নারীর মার্জিত লুক কি শুধু হিজাবেই! 'মার্জিত রঙের হিজাব যা আপনাকে দেবে মার্জিত লুক, পাশাপাশি আপনার ব্যক্তিত্বকে আরো প্রস্ফুটিত করবে'- এটা একটি বিজ্ঞাপনের কথা

0
286

– নাসরীন রহমান

‘মার্জিত রঙের হিজাব যা আপনাকে দেবে মার্জিত লুক, পাশাপাশি আপনার ব্যক্তিত্বকে আরো প্রস্ফুটিত করবে’- এটা একটি বিজ্ঞাপনের কথা।
হিজাব ছাড়া কি নারীর মার্জিত লুক সম্ভব নয়? পুঁজিবাদ তার ব্যবসার
স্বার্থে নারীকে করে তুলেছে পণ্য!!
হিজাব নারীকে মার্জিত লুক দিবে? তবে সাথে সাথে এই প্রশ্নও এসে যায়
হিজাব ছাড়া কি নারীর মার্জিত লুক সম্ভব নয়?

আসল কথা ব্যবসা! এই ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে হিজাবকে নারীর মার্জিত লুক এর ধারণার সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন এবং এই ধারণা সমাজের অনেকেই পোষণ করেন।
যেই ধারণা থেকে সমাজের এই অংশ বেরিয়েও আসতে পারে না আর এটাই পুঁজিবাদের লাভ! দুঃখজনকভাবে এর মাসুল দিতে হচ্ছে নারীকেই। কারণ এসব প্রচারের পক্ষে সমাজে একাংশের ভেতর এই ধারণা প্রবল হচ্ছে যে, হিজাবধারী নারীরা মার্জিত এবং এর বিপ

বাংলাদেশের তিন অনূকরণীয় নারী বেগম রোকেয়া, নুর জাহান বেগমও বেগম সুফিয়া কামাল
বাংলাদেশের তিন অনূকরণীয় মহান নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, নুর জাহান বেগও বেগম সুফিয়া কামাল

রীতে যারা তারা বোধ করি ততটা মার্জিত নন বা নারীকে মার্জিত হতে হলে হিজাব পরিধান আবশ্যক! অর্থ্যাৎ হিজাবকে নারীর মার্জিত লুক এর মানদণ্ড করা হচ্ছে! কিন্তু এটা যে কতটা অসাড় বক্তব্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নারী-পুরুষ সকলের মার্জিত রুপটি প্রকাশিত হয় তাদের ব্যক্তিত্বে। সঠিক ব্যক্তিত্ব গঠনের মাধ্যমেই নারী বা পুরুষ তাদের মার্জিত রুপটি প্রকাশিত করতে পারেন অন্যথায় নয়। সঠিক ব্যক্তিত্ব গঠন হয় সৎ গুণাবলীর সমাবেশে; পোশাক সেখানে মূখ্য নয়।

আমরা যদি বেগম রোকেয়ার ছবিটির দিকে দেখি, তাহলে দেখবো তার সেই ছবিটিতে তিনি হিজাব পরেননি; তাতে কি তার মার্জিত রুপটি প্রকাশ কোথাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে? বেগম রোকেয়ার নামটি এই কারণে উচ্চারণ করা যে, প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাধারার অনেকেই আজকের নারীবাদীদের জব্দ করতে বেগম রোকেয়ার উদাহরণ টানেন। বেগম রোকেয়া তার সময় থেকে এগিয়ে ছিলেন, চিন্তায়, চেতনায়, কর্মে। তবে আজকের নারীদের কেন পদে পদে বাধা? কেন নারীকে মর্যাদার মোড়কে ঢাকার কথা বলে অন্তরালে অমর্যাদার আয়োজন চলে? আমার এই
কথাগুলো বলার অর্থ এই নয় যে, হিজাবের বিপক্ষে আমার অবস্থান। কার্যত নির্মোহ অবস্থানে থেকে এই প্রশ্নটিই আমার, হিজাবকে কেন নারীর মার্জিত লুক এর ধারণার মানদণ্ড করা হবে? আজকাল অনেক স্কুল, কলেজগামী মেয়েদের দেখা যায় হিজাব পরতে; ধর্মের অনুশাসন মেনে সকলে পরেন তাই কি?

