ইতিহাসের জেরার মুখে আমাদের সৃজনকাল

 

kabi5-1418018376

আহমেদ মূসা
আমরা একটি বড় ক্যানভাস পেয়েছিলাম। রঙ-তুলি সবই ছিল, কিন্তু কালজয়ী কোনো ছবি কেউ আঁকলেন না। সর্বত্রগামী রচনার জন্য কালি-কলমের অনটন কখনো দেখা যায় নি, শুধু অভাব দেখা গেছে উদযোগ ও সাহসের। আমরা একটি বহতা নদী পেয়েছিলাম, কিন্তু কুয়ো থেকে বেরই হতে চাইলাম না। আমরা পেয়েছিলাম একটি সঙ্গীতময় উদার দিগন্ত, কিন্তু মানুষের মুক্তির মিছিল নিয়ে যাওয়া হয় নি সেদিকে।
বয়সের ফিতায় ষাটের কাছাকাছি থেকে তার উপরে যাদের বিচরণ ছিল ও আছে এবং আমাদের কালের লেখক-শিল্পী-গবেষকসহ সৃজনশীলতার সামনে যে বিরাট ক্যানভাস ছিল ও বিদ্যমান Ñ অতীতে এতোবড় ক্যানভাস আর কখনই ছিল না, ভবিষ্যতেও পাওয়ার সুযোগ নেই।
আমরা দেখেছি,

আহমেদ মূসা

আয়ুব খানের মার্শাল ল’, ষাটের শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, একদলীয় শাসন, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজনের বড় অংশের ওপর নির্মম হত্যাকান্ড, জেলখানায় জাতীয় নেতৃবৃন্দের নির্মম হত্যাকান্ড। দেখতে হয়েছে স্বাধীন দেশের কয়েক দফার সামরিক শাসন, সেনা-শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সামরিক ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও বলিদান এবং দেখেছি মহতী সংগ্রামসমূহের বিজয়ও।
আমাদের দেখতে হয়েছে পাকিস্তানী হানাদারদের এ-দেশীয় দোসর, বাংলাদেশের জন্মশত্রু, একাত্তরের ঘাতক-দালালদের হিং¯্রতা ও হিং¯্র মুখ।
পাশাপাশি আমরা দেখতে বাধ্য হয়েছি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের রাজনৈতিক হত্যাকান্ড Ñ যার শিকার হয়েছেন জাসদসহ তৎকালীন বিরোধী দলের অসংখ্য নেতাকর্মী এবং বিপ্লবী নেতা সিরাজ শিকদারসহ বামপন্থীরা। আমাদের বেদনার সঙ্গে দেখতে হয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধের কিংবদন্তীর বীর সেনানী খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার এবং ৭ নভেম্বরের পূর্বাপর সময়ে সেনাবাহিনীর অনেক অফিসারের হত্যাযজ্ঞ, কর্ণেল তাহেরের জুডিশিয়াল কিলিং, পুরনো বিমান বন্দরে ক্যু’র মোড়কে বিমান বাহিনীর বহু সদস্যের মৃত্যু, ১৯৮১ সালে বীর-মুক্তিযোদ্ধা বীরোত্তম জিয়াউর রহমান ও জেনারেল মঞ্জুরসহ সেনাবাহিনীর বহু সদস্যের নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং বিভিন্ন সময়ে ক্যু-পাল্টা ক্যুয়ের রক্তাক্ত অধ্যায়। দেখতে হয়েছে একুশে আগস্টে আরেকটি নির্মম হত্যাযজ্ঞসহ প্রধান টার্গেট শেখ হাসিনার অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পাওয়া। আবার দেখেছি একই দিনে সারাদেশে বোমা ফাটিয়ে জঙ্গী মৌলবাদীদের ক্ষমতাদখলের অভিলাষ প্রকাশ এবং সাম্প্রতিককালের জঙ্গী-মৌলবাদের সরব প্রাদুর্ভাব ও তার আন্তর্জাতিকীকরণ ।
আবার আমরা দেখতে বাধ্য হয়েছি ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন’, ভোটারছাড়া নির্বাচনে জিতে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে ক্ষমতা ভোগের কসরত, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামে বিজয়ীদেরও একই অপকীর্তি।
