’বঙ্গবন্ধু’ ও নিউইয়র্কের বাণিজ্যিক সাংবাদিকতা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

।। মাহফুজুর রহমান।।
নিউইয়র্ক তথা আমেরিকায় যারা সাংবাদিকতা পেশার সাথে কোন না কোনভাবে জড়িত তাদের সিংহভাগই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেন উৎকটভাবেই। তাদের কথায় মনে হবে বঙ্গবন্ধু কিছুই ছিলেন না। এদের কাছে কসাই কাদের মোল্লা বা ফকা‘র পোলা সাকা অথবা নিজামী অনেক বড় মাপের মানুষ। এরা কথায় কথায় বলেন বঙ্গবন্ধুর দাফনের সময় হাতে গোণা মানুষ উপস্থিত থাকায় তার অজনপ্রিয়তা প্রকাশ পায় এবং তারা কাদের মোল্লার জনপ্রিয়তার (!) কারণে তার শোক সভায় গিয়ে কাদের মোল্লাকে ‘শহিদী’ মৃত্যুবরণকারী হিসাবে অ্যাখ্যায়িত করেন।
 
এদের মধ্যে সরাসরি জামাত করেন বা যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গী যারা তাদের কথা বাদ দিলাম না হয়, কিন্ত যারা তথাকথিত ছাত্র ইউনিয়নিস্ট ( আমেরিকায় বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন রয়েছে যারা নিজেদের স্বাথে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতি তাদের সমর্থন বিক্রি করেন)-এই ইউনিয়নিস্টরাও তেমন নিজেদের স্বার্থে এবং সুবিধাজনক সময়ে ও পরিবেশে এরা বঙ্গবন্ধুকে তুলোধূনা করতে ছাড়েন না। আবার ইদানিং (দীর্ঘ আটবছর আাওয়ামীলীগ দেশ শাসন করায়) এদের চরিত্রে অনেক পরিবর্তন ও হতাশা সৃষ্টি হওয়ায় এরা আর বঙ্গবন্ধুকে আগের মত গালাগাল করেন না এবং করতে ভয় পাওয়াও শুরু করেছেন (!)। এই না করাটার পেছনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে বলে মনে করার কোন কারন নেই। কারন হচ্ছে কিছু সুবিধাভোগী ও নিন্মমানের আয়োজেকদের অনুষ্টানকে আলোকিত করতে এরা এখন বঙ্গবন্ধুর জন্য মায়া কান্না করেন আর অনুষ্ঠানের চেয়ার দখল করেন।
 
নিউইয়র্কে সেই ১৯৯৬ সাল থেকে বসবাস করছি এবং ঘটনাচক্রে সাংবাদিকতার পেশায় রয়ে গেছি। এই দীর্ঘ বিশবছরের পথচলায় নিউইয়র্কে এক কি দুইজন সাংবাদিকের মুখে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি উচ্চারিত হতে শুনেছি। অথচ নিউইয়র্কে
তখনও ২০ বছর আগে ডজনের বেশী সাংবাদিক ছিলেন তেমনি এখন কয়েক ডজন সাংবাদিক রয়েছেন এরমধ্যে বয়োবৃদ্ধ থেকে তরুণতম অনেক সাংবাদিকের মুখে বঙ্গবন্ধু শব্দটি উচ্চারিত হতে শুনি না। আবার কেউ কখনও সখনো ’বাণিজ্যিক’ কারণে আগস্ট মাসে দুয়েকবার শব্দটি উচ্চারন করেন। আবার এদের মধ্যে যারা পত্রিকা পরিচালনা করেন তাদের অনেকেই সম্পাদকীয় নীতিতে বঙ্গবন্ধু কথাটির সাথে তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করেন এবং উপরে উপরে বিএনপিকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে ‘অন্তরে জামাত-যুদ্ধাপরাধী’র পক্ষে কাজ করেন ও কৌশলে সংবাদ প্রকাশ করেন তাদের আগস্ট মাসে গিরগিটির মত রং বদলানো দেখলে অনেক সময় নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখতে হয় আসলে জেগে আছি নাকি…?
 
