আমাদের মা – আমাদের স্বাধীনতা

0
296

download

সাদিক আওয়াল

মার মায়েরও সুন্দর একটা সংসার ছিলো। বাবার স্বল্প আয়, মফস্বল শহরের ঘনঘন বদলীর চাকুরী। অনেকগুলো সন্তান, দশ দশটি সন্তানের দেখাশুনা, যত্ন  নেয়া, বেশীর ভাগ সময় কোলে একজন কয়েক মাসের শিশু। বাড়িঘর  গোছানো,  কোথাও ময়লা জমে নেই, দেয়ালের কোনো কোণায় মাকড়সার জাল ঝুলে নেই, ঝকঝকে মেঝে। টেবিলের উপরে হাতে বোনা এমব্রয়ডারী করা টেবিল ক্লথ। রান্নাঘরে গ্লাক্সো, হরলিক্সের খালি কৌটায় রান্নার মশলাপাতি। প্রতিটি কৌটায় চমৎকার করে লেখা, “চিনি” “চা” “জিরা”….। কোনো কৌটার মুখ খোলা নেই, কোনোটার ঢাকুনী হারিয়ে যায়নি। মিটসেফের আংটাগুলো থেকে ঝুলছে ঝকঝকে চায়ের কাপগুলো, তার নীচে পিরিচ। এক পাশে আচারের বৈয়ামগুলোয় হরেক রকমের আচার। রান্নাঘরের এককোনে ছোট মুষ্টি চালের টিন। বাবার অফিসে যাওয়ার আগেই গরম ভাত তরকারী রেডি। ছেলে মেয়েদের গোসল করিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে দিয়ে, কালো টিপ পরিয়ে দেবেন, যেগুলোর স্কুলে যাওয়ার বয়স সেগুলোকে স্কুলে পাঠাবেন। দুপুরে বাবার ঘুমের অভ্যাস। ছোটবাচ্চা গুলোকে তার আগেই ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে, যেনো বাবার ঘুমের ব্যাঘাত না হয়! স্কুল থেকে ফিরলেই মেয়েদের খাইয়ে দিয়ে, বিকেলের স্বল্প অবসরে মাথায় তেল দিয়ে, দুপাশে  দুটি চুলের বেণী করে দিয়ে বলতেন, “যা তোরা খেল গিয়ে”।

তখন বাজারে ফ্রীজ  এসেছে কিনা জানিনা, আমাদের ছিলো না। গরমের সময় মাঝে মাঝে বাবা আস্ত তরমুজ কিনে আনতেন। সেই তরমুজ সারাদিন রেখে দেওয়া হোত পানির চৌবাচ্চায়। তখন মফস্বল শহরে গোছলখানায় ইট সিমেন্টের তৈরী পানির চৌবাচ্চা থাকতো। আমারা বলতাম “পানির হাউজ”। পানি তোলার লোক এসে প্রতিদিন টিউবওয়েল থেকে পানি এনে ঐ “হাউজ”  ভরে দিতো। টিউবওয়েল এর বরফ শীতল পানিতে ভরা “হাউজে” রাখার কারনে তরমুজটি ঠান্ডা থাকতো। বাবা ঘুম থেকে ওঠার পর, পড়ন্ত বিকেলে মা বটি দিয়ে  তরমুজটি কাটছেন, বাবা সহ আমরা মাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে আছি। তরমুজের প্রথম ফালি বাবাকে দিয়ে মা দিতেন তার সন্তানদের। আহারে! কিযে মজা লাগতো খেতে! তরমুজের ফালির উপরের লাল অংশ খাওয়া হয়ে গেলে নীচের সাদা অংশে মা লবন ছিটিয়ে দিতেন আর বলতেন “খাও সোনামানিক-রা, কামড়িয়ে কামড়িয়ে খাও, এগুলো তে অনেক ভিটামিন আছে”। ঈদ আসলেই বাসায় অন্য রকম পরিবেশ। মাকে মনে হোত সবচেয়ে বেশী খুশী। কতোকাজ তার! ছেলেমেয়েরা নতুন নতুন জামা কাপড় পরবে, সেই জামা কাপড় আবার নিজ হাতে রাত জেগে মেশিনে সেলাই করতে হবে। ঈদের সকালে যখন বাবার সাথে ছেলেগুলো নামাজ পড়তে যাওয়ার জন্য তৈরী  হচ্ছে, মা ব্যস্ত ঈদের সকালের মুগের ডালের খিচুরী, ভূনা কলিজা, সেমাই রান্নাতে, আর ছেলেমেয়েদের তৈরী করে দেওয়ার কাজে। নামাজ থেকে এসেই আমাদের প্রথম কাজ ছিলো বাবা আর মাকে সালাম করা। এর মধ্যেই মা গোসল সেরে নতুন শাড়ী পরে আছেন, চুল আঁচড়েছেন কিন্ত ভেজা চুল দিয়ে তখনো টপ টপ করে পানি পড়ছে। বাবাকে সালাম করে মাকে সালাম করি, মা নীচু হয়ে বুকে চেপে ধরেন। আলতোকোরে কপালে ছোট একটা চুমু দিয়ে বলেন, “আমার সোনামনিকে আল্লাহ অনেক হায়াত দাও।”  মার বুকের ভিতর থেকে সরতে ইচ্ছে হয়না। সদ্য গোসল করে এসেছেন, ঠান্ডা শরীর, মুখে পন্ডস ক্রীম, গায়ে  ট্যালকম পাউডার, নুতন শাড়ীর গন্ধ সব মিলিয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ যে গন্ধের জন্ম এই পৃথিবীতে না। সারাদিন পর রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে  ছোট তিনটি কে বুকের কাছে নিয়ে মা গান গাইতেন, প্রতিমা, সন্ধ্যা, অথবা জগন্ময় মিত্রের গান, খুব চমৎকার গানের গলা ছিলো আমাদের মার!

