ট্রাম্প পরাজয় মেনে না নিলে কি হবে?

trump-stupid-face

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এখন হিসাব হচ্ছে ইলেকটোরাল ভোটের, যিনি ২৭০টি ভোট পাবেন তিনিই হবেন প্রেসিডেন্ট। বোদ্ধারা হিসাব দিচ্ছেন হিলারির ৩০০টি ভোট পেতে তেমন অসুবিধার কথা নয়। সেক্ষেত্রে হিলারি প্রেসিডেন্ট। তাহলে ট্রাম্পের কি কোনই আশা

শিতাংশু গুহ
শিতাংশু গুহ

নেই? এবিসি নিউজ রোববার একটি হিসাব দিয়ে বলেছে, বিষয়টি শক্ত, কিন্তু অসম্ভব নয়। যদিও ট্রাম্পের জয়ের আশা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রথাগতভাবে নীল ষ্টেটগুলোতে হিলারির অবস্থান শক্ত এবং কোন কোন লাল ষ্টেটে তার অবস্থান ভালো। বলা হচ্ছে, হিলারি যদি ওহাইও এবং ফ্লোরিডাতে হারেন, কিন্তু পেনসিলভানিয়া ও কলোরাডোতে জেতেন তবু তিনি প্রেসিডেন্ট হবেন। অন্যরা বলছেন, ট্রাম্প প্রতিটি ব্যাটেলগ্রাউন্ড ষ্টেটে জিতলেও হিলারির জয় নিশ্চিত। কিন্তু ট্রাম্পের পক্ষে সবগুলো প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ ষ্টেটে জেতা কি সম্ভব?

বিজয় ছিনিয়ে নিতে হলে ট্রাম্পকে নর্থ ক্যারোলিনা, ওহাইও এবং ফ্লোরিডাতে জিততে হবে। ২০১২তে মিট রমনি যেসব ষ্টেট জিতেছেন সেইসব ষ্টেট জিততে হবে এবং সাথে আরিজোনা ও জর্জিয়া। ট্রাম্পকে উত্তাহ জিততে হবে, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইভান ম্যাকমুলিন মরমোনদের ভোটে জয় ছিনিয়ে নিতে পারেন। ট্রাম্পকে নর্থ ক্যারোলিনাতেও জিততে হবে, সেখানে হিলারির সাথে তার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে (ট্রাম্প ৪৮-হিলারি ৪৭%)। ওহাইও-তে না জিতে কোন রিপাবলিকান প্রার্থী হোয়াইট হাউসে যেতে পারেননি, সেখানে ট্রাম্পের অবস্থান সামান্য ভালো (৪২-৪১%), তবে হিলারি এখনো হুমকিস্বরূপ । ফ্লোরিডা না জিতলে ট্রাম্পের কোন আশা নেই, সেখানে আগাম ভোট চলছে, এক্সিট পোল হিলারির অনুকূলে। এছাড়া ট্রাম্পকে পেনসিলভানিয়া এবং ছোট ছোট কিছু ষ্টেট যেমন আইওয়া, নেভাদা, মেইন ও নিউ-হ্যাম্পশায়ারে জয় পেতে হবে। কিন্তু নিউ-হ্যাম্পশায়ারে ক্লিন্টন ১৫% এগিয়ে।

তবে অপ্রত্যাশিতভাবে মোটামুটিভাবে নীল ষ্টেট যেমন উইসকনসিন, ভার্জিনিয়া, মিশিগান বা কলোরাডো যদি ট্রাম্পের পক্ষে চলে যায় তবে তিনি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। উইসকনসিন, মেইন সাথে নেভাদা অথবা আইওয়া বা নিউ-হ্যাম্পশায়ার জিতলে ট্রাম্পের সম্ভবনা আছে। ভার্জিনিয়ার সাথে নেভাদা অথবা আইওয়া বা নিউ-হ্যাম্পশায়ার জিতলেও ট্রাম্প এগিয়ে যাবেন। একই সাথে মিশিগান ও মেইন জিতলে তার কপাল খুলবে। অথবা কলোরাডো, আইওয়া-র সাথে নেভাদা বা নিউ-হ্যাম্পশায়ার জিতেও তিনি হোয়াইট হাউস দখল করতে পারেন। সম্ভবনার দেশ আমেরিকা, এখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। সব চাবিকাঠি ভোটারের হাতে। জয় ভোটারের জয়। এখানে কারচুপি’র সুযোগ নেই। যদিও ট্রাম্প নিজেই কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। আমেরিকা তাই এখন ভোট কারচুপি নিয়ে সরগরম।

