কে জিতবেন, ট্রাম্প না হিলারি?

hillaryclinton-donaldtrump_web

আলী রীয়াজ
ডোনাল্ড ট্রাম্প, হিলারি ক্লিনটনযুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দরজায় দাঁড়িয়ে জনমত জরিপে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূরত্ব কমে আসার ঘটনাকে কয়েক দিন ধরে রিপাবলিকান দলের নেতারা দলের ‘সমর্থকদের ঘরে ফেরা’ বলে বর্ণনা করছেন। তাঁদের এই বক্তব্য এক অর্থে ঠিক। রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডোনা

আলী রীয়াজ: ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক
আলী রীয়াজ: ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক

ল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে দলের ভেতরে যে মতপার্থক্য ও টানাপোড়েন, তার প্রকাশ ঘটতে শুরু করেছিল গ্রীষ্মকালেই, যখন এটা নি

শ্চিত হয় যে তিনিই হতে চলেছেন দলের প্রার্থী; দলের সম্মেলনের পর সেই টানাপোড়েনের একটা সমাধান তৈরি হয়েছিল এভাবে—যেহেতু তিনি দলের প্রার্থী, তাঁকে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সেই বিবেচনায় দলের নেতারা তাঁকে মেনে নিয়ে এগোতে শুরু করেন।
কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে নারীদের প্রতি অবমাননাসূচক বক্তব্যসংবলিত ২০০৫ সালের ভিডিও টেপের প্রকাশ এবং বেশ কয়েকজন নারী কর্তৃক ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর দলের নেতারা তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করতে শুরু করেন। দলের সমর্থকদের মধ্যেও তৈরি হয় হতাশা। আর সেই সময়ই হিলারি ক্লিনটন উল্লেখযোগ্যভাবে জনমত জরিপে এগিয়ে যান; মনে হচ্ছিল, হিলারির বিজয় কেবল সুনিশ্চিতই নয়, তিনি একটা বড় ধরনের জয় পেতে যাচ্ছেন। তখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় সিনেটের ৩৪টি আসনের দিকে, যেগুলোর গোটা পাঁচেক আসনের হাতবদল হলে সিনেটের কর্তৃত্ব যাবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

কিন্তু সেই জোয়ারের মুখে এফবিআই–প্রধান জেমস কোমি হিলারির ই-মেইলের বিষয়ে ইঙ্গিত করে ২৮ অক্টোবর কংগ্রেসের কাছে যে অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর চিঠি পাঠান, তাতে ট্রাম্পের প্রচারণায় প্রাণের সঞ্চার হয়। শুধু তা-ই নয়, রিপাবলিকান দলের নেতারা ট্রাম্পের পাশে এসে দাঁড়াতে শুরু করেন। দলের নেতারা, যাঁরা দুই সপ্তাহ আগেও ট্রাম্পের নামোচ্চারণে অনীহ ছিলেন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন ট্রাম্পের প্রধান প্রচারক। উদাহরণ হিসেবে প্রতিনিধি সভার স্পিকার পল রায়ান কিংবা সিনেটর টেড ক্রুজের কথাই বলা যায়। অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটনকে কোমির চিঠির বিষয়ে কথা বলতে হয়, আত্মপক্ষ সমর্থনে সময় ব্যয় করতে হয়; যে ই-মেইল সার্ভার প্রসঙ্গ তিনি পেছনে ফেলে এসেছিলেন, সে বিষয়েই ব্যাখ্যা দিতে হয়; আর দলের বাইরে নিরপেক্ষ ভোটারদের বোঝাতে হয় যে তাঁর বিরুদ্ধে এক বছরের তদন্তে এফবিআই আইনভঙ্গের কোনো প্রমাণ পায়নি। হিলারির জন্য ই-মেইলের দুঃস্বপ্ন আবার বাস্তব হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রাম্প শিবিরের মিথ্যা প্রচারণা; যেমন ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকেরা বলতে শুরু করেন যে হিলারি খুব শিগগির আইনভঙ্গের জন্য অভিযুক্ত হবেন এবং বিচারের সম্মুখীন হবেন। এমনকি রক্ষণশীল টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স টেলিভিশনে কোনো রকম সূত্র ছাড়াই ‘খবর’ পরিবেশন করা হয় যে এফবিআই হিলারিকে অভিযুক্ত করতে যাচ্ছে (এক দিন পর এই ভুলের জন্য ওই সাংবাদিক দুঃখ প্রকাশ করেন)।