মাঝে মাঝে মাগরিবের নামাজ পড়েই  বাবার সাথে সন্ধ্যার শো`তে সিনেমা দেখা। বাসায় ফিরেও গুনগুন গান, শুয়ে শুয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আর স্বপ্ন! অনেক কষ্টে মাটির ব্যাংকে, এখানে ওখানে সিকি, আধুলী আর নোট জমিয়ে,যশোর শহরে ছোট্ট একটি জমি কেনা হয়েছে। গ্রামের বাড়িতে জমাজমি আছে, ওগুলো গ্রামের চাচা ভোগ করেন। গ্রামে যাওয়ার মার একেবারেই ইচ্ছে নেই। সারাজীবন মফস্বল শহরে শহরেই কেটেছে। গ্রামে যাওয়ার কথা মা চিন্তাও করেন না কখনও। বড় ছেলে দেশের সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। সংসারে একটু স্বচ্ছলতা আসলেই যশোরের জমিটার উপরে একটা ছোট্ট বাড়ী করবেন। এই বদলীর ঝামেলা, দুই তিন বছর পর পরই জিনিষপত্র বাধা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা যাওয়া আর ভালোলাগেনা!  যশোরে বাড়িটা কোরতে পারলে আর ঝামেলা পোহাতে হবেনা। নিজের বাড়ি মনের মতো করে সাজাবেন! স্বপ্ন দেখেন মা!!

এলো ১৯৭১।  আমরা তখন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা-য়। সৈয়দপুর, পাকশী ,ভেড়ামারা  এসব জায়গাগুলিতে সবসময়ই বিহারীদের আধিক্য। মার্চ মাসের শেষ, পাকিস্তানি মিলিটারী নির্বিচারে মানুষ মেরে যাচ্ছে, শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলছে। এপ্রিলের প্রথম, তখনো ভেড়ামারা, কুষ্টিয়াতে মিলিটারী আসতে পারেনি। পাকশী হার্ডিন্জ ব্রীজের এপারে ইপিআর এর বাঙালী মুক্তিযোদ্ধারা আর ওপারে পাকিস্তানিদের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে।  চারিদিকে থমথমে অবস্থা, এরই ভিতর  বিহারীদের উল্লাস। একপর্যায়ে ইপিআর আর পাকিস্তানিদের ঠেকিয়ে রাখতে পারলনা। ইপিআর গুলি করতে করতে পিছিয়ে যাচ্ছে, আর চিৎকার করে বলছে “আপনারা পালান, মিলিটারী এসে গেছে”।“আপনারা পালান…” । মুহুর্তের ভিতর বাবা-মা তাদের দশটি সন্তান নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন, শুন্য হাতে। ঐ বিপদসংকুল মুহুর্তেও মা ভুললেননা দরজা জানালা বন্ধ করতে, প্রয়োজনীয় সব কিছুতে তালা দিতে। তার এতো সাধের  যত্নে গড়া সংসার যেনো থাকে নিরাপদে!!