এও শোনা যায় ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবেও হিজাব পরেন অনেক মেয়েরাই। এবং পুঁজিবাদ ‘মার্জিত লুক’ এই ধারণার মোড়কে এই ফ্যাশন চালু করতে পেরেছে বলে আজ তাই হিজাবের এত জয় জয়কার! কারণ মার্জিত লুক কে না চায়! বিশেষত আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যেখানে নারীকে চলনে-বলনে নত রূপটি দেখতে ইচ্ছুক!

আমি প্রায়শই আমার বিভিন্ন লেখায় এই বিষয়ের উল্লেখ করি যে, নারীদের প্রথমত উপলব্দি করতে হবে কোথায় তাদের অমর্যাদা, কোথায় তাদের অধিকারের প্রশ্ন?

এটা আল্লাহর হুকুম মানার ‘হিজাব’ নাকি স্টাইল ?
এটা আল্লাহর হুকুম মানার ‘হিজাব’ নাকি স্টাইল ?

হিজাব নারীকে ঘোরটোপে আটকে রেখেছে তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয় বা কেউ স্বেচ্ছায় হিজাব বেছে নিলে তার বিপক্ষে বলাও আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। হিজাব পরলেই কেউ শৃঙ্খলিত হয়ে যাচ্ছেন তাও নয়। পোশাক কখনো নারীর চিন্তা, চেতনা বা নারীর অধিকারের মানদণ্ড নয়। নারী মুক্তির চেতনা নারী ধারণ করেন তার মেধা, মননে। আমার আক্ষেপ এখানেই যে পুঁজিবাদ তার স্বার্থে কিভাবে নারীর মার্জিত লুক এর ধারণাটিকে ব্যবহার করছে! এই বিজ্ঞাপনে হিজাবের প্রচারনার পেছনে কতটা ধর্মীয় দিক থেকে প্রচারণা আর কতটা ব্যবসায়িক দিক থেকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আজ মধ্যবয়সী নারীরাই শুধু নয় বাংলাদেশে কিশোরী, তরুণীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিজাব পরিহিতা দেখা যাচ্ছে। তারা ‘মার্জিত লুক’ এর জন্য পরছেন? হিজাব পরিধান করলে যদি নারীর মার্জিত রূপের বহিঃপ্রকাশ হয়, এই ধারণা সমাজে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তবে আশঙ্কা হচ্ছে সত্যিই দুর্ভোগ তা নারীর জন্য! হিজাব
কোনও অবস্থাতেই নারীর মার্জিত লুক এর মানদণ্ড নয়।

আমি আমার এই লেখায় শুরুতে বেগম রোকেয়ার নাম উল্লেখ করেছি; যে সমস্ত মহীয়সী নারীরা বাংলাদেশে তাদের চিন্তায়, চেতনায়, কর্মে স্মরণীয় হয়ে আছেন তারা কি সকলে হিজাব পরতেন? বেগম সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, বেগম নুরজাহান আরও কত নাম …… হিজাব ছাড়াই তারা তাদের চিন্তা, চেতনা, কর্মের জন্য শ্রদ্ধার আসনে বসে আছেন বাঙালির মননে। হিজাব ছাড়া তাদের লুক বাধাগ্রস্ত করেনি মর্যাদার আসনে তাদের আসীন করতে। ৭০, ৮০, ৯০ দশকে এই বাংলদেশের নারী, তরুণীরা কি এত উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় হিজাব পরতেন? না, হিজাবের এত প্রচলন তখন ছিল না। কিন্তু তাই বলে নারীরা অমার্জিতও ছিলেন না।
আসলে হিজাব কে এখন ফ্যাশন বা ট্রেন্ড হিসেবে নেওয়া হয়েছে আর তাতে মূলত লাভ পুঁজিবাদের, ব্যাবসায়ীদের। ধর্মান্ধরা তাতে বাড়তি বাতাস দেয়। আর ক্ষতি যা হবার তা হয় নারীর, যেহেতু এই সমাজে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপক প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘হিজাব নারীকে মার্জিত লুক দিবে’!

লেখক : গল্পকার ও কলাম লেখক
-পরিবর্তন ডটকমের সৌজন্যে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here