একই সঙ্গে আমরা দেখে চলছি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ Ñ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হতে থাকা। এ-সবের সঙ্গে অনেক বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো ছিলই। আমাদের ক্যানভাসে আরো বহু প্রপঞ্চ আছে যে-সবের উল্লেখ এখানে নেই, কিন্তু সেগুলিও গুরুত্ববহ।
কিন্তু, আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের ক্ষেত্র-সম্বলিত সৃজনী-প্রতিভার প্রতিটি স্তরে এমন প্রভিবানদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যারা তাদের কালকে সামগ্রিকভাবে ধারণ করেছেন; কলম-কন্ঠ-তুলি-ক্যামেরায় তুলে এনেছেন।
আমরা দেখে আসছি আমাদের লিখিয়ে-আঁকিয়ে-গাইয়ে-নাচিয়ে-চিত্রতুলিয়ে মায় সাংবাদিকতার জগৎ আচ্ছন্ন দলমন্যতা, ধারামন্যতা ও উচ্ছিষ্টের অনুগামী হয়ে পড়েছে। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের জগতে দেখছি বাল্মীকীকে নারদ মুণির আশ্বস্ত করার আপ্তবাক্য, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি/ ঘটে যা তা সব সত্য নহে।’ ( রবীন্দ্রনাথ ঃ ভাষা ও ছন্দ)। অথচ উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলিতে এক সময় বলিদান ও আত্মত্যাগের সুমহান নজিরও রয়েছে।
সরস্বতীর বরপুত্র আমাদের সৃজনকালের প্রতিভাবানদের অনেক রকম-ফের দেখেই চলেছি। তারা তাদের নিজেদেরকে কেউ ভাবেন বাঙালি, কেউ ভাবেন বাংলাদেশি। কেউ ভাবেন তারা অমুকের সৈনিক, কেউ ভাবেন তমুকের সৈনিক Ñ কিন্তু নিজেকে পূর্ণ মানুষ ভাবেন না। তারা কিছু দেখেন কিছু দেখেন না, কিছু লেখেন কিছু লেখেন না, কিছু বলেন কিছু বলেন না। মনে-মনে অবশ্য ভাবেন সবই। কিন্তু প্রকাশে তারা অর্ধ-মানব, কেউ বা সিকি মানব। চিন্তার এই বামুনত্বের জন্যও আমাদের কেনো কিছুই বিশ্ব-মাপের হয়ে ওঠে না, এমন কি হয়ে ওঠে না মানসম্মত বা রুচিসম্মতও। এবং অভিন্ন কারণেই দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের প্রপঞ্চগুলি নির্মোহভাবে তুলে ধরার কাউকে আমরা দেখি না।
শুধু আমাদের কালের কেন, যে ঘটনা এ-যাবতকালের শ্রেষ্ঠ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত, আমাদের সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর এ-যাবত প্রায় চার হাজার গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে (মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের করা তালিকায় স্বাধীনতা-বিরোধীদের লেখা কয়েকটি গ্রন্থও রাখা হয়েছে পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য)। এই চার হাজারের সবগুলিই মানোত্তীর্ণ নয়, সেটা সম্ভবও নয়। সংখ্যাটা অবশ্যই গর্ব করার মতো। কিন্তু তালিকায় অনেক খ্যাতনামা লেখকের গ্রন্থ নেই, কারো বা আছে দায়সারা গোছের। তাদের কেউ কেউ আবার দল-বিশেষের সমালোচনা বা ভারতের কিছু পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেই বাক্যচালাচাল করেন। মুক্তিযুদ্ধে দলীয়ভাবে নেতৃত্ব ছিল আওয়ামী লীগের। কিন্তু এ দলের বাইরেও অসংখ্য লোক মুক্তিযুদ্ধ করেছেন Ñ বিশেষ করে সমকালের বামশক্তি। তৎকালের বিশাল বামশক্তির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় লিপ্ত ছিল। কিন্তু যুদ্ধকরা সেই বিশাল বামশক্তির কিছু অংশও পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ময়দানে দাঁড়িয়ে থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের পার্থক্য তুলে ধরার পরিবর্তে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ময়দানটাই ছেড়ে দিয়েছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ তাদের সৃজনী প্রতিভার অবদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আবার আমাদের কালের অনেক বড় প্রতিভাবানদের মধ্যেও দেখি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তারা সরব-সচল থাকলেও দুর্র্ভিক্ষের মতো একটি বড় ঘটনা তাদের মোটেও আলোড়িত করছে না। ১৯৭৪ সালে আমাদের দেশে মানব-সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে লাখো মানষের প্রাণ গেছে। কিন্তু এ-নিয়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি পালন করছে মর্মান্তিক নিরবতা। অথচ তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে রচিত হয়েছে কালজয়ী সাহিত্য, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা প্রভৃতি। এ কাজে অনেকের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদিনের মতো ব্যক্তিত্বও। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিটি ছাড়া শিল্প-সাহিত্যে তেমন কোনো ছাপ নেই। আমাদের কাপুরুষ ও সুবিধাবাদী ‘ক্রিয়েটিভ টাওয়ার’দের কাছে মানুষের জীবন ও শরীরে দুর্ভিক্ষের কারুকাজ উপেক্ষিত হয় বলে সে-কাজ সমাধা করেন দূর দেশের সুসান জজেরা (‘হাউ দ্য আদার হাফ ডাইজ’ দ্রষ্টব্য)।
একইভাবে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব ও ভারতের অনেক অন্যায় আচরণেরও প্রতিবাদ তারা করেন না। স্বাধীনতার অব্যবহিতপরের বামপন্থী নিধন নিয়েও ওদের মাথাব্যথা নেই। হতে পারে বিপ্লবের প্রশ্নে কারো কারো লাইন ছিল হটকারী বা ভুল । কিন্তু বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে যারা নিজেদের জীবন বিলিয়েছেন তারাতো ভুল মানুষ নন। একজন সিরাজ সিকদার বা একজন মুফাখ্খারের মতো মানুষকে কিংবা জাসদের মোশাররাফ হোসেন- সিদ্দিক মাস্টারদের আমরা ভুল মানুষ বলব? পশ্চিম বঙ্গে একসময় নক্সাল আন্দোলন হয়েছে। লাইন ভুল হলেও প্রাণ দেওয়া অসংখ্য তরুণ ছিল সেকালের সেরা মানুষ । বিদ্যায়-মেধায়-অঙ্গীকারে তাদের তুলনা ছিল না। বাম ঘরানার লেখকরাতো বটেই, এমন কি কংগ্রেসপন্থী শিল্পী-সাহিত্যিকরাও ওদের সহানুভূতির সঙ্গেই দেখেন Ñ মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম ছাড়া। নক্সাল আন্দোলনে বলিদান নিয়ে রচিত হয়েছে হাজার চুরাশির মা, শ্যাওলা, কালবেলা-ট্রিলজিসহ অসংখ্য উপন্যাস, চলচ্চিত্র প্রভৃতি। এক বছর আগেও পশ্চিম বঙ্গে নক্সাল নামে অসাধারণ একটি ছবি তৈরি হয়েছে যার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মিঠুন চক্রবর্তী। নক্সালদের নিয়ে বোম্বেও তৈরি হয়েছে অনেক মানোত্তীর্ণ ছবি। সেখানে চারু মজুমদার, কানু সান্ন্যাল, আজিজুল হক, জঙ্গল সাঁওতালদের নাম সম্মানের সঙ্গেই উচ্চারিত হয় Ñ ক্ষুদ্র ক্ষেত্রবিশেষ ছাড়া। এ ছাড়া ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে রণদীভের ভুল থিয়োরি বা ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ শীর্ষক অসমোয়োচিত স্লোগানের কারণে বিভিন্ন আন্দোলনে বলীয়ান আত্মত্যাগ যারা করেছেন তারা ভুল মানুষ? ওরা তো স্মরণীয়-বরণীয়। কিন্তু বাংলাদেশের বামুন-সৃজনশীলদের কাছে তাদের কালের কিংবদন্তীর মুক্তিযোদ্ধা বা বিপ্লবী-বীরদের বলিদানও উপেক্ষিত হয়। বরং তাদের কেউ কেউ আবার নিধনযজ্ঞের পুরোহিত রাজনীতিবিদ বা শাসকদের সঙ্গেও কন্ঠ মেলান।