গোলাগুলির বিভীষিকা, আগুন,  বিহারীদের লুটতরাজ আর তান্ডবের ভিতর দিয়ে প্রানভয়ে আমরা পালাচ্ছি। উদ্দ্যেশ্য শৈলকুপায় আমাদের গ্রামের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়া। ভেড়ামারা থেকে অজানা অচেনা গ্রাম আর জংগলের ভিতর দিয়ে আমরা গ্রামের দিকে যাচ্ছি, পথে জনপদ, বাড়ীঘর, দোকানপাট দাউ দাউ করে জ্বলছে। মাথার উপর দিয়ে গুলি, কামানের উত্তপ্ত আগুনের গোলা ছুটে যাচ্ছে, আমরা এগিয়ে চলেছি। কখনো পায়ে হেটে, কখনো গরুর গাড়ী, কখনো  ঘোড়ার গাড়ী। রাতে অজানা অচেনা বাড়ীতে আশ্রয়। আর তখনই অল্প কিছু খাওয়া জুটতো। একদিন এক অচেনা বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছি অনেকগুলো পরিবার। ভোরের অন্ধকারেই মিলিটারিরা গ্রামটি ঘিরে ফেললো। সামনে যাকে পাচ্ছে মেরে ফেলছে, নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পাচ্ছেনা। আমরা প্রায় দুই শো মানুষ ডোবা জাতীয় নীচু এক জায়গায় লুকিয়ে আছি। চারিদিকে ঘন জংগল, বাঁশের বন। আমরা শুয়ে আছি। আগুনের গোলা মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, গুলির ঠা ঠা শব্দে কান ঝালাপালা, শুকনো বাঁশ পাতার ভিতর মিলিটারিদের বুটের মচমচ শব্দ। একপর্যায়ে শুনতে পেলাম আমাদের থেকে অনতিদুরেই এমনই এক ডোবা মতো জায়গায় কিছু লোক প্রানভয়ে লুকিয়ে ছিলো, মিলিটারীরা ব্রাশ ফায়ার করে  প্রতিটি মানুষ কে মেরে ফেলেছে। এখন আমাদের ডোবার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি বাবার পাশে  শুয়ে আছি, প্রচন্ড ভয়ে কাঁপছি। বাবা বললেন,   “আয় বাপ বুকে আয়” বাবা আমাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরার অছিলায় নিজের শরীর দিয়ে আমার ছোট্ট শরীর টা ঢেকে রাখলেন। বাবার বুকের ভিতরে মুখ গুজে দিয়ে, বাবার শরীরের উষ্ণতায় কাঁপুনি কমে গেলো। বাবা অনর্গল মৃদু কন্ঠে দোয়া পড়ে যাচ্ছেন, আমিও বাবার সাথে সাথে পড়ে যাচ্ছি। দুজনেই মৃত্যুর অপেক্ষা করছি। ঐ ডোবার ভিতর আমরা একটানা চারদিন লুকিয়ে ছিলাম। অনেক কষ্টে, প্রায়  বিশ দিন পর কাক্ষিত নিরাপদ আশ্রয় আমাদের গ্রামের বাড়ীতে পৌছালাম। মা বা আমরা কেউ কখনো গ্রামে থাকিনি। আমাদের সমস্ত জমাজমি গ্রামের চাচা ভোগ করতেন। আমাদের গ্রামে  আসাটা চাচা পছন্দ করলেন না। যাইহোক তবুও  প্রানে বেঁচে আছি , এতেই সবাই খুশী। মা সান্ত্বনা দেন, “যুদ্ধ শেষ হবে, দেশ স্বাধীন হবে, বাবা  চাকুরীতে যোগ দেবেন, আমরা আবার আমাদের বাসায় ফেরৎ যাবো”। “কয়েকটা দিন কষ্ট করো, সোনামানিক রা”! আমরা আশায় বুক বাধি, দেশ কবে স্বাধীন হবে?

