প্রধানমন্ত্রীর চর্তুপাশে সুবিদ আলীরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে

সুব্রত বিশ্বাস

মুক্তিযুদ্ধের পর ফিদেল ক্যাস্ত্র্যোর সাথে বঙ্গবন্ধুর দেখা হলে অনেক কথার ফাঁকে ফিদেল জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমার প্রশাসনে কাদের বসিয়েছ? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা সামরিক ও বেসামরিক অভিজ্ঞ কর্মচারীদের। ফিদেল তখন তাঁর পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মীদের দেখিয়ে বলেছিলেন, এরা আমার যুদ্ধের সহকর্মী। এরা আমাকে বহু অবধারিত মৃত্যু থেকে রক্ষা করেছে। আমাকে কোন খাবার দিলে তারা আগে না খেয়ে আমাকে খেতে দেয় না। এমনকি আমাকে দেওয়া খাবার খেয়ে মারাও গেছে পাঁচজন। তারা মনে করে দেশের জন্য, জাতির জন্য আমাকে বাঁচিয়ে রাখা তাদের কর্তব্য। তোমারও উচিত মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বত্র দায়িত্বে বসানো। কারণ এরাই তোমার সবচেয়ে বিশ^স্ত। তুমি তাদের স্বপ্ন ও আদর্শ। তাদের হাতে তোমার ক্ষতির সম্ভবনা

প্রধানমন্ত্রীর চর্তুপাশে সুবিদ আলীরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে
প্রধানমন্ত্রীর চর্তুপাশে সুবিদ আলীরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে

নেই। বঙ্গবন্ধু যখন ফিদেলের পরামর্শ অনুধাবন করে সুদরানোর চেষ্টা করেছেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

একইভাবে আজকে ভাববার বিষয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চতুর্দিকে যারা তারা কারা? তারা কি তাঁর একান্ত ও বিশ^স্ত? তারা কি প্রকৃত আওয়ামী লীগ? নিশ্চয়ই না। দ্বিতীয়তঃ নিকট আত্মীয় হলেই আপন এবং বিশ^স্ত হওয়া যায় না। নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল হতে হয়। দেশাত্ববোধে কমিটেড হতে হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগে যারা তাদের বেশিরভাগই ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন দল থেকে আসা উচ্চবিলাসী-সুবিধাবাদী ও সুযোগ সন্ধানীরা। এখন আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ সৃষ্টি করেনা, জন্মও হয়না। অন্যদিকে দীর্ঘ ২৪/২৫ বছর যাবৎ স্কুল, কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ। রাজনীতি চর্চার কোন সুযোগ নেই। ফলে ছাত্র রাজনীতি থেকে নতুন নেতৃত্ব আসার সুযোগ নেই। কলেজ বিশ^বিদ্যালয় থেকে যারাইবা আসে তারাও প্রকৃত আওয়ামী রাজনীতির ধারক নয়। তারা চাাঁদাবাজি দুর্নীতির প্রলোভনে চাপিয়ে দেওয়া নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চরমভাবে অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ।

সম্প্রতি দু’জন পরিচিত বন্ধু দীর্ঘদিন পর দেশে গিয়ে মাস দ’ুয়েক থেকে ফিরে এসেছেন। উভয়ই রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিত্ব। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে দু’জনের সাথেই কথা হয়েছে। দু’জনেরই বক্তব্য ও মন্ত্রব্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে বহু উন্নতি করেছেন অস্বীকার করার নয়। তারপরও বাস্তবতা হলো এই মুহূর্তে যদি নির্বাচন দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ নির্ঘাত হারবে। কারণ জিজ্ঞেস করলে জানালেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন কোন সংগঠিত সংগঠন নয়। যেহেতু আওয়ামী ক্ষমতায় সে হিসেবে একশ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী লোক অসংগঠিতভাবে আওয়ামী লীগ এবং সরকারী দল। সরকার বা প্রধানমন্ত্রী যে দেশের উন্নতি করেছেন এবং করছেন সেটাকে প্রচার করা, মানুষের মাঝে দলকে নিয়ে গিয়ে আরও সংগঠিত হওয়া তাদের কাছে কোন মূখ্য বিষয় নয়। সকলেই চরম ও উলঙ্গ ভাবে নিজের ভাগ্যপরিবর্তনে ব্যস্ত। অর্থাৎ সকলেই দুর্নীেিততে আকুণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে আছে। খাওয়া পরায় মানুষ অনেকটা ভাল অবস্থানে আছে বলে চরম বহিঃপ্রকাশ নেই। তবে নেতাকর্মীদের দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য মানুষ তীব্র ভাবে বিক্ষুদ্ধ। এটা গেল এক দিক।

