পূর্নিমায় রুপালি তাজমহল, ভোরের আলোয় গোলাপি

0
200
চাঁদের আলোয় তাজমহল। ছবি-সংগৃহীত
চাঁদের আলোয় তাজমহল। ছবি-সংগৃহীত

তাজমহল! সকাল থেকে একটা ঘোর লেগে ছিল মনে। সেই তাজের সাথে আজ হবে দেখা। শত যুবার প্রতিজনের মনেই ছিল অদ্ভুত এক অনুভূতি। কেউ পরেছিল বিশেষ পোশাক, কারও সাজ ছিল অন্যদিনের চেয়ে একদম আলাদা। শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও এনেছিল পাঞ্জাবি-শার্ট শুধু এই দিন পরবে বলে। ইন্ডিয়ান হাই কমিশনের আয়োজনে ভারত সফরে মাননীয় রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাতের পর ২য় বড় পাওয়া ছিল এটি।

ছোটবেলা থেকে কতবার কতভাবে শুনেছি তাজের গল্প। কেউ বলেছে এটি ভালোবাসার নিদর্শন আবার কেউ বলেছে সম্রাটের খ্যাতি পাওয়ার লিপ্সা। কেউ বলেছে, চাঁদের গায়ে খুঁত আছে কিন্তু তাজের গায়ে নেই। কেউ বলেছে, এর কারিগর নিজ হাতেই মূল হল ঘরের ছাদে ছোট্ট ফুটো করেছিলেন , যখন তিনি জানতে পারেন সম্রাট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সব কারিগরের হাত কেটে ফেলার। এক তাজ, তাকে নিয়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র গল্প, আছে নানান রকম জনশ্রুতি যার কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা আজ বোধ হয় আর নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

দিল্লীতে তখন ভোর। ৭টায় আমাদের বাস। কুয়াশা মোড়া দিল্লী থেকে কুয়াশার ভারী চাদর জড়িয়েই শুরু হল আমাদের যাত্রা। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না বলতে গেলে। শীতে জবুথবু আমরা সবাই, কিন্তু মনে উত্তেজনা। এর মাঝেই বাসে শুরু হল গান। সবার মনেই বাজছে প্রেমের সুর, তার আমেজ ছিল গানে-গানের কথায়।

বাস থেকে নেমে ব্যাটারি চালিত গাড়িতে উঠলাম আমরা। নামলাম তাজমহলের গেটে। আর খানিক এগিয়েই দেখা মিলবে এই অনন্য স্থাপত্যের। সারিবদ্ধ হয়ে প্রবেশের আগে আমাদের পরিয়ে দেওয়া হল কাপড়ের জুতা। এখানেই পরিচয় হল লম্বা সুদর্শন যুবক সুশান্ত গোরের সাথে। ট্যুরিস্ট পুলিশের আগ্রা তাজমহল এলাকার ইনচার্জ তিনি। দায়িত্বরত আছেন ৫ বছর যাবত। তাজমহলের প্রেমে মত্ত তিনি। তাজের প্রতিটি পাথরের পেছনের গল্প জানেন, বলতে ভালবাসেন।

একই নকশার ৫ দিক। ছবি- সংগৃহীত

তাজমহলের করিডোরেই সুশান্ত দেখালেন এক নকশার ৫ দিক। করিডোরে তাকালে যে কোন দর্শনার্থী দেখতে পাবেন ৪ পাতার ফুল কাটা নকশা। কিন্তু এই নকশার আছে ৫টি অ্যাঙ্গেল। ৫ দিক থেকে খেয়াল করলে দেখা যায় নকশাটি কখনো ফুলের, কখনো পাতার, কখনো চৌকো তারার, কখনো ঢেউয়ের মত আর কখনো চতর্ভূজের। গর্বের সাথে জ্যামিতিক এই নকশা ব্যাখ্যা করলেন তিনি। ইংরেজি হিন্দী মিলিয়ে বললেন, তাজের প্রতি কোণায় আছে গণিত। এক টুকরো পাথরও হিসেবের বাইরে বসানো হয়নি এখানে।

সম্রাট শাহজাহান এবং সম্রাজ্ঞী মমতাজের সমাধি। ছবি- নূর ই প্রতীক

সমাধি ঘরের দিকে যেতে হলে পেরোতে হয় ছোট্ট একটি সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির কোণায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে মূল গম্বুজের নিচে খচিত আয়নার কাজ। এখানে প্রতি পূর্ণিমায় চাঁদ ভেসে ওঠে অপরূপ মহিমায়।