জুন মাসের দিকে বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মহকুমা, থানা, গ্রাম কোথাও কোনো ডাক্তার নেই। বাজারের অষুধের দোকান সহ সব ধরনের দোকানপাট পাকিস্তানিরা জ্বালিয়ে দিয়েছে। মহকুমার হসপিটাল, ক্লিনিক পুড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকায়, এমনকি বড় কোনো জেলা শহরে বাবাকে  নিয়ে  যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য, উপায়, সংগতি কোনোটাই নেই। আমরা জানিনা বাবার কি হয়েছে! গ্রামের হোমিওপ্যাথ কেশব ডাক্তার আসে, চার পুরিয়া অষুধ দেয়। বাবাকে খাওয়ানো হয়, বাবার কোনো উন্নতি হয় না। অবস্থা ক্রমাবনতি হতে হতে বাবা শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন। আমরা অসহায়ভাবে বাবার ক্রমাবনতি দেখতে লাগলাম। বাবার কষ্টে, মা যন্ত্রনায় ছটফট কোরে বেড়াচ্ছেন। সারাদিন সারারাত মা বাবার পাশে জায়নামাযে আল্লাহকে ডেকে যাচ্ছেন। একমুহুর্ত বাবার কাছ থেকে সরেন না, মা খাওয়া ভূলে গেলেন, নাওয়া ভূলে গেলেন। ঘুমাতে যাননা, যদি বাবার কিছু প্রয়োজন হয়, যদি বাবা চোখ খুলে দেখেন মা পাশে নেই!  মা  বাবার শরীর ভিজা ন্যাকড়া দিয়ে মুছে দেন, খাইয়ে দেন। বাবা এখন ছোটো শিশু, পুরোপুরি অচল, সবকিছু তাকে বিছানাতেই করতে হচ্ছে। মা নিজ হাতে বাবাকে পরিষ্কার কোরে দেন, গোসল করিয়ে চুল আঁচড়িয়ে  দেন। বাবার অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে লাগলো, শেষ পর্যায়ে গভীর অচৈতন্যতায় চলে গেলেন। দুই তিনদিন গভীর অচেতনতায় থেকে আমাদের মাকে এক অনিশ্চিত, সহায় সম্বলহীন কপদর্কশুন্য অবস্থায় রেখে, যুদ্ধের মধ্য অবস্থায়,  এক বৈরী পরিবেশে, দশদশটা বিভিন্ন বয়সের সন্তানদের রেখে বাবা মারা গেলেন!   সবার বড় ছেলেটি তখনো সবে তরুন, কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছে। সবার ছোটটি এক বছরের কাছাকাছি।

বাবা মারা যাওয়ার চার বছর পর বড়ভাই বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাশ করেন, আর সাথে সাথে চাকুরীও পেয়ে যান। পরিবারের বিশাল বোঝা নিজ কাধে তুলে নিলেন।  আমাদের বড়ভাইকে আমরা দাদা বলি। বিভিন্ন বইতে, গল্পে, উপন্যাসে এধরনের দ্বায়িত্ববান বড়ভাইকে, “পিতৃতুল্য”, “দেবতুল্য”, “ফেরেশতা-সম” ইত্যাদি বহুধরনের বিশেষণে অলঙ্কারিত করা হয়। এই ধরনের বিশেষন ব্যাবহার শুধু মাত্র গল্পো উপন্যাসের বাক্যলংকরি শব্দই বৃদ্ধি করে।  ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির তুলনা করে ব্যক্তির হৃদয় নিংড়ানো, ঘাম ঝরানো অবদান প্রকাশ করা সম্ভব না! বাবা-মার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা বা সন্তানের প্রতি বাবা-মার ভালোবাসা ব্যাকরনগত শব্দচয়ন দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, করা উচিৎনা।  আল্লাহ্তো আমার মায়ের কঠিন দুঃসময় আর নিকষকালো অন্ধকার পৃথিবীর কথা জানতেন, তাই আগে থেকেই উনি আমার মা আর আমাদের জন্যে আমাদের  দাদাকে প্রস্তুত রেখেছিলেন Celestial Being হিসাবে! আমি নিশ্চিত, আল্লাহ না করুন, (আল্লাহ যেনো আমার দাদাকে, আমাদের সব ভাইবোনদের আয়ুদান কোরে দীর্ঘজিবী রাখেন) যদি কখনো আমার দাদার হার্টের প্রয়োজন হয়, আমাদের ভাইবোনদের ভিতর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে, কে তার হার্টটা আমাদের দাদাকে দেবে! আমাদের দাদার প্রভা-তে, আর মায়ের প্রচেষ্টায় আজ আমরা যে যেখানে যেমনই আছি, সুন্দরভাবে বেঁচে আছি।