এই পটভূমিকায় রিপাবলিকান দলের সমর্থকেরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তাঁদের গৃহে প্রত্যাবর্তনের কারণে নির্বাচনের ঠিক আগের দিনগুলোতে মনে হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হবে। সেটা কিছুদিন আগেও অপ্রত্যাশিত ছিল এই কারণে যে এবারের নির্বাচনের অনেক কিছুই ভিন্ন রকম, অনেক ঘটনা ঘটেছে এবং রিপাবলিকান প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বহুবার। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে এ ধরনের অবস্থা মার্কিন নির্বাচনে নতুন কিছু নয়, নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র বলেই মনে হয়। শুক্রবার রাত অবধি যেসব জনমত জরিপ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে হিলারি ক্লিনটন এগিয়ে আছেন—জরিপভেদে এই এগিয়ে থাকা ৩ থেকে ৭ পয়েন্টের। রিয়েল ক্লিয়ার পলিটিকস নামের ওয়েবসাইট, যারা সব জরিপের গড় প্রকাশ করে, তাদের হিসাব অনুযায়ী হিলারি মাত্র ২ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। ২০১২ সালে নির্বাচনের ঠিক আগের দিনগুলোতে জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল, বারাক ওবামার অবস্থাও ছিল একই রকমের; রিয়েল ক্লিয়ার পলিটিকসের হিসাব অনুযায়ী তিনি ঠিক এ জায়গাতেই ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ৩৩২টি ইলেকটোরাল ভোট, আর মোট ভোটের ৫১ শতাংশ।

ফলে রিপাবলিকান দলের সমর্থকদের ঘরে ফেরার অর্থ যদি এই হয় যে তাঁরা ফিরে এসেছেন ঠিক যেখানে তাঁরা ছিলেন ২০১২ সালে, তবে তা নিশ্চয় রিপাবলিকান দলের জন্য খুব আশার বিষয় নয়। ২০১২ সালের রিপাবলিকান দলের প্রার্থী মিট রমনি পেয়েছিলেন ২০৬টি ইলেকটোরাল ভোট, মোট ভোটের ৪৮ শতাংশ। এই হিসাবের সঙ্গে এটা যোগ করা দরকার যে ২০১২ সালের হুবহু পুনরাবৃত্তি হবে এমন মনে করার কারণ নেই। কেননা, ওবামা যেসব অঙ্গরাজ্যে জিতেছিলেন, হিলারি তাঁর সব জিততে পারবেন, এটা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। সেই বিবেচনায় এবং গত কয়েক দিনের জরিপের ফল থেকে বলা যায়, হিলারিকে ওহাইও অঙ্গরাজ্যে বড় রকমের বাধা পেরোতে হবে। তিনি সম্ভবত আইওয়াতে জয়ী হবেন না, একইভাবে মেইন অঙ্গরাজ্যের চারটি ইলেকটোরাল ভোটের সবই হিলারি পাবেন বলে মনে হয় না। এই দৃশ্য বিবেচনায় নিলে এবং ওহাইওকে বিবেচনার বাইরে রাখলে হিলারি কমপক্ষে ২৬টি ইলেকটোরাল ভোট হারাবেন। কিন্তু এগুলো হারানোর ফলে তাঁর জন্য কোনো বিপদ সৃষ্টি হবে না। ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনের ইতিহাস বলে যে এই রাজ্য নিয়ে আগাম কিছু না বলাই শ্রেয়; ফলে হিলারির জন্য ২৯টিভোটের ওপর নির্ভর না করাই হবে সমীচীন। বিপরীতক্রমে নর্থ ক্যারোলাইনা, যে অঙ্গরাজ্যে ওবামা ২০০৮ সালে জিতেছিলেন, কিন্তু সামান্য ভোটের ব্যবধানে ২০১২ সালে তিনি যেখানে পরাজিত হয়েছিলেন, তার ঝোঁক হিলারির দিকেই। ফলে সেখানকার ১৫টি ভোটের আশা করছে হিলারি শিবির।