আবার অন্যদিকে, যিনি জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সরব তিনি আবার জেনারেল মনজুরের হত্যাকান্ডে নিরব। যারা খালেদ মোশাররফ বা কর্ণেল হায়দারের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করেন তারা কর্ণেল তাহেরের জুডিশিয়াল কিলিং নিয়ে কিছু বলতে চান না। অথচ, কোনো হত্যাকান্ডই কাম্য যেমন নয়, তেমনি জাস্টিফায়েডও নয়। একটি হত্যা আরেকটি হত্যাকে ডেকে আনে কিংবা একটি হত্যাকান্ড পূর্ববতীঁ আরেকটি হত্যাকান্ডেরই জের। কিন্তু প্রতিটি হত্যাকান্ডই নিন্দার্য ও বিচার্য। এ ব্যাপারে সৃজনশীলদের তো আরো বেশি সোচ্চার হওয়া উচিত। অন্তত তাদের বলা উচিত যে, সব হত্যাকান্ডের বিচারই বাংলা মাটিতে হওয়া প্রয়োজন, কোনো কোনো বিচার শুধুমাত্র রোজ হাসরের ময়দানের জন্য তুলে রাখা যাবে না। রোজ হাসরের ময়দানে সব অপরাধের বিচারই আল্লাহ করবেন এবং আল্লাহতায়ালাই দুনিয়াতে অপরাধের সব বিচার মানুষকেও করার তাগিদ দিয়েছেন।
আমাদের প্রধান-প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি তাদের তল্পিবাহক বাহিনী ও কলমী-বরকন্দাজদের দিয়ে ইতিহসের স্ব-স্ব দলীয় পরিকাঠামোও তৈরি করে ফেলেছে। তাদের সেই দলীয় পরিকাঠামোর ‘ইতিহাস’ প্রকৃতপক্ষে আদল অর্জন করেছে বৈঞ্চব পদাবলীর, যেখানে সকল গানই শ্রী-কৃষ্ণকে নিয়ে; বা প্রবাদের ‘কানু বীনা নাহি গীত।’ কথিত সৃজনশীলদের কেউ কেউ এ-সব আবর্জনা সৃষ্টির বিনিময়ে করে-কেটে খাচ্ছেন। অথচ স্তাবকতা ও নিন্দা Ñ এ দুটিই ইতিহাসের বড় শত্রু। সত্যিকারের ইতিহাস কেবল নির্মোহ সত্যকেই গ্রহণ করে।
সৃজনশীলতাকে অবশ্যই রাজনীতিমনষ্ক হতে হবে, কারণ কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। কিন্তু সৃজনশীলতা দলমন্য হলেই বিপজ্জনক এবং আরো বিপজ্জনক এটা উচ্ছিষ্টের অনুগামী হলে। বাংলাদেশে সেই বিপদই হয়ে পড়েছে স্বাগতিক। এর অন্যতম কারণ, দলকানা সৃজনশীলদের অনেক সুবিধা। এতে কড়ির সঙ্গে আসে প্রচার, ভ্রমণ, পদক প্রভৃতি। গরুর চেয়ে সামান্য বেশি বুদ্ধি থাকলেই চলে দলকানাদের। দলকানা হলে দুই লাইন লিখে, দুই পঙক্তি গেয়ে, দুই কদম নেচে, দুই পোচ এঁকে বা দুই হাঁক দিয়েই অতি বিখ্যাত ও বিত্তবান হওয়া যায়। যারা কোনো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেন নি বা সারা জীবনে উদ্ধৃতিযোগ্য দু’টি লাইনও লেখেন নি, তারাও বিভিন্ন পদক ভাগাভাগির কারণে ‘বিরাট প্রতিভা।’ এবং সেটা অবশ্যই বরকন্দাজীর জন্য। সে কারণেই আমাদের সৃজনকাল অনেকটাই বন্ধ্যা; আমাদের সৃজনশীলরা প্রতিভার সংজ্ঞায় ঊন-মানুষ, কেউ বা আধা মানুষ, পরিপূর্ণ মানব কেউ নয়।
উচ্ছিষ্টের লোভ বা সুবিধাবাদের বাইরেও আমাদের সৃজনশীলতার মর্মান্তিক বিপর্যয়ের কিছু কারণ রয়েছে বলে আমার মনে হয়। আমি এখানে আমার সেই পর্যক্ষেণ শেয়ার করতে চাই।
