খালেদা জিয়া দাঁড়ালেও আইভি জিততেন 

0
396

ivy-khaleda000নারায়ণগঞ্জে আইভী জিতেছেন। এ জয় অবধারিত ছিলো। সদ্য নারায়ণগঞ্জ ঘুরে এসে একজন জানান, খালেদা জিয়া দাঁড়ালেও ওখানে আইভী জিততেন। আগেরবারও আইভী প্রায় একই পরিমান ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। তাহলে নৌকার ভোট গেলো কই? ফেইসবুকে একজন লিখেছেন, নৌকা না নিলে আইভী আরো বেশি ভোটে জিততেন, যদিও একথা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে আর একজন বলেছেন, এটা কোননির্বাচন হলো? কেন? একটা পটকাও ফুটলোনা! নির্বাচনটি আসলে ভালোই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, ‘সুন্দর নির্বাচন হয়েছে, এমনকি বিএনপি’র কোন অভিযোগ নেই’। খেলার মত নির্বাচনেও জয়-পরাজয় থাকবে, কথা হলো নির্বাচনে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে কিনা? নারায়ণগঞ্জে হয়েছে। প্রমান হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুষ্ঠূ ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব।

আইভীও একই কথা বলেছেন যে, শেখ হাইসনা নেতৃত্বে যে সুষ্ঠূ নির্বাচন সম্ভব নারায়ণগঞ্জ এর প্রমান। তিনি শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেছেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি প্রতিদ্বন্ধীর বাসায় গিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যদিও         গয়েশ্বর রায় কিছু উল্টাপাল্টা বলেছেন, এবং ওবায়দুল কাদের এর যথার্থ জবাব দিয়েছেন। রাজনীতিতে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন প্রমান করেছে, দুই পক্ষেরশান্তিপূর্ণ সহবস্থান সম্ভব। মাগুরা নির্বাচন যেমন বিএনপি’র জন্যে কাল হয়েছিলো, নারায়ণগঞ্জ ঠিক ততটাই আওয়ামী লীগের জন্যে আশীর্বাদ হতে পারে। এদিকে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আবদুল হামিদ এবং বেগম জিয়ার হাস্যোজ্জ্বল ছবি জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। এরশাদ চাচার হাসি তো আছেই। রাজনৈতিক নেতারা সবাই মিলে হাঁসতে পারলে দেশের মানুষ খুশিতে হাসবে।

 দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাটা পাকাপোক্ত হলে সবারই লাভ। সংবিধানে নির্বাচন কমিশন নিয়ে যে আইন করার কথা বলা হয়েছে, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার এটি করলে ক্ষতি কি? এই সরকারের অনেক অর্জনের ঝুলিতে এটিও আর একটি অর্জন হিসাবে সংযোজিত হবে। আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন, শেখ হাসিনা না থাকলে দেশ আফগানিস্তান হতো। কথাটা সত্য। একইভাবে এ কথাও বলাযায়, শেখ হাসিনাই পারেন বাংলাদেশকে একটি উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক একটি সাপ্রদায়িক রাষ্ট্র জন্ম নেয়। সেই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র থেকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশের জন্ম। দেশের মানুষ মোটামুটিভাবে পাকিস্তান বিরোধী হলেও পাকিস্তানী চেতনা বা ধ্যানধারণার ততটা বিরোধী নয়। সেই চেতনার যদি পরিবর্তন আনা না যায়, তাহলেবাংলাদেশ তো আর একটি মিনি পাকিস্তানই থাকলো। তাই দরকার মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবসের চেতনার পুন্:প্রতিষ্ঠা।

নি:সন্দেহে দেশ অনেকটা এগিয়ে গেলেও চেতনার দিকটায় তেমন অগ্রগতি চোখে পড়েনা, বরং হচ্ছে উল্টোটা। সেই পঁচাত্তরে মহানায়কের তিরোধানের পর স্বাধীনতা বিরোধীরা চেতনার রশি টেনে ধরেছে, আমরা পিছু হটেছি। এদের অনেকেই এখন চেতনার পতাকাতলে। জামাত এবছর ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ পালন করেছে। সামনে হয়তো শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় গোলাম আযম, মীর কাসেম বা নিজামীর নামদেখা যাবে? যেমন যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ফাঁসির রায় কার্যকর হবার পর কারো কারো কবরে ‘শহীদ’ লেখা হয়েছে। প্রসাশন অবশ্য বলছে, ওগুলো সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো: এবারকার বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালায় জামাতের একটি ব্যানারে দেখলাম, ‘স্বাধীনতা এনেছি, স্বাধীনতা রাখবো’ লেখা। চমৎকার!এজন্যেই হয়তো দেশে ঘনঘন বিমানে ক্রটি ধরা পড়ছে। এতে শংকিত হবার যথেষ্ট কারণআছে বৈকি। একমাত্র গণতান্ত্রিক চেতনাই পারে ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে।