এই হিসাবের বড় দিক হচ্ছে এই যে ট্রাম্পের জন্য বিজয়ের জন্য কেবল ফ্লোরিডাই যথেষ্ট নয়। ইতিমধ্যে যেসব জায়গায় তিনি এগিয়ে আছেন—ওহাইও ও আইওয়া—সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে, নর্থ ক্যারোলাইনা হারালে আরও কিছু অঙ্গরাজ্য তাঁর ব্যাগে তুলে আনতে হবে। সেই সম্ভাবনার কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি। নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত প্রার্থীদের প্রচারাভিযানের তালিকা দেখলেই এখন বোঝা যায় কে কী কৌশল নিয়েছেন। গত কয়েক দিনে আগেভাগে ভোট দেওয়ার যে হিসাব বেরিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে ২০০৮ ও ২০১২ সালের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট দেওয়ার হার এখন পর্যন্ত কম; ফলে হিলারির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা।

যে চারটি অঙ্গরাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাররা ফলাফল বদলে দিতে পারেন—নর্থ ক্যারোলাইনা, পেনসিলভানিয়া, ওহাইও ও ফ্লোরিডা—সেখানেই হিলারি, ওবামা, বিল ক্লিনটন, বার্নি স্যান্ডার্স গত কয়েক দিন প্রচার চালিয়েছেন এবং নির্বাচনের আগের রাত পর্যন্ত সেখানেই সমাবেশ করবেন। হিলারি ক্লিনটনের শেষ প্রচার অনুষ্ঠান হবে সোমবার রাতে ফিলাডেলফিয়ায়, যেখানে তাঁর সঙ্গে যোগ দেবেন বিল ও চেলসি ক্লিনটন, মিশেল ও বারাক ওবামা। অন্যদিকে ট্রাম্পের সফরের তালিকায় অবশ্যই আছে ফ্লোরিডা, নর্থ ক্যারোলাইনা ও উইসকনসিন। কয়েক দিন ধরেই ট্রাম্প এমনকি ডেমোক্র্যাটদের ঘাঁটি বলে পরিচিত রাজ্যেও যাচ্ছেন এই আশায় যে শহরের বাইরের এলাকাগুলোতে তাঁর সমর্থন বাড়িয়ে তিনি রাজ্যের ফলাফল তাঁর অনুকূলে আনতে পারেন কি না।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ট্রাম্প গ্রামাঞ্চলের শ্বেতাঙ্গ কর্মজীবী ও দরিদ্র ভোটারদের মধ্যে তাঁর সমর্থন তৈরি করেছেন এবং তা ২০১২ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনির চেয়ে বেশি; এতে তিনি যতটা এগিয়েছেন, সম্ভবত তার চেয়ে বেশি সমর্থন হারিয়েছেন শহরতলির কলেজশিক্ষিত, বিশেষত নারী ভোটারদের মধ্যে। তা ছাড়া হিস্পানিকদের মধ্যে তাঁর সমর্থন ২০১২ সালের চেয়ে অনেক কম বলেই জরিপের ইঙ্গিত। এসব হিসাব কতটা সত্যি, তা আমরা দেখব ৮ নভেম্বর। কিন্তু এখন যেটা অনুমান করা যায় তা হলো, রিপাবলিকান দলের সমর্থকদের ‘গৃহে প্রত্যাবর্তনই’ ট্রাম্পের জন্য যথেষ্ট নয়।

আলী রীয়াজ: ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।
– প্রথম আলো’র সৌজন্যে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here