স্বাধীনতার পূর্বাপর সময়ে সৃজনশীলতার সিংহভাগই ছিল বাম ঘরানার দখলে। মস্কো-পিকিং বিভেদের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল এই ভূ-খন্ডেও। স্বাধীনতার পর সিপিবি-মোজাফ্ফর ন্যাপ প্রভৃতি আওয়ামী লীগ ঘরানায় এবং ভাসানী ন্যাপ ও চীনপন্থী বামেরা আওয়ামী লীগ-বিরোধী শিবিরে সামিল হন। চীনপন্থীদের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও সৃজনশীল অঙ্গনে তাদের কোনো প্রভাব ছিলো না। ডানপন্থীরা তখন মাঠে না থাকলেও ঘাপটি মেরে ছিল। মস্কোপন্থীরা তখন প্রবল হলেও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর তারা সাময়িকভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ভয়ে কেউ কেউ জিয়াউর রহমানের খালকাটাকেও সমর্থন জানান। বিএনপি গঠিত হওয়ার পর ভাসানী ন্যাপের সিংহ ভাগ তাদের দলের প্রতীকসহ বিএনপিতে যোগ দেন। চীনপন্থীদের আরেকাংশ বিএনপিতে যোগ না দিলেও তাদের আওয়ামী লীগ-বিরোধিতার সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডের সুফল মূলত বিএনপিই পেতে থাকে। তখন সরকার, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ক্ষণকালের জন্য প্রাধান্য বিস্তার করেন চীনপন্থীরা।। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ও শিক্ষক সমিতিগুলিতেও প্রধান্য বিস্তার করেন তারা। এরশাদ আমলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রগুলিতে অনেকটা ভারসাম্য ফিরে আসে। ১৯৯১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত চীনপন্থীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতে সাহায্য করে। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জামায়াতের সহায়তা গ্রহণ ও দুইজন মহিলা এমপি জামায়াত থেকে নেওয়ার পর থেকেই চীনা ঘরানার সৃজনশীলরা আস্তে- আস্তে সরে যেতে থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জিতে বিএনপি জামায়াতের দুইজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও বিএনপির আলোচিত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ায় এবং ক্রমাগত জামায়াত তোষণের ফলে চীনপন্থী লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মূলধারা বিএনপিকে পরিত্যাগই শুধু করে নি, অনেকে সরাসরি পক্ষ নেন আওয়ামী লীগের। পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মস্কোপন্থীরা আরো ঘনিষ্ঠ হন আওয়ামী লীগের। মতিয়া চৌধুরী, নূরুল ইসলাম নাহিদ, নূহ আলম লেনিনসহ অনেকে সরাসরি যোগ দেন আওয়ামী লীগে। মস্কোপন্থী-চীনপন্থীদের সমন্বয়ে শুধু রাজনীতি নয়, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে একেবারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ ঘরানা। অন্যদিকে এক সময়ের চীনপন্থীদের মতো মস্কোপন্থীরা বর্তমান সময়ে এই সরকার, মিডিয়া ও সংস্কৃতির অঙ্গনে প্রবল আধিপত্য অর্জন করেন। এটা তারা তাদের শ্রম-মেধা দিয়েই করেন। আওয়ামী লীগ দল ও সরকার কোনো কিছু না করেই মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির নজিরবিহীন সমর্থন লাভের একটা যুগান্তকারী নজির উপভোগ করে চলেছে। মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির সামনে বিকল্প না থাকাতেই এটা ঘটছে। শেখ হাসিনা ওদেরকে একটা বিকল্পহীন রামকুন্ডলির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। শেখ হাসিনার এতো বুদ্ধিমত্তা ও সাহস অতীতে আর কখনো দেখা যায় নি।
