিকটা পাঠ দেখে নেওয়া যেতে পারে: ‘ভাদ্র মাসের সন্ধ্যা। আকাশে মেঘ আছে। লালচে রঙের মেঘ। যে মেঘে বৃষ্টি হয় না, তবে দেখায় অপূর্ব। এই গাঢ় লাল, এই হালকা হলুদ, আবার চোখের নিমিষে লালের সঙ্গে খয়েরি মিশে সম্পূর্ণ অন্য রঙ। রঙের খেলা যিনি খেলছেন মনে হয় তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।’ বর্ণনাটিতে প্রকৃতির স্রষ্টার ‘খেলা’র সাথে বর্তমান কাহিনির রূপকারের ‘চিন্তাধারা’র আবহ আস্বাদ সামান্য সাদৃশ্যও কল্পনা করা যেতে পারে। উপন্যাসটিতে কিছু চিঠিপত্রের উপস্থিতি পাঠককে নতুন নতুন আনন্দ এবং তথ্য সরবরাহ করে। যেমন অবন্তিকে লেখা তার স্পেন-প্রবাসী মায়ের চিঠি আর বাংলাদেশের কোনো এক আন্ধা পীরকে লেখা মুজিব-হত্যার অন্যতম নায়ক লিবিয়া-প্রবাসযাপনকারী কর্নেল ফারুকের পত্র। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির দ্বন্দ্ব আর তার আড়ালে লুকিয়েথাকা রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতা লোভ বিলাস সরলতা, রেষারেষি দ্বিমত, চাটুকারিতা, সহাবস্থান, রক্তরঙের নেশা ও আভাস বিষয়ে লেখকের অভিজ্ঞান বুঝতে অবন্তির মায়ের একটা চিঠির কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি: ‘যাই হোক, আমার এই বয়ফ্রেন্ড সম্পর্কে  তোমাকে বলি। তার একটা কফি শপ আছে। কফি শপের নাম ‘নিন্নি ব্ল্যাক’। তার প্রধান শখ হলো ঘোড়ায় চড়া। তার তিনটা ঘোড়া আছে। রোনিওর পাল্লায় পড়ে আমাকেও ঘোড়ায় চড়া শিখতে হচ্ছে। তার গলায় পুরোপুরি ঝুলে পড়ার কথা এখনো ভাবছি না, তবে আমরা একসঙ্গে বাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সে চাইছে আমি তার সঙ্গে গিয়ে থাকি। দুই বেডরুমের একটা অ্যাপার্টমেন্টে সে থাকে। এটাই সমস্যা। বিশাল ভিলায় থেকে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। রোনিওর সঙ্গে বাস করলে নিশিরাতে ভিলার বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হব। সবকিছু তো আর একসঙ্গে হয় না। রোনিওর সঙ্গে আমার কিছু মতপার্থক্যও আছে। যেমন, সে সি ফুড পছন্দ করে না। আমি হচ্ছি সি ফুড লাভার। তার লাল রঙ পছন্দ আর আমার অপছন্দের রঙ হচ্ছে লাল। রোনিওর অ্যাপার্টমেন্টের পর্দার রঙ লাল, কার্পেটের রঙ লাল। আমি তাকে পর্দা ও কার্পেট বদলাতে বলেছি। সে রাজি হচ্ছে না। কী করি বলো তো?’ ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ কি তাহলে লালরঙের পরিবেশনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হত্যাকা নাটক রহস্য এবং ‘মেয়ের কাছে মায়ের পরামর্শ’ চাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের অদূরদর্শিতা আর অসহায়তাকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন?


সাহিত্যচর্চার নানান বাঁকে ও মোড়ে ভূতপ্রসঙ্গ কিংবা খেলাধূলা নিয়েও মেতেছেন এই কথাকারিগর। হুমায়ূনের গল্পে ফ্যান্টাসি আছে। আছে ম্যাজিক রিয়ালিজমও।


সাহিত্যের চেতনাপ্রবাহ রীতির অনুষঙ্গও তিনি প্রয়োগ করেছেন কাহিনিবয়নের সূত্র হিসেবে। স্বপ্নময় বাস্তবতার জগতে দাঁড়িয়ে মনকে জাগ্রত রাখার কলা ও কৌশল তিনি পরিবেশন করতে পেরেছেন। কাহিনি কাঠামো বিন্যাস, সহজ বর্ণনাশৈলী, চরিত্রের নিজস্ব-আলোক, রসে পূর্ণ সংলাপ, নাটকীয়তার প্রাচুর্য, চলমান জীবনে অসঙ্গতির নিবিড় পর্যবেক্ষণ হুমায়ূনের রচনার নন্দনবাগান। বর্ণনার ডিটেলে খুব একটা যেতেন না হুমায়ূন। কম কথায় জাপানি চিত্রকরের মতো নকশা আঁকতেই ছিল তাঁর আনন্দ। যাপিত জীবনের সংকীর্ণতাকে তিনি ব্যক্তিবিবেচনার বাইরে শিল্পের বারান্দায় দাঁড় করাতে চেয়েছেন। শিক্ষায় শিক্ষকতায় লেখায় সৃষ্টিতে ও পরিচালনায় ‘জিরো থেকে হিরো হওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন এই অপরাজেয় ও পূর্ণিমাভক্ত নিবিড় চাঁদমানব কথানির্মাতা। ইংরেজ কবি রবার্ট ফ্রস্টের মতো তিনি বিশ্বাস করতেন: ‘ঘুমোবার আগে যেত হবে বহুদূর…’।

