‘দেয়াল’ উপন্যাস কি শেষ করে যেতে পেরেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ!

 

।।ফকির ইলিয়াস।।

একটা সন্দেহের দানা থেকেই গিয়েছিল। না, প্রকাশিত ‘দেয়াল’ উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত সমাপ্ত করে যেতে পারেননি প্রয়াত উপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ ! এমন একটি আভাসই বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া গিয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের চিরবিদায়ের পর Humayun New 0019এই উপন্যাসটি অন্য কারো দ্বারা লিখিয়ে নেয়া হয়েছে! যে কাজটি হুমায়ুন আহমেদ শুরু করেছিলেন, তা তার নিজ হাতে শেষ পর্যন্ত সমাপ্ত হয়নি, এমন কথাই বলেছিলেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।
হুমায়ুন আহমেদ ‘দেয়াল’ উপন্যাসটি লেখার সিদ্ধান্ত নেন একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে। যা ছিল রাজনৈতিকভাবে খুবই সংবেদনশীল। তিনি এই উপন্যাসটি লেখার সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করেন যখন জাতিসংঘ অধিবেশনে এসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসুস্থ হুমায়ুন আহমেদকে দেখতে নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকায় তার বাসায় যান।
দিনটি ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১। ওইদিনই শেখ হাসিনা হুমায়ুন আহমেদকে ১০ হাজার ডলারের একটি চেক হস্তান্তর করেন সম্মাননা হিসেবে।
এর কয়েকদিন পরই সরকারি অধ্যাদেশ বলে, হুমায়ূন আহমেদকে নিউ ইয়র্কস্থ বাংলাদেশ জাতিসংঘ স্থায়ী মিশনের উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়।
এর পরপরই হুমায়ুন আহমেদ ‘দেয়াল’ নামের উপন্যাসটি লেখার জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। এ সময়ে নিউ ইয়র্কস্থ বইয়ের দোকান ‘মুক্তধারা’ থেকে তার প্রয়োজনীয় বইগুলো সাপ্লাই দেন, মুক্তধারা’র কর্ণধার বিশ্বজিত সাহা।
প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে হুমায়ুন দেয়াল লেখা শুরু করেন। যার কিছু অংশ একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত হয়।
এরপরই ঘটে যায় অন্য বিপত্তি। পাঠক মহলে তা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সমালোচক, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন- “দেয়াল ভুল তথ্যের ওপর ভর করেছে।”
২০১২ সালের ১৫ মে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, হুমায়ূন আহমেদের লেখা দেয়াল নামের উপন্যাস সংশোধন না করে তা প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন হাইকোর্ট। এই উপন্যাসে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার বিবরণে তথ্যগত ভুল রয়েছে, এমন অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতের নজরে এনেছিলেন।
বলে রাখা দরকার, এই বিষয়ে আমি ঢাকার একটি দৈনিকের ‘দেয়াল এর শানে নুযুল, উপন্যাসের ডানা ও ইতিহাসের সত্যস্তম্ভ’- শিরোনামে একটি উপসম্পাদকীয় লিখি। যা ২০১২ সালের ২০ মে ছাপা হয়।
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, ক্যানসার আক্রান্ত হুমায়ুন আহমেদ নিউ ইয়র্কে অধিক সময়ই ছিলেন গুরুতর অসুস্থ। প্রথম দিকে তিনি কিছুটা লেখালেখি করলেও, পরে আর কলমই ধরতে পারছিলেন না। এই অবস্থায় তিনি ২০১২ সালের ৯ মে বাংলাদেশে যান এবং ৩ জুন আবার নিউ ইয়র্কে ফিরে আসেন।
নিউ ইয়র্কে ফিরে তিনি ‘দেয়াল’ উপন্যাসের আরো তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহের জন্য, খন্দকার মোশতাক আহমদ বিষয়ে বিস্তারিত জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই কাজে তাকে সহায়তায় এগিয়ে আসেন আবারো ‘মুক্তধারা’র বিশ্বজিত সাহা।
এখানে উল্লেখ করা দরকার, খন্দকার মোশতাক আহমদের পালিত পুত্র রফিক আহমদ খান নিউ ইয়র্কে বসবাস করেন। রফিক আহমদ খান একজন সাবেক কুটনীতিক, যিনি নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটেও ‘কনসাল জেনারেল’-এর দায়িত্ব পালন করেছেন।
রফিক আহমদ খানের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের অ্যাপোয়েন্টম্যান্ট করে দেন বিশ্বজিৎ সাহা। তারিখ ঠিক হয় ৬ জুন ২০১২।
কিন্তু পরে বিশ্বজিৎ সাহাকে হুমায়ূন আহমেদের সফরসঙ্গী অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম জানান, হুমায়ূন আহমেদের শরীর অত্যন্ত খারাপ, তাই অ্যাপোয়েন্টম্যান্ট রক্ষা করা সম্ভব নয়। এর পরে রফিক আহমদ খানের সাথে হুমায়ূন আহমেদের আর কোনো বৈঠক হয়নি।
পরবর্তী দিনগুলোতে হুমায়ূন আহমেদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। ২০১২ সালের ৫ জুন এনেসথেসিয়া বিভাগ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ১২ জুন অস্ত্রোপচারের ক্লিয়ারেন্স দেন ডাক্তাররা। সেদিন হুমায়ূন আহমেদের কোলনে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়। ১৯ জুন তিনি হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন।
২০ জুন তিনি বাসায় চেয়ার থেকে পড়ে যান। আবার তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর তিনি আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাননি। ২৯ জুন তাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। তার পরের প্রতিটি দিন ছিল তার মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। অবশেষে ১৯ জুলাই দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে তিনি চিরবিদায় গ্রহণ করেন।
এখন যে প্রশ্নটি আসছে, তা হলো এই সময়ের মধ্যে হুমায়ুন আহমেদ ‘দেয়াল’ সংশোধন করে লিখে যাওয়ার সময় কোথায় পেলেন?
আমরা জানি, হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন এই সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক। তার বইগুলো একুশে বইমেলার প্রথম দিকেই বের হতো। যাতে পুরো মাস বিক্রি হয়। কিন্তু ২০১৩ তে দেখা গিয়েছিল ‘দেয়াল’ মেলায় এসেছে ২০ ফেব্রুয়ারি। এর কারণ কী? তবে কি দ্বিতীয় কোনো হাত ছুঁয়ে বইটি সমাপ্তি পেয়েছে বলেই যথাসময়ে বাজারে আসতে পারলো না? এসব বিষয় ও প্রশ্নগুলোর জবাব খুব সঙ্গত কারণেই পাঠক সমাজ জানার দাবি রাখেন। এখনও প্রশ্ন করেন কেউ কেউ- এটা আসলেই কি
তাঁর লেখা শেষ উপন্যাস !

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here