ট্রাম্প সমর্থকরা বলছেন, ট্রাম্প জিতলে ঠিক আছে, হিলারি জিতলে ধরে নেয়া হবে কারচুপি হয়েছে। তাদের ধারণা অবৈধ ইমিগ্র্যান্টরা ভোট দেয়! শেষ বিতর্কে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, পরাজিত হলে তিনি ফলাফল মেনে নেবেন কিনা? উত্তরে তিনি বলেছেন, সময় এলে দেখা যাবে, আপাতত: সাসপেন্স থাকলো। ট্রাম্প সৃষ্ট ধুম্রজাল নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। অবশ্য, পরদিন ওহাইওতে এক সমাবেশে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন যে, ফলাফল মানবো, যদি আমি জয়ী হই। রয়টার/আইপিএসওএস শুক্রবার এক জরীপে বলেছে হিলারি জিতলে অর্ধেকের বেশি রিপাবলিকান নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করবেন। প্রায় ৭০% বলেছেন, শুধুমাত্র ভোটে কারচুপি হলেই হিলারি জিতবেন। পক্ষান্তরে প্রতি ১০জনের মধ্যে ৭জন ডেমোক্রেট বলেছেন, ট্রাম্প জিতলে তারা ফলাফল মেনে নেবেন। হিলারি নিজেও বিতর্কে ফলাফল মেনে নেয়ার কথা বলেছেন।

ট্রাম্প কেন কারচুপির কথা বলছেন? ডেমোক্রেটরা বলছেন, তিনি হারবেন তাই ওকথা। অন্যরা বলছেন, ওটা ভয় দেখানো। হয়তো এটাও হতে পারে, সেক্স স্ক্যান্ডাল থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরাতে ট্রাম্প নুতন বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। এরমধ্যে ১০ম মহিলা নিউজার্সীর এক ইয়োগা ইনস্ট্রাক্টর কারিনা ভার্জিনিয়া,৪৫ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসভ্যতার অভিযোগ এনেছেন। বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালে ইউএস ওপেন টেনিস টুর্নামেন্টে ট্রাম্প তার শরীর ও বুকে হাত দেন। তিনি এও জানান, এতদিন লজ্জায় তিনি কথা বলেননি। হিলারী সমর্থক এটর্নী গ্লোরিয়া অলরেড এসময় তার সাথে ছিলেন। ট্রাম্প পুনরায় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এপর্যন্ত যেসব মহিলা তার অভিযোগ এনেছেন ট্রাম্প তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্পের জন্যে সু-খবর যে, আমেরিকা এখন তার সেক্স-স্ক্যান্ডাল নিয়ে তেমন কথা বলছেন না! বরং আমেরিকানরা ভাবছেন ট্রাম্প হারলে গোলযোগ বা নুতন সমস্যা সৃষ্টি হবে কিনা?

আসলেই ট্রাম্প যদি হেরে যান এবং ফলাফল না মানেন তাহলে কিহবে? আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজের ভোটাভুটিই চূড়ান্ত, যিনি ২৭০টি ভোট পাবেন তিনিই জয়ী; পরাজিত প্রার্থী মানলেন কি মানলেন না তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। তবে প্রথা হচ্ছে, পরাজিত প্রার্থী ফোন করে বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান, পরাজয় স্বীকার করে নেন। ট্রাম্প যদি বেশি ব্যবধানে হারেন তবে পরাজয় স্বীকার না করার কোন কারণ থাকবে না। সামান্য ব্যবধানে হারলে মামলা-মোকদ্দমা হতে পারে। যেমন হয়েছিলো বুশ-আলগোরের সময়। ২০০০সালে বুশ পপুলার ভোট (০.৫১%) হারলেও ইলেকটোরাল ভোটে (২৭১-২৬৬) জিতে প্রেসিডেন্ট হন। নির্বাচনের দিন রাতে আল-গোর প্রাথমিকভাবে বুশের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিলেও পরক্ষনে আবার ফোন করে জানান যে তিনি তার মত পাল্টাচ্ছেন। বুশ প্রশ্ন করেন, আপনি কি তাহলে পরাজয় স্বীকার প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন?

ঐসময় ফ্লোরিডায় ভোটের ব্যবধান এতটাই স্লীম ছিলো যে আলগোর কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট পুন্:গণনার জন্যে মামলা করেন। বুশ পাল্টা মামলা করেন গণনা বন্ধ করার জন্যে। মামলা মার্কিন সুপ্রীম কোর্টে যায়। আদালত ৫-৪ভোটে ভোট না গণনার পক্ষে মত দেয়। আলগোর হেরে যান। আদালতের রায়ের সাথে তিনি একমত ছিলেন না, কিন্তু রায় মেনে পরাজয় স্বীকার করে নেন। বুশ প্রেসিডেন্ট হন। এবারকার নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, দীর্ঘদিন পর নিউইয়র্ক থেকে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন। দু’জন প্রধান প্রতিদ্বন্দীই নিউয়র্কের। ট্রাম্পের জন্ম কুইন্সে। হিলারির জন্ম শিকাগোতে হলেও ক্লিন্টন পরিবার এখন স্থায়ীভাবে লং- আইল্যান্ডের বাসিন্দা। ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট (এফডিআর) ছিলেন নিউয়র্কের। ৭১ বছর পর নিউইয়র্ক থেকে আবার একজন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন। এফডিআর-এর জন্ম নিউ হাইড পার্কে।তিনি ডেমোক্রেট এবং একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ৪র্থ টার্ম ক্ষমতায় ছিলেন (১৯৩৩-১৯৪৫)। অবশ্য ৪র্থ টার্মের শুরুতে ১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল তিনি মারা যান।

