ভারত এখন সাম্রাজ্যবাদী সামরিক জোটের অংশ জানান দিতেই মোদী জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন যোগ দেননি

0
249

018214288_30300

সুব্রত বিশ্বাস

জোটনিরপেক্ষ জোট গঠনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু, মিসরের জামাল আবদেল নাসের, যুগশ্লাভিয়ার টিটো তঁদের ভূ

সুব্রত বিশ্বাস
সুব্রত বিশ্বাস

মিকা ছিল অগ্রগণ্য। দীর্ঘদিন যাবৎ ভারত সে জোটের আদর্শ লালন ও জোটের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আসছিল। সাম্প্রতিককালে সাম্প্রদায়িক বি জে পি ভারতের শাসন ক্ষমতায় আসে। আমেরিকার সাথে সামরিক জোটে আবদ্ধ করে নেওয়া হয় ভারতকে। সংশয় দেখা দেয় ভারতের জোট নিরপেক্ষ চরিত্র অক্ষুন্ন থাকা নিয়ে। দেখা দেয় জোটনিরপেক্ষ জোটে থাকা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ। আর তাই জাতিসংঘের পর সবচেয়ে বড় যে আন্তর্জাতিক মঞ্চ সেই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে এবার যোগ দিলেন না সাম্প্রদায়িক বি জে পি’র অনুসারী বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ১৩ থেকে ১৮ই সেপ্টেম্বর যখন শীর্ষ সম্মেলনের পর্ব চলছে তখন ঘটা করে নিজের জন্মোৎসব পালন করেছেন নরেন্দ মোদী। উৎসবের বর্ণাঢ্যে ও আড়ম্বরে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিতে কোন কার্পণ্য করেনি তাঁর নিজের রাজ্য গুজরাটও। বিশে^র সর্বকালের সর্ববৃহৎ জন্মদিনের কেক কেটে গিনেস বুকে নাম তোলারও ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু ভুলেও উচ্চারণ করেননি জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনের কথা। বিশে^র ১২০টি দেশ যে মঞ্চের শরিক, যে মঞ্চের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ভারত সেই মঞ্চের ১৭তম শীর্ষ সম্মেলনে নেই ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান। শুনেছি সুযোগ পেলেই যিনি বিদেশে পাড়ি দেন, কোন দেশে দু’বার-তিনবার যেতেও যাঁর ক্লান্তি নেই, যতদূর শুনেছি এবং জানি বিদেশ সফরে ভারতের সব প্রধানমন্ত্রীকে যিনি ইতিমধ্যেই পেছনে ফেলে দিয়েছেন, দেশ থেকে বিদেশেই যিনি বেশি জনমনে সেই মোদীর জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে অনুপস্থিতি কোন্ বার্তা দিল দুনিয়াকে?

দেশে বা দেশের বাইরে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কোন কর্মসূচী ছিল বলেও জানা যায়নি যে তার জন্য মোদীকে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে না যাবার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কেন যাননি তার কোন কারণও সরকারি তরফ থেকে জানানোও হয়নি। আবার ইচ্ছে করে যাওয়া হয়নি বা যাননি, শোনা যায় তেমনটিও নয়। আসলে সিদ্ধান্ত নিয়েই মোদী যাননি। যাননি সম্ভবত ভারতকে বিশে^র অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসেবে তুলে ধরতে জোট নিরপেক্ষ অবস্থান ত্যাগ করে আমেকিরার সাথে সামরিক জোটই এখন ভারতের নতুন অবস্থান ও চরিত্র। ভারতের এই নতুন অবস্থান জানান দিতেই মোদী জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যাননি। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর মোট ১৬টি শীর্ষ সম্মেলনের মধ্যে একটি ছাড়া প্রত্যেকটিতে হাজির ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা। শুধু হাজির থাকেননি রীতিমতো নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁরা। এবার ভেনেজুযেলায় অনুষ্ঠিত সপ্তদশ শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধি থাকলেও নেই প্রধানসমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবেই ভারতের মর্যাদা ও সুনামও অনুচ্চারিত থেকে গেছে।

নেহেরুর নেতৃত্বে জন্মকাল থেকেই জোট্ নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা হয়ে উঠেছিল ভারত। ১২০টি দেশের মঞ্চের একেবারে সামনে আসতে পেরেছিল নিজের ভূমিকার জোরেই। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ তথা ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের পর বিশ^জুড়ে যখন মুক্তি সংগ্রাম জোরদার হয়ে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ছিন্ন করে একের পর এক দেশ স্বাধীন হতে থাকে সেই প্রেক্ষাপটেই জন্ম জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের। মূলত পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের এবং সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের মধ্যেকার ঠা-াযুদ্ধের মধ্যে সদ্য স্বাধীন দেশগুলো ভিন্ন মঞ্চ গড়ে তোলাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় এইসব দেশই হয় এই আন্দোলনের শরিক। এই দেশগুলোকে নিয়েই আসলে তৃতীয় বিশ^। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন সবচেয়ে গুরুত্ব দেয় যে বিষয়গুলোকে সেগুলো হলো জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, যেকোন ধরনের সা¤্রাজ্যবাদী জোটের বাহিরে থাকা, বিদেশের মাটিতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ নিষিদ্ধ করা, মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ^ শান্তির লক্ষ্যে নিরস্ত্রীকরণ।



এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জোট্ নিরপেক্ষ আন্দোলনে ভারতের নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয় বিশে^ ভারতের মান-মর্যাদা বাড়ে। সোভিয়েত বিপর্যয় এবং নয়া উদারনীতি চালু হওয়ার পর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে ভারতের উৎসাহে কিছুটা ভাটার টান দেখা গেলেও মৌলিক অবস্থান বিশেষ পাল্টায়নি। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দ্রুত সব পাল্টাতে শুরু করে। হিন্দুত্ববাদী বি জে পি চালিত মোদী সরকার সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী নয়। বরং সা¤্রাজ্যবাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র শক্তি হতেই বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছে। তাই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন থেকে দূরত্ব বাড়ানো হচ্ছে। বিদেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে মোদীদের আপত্তি নেই। পারলে নিজেরাও দু’একটা ঘাঁটি বানাতে আগ্রাহী। নিরস্ত্রীকরণের বদলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও বৃহৎ সামরিক শক্তিধর হয়ে উঠতে অতি আগ্রহী ও বদ্ধপরিকর। অর্থাৎ সা¤্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তির হাত ধরে আমেরিকার স্বার্থের মধ্যে ভারতের স্বার্থকে বিলীন করে দিতে চায়। এমতাবস্থায় জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে গেলে আমেরিকার কৃপালাভে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাও আবার ভেনেজেুয়েলায়। যেখানে গণতান্ত্রিক ও বামমুখী সরকারের পতনের জন্য গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি। অতএব ১২০টি দেশের ও তাদের জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে শামিল হওয়ার চেয়ে আমেরিকার সুনজরে থাকাই শ্রেয়। সেজন্যই মোদীর জোট সম্মেলন বর্জনের প্রধান কারণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here