এই বাণিজ্যিক সাংবাদিকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন এক শ্রেণীর আমলাও। এক সময়ে নিউইয়ক বা ওয়াশিংটনে ছোটখাটো পোস্টে চাকুরী করার সময় সেইসব আমলারা বঙ্গবন্ধুর প্রতি অশ্রদ্ধাশীল কোন কোন সাংবাদিকের সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক করে নিজের নামে তৈলাক্ত প্রতিবেদন রচনা করিয়ে নিয়োগকর্তার সুনজরে আসার কাজটি করিয়ে নিয়েছিলেন পরবর্তীতে সেই ছোট আমলারা ক্রমেই বড় হয়ে ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক বা লস এঞ্জেলেসে বড় পদ নিয়ে যোগ দিয়ে ‘তৈলের্ ঋণ’ শোধ করার জন্য সেইসব বঙ্গবন্ধু ঘৃণাকারীদের বঙ্গবন্ধুপ্রেমী হিসাবে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন।
 
এইতো গেলে আমলাদের কথা। এবার আসি এখানে আওয়ামীলীগ নামে রাজনীতি করা কোন কোন মানুষের মুখে বঙ্গবন্ধু বলে ফেনা তুলে ফেলার সাথে সাথে জামাতের সমর্থক সংগঠন মুসলিম উম্মাহ বা এজতীয় আরো কিছু নামে-বেনামের সংগঠনের প্রতি সমর্মিতার কথা। তাদের কাছে এ নিয়ে জানতে চাইলে তারা বলিষ্টকণ্ঠে বলেন ‘মুসলিম উম্মাহ’ জামাত না। তাদের এই কথা শুনে আশে পাশের মানুষজন হাসলেও তারা বিব্রত হন না। আর না হবারই কথা কারন এসব ইউএস আওয়ামীলীগারদের অনেকের সহধর্মীনী মুসলিম উম্মাহর দাওয়াত কবুল করে তাদের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করছেন। এমনও দেখা গেছে কয়েক বছর আগে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘে ভাষন ও ম্যানহাটানে নাগরিক সববর্ধনার সময়ে স্বামী প্রবর (ইউএস আওয়ামীলগ নেতা) গলা ফাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর বন্দনা করে আর তারই পাশে আগেরটি সমাবেশ থেকে তার অধাঙ্গীনী ‘হাসিনা সরকারের ড়তন’ কামনা করে চিৎকারে গলা ফাটাচ্ছেন।
 
অন্যদের মত নিউইয়র্কে আওয়ামীপন্থী বলে দাবীদার ব্যবসায়ীরাও একই অদ্ভুত আচরণ করে থাকেন তাদের কর্মকান্ডে। প্রচন্ড আওয়ামীলীগ অনুরাগী ও বঙ্গবন্ধুভক্ত কোন কোন ব্যবসায়ী অকাতরে মুসলিম উম্মাহ (যাদের সংগঠনের চিহ্নিত সদস্যরা যুদ্ধাপরাধীদের লবিংয়ে জড়িত)-কে অনদান দেন। আবার দেখা যায় তাদের সহধর্মীনীরা ৫ হাজার ডলার খরচ করে মুসলিম উম্ম্হ বা্ এমন সংগঠনের বার্ষিক সমাবেশে যোগ দেন। এদের কেউ কেউ ছদ্মাবরণের জামাতী মিডিয়াকে প্রকাশ্যে আর্থিক সহযোগিতাও করেন। জানতে চাইলে তারা নিজেদের নিরপেক্ষ (শিশূ বা পাগল নয়) বলে প্রমাণের চেষ্টা করেন। একই কথা প্রযোজ্য নিউইয়র্কের আওয়ামীপন্থী পেশাজীবদের বেলায়। মুজিবভক্ত দাবীদার চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা ফার্মাস্টিরা নীরবে জামাতীদের আর্থিক সমর্থন দেন।
-মাহফুজুর রহমান,
প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা, নিউইয়র্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here