গতকাল প্রধানমন্ত্রী বিএনপি’র উদ্দেশ্যে অভিযোগ করে প্রশ্ন রেখে বলেছেন, বিএনপিতে যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের যেভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে তাতে সে দলকে স্বাধীনতার পক্ষের দল বলা যায়? প্রথমত বিএনপি কখনো স্বাধীনতার দল ছিল না, আজও নয়। যুদ্ধাপরাধীদের নিয়েই জিয়া দলটি গঠন করেন। মূলত যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের পূর্বসুরী মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী ইত্যাদি বিলুপ্তপ্রাপ্তদের উত্তরসুরীদেরই দল বিএনপি। সুতরাং বিএনপিতে যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের সন্তানরা যুক্ত হবে এতে আশ্চর্য হবার কারণ দেখিনা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগে কি কম যুদ্ধাপরাধীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে কিংবা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজের বেয়াই স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশারফ একজন ঘৃন্য যুদ্ধাপরাধী। অভিযোগ রয়েছে বাচ্চু রাজাকারকে দেশত্যাগে তার অবদান রয়েছে। তার বাবা নুরু রাজাকার একজন দাগী রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী। হিন্দু সম্পত্তি দখল সহ তার কর্মকান্ডে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে বিভিন্ন সময় বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেসবের গুরুত্ব দেননি। বরং তাকে আরো প্রভাবশালী মন্ত্রীত্বের পদে আসীন করা হয়েছে। চট্টগ্রামে জামাতের লতিফ আওয়ামী লীগ এবং জামাত দু’দলের কর্মকান্ডে জড়িত। জনৈক সাংবাদিক মহিলা অভিযোগ করার পরও কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। হবিগঞ্জের মাধবপুরে দাগী যুদ্ধাপরাধী শাহাবুদ্দিনকে আওয়ামী লীগে নেওয়া হয়েছে। বাশখালীর দাগী শিবির কাওসা নিয়াজ সায়মন এখন সেখানকার ছাত্রলীগের প্রধান নেতা। দেশের সর্বত্র এখন এধরনের জামাত-শিবির-বিএনপির অনুসারীরাই আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতাকর্মী। এরাই মাঝে মধ্যে দলকে বিব্রত অবস্থায় ফেলতে দেখা যায়।

সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার এমপি মাহমুদুস চৌধুরী কয়েস এলাকার প্রধান রাজাকারের ছেলে। তার বাবা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মিষ্টি বিতরন করে। এই মাহমুদুস সামাদ গত বছর বিশিষ্ট অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালকে চাবুক মারার ঔদ্ধত্ব দেখিয়েছে। শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় থেকে তাঁকে অপসারণ করার জন্য জেলা জামাতকে নিয়ে শহরে মিছিলও করেছিল।

জিয়ার একান্ত সহযোগী মেজর জেনারলে সুবিদ আলী ভূইয়া বিএনপি’র কাছে নমিনেশন না পেয়ে আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছেন। সম্প্রতি জিয়াকে দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট বলে বেকায়দায় পড়েছেন। জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন, সরকারকে বিব্রত অবস্থায় ফেলতে বিএনপি বার বার অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য উত্থাপন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করে আসছে। তাঁর এ অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই এবং বিএনপি এসব করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেবল কি বিএনপি করছে? আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে থেকে সুবিদ আলী ভূইয়া, চট্টগ্রামের লতিফ, সিলেটের কয়েস, খন্দকার মোশারফ, নারায়ণগঞ্জের সেলিম ওসমান, শামীম ওসমানারা সরকারকে বিপাকে ফেলতে কি কম অবদান রেখে চলেছে? প্রশ্নটা এখানেই। প্রধানমন্ত্রী কাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে এগুচ্ছেন। তারা কি তাঁর বিশ^স্ত। শুনেছি এবার মন্ত্রী পরিষদের সভায় প্রবেশের আগে সকলকে নিরাপত্তাবাহিনী চেক করে প্রবেশ করিয়েছে। এত উন্নতির পরও যদি ভোটের জন্য অনিশ্চিত থাকতে হয়, মন্ত্রী পরিষদের লোকরাও যদি বিশ^াসযোগ্য বিবেচিত না হয় এভাবে কি আদৌ একট্ িসরকার চলতে পারে। না পারেনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি দলকে সুসংগঠিত করতে না পারেন, দলীয় কার্যক্রমে বিশ^স্ত ও উপযুক্ত সংগঠক বসাতে ব্যর্থ হন, চর্তুপাশে থাকা তৌফিক এলাহি চৌধুরী, শামীম ওসমান, মাহমুদ সামাদ কয়েস, সুবিদ আলীদের ব্যাপারে আগাম ব্যবস্থা নিতে অপারগ হন তবে এরাই হবে নিজের, দলের এবং দেশের জন্য মহাবিপদের কারণ। এই সত্যটি উপলব্ধি করতে বঙ্গবন্ধুকে বলা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর পরামর্শটিই আজ প্রধানমন্ত্রীর জন্য একমাত্র প্রণিধানযোগ্য মনে করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here