শহীদ কাদরীর ‘কথিত নাগরিক স্মরণসভা ও উদ্যোক্তাদের প্রসঙ্গে’

0
621
সুব্রত বিশ্বাস
সুব্রত বিশ্বাস

।। সুব্রত বিশ্বাস ।। 

কবি শহীদ কাদরী ছিলেন সমকালীন সময়ের আধুনিক বাংলার একজন প্রধান কবি। দীর্ঘদিন থেকে প্রবাসে থাকায় প্রবাসের কবি সাহিত্যিপ্রেমী ও প্রগতিশীলদের মধ্যে গভীর স্থান করে নিয়েছিলেন। সকলের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবেপরিচিত। তাঁর একান্ত ইচ্ছা ও অনুপ্রেরণায় কবি পত্নী তাঁকে কেন্দ্র করে প্রবাসের কবিপ্রেমিকদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি কবিতা আসর। বস্তুত আসরটি শিক্ষানবীশ কবি, সাহিত্যিক অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। অপরদিকে আড্ডাপ্রেমিক কবিকে নিয়ে প্রগতিশীলদের চলতো বিভিন্ন সময় কবির সাথে আড্ডা ও গল্পের আসর। এসবের মধ্য দিয়ে অসুস্থ কবির মনে যথেষ্ট মনোবল ও শক্তি সঞ্চয় করতো। অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীরা অনুপ্রেরণা পেতেন।

কবি শহীদ কাদরী ধর্মত মুসলমান হলেও মনে প্রাণে ও চিন্তা-চেতনায় ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব। মতাদর্শগতভাবে ছিলেন সাম্যবাদে বিশ^াসী, তবে সাম্যবাদের এক্টিবিস্ট ছিলেন না। এমন একজন কবির মৃত্যুতে তাঁর অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারেনি। পারেননি কিছু সংখ্যক অতিউৎসাহী নব্য ও কথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও লেখক নামধারী অর্বাচীনদের মরদেহ দখলদারীর কারণে। তারা সম্ভবত কবি শহীদ কারদীর জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতা সম্পর্কে অজ্ঞ।

অভিযোগকারীদের অভিযোগ ছিল, কবি শহীদ কাদরী অবশ্যই ধর্মত একজন মুসলমান। তাঁর মৃত্যুতে ধর্মীয় নিয়মনীতি আচরণ অনুষ্ঠান অবশ্যই পালিত হবে এতে দ্বিমতের অবকাশ নেই। কিন্তু কবিকে মসজিদের অভ্যন্তরে বা মসজিদের সীমানায় কেবলমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে আবদ্ধ রেখে কবিকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর যেসব অনুসারী বা শুভানুধ্যায়ী ছিলেন তাদেরকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বঞ্চিত করা হয়েছে। অপরদিকে কেবলমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রেখে কবির অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার প্রতি অসম্মান করা হয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা, লেখালেখি অনেক হয়েছে। পুনরাবৃত্তি না করে আজকের লেখার সাথে প্রসঙ্গটি প্রাসঙ্গিক বিধায় খানিকটা উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করেছি।

কবির মৃত্যুর পর কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিজীবী প্রগতিশীল সকলের সমন্বয়ে একটি নাগরিক স্মরণসভার চিন্তা-ভাবনা, আলাপ-আলোচনা চলছিল। কবির মরদেহের সাথে কবিপতœী এবং আরো দু’একজন দেশে চলে যাওয়ায় বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কোন সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হয়নি। এমনি অবস্থায় লক্ষ্য করা গেল কবির মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো নিয়ে মুখচেনা কথিত বুদ্ধিজীবীর নেতৃত্বে যে লোকগুলো প্রতিবন্ধক ও বিতর্কের অবতারণা করেছিল তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আগে মৃতদেহ জবরদখলের অপচেষ্টা হয়েছে, এবার দেখা গেল তারা স্মরণসভা দখলে মাঠে নেমে পড়েছে। কারো সাথে কোন আলাপ-আলোচনা ছাড়া কথিত বুদ্ধিজীবীর নাম সহ চারজনের নামে একটি সার্বজনীন স্মরণসভার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, নাগরিক স্মরণসভার বিজ্ঞাপনে যাদের নাম দেখা গেছে তারা সে যোগ্যতা রাখেন বলে অনেকেই মনে করেন না। তাদের মতে কবি শহীদ কাদরীর সার্বজনীন স্মরণসভা হতে গেলে স্মরণসভার আহ্বায়ক হতে হবে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও গ্রহনযোগ্য কোন ব্যক্তি। তাছাড়া কবিকে কেন্দ্র করে যে কবিতা আসরের বলয় গড়ে উঠেছিল সেটির সাথে সম্পৃক্ত কবি ফকির ইলিয়াস, লোদী, শামস আল মোমিন, কাজী আতিক সহ যেসব কবি অনুসারী, শুভানুধ্যায়ী ছিলেন তাদের নাম অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। নাম থাকা উচিত লুৎফুন্নাহার লতা, ফারুক ফয়সল, গোপন সাহা সহ সকল আবৃত্তিকারের। সম্পৃক্ত করা উচিত, জামাল উদ্দিন আহমেদ সহ সকল নাট্য ব্যক্তিত্ব, সকল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নাম। নাম থাকা উচিত সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ, বেলাল বেগ, কবির আনোয়ার সহ কবির কাছের ব্যক্তিদের। এসব ব্যক্তি ও সংগঠনকে বাদ দিয়ে কবি শহীদ কাদরীর নাগরিক স্মরণসভা হতে পারেনা। অথচ বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে কথায়, কবিতায় ও গানে স্মরণ করা হবে কবিকে।