চেতনার কথা উঠলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আসে। সদ্য বিজয় দিবস চলে গেলো। বিজয় দিবস ছিলো, আছে; কিন্তু এর চেতনা অনেকাংশে ম্লান। হয়তো জামাতকে তাই স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে? একাত্তরের বিজয় দিবসের চেতনা ছিলো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, আমরা সবাই বাঙ্গালী ছিলাম। সবার হৃদয়ে ছিলো রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল। এখনো কি তা আছে? রথীন্দ্রনাথ রায় এখনো প্রায়শ: এগানটি গাইতে পছন্দ করেন: ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলিম, বাংলার ক্রিষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ–আমরা সবাই বাঙ্গালী’। ২০১৬-তে এসে আসলে কি সত্যিই এ কথা বলা যাবে? দেশ অনেক এগিয়েছে: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে; যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে; অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বাংলাদেশ, কিন্তু চেতনার জায়গাটি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

নারায়ণগঞ্জে নির্বাচন ছিলো গণতান্ত্রিক চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে গণতান্ত্রিক চেতনার তেমন তফাৎ নেই। কিন্তু সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশ আগুন দিচ্ছে, এটা কেমন চেতনা? পুলিশ অবশ্য বলেছে, আগুন দিতে নয়, পুলিশ আগুন নেভাচ্ছিলো। এই ভিডিওটি প্রকাশ করেছে ‘আল-জাজিরা’, আমাদের নম্রভদ্র সুশীল ,মিডিয়া এটি পেলোনা কেন? একটি বিদেশী মিডিয়া এটি পেলো কি করে? যারা দেশে বিদেশী মিডিয়াবন্ধের জন্যে আন্দোলন করছেন, এঘটনা প্রমান করে, বিদেশী মিডিয়ার প্রয়োজন আছে। দেশি মিডিয়াকে বিদেশী মিডিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করে যোগ্যতার বিচারেই টিকে থাকতে হবে। ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের স্বার্থে ভারতীয় ম্যুভি আমদানী বন্ধ হয়ে যায়। পঞ্চাশ বছর পর আমাদের চলচ্চিত্রের দুর্দশার কথা আর নাইবা তুললাম। বিশ্ব ছোট হয়ে গেছে, সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে কিছু হবেনা, বাংলাদেশকে প্রতিটিক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা করে মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে এগিয়ে যেতে হবে।

সাঈদীর ছেলে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দেন বা জামাত পিতার সন্তান হয় ছাত্রলীগের সভাপতি, তখন চেতনার বড়াই করে লাভ নাই! মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামে আছে, কামে নাই। কারো দোষ দিয়ে লাভ নেই, দায় সকলের। আমরা সবাই মিলে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি, তাও বলা যায়না, আমরা চাইনি। আমরা বিজয় চেয়েছি, চেতনা চাইনি। হয়তো এজন্যে এখন বিজয় আছে, চেতনা নেই! আবার দেখলামপ্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম অন্য এক চেতনার কথা বললেন। তিনি বললেন, পর্ণ-সাইটে প্রবেশকারীদের নামধাম প্রকাশ করা হবে। ভাবলাম, এ কেমন চেতনা? ভাগ্য ভালো, চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই আবার তারানা হালিম বলেছেন, তিনি ওকথা বলেননি। এও বললেন, প্রশ্নই ওঠেনা, টেকনিক্যালিও সম্ভব নয়। আসলে আমাদের দেশে বহুবিধ চেতনা আছে, শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছাড়া! কেউ কি কখনো ভেবেছেন, যারাজিন্নাহ্কে খুশি মনে ‘জাতির পিতা’ মানতে অতিশয় উৎসাহী ছিলেন, তাদের কেন বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা মানতে এতটা আপত্তি? এটাও চেতনা, তবে ভিন্নধর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।  সম্ভবত: এই চেতনা দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে?

শিতাংশু গুহ, কলাম লেখক।

নিউইয়র্ক। ২৩শে ডিসেম্বর ২০১৬।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here