মানুষকে চমকে দিতে ভালোবাসতেন হুমায়ূন। কাউকে হঠাৎ ভয় দেখানো, নানান রকম মজা করা, অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা করে সবাইকে ভড়কে দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যাদুবিদ্যার প্রতিও প্রবল ঝোঁক ছিল তাঁর। হয়তো সে যাদুই তিনি প্রয়োগ করেছেন কথামালায় ও চরিত্রের আচরণে। আর সব সাধারণ বিষয়ের ভেতর থেকেও তিনি সহজেই আবিষ্কার করতে পারতেন সৌন্দর্য ও ভিন্নতা। এ-বিষয়ে হুমায়ূন একবার লিখেছিলেন: ‘আমি আমার বড় মেয়ের বিয়েতে বিশেষ কোনো উপহার দিতে চেয়েছিলাম। শাড়ি, গয়না, ফ্রিজ, টিভির বাইরে কিছু। কী দেওয়া যায় কী দেওয়া যায়? নোভার অতি প্রিয় লেখকের নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নোভার বিয়ের আসরে প্রিয় লেখককে উপস্থিত করলে কেমন হয়? এই উপহারটি হয়তো তার পছন্দ হবে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং তার স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে নিমন্ত্রণ জানালাম। তাঁদের বললাম, মেয়ের বিয়েতে গিফট হিসেবে তাঁদের প্রয়োজন। আমাকে অবাক করে দিয়ে দু’জনেই চলে এলেন। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বিয়ের আসরে বিডিআর-এর দরবার হলে উপস্থিত হলেন। নোভা তার বরকে নিয়ে স্টেজে বসে ছিল। বিয়ের এবং উৎসবের উত্তেজনায় সে খানিকটা দিশেহারা। আমি বললাম, মা, তোমার বিয়ের গিফট দেখে যাও। নোভা তার প্রিয় লেখককে বিয়ের আসরে দেখে চমকে উঠল।’ একটা শক্তি ছিল হুমায়ূনের- প্রকাশের শক্তি। সচেতন কিংবা অবচেতনে তিনি প্রকাশ করেছেন অনুভূতি, কল্পনা ও পরিকল্পনা। স্বদেশ ছিল তাঁর প্রিয় ভূমি। তিনি বিদেশ পছন্দ করতেন না। হাসপাতাল পছন্দ করতেন না। ডাক্তার পঝন্দ করতেন না। কিন্তু শেষবেলায় তাঁকে বিদেশ-হাসপাতাল-ডাক্তার আষ্টেপিষ্টে ছিল। কিছুতেই ছাড়েনি।

২০১২ সালের বর্ষাকাল। ১৯ জুলাই। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুসংবাদ প্রচার হচ্ছে মিডিয়ায়। একটি গান বারবার বেজে উঠছে, মনে পড়ে- ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়।/ ঝরঝর বৃষ্টিতে জলভরা দৃষ্টিতে এসো কোমল শ্যামল ছায়।/ … যদিও তখন আকাশ থাকবে বৈরী/ কদমগুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরি/ উতলা আকাশ মেঘে মেঘে হবে কালো ঝলকে ঝলকে নাচিবে বিজলি আলো/ চলে এসো তুমি চলে এসো এক বরষায়।’- আবার ফিরে এলো বর্ষার প্রহর। বাদলের রাত। বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলও ফুটেছে দিকে দিকে। হুমায়ূন আহমেদ পছন্দ করতেন বৃষ্টির কাল। বর্ষাকে মাথায় করেই ৩ বছর আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। সে বারের মতো প্রতিবছর আসবে বর্ষা। আর প্রতিবারের মতো আগামী সব শীতের শেষে ফাল্গুনের শুরুতে বসবে বইমেলা। বাংলা একাডেমি চত্বরে বইপ্রেমীদের আনাগোনা হবে। হবে নতুন-পুরনো বই-এর বিকিকিনি। হুমায়ূনের ছবি উঁকি দেবে কোনো প্যাভিলিয়নের জানালা থেকে। গাছেদের ছায়ায় ধীরে ধীরে পুরনো হতে থাকবে হুমায়ূনের পদধ্বনি। প্রতি বর্ষায় শীতে বসন্তে নূহাশ পল্লীর লিচুতলায়, বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের চত্বরে হয়তো কেঁদে ফিরবে হুমায়ূনের মন। আর বাতাসে বাতাসে ভেসে আসবে একটি গানের সুর, হুমায়ূনের অনেক প্রিয় গানের একটি- ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়…’। হয়তো আরো বহুদিন এই গানে গানে আমাদের সাহিত্য-বাগানে ঘুরে বেড়াবে একটি কথা- হুমায়ূন নেই, হুমায়ূন আছেন…

লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here