গ্রেট গেট। ছবি- অনিন্দিতা রায়

তাজমহলের বিভিন্ন অংশে কোরআনের আয়াত ব্যবহার করা হয়েছে নকশা হিসেবে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া তথ্য মতে, ইরানের ক্যালিগ্রাফার আব্দ-উল-হক ১৬০৯ সালে ইরান থেকে ইন্ডিয়া আসেন। তিনিই নির্বাচন করেছিলেন কোরআনের আয়াতগুলি। চোখ ধাঁধানো চারুশিল্পের জন্য সম্রাট শাহ জাহান তার নাম দেন আমানত খান। গ্রেট গেটে তিনি যে আয়াতটি লিখেছিলেন তার অর্থ হল- “হে পবিত্র প্রাণ, তুমি শিল্পে বিশ্রাম নাও, শান্তির সঙ্গে ফিরে এসো সৃষ্টিকর্তার কাছে, আর তিনি শান্তির সঙ্গেই আছেন।”

আয়াতগুলো লেখা হয়েছে সাদা মার্বেলের স্তম্ভে কালো মার্বেল ব্যবহার করে। চোখের সমতল থেকে যত উপরে উঠেছে লেখা হয়েছে তত বড়, যাতে নীচ থেকে দেখলেও একই আকার মনে হয় এবং পড়তে অসুবিধা না হয়। কবরের স্মৃতিস্তম্ভের ক্যালিগ্রাফি আরও নিখুঁত এবং চমৎকার।

চলছে মেরামত কাজ। ছবি- মারিয়া গোমেজ

তাজমহলের জায়গাটি সম্রাটের নিজের ছিল না! ছিল মহারাজা জয় সিং এর। আগ্রার মাঝামাঝিতে বিশাল একটি প্রাসাদ নির্মাণ করে দেওয়ার বদলে এই জায়গাটি নেন সম্রাট। তাজমহলের কাজ শুরু হয় সমাধির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে। প্রায় ৩ একর জায়গাকে খনন করে তাতে আলগা মাটি ফেলা হয় নদীর ক্ষরণ কমানোর জন্য। সম্পূর্ণ এলাকাকে নদীর পাড় থেকে প্রায় ৫০ মিটার উঁচু করা হয়। তাজমহল ৫৫ মিটার দীর্ঘ। সমাধিটি নিজে ব্যাসে ১৮ মিটার এবং উচ্চতায় ২৪ মিটার। কথিত আছে নির্মাণের সময় যমুনার পানি রোধ করার জন্য জটিল এবং বিশাল বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে এই বেষ্টনী সরানোই অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিল। অন্তত ১ বছর লেগে যাবে এই কাজে বলে মনে হচ্ছিল। কথিত আছে, সম্রাট তখন ঘোষণা করেন যে কেউ বেষ্টনীর ইট নিয়ে যেতে পারবে। এক রাতের মাঝেই কৃষক, মজুর সবাই মিলে সরিয়ে ফেলে বেষ্টনীর সব ইট!

তাজের গায়ে করা হয়েছে এমনই সুক্ষ্ণ নকশা। ছবি- নূর ই প্রতীক

তাজমহলের সাথে একই সমান্তরালে পশ্চিমে নির্মিত হয়েছে একটি মসজিদ আর পূর্বে জওয়াব। জওয়াব মানে উত্তর। এই ভবনটি মূলত ব্যবহৃত হত গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের আতিথেয়তা এবং আবাসনের কাজে। নকশার ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনেই এর নির্মাণ। দেখতে হুবহু মসজিদের মত হলেও নামাজ পড়ার জন্য কোন নকশা কাটা নেই এর মেঝেতে। আর নেই মেহরাব!

তাজমহলে ঘুরতে ঘুরতে জানা গেল আরও অনেক মজার তথ্য। ২২ বছর লেগেছিল তাজ তৈরিতে। তাই গুনে গুনে ২২ টি মিনার আছে এর। সে সময়ের স্থাপনায় প্রেরণা নেওয়া হত ভিন্ন ধর্মের শিল্পনিদর্শন থেকেও। শিল্পের অধিপতি শিল্পী, তার কোন জাত নেই- এমনটিই মানা হত। তাজমহলের প্রধাণ গম্বুজের চূড়াটিতে তাই হিন্দু-মুসলিম উভয় ঘরাণার নিদর্শন নেওয়া হয়েছে। এই চূড়াটিই পারস্যদেশীয় এবং হিন্দুদের শোভাবর্ধক উপাদানের মিলনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। চূড়ার উপরের অংশে আছে একটি চাঁদ, যা ইসলামিক উপাদান এবং চূড়ার শিং তাক করা আছে স্বর্গ বা বেহেস্তের দিকে। বড় গম্বুজের উপর চূড়ার চাঁদ এবং তাক করা শিং মিলে একটি ঐতিহ্যবাহী চিহ্নের আকার ধারণ করে, যা হিন্দু দেবতা শিব এর চিহ্নের মত। চূড়াটি ছিল স্বর্ণের।