দু’একটা জরিপ বাদে প্রায় সকল জরিপে ট্রাম্প পিছিয়ে। সোমবার ট্রাম্প তাই বলেছেন, ‘ঐসব জরিপ ভুয়া। আমার ভোটারদের ভীতি প্রদর্শনের লক্ষ্যে এসব করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি জিতবো’। ট্রাম্প সমর্থকরা বলছেন, ডেমোক্রেটদের মধ্যে থেকে ওইসব জরিপ করা হচ্ছে। ফ্লোরিডাতে একজন সমর্থক বলেন, ‘প্রসাশনের তিনটি শাখা, প্রেস ট্রাম্পের বিরুদ্ধে, ট্রাম্প একটি আন্দোলন চালাচ্ছেন। ব্যালটের মাধ্যমে এই আন্দোলন সফল করতে হবে’। ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ক্যালিয়ন কনওয়ে রোববার স্বীকার করেছেন যে তারা পিছিয়ে, কিন্তু তিনি এও বলেন যে রেস্ শেষ হয়ে যায়নি, এবং তারা এখনো জিততে পারেন। ট্রাম্প শিবির একটি হিসাব দিয়ে বলছে তাদের ২৬৬টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট আছে, হিলারির ১৯৩টি। তাদের মতে নিউ-হ্যাম্পশায়ার, কলোরাডো বা পেনসিলভানিয়ার জিতলে হোয়াইট হাউস তাদের দখলে চলে আসবে।

এদিকে জিওপি নেতারা ভাবছেন ট্রাম্পের পতনশীল ক্যাম্পেইন থেকে উঠে আসার সময় চলে গেছে। এমএসএনবিসি বলেছে, তৃতীয় বিতর্কে ট্রাম্প তার পরাজয় নিশ্চিত করেছেন। ওয়াশিংটন পোস্ট বলেছে, ট্রাম্প নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। সিএনএন বলেছে হিলারী তৃতীয় বিতর্কে ৫২-৩৯% জিতেছেন। রাসমুসেন জরিপ বলেছে ট্রাম্প ৪৩-৪০% জিতেছেন। বিল-ও-রেইলি পঁচিশ হাজার ভোটারের ওপর জরিপ চালিয়ে বলেছে, ট্রাম্প বিপুলভাবে জয়ী হবেন। ডেমোক্রেটরা বলেছেন, ট্রাম্প হারছেন, কাজেই কংগ্রেস ও সিনেট দখল করার এইতো সময়। এদের ভয়, হিলারি জিতলে এবং হাউজ ও সিনেট রিপাবলিকানদের দখলে থাকলে হিলারিকে ওরা ছিঁড়ে ফেলবেন।হিলারির ক্যাবিনেটে লিবারেল রিপাবলিকানরা স্থান হচ্ছে বলে গুজব রয়েছে, এদের একজন হচ্ছেন, হিউলেড প্যাকার্ডের সিইও মে উইটম্যান। অনেকের ধারণা, লিবারেল রিপাবলিকানরা কেউ কেউ হিলারিকে ভোট দেবেন।

সর্বশেষ, সিএনএন সোমবার বলেছে, হিলারি ৫%-এ ট্রাম্প থেকে এগিয়ে (৪৯-৪৪%)। এবিসি নিউজ জরিপ রোববার বলেছে, হিলারি ডবল ডিজিটে ট্রাম্পকে পিছনে ফেলে এগিয়ে। শনিবার পর্যন্ত ১৩৯১জন মার্কিনীর ওপর জরিপ চালিয়ে তারা বলেছেন, হিলারি ৫০%-ট্রাম্প ৩৮%। রাসমুসেন জরিপ সোমবার বলেছে ট্রাম্প ২%-এ হিলারি থেকে এগিয়ে। আইবিডি/টিআইপিপি জরিপ বলছে দু’জন্যেই ৪১-৪১%। উল্লেখ্য যে, ৩৭টি ষ্টেট এবং ডিষ্ট্রিক্ট অফ কলম্বিয়াতে আগাম ভোট চলছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ৫কোটি ডলার নিজের টাকা খরচ করেছেন। আবার ৩য় বিতর্কে নিউক্লিয়ার রেসপন্স টাইম ৪মিনিট বলায় পেন্টাগন হিলারির ওপর বিরক্ত। ট্রাম্প ও হিলারি বিতর্কে একজন অন্যকে তুলাধুনা করলেও পরদিন নিউইয়র্কে ‘আল-স্মীথ’ ডিনারে কার্ডিনাল টিমোথি ডোনালের দুইপাশে বসে দু’জন যথেষ্ট হাসিঠাট্টায় মত্ত ছিলেন।

শিতাংশু গুহ, কলাম লেখক।
রবিবার, ২৪শে অক্টবর ২০১৬।
নিউইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here