মরদেহ দেশে নিতে কবিপতœীর সঙ্গ দিতে সাহায্যকারী হিসেবে দেশে গিয়েছিলেন উদীচীর অন্যতম কর্মকর্তা উর্বি হাই। মরদেহ দেশে নিয়ে যাওয়া এবং সাথে যাওয়াদের খরচ বাবদ কোন সরকারী অনুদান ঐ মুহূর্তে পাওয়া যায়নি, পাওয়ার কথাও ছিল না। এমনি অবস্থায় উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জীবন বিশ^াস কবি ও কবি পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ব্যক্তিগতভাবে এসব খরচ বহন করে ব্যবস্থা করেছিলেন। যারা নাগরিক স্মরণসভার নামে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন এসব ক্ষেত্রে তাদের কোন অবদান ছিল না। অথচ যারা এসব ব্যবস্থা করলেন, কবি পতœীর সাথে দেশে গেলেন তাদের কারো নাম কমিটিতে স্থান পায়নি।

কথিত নাগরিক স্মরণসভার উদ্যোক্তাদের এমনতর কর্মকা-ে সকলেই উদ্যোক্তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ ও বিক্ষুব্ধ। অনেকে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার ক্ষোব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। অনেকে মনে করেন কথিত বুদ্ধিজীবী নামধারী এই ব্যক্তিটি এবং তার কিছু সাগরেদ সকল সময় কমিউনিটির সুস্থ-সুন্দর সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও অনুষ্ঠানাদিতে অহেতুক অনাধিকার চর্চা করে বিতর্কের সৃষ্টি করে থাকেন। প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে প্রতিক্রিয়াশীলের ভূমিকায় নিজের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত থাকেন। অতীতে বইমেলা, নাটক, প্রকাশনা উৎসব সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার কর্মকা- নিয়ে বহু সমালোচনা হয়েছে। এমনকি কবিকেও তাঁর ঘরে কথা প্রসঙ্গে বলতে শোনা গেছে, ’ছি…! তুমি এত নীচে নেমে যেতে পার’। কবি শহীদ কাদরীর মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী অনুষ্ঠান নিয়েও তাই আজ তার এই অযথা, অসুন্দর অনাধিকার চর্চা। অনেকের মতে নিজের যোগ্যতা এবং গ্রহনযোগ্যতা তো নেইই সাথের অনুসারীরাতো এসবের জন্য বালকমাত্র। তবে কেউ কেউ কিছুটা অবাক সাপ্তাহিক বাঙালির সম্পাদকের নাম দেখে।

এখন যখন বিষয়টি নিয়ে সর্বত্র ধিক্কার উঠেছে, শোনা যাচ্ছে বিভিন্নজনকে ফোন করে, হাতে পায়ে ধরে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা চলছে। গতকাল দু’তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে গাড়ীতে করে একজন রোগী দেখতে যাচ্ছিলাম। এমনি অবস্থায় পাশে বসা একজনের কাছে ৪ বার জনৈক স্মরণসভার ব্যক্তির ফোন আসে। নাম দেখে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ফোন ধরছিলেন না। চতুর্থবার তিনি ফোন ধরেন। যতদূর শুনতে পেয়েছি, বলেছেন কমিটিতে ওমুকদের নাম নেই কেন? এদেরকে বাদ দিয়ে কিভাবে স্মরণসভা হয়…..ইত্যাদি। পাঠকবৃন্দ, এটাই সম্ভবত কবি শহীদ কাদরীর নামে কথিত স্মরণসভা এবং আয়োজকদের অবস্থান ও ইতিহাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here