জীবন থেমে থাকেনা। আমাদের জীবনও থেমে থাকেনি। আমাদের জীবনের চালিকা শক্তি ছিলো আমাদের মা। তিনি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে, সবকিছু বিসর্জন দিয়ে আমাদের জীবনকে সামনে ঠেলে নিয়ে গেছেন। উনি ওনার নিজের সার্বভৌম সংসারে আর কখনই ফিরে যেতে পারেননি। এমনকি এক পলক দেখতেও পাননি তার সেই যত্নের সংসার। আমার মার জীবন ১৯৭১ সালের ১৪ই আগষ্ট ই থেমে গেছে। আগষ্টের ১৪ তারিখ, কাক ডাকা ভোর, চারিদিকে তখনও হালকা অন্ধকার। বাবার শেষ সময়। গতরাত থেকেই বাবার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গতদুই দিন ধরে উনি সম্পুর্ন অচেতনতার ভিতর চলে গেছেন। ফুসফুস প্রতিটি নিশ্বাস নিচ্ছে মিনিট ধরে, ফুসফুসের বাতাসের অভাবের যন্ত্রনার শব্দ আমরা শুনতে পাচ্ছি। আমরা সবাই তার চারিদিকে বসে আছি। আমরা বুঝতে পারছি তিনি চলে যাচ্ছেন। একজন মানুষ, যে আমাদের বাবা, আমার মার সারাজীবনের সংগী, পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, সবাই তার মাথার কাছে বসে অসহায়ের মত তার চলে যাওয়ার প্রতিটা সেকেন্ড দেখতে পাচ্ছি। ফুফু কোরআন তেলোয়াত করছেন, “ইয়া-সীন অল  কুরানিল হাকীম…..”। আমরা অঝোরে কেঁদে যাচ্ছি। মার উন্মত্ত চেহারার দিকে তাকানোর ক্ষমতা আমাদের নেই॥ মা বাবার কানের কাছে মুখ নিয়ে উদভ্রান্তের মতো কেঁদে যাচ্ছেন, “শোন, তুমি আমাকে, আমার বাচ্চাদের কার কাছে রেখে যাচ্ছো।” “শোন, তুমি আমাদের কোথায় রেখে যাচ্ছো”? “এই, শোনো……….”। আমার মার বুকফাটা আকুতি বাবা শুনতে পাচ্ছিলেন কিনা জানিনা, বাবার শরীর নিথর, চোখ দুটি বন্ধ, কিন্তু দুই চোখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি । বাবা চলে গেলেন! মা শুন্যের দিকে তাকিয়ে  ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “আল্লাগো,  এখন আমি কোথায় যাবো, এই দুধের বাচ্চাদের কিভাবে বাচাবো”?

দেশ স্বাধীন হোলো। সাতকোটি মানুষ স্বাধীনতা পেলো, স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেলো। আর আমার মা নিজের ভুবন, নিজের সংসার হারিয়ে, ঝাপিয়ে পড়লেন তার বাচ্চাদের স্বাবলম্বী করার কঠিন সংগ্রামে। পাশে পেলেন তার আদরের বড়ছেলেকে। মার সেই হাসিখুশীমাখা, প্রানোচ্ছলে ভরা চেহারা আর কখনো দেখিনি, আমার মা আর কখনো স্বপ্ন দেখেননি যশোর শহরে নিজের সেই বাড়ীর!!

সাদিক আওয়াল, মেলবোর্ন, অষ্ট্রেলিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here