জটিল জ্যামিতিক নকশার সাথে রঙের সুক্ষ্ণ কাজও দেখতে পাবেন তাজমহলে। ছবি- অনিন্দিতা রায়

ওস্তাদ আহমেদ লহরী ছিলেন তাজমহলের প্রধান স্থাপত্যশিল্পী। তাজের পর তিনি নির্মাণ করেন লাল কেল্লা। তাই বলা যায়, তাজ নির্মাণশিল্পীদের হাত কেটে দেওয়ার কাহিনী প্রকৃতপক্ষে সত্য নয়। শাহ জাহান বরং শিল্পীদের যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন এবং পরবর্তী নির্মাণের দায়িত্বও আরোপ করেছেন।

যে কোন যুদ্ধ বা সহিংসতায় তাজকে রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন ভারত সরকার। বিংশ শতাব্দীতে একবার বোম্বারদের বিভ্রান্ত করতে বাঁশের মাচায় ঢেকে দেওয়া হয় তাজকে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আবার এর পরের ৯/১১ এর সময়েও বিশাল সবুজ আচ্ছাদনে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল এই স্থাপত্যটিকে।

যমুনা নদীর প্রবাহকে মোকাবেলা করে নির্মিত হয়েছিল তাজ। ছবি- সংগৃহীত

তাজের নির্মাণ খুবই বৈজ্ঞানিক। এর চারদিকের চারটি বড় মিনার মূল বেদীর বাইরে নির্মাণ করা হয়েছে। যাতে ভূমিকম্প বা কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে এরা ভেঙে পড়লেও তাজের ওপর না পড়ে। বরং হেলে পড়ে তাজের গন্ডির বাইরে। যমুনা নদী না থাকলে আরও অনেক আগেই তাজের কাজ শেষ হয়ে যেত। কিন্তু স্রোতস্বিনী নদীর সব প্রতিবাদ তুচ্ছ করে সেই সময়ে নির্মাণ হয়েছে তাজ, গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে আজও। তাজমহলের সামনের কৃত্রিম ঝর্ণায় ব্যবহার হয়েছে বিশেষ প্রযুক্তি যাতে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

এত চমৎকার স্থাপনা, খরচটাও নিশ্চয়ই হয়েছে প্রচুর! ঠিক তাই। সে সময়ের হিসেবে তাজ নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৩২ মিলিয়ন রুপি। যার বর্তমান মূল্যমান ১,০৬২,৮৩৪,০৯৮ ইউএস ডলার।

মজার ব্যাপার কি জানেন? পিসি সরকার জুনিয়র ২০০২ সালে উধাও করে দিয়েছলেন তাজমহল! না, সত্যিই উধাও হয় নি তাজ। পিসি সরকার ব্যবহার করেছিলেন অপটিকাল ইলুশ্যন। তার এই কাজটি কী ছিল, যাদু নাকি বিজ্ঞান? এমন প্রশ্নের উত্তরে পিসি সরকার বলেন, ‘আজকে যা যাদু, কালক্রমে তাই পরিণত হয় বিজ্ঞানে!’

তাজমহল কুতুব মিনারের চাইতেও ৫ ফুট দীর্ঘ। অন্যান্য বিখ্যাত স্থাপনার সাথে এর উচ্চতার তারতম্য দেখুন ছবিতে-

ছবি- সংগৃহীত

তাজের রং বদলায় দিনের রঙের সাথে মিলিয়ে। ভোরে এর রং হয় হালকা গোলাপি, দুপুরে দুধের মত সাদা আর চাঁদের আলোয় রুপালি। তাজের প্রকৃত রং এখন আর নেই। বায়ুদূষণের কারণে এর মার্বেলগুলো হলদেটে হয়ে গেছে। তাই আলোর প্রতিফলন কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। তবু আপনার যদি সৌভাগ্য হয় তাজের কাছে দিনযাপনের আর সে সময় যদি থাকে পূর্নিমা তাহলে জাদুকরি এই রং বদল দেখতে পাবেন নিজের চোখেই। এর কারণ আর কিছু নয়। ঝকঝকে সাদা মার্বেল পাথর।

প্রবেশ ফটক থেকে। ছবি- সংগৃহীত

তাজের নির্মানে ব্যবহৃত হয়েছে কিছু অপটিকাল ট্রিক। আপনি তাজের যত কাছে যেতে থাকবেন তত ছোট লাগবে তাকে। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার সময় যখন পেছন ফিরে তাকাবেন দেখবেন তার বিশাল মূর্তি। বিষয়টা যেন এমন যে আপনি তাজকে নিয়ে যাচ্ছেন হৃদয়ে করে, সে আছে আপনার খুব কাছেই।

সূত্র- স্কুপহুপ, উইকিপিডিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here