অন্যদিকে জামায়াত এবং বিএনপির ভেতরকার ছদ্ম-জামায়াতীরা সৃজনশীল ক্ষেত্রে বিএনপিকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছেন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে যেখানে যুদ্ধাপরাধী-অধ্যুসিত জামায়াতের গন্ধ আছে সেখানে নতুন যুগের সৃজনশীলদের তো বটেই, কোনো সংস্কৃতবান লোকেরও সেখানে যাওয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভোট-পার্থক্য প্রায় পাশাপাশি হওয়ায় জামায়াতিরা বিএনপির পেশাজীবী সংগঠনগুলিতেও স্বল্পসংখ্যক ভোটের সঙ্গে মোটা তহবিল নিয়ে হাইফেন হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরুতে থাকেন। যদিও জামায়াতের ভোট-সমর্থন এখন বিএনপির বোঝা হয়ে গেছে। এরমধ্যে গাঙ্গে অনেক পানি গড়িয়েছে। জামায়াতের কারণে বিএনপির যে-কয়টি ভোট বাড়বে, আওয়ামী লীগ নতুন প্রজন্মের কয়েকগুণ ভোট বেশি পাবে, বিএনপির সঙ্গে জামায়াত থাকার কারণে।
এমন একটা পরিস্থিতিতে কাউকে লেখক, সাংবাদিক, নায়ক, গায়ক, বা যে কোনো ক্ষেত্রের সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে দাঁড়াতে হলে আওয়ামী লীগ ঘরানার মদদ ছাড়া অত্যন্ত কঠিন। তাই আওয়ামী লীগ ঘরানা অখুশি হয়, কেউ এমন কিছুকে শিল্প-সাহিত্যের বিষয় হিসেবে বেছে নিতে চান না । দুর্ভিক্ষ-ফারাক্কা প্রভৃতি সেই চক্রে পড়ে গেছে। অনেকে আওয়ামী লীগে বিশ্বাসী না হলেও ক্যারিয়ারের স্বার্থে আসল মনোভাব গোপন রেখে করে-কেটে খাচ্ছেন। সে কারণেও আমাদের ক্যানভাসের অনেকটাই ফাঁকা। আবার যত দুর্বলই হোক, বিএনপি ঘরানা অখুশি হোক এটাও কেউ কেউ চান না বলে ক্যানভাসেব আরেকটা অংশও ফাঁকা।
বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও নেতৃত্বের স্বাভাবিক বিকাশ হলে এমনটা ঘটতো না। রাজনীতির বিকৃত বিকাশ থেকেই সৃজন-পল্লীগুলিতেও এসেছে বিকৃতি।
কিন্তু নিকট ও দূর ভবিষ্যতের তখনকার প্রজন্ম যখন ক্যানভাসের ফাঁকা জায়গাগুলি দেখবেন, জানতে চাইবেন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি সম্পর্কে, প্রয়োজনীয় তথ্য না পেয়ে তারা হতাশ হওয়ার পাশাপাশি হবেন ক্রুদ্ধও। আমাদের কালের সৃজনী-প্রতিভার কাপুরুষতার জন্য ধিক্কার জানাবেন নিশ্চয়। তাই আমাদের গোটা সৃজনকাল ইতিহাসের জেরার মুখে। সদুত্তর দেওয়ার জন্য ইতিহাস কাঠগড়ায় তুলবে আমাদের কালের সৃজনশীল সবাইকে। এমন কি ঘটনাচক্রে বাংলাদেশের কোনো সাহিত্যিক যদি আগামী বছর নোবেল পুরস্কারও পেয়ে যান, তাকেও মলিনবদনে উঠতে হবে সেই কাঠগড়ায়; কারণ তিনিও অনুপম-দুর্লভ সেই ক্যানভাসের সদ্ব্যবহার করেন নি, তারও সময় গেছে কাপুরুষতায়, দ্বিধায় কিংবা গ্লানিতে।
মানুষের সৃজনী-প্রতিভা যেখানে বেপথু হয় অথবা এর নিদারুণ অপচয় হয়, সেখানে ইতি ঘটে সৃজনকালের; আসে মড়ক-মাৎস্যন্যায়। কখনো আসে স্বল্পকালের জন্য, কখনো বা সুদীর্ঘকালের জন্য। হাজার হাজার বছর ধরে ইতিহাস এই সত্যকে তার বুকে ধারণ করে সাক্ষী হয়ে আসছে। সে-কারণেই অবসানকালের আগে, জড়িতদেরকে কাঠগড়ায় তোলে জেরার জন্য। কিন্তু আমাদের কাছে সদুত্তর আছে কি! (আলোকিত বাংলাদেশ)
নিউইয়র্ক; ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
আহমেদ মূসা লেখক, সাংবাদিক, নাট্যকার ও উপদেষ্টা সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here