বাংলাদেশের সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও উপজাতি সমস্যা আর বিশ্ব অভিবাসন সমস্যা এক ও অভিন্ন

0
940

সুব্রত বিশ্বাস

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানের ন্যায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নিয়মমাফিক গেল সপ্তাহে নিউইয়র্ক এসেছিলেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন সমূহে অংশগ্রহণ করেন। প্রধান অধিবেশনে তিনি

সুব্রত বিশ্বাস
সুব্রত বিশ্বাস

বাংলায় বক্তব্য রাখেন। বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাংলায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন। তার কন্যা শেখ হাসিনা সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করছেন। সেজন্য তিনি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখেন। এবারের অধিবেশনে তাঁর মূল ও আকর্ষণীয় বক্তব্য ছিল বিশ^ অভিবাসন। বিশ^ নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বর্তমান অশান্ত বিশে^র অভিবাসন সমস্যার একটি সুষ্ঠু সমাধানের ব্যাপারে জোরালে আহ্বান জানান। সিরিয়ার অশান্ত অমানবিক ও অন্যায় যুদ্ধের পাশবিকতায় আক্রান্ত দুই শিশুর করুন ইতিহাস তুলে ধরে বিশ^বাসীর কাছে তার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকে বাংলাদেশে রুহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা নিয়ে মিয়ানমারের নেত্রী সুকীর সাথেও বৈঠক করেন। তার এ আহ্বান এবং উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়।

সা¤্রাজ্যবাদী পরাশক্তি অর্থনৈতিক আধিপত্য লাভের অশুভ উদ্দেশ্যে বিশে^র বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তৈল সম্পদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব করায়াত্ত করার উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে নিজেদের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের অস্ত্রবিক্রির সুযোগ নিরঙ্কুশ করা। সে লক্ষ্য চরিতার্থের আক্রমণে ইতিমধ্যে আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইরাক ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্র রক্ষার অজুহাত তুলে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া যুদ্ধরত সন্ত্রাসী আইএস বাহিনীর গায়ে আসাদ সরকারের বিরোধীপক্ষ আখ্যায়িত করে সিরিয়ায় চালানো হচ্ছে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আক্রমণের নামে ইয়েমেনে শিয়াদের ওপর চলছে সৌদি আরবের বিমান হামলা ও হত্যাযজ্ঞ। গণতন্ত্রের মুখোশ পরে নিজেরাই তৈরি করছে আলকায়দা, আইএস সন্ত্রাসী সংগঠন ও বাহিনী। তারাই অস্ত্র তুলে দিচ্ছে তাদের হাতে। তাদের অস্ত্র ব্যবসায়ীরাই এদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার মুনাফা করছে। অন্যদিকে তেল খনি দখল করিয়ে সস্তায় তেল কিনে নিচ্ছে।

সা¤্রাজ্যবাদী পরাশক্তি ও তাদের দোসর সৌদি আরব, তুরস্ক,কাতার, কুয়েত সহ অন্যান্য অনুগত দেশসমূহের প্ররোচনা ও সহযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্য সহ বিভিন্ন দেশে চলছে এসব আক্রমণ। একই সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাস রপ্তানী করে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাধ্যমে উত্তেজনার বিস্তার ঘটনানো হচ্ছে। এসব আক্রমণ থেকে প্রাণে বাঁচতে লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও সিরিয়া থেকে ¯্রােতের ন্যায় হাজার হাজার সাধারণ মানূষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। সে আশ্রয় দানে আবার অমুসলিম দেশগুলোই প্রধান ভূমিকা পালন করছে। সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, কাতার কুয়েত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ কোন মুসলিম দেশ সাহায্যে হাত বাড়ায়নি। আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিংবা শরণার্থীদের প্রতি তাদের কোন প্রকার সহনুভূতি নেই। অথচ নিজেরা সবাই একই মুসলিম ধর্মের দাবি করে গর্ব করা হয়।

আমার লেখার মূল প্রতিপাদ্য কিন্তু ভিন্ন। তবে প্রতিপাদ্য ভিন্ন হলেও প্রাসঙ্গিকতা একই। আগেই বলেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ^ অভিবাসন সমস্যার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন বলে প্রশংসার দাবি রাখেন। তবে তিনি নিজ দেশের অভিবাসন সমস্যা গোপন রেখে চরম অন্যায় ও দ্বিচারিতা করেছেন। রুহিঙ্গা সমস্যা সমাধান অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হিন্দ-বৌদ্ধ-খৃষ্টান-আদিবাসী-উপজাতিরা যে প্রতিনিয়ত অভিবাসনে পরিণত হচ্ছে সেটাকে অস্বীকার কেন। প্রতিটি সরকার ও সরকারী দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ সমাজবিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠরা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিনিয়ত কিভাবে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়কে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে পাহাড়ীদের আন্দোলন সংগ্রাম ঠেকাতে শান্তি চুক্তি করা হয়। অথচ সেই চুক্তির প্রতি চরম বিশ^াসঘাতকতা করা হয়েছে। আটারো বছরেও চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। অধিকন্তু অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক পাহাড়ীদের উচ্ছেদ এবং তাড়িয়ে দিতে সেখানে বাঙালী মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সরকারের অঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে। একই অপচেষ্টা চলছে সাওতালদের ওপর। সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর চলছে চরম অত্যাচার নির্যাতন। চলছে ধর্মান্তকরণ ও দেশত্যাগের হুমকি। নির্বাচনে এক পক্ষকে ভোট দিলে অন্য পক্ষের অত্যাচারের শিকার হতে হচ্ছে। জোর করে ভিটামাটি, জায়গা জমি থেকে উচ্ছেদ করে বাধ্য করা হচ্ছে ভারতে পাড়ি দিতে। হত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তকরণের ও নির্যাতনে আত্মসম্মানের ভয়ে দেশ ছাড়ছে বাধ্য হচ্ছে সংখ্যালঘুরা। স্বাধীনতার সময় সংখ্যালঘুদের যে সংখ্যা ছিল ২৯%, অত্যাচার নির্যাতন, উচ্ছেদ, জবরদখল ও তাড়িয়ে দেওয়ার ফলে এখন সে সংখ্যা ৮% নেমে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বিশ^ অভিবাসনের সমস্যার সাথে নিজের দেশের সমস্যা তুলে ধরলে খুশী হতাম। কিন্তু না, তিনি অত্যন্ত উদ্দেশ্যমূলকভাবে এড়িয়ে গেছেন। আরো পরিস্কার করে বললে নিজের এবং নিজেদের অন্যায়, অত্যাচার, অবিচারকে চাপিয়ে গেছেন। অথচ এ নিয়ে আমেরিকা এ্যামনেস্টি ইন্টান্যাশনাল সহ বিভিন্ন দেশ তাদের উদ্বেগের কথা প্রায়ই জানিয়ে আসছেন। আদিবাসী, পাহাড়ী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সরকারের ধর্মাশ্রয়ী দ্বিচারি ভূমিকাই আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে সহাবস্থান কঠিন ও অশান্ত করে তুলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here