শেখ হাসিনা এখন জিয়া-এরশাদ-খালেদার অসমাপ্ত দায়িত্ব পালন করছেন

pm-alwc-1
নতুন বছরের সালতামামি শুরু এমপি লিটন হত্যার ঘটনা দিয়ে। আজ বঙ্গভবন থেকে দ্রুত অপরাধীদের ধরতে স্কাইপে প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এরূপ নির্দেশের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু কেবলমাত্র দলের এমপি হত্যায় এ উদ্যোগ কেন। গতবছর যখন এই সাংসদ মদ্যপ অবস্থায় একটি গরীব ছেলের ওপর গুলি করে তখন কেন উদ্যোগ দেখা গেলনা। আজও তনু ও আফসানা হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। তাদের পিতা-মাতা আজও জানতে পারলো না তাদের মেয়ের অপরাধী কারা। ঘটনায় সমস্ত দেশ আন্দোলনে উত্তাল হলো, অথচ প্রধানমন্ত্রীর কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। নাসিরনগরে সংখ্যালঘু এবং গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর একাত্তরের কায়দায় আক্রমণ হলো। মিথ্যা অভিযোগ গ্রেফতারকৃত রসরাজ নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া সত্বে কেন ছাড়া পাচ্ছে না। ঘটনায় দলের নেতাকর্মী, মন্ত্রী-এমপিরা জড়িত। অভিযোগ টিভি, গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার কর্মীদের তথ্যে বেরিয়ে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কোন উদ্যোগ দেখা যায়না। বছরব্যাপী সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের কত ঘটনা ঘটে গেল। কোথাও সামান্যতম সমবেদনা জানাতে দেখা যায়নি। মদ্যপ সাংসদ, খুনী, ধর্ষক যুবলীগ, ছাত্রলীগের প্রতি মনবেদনা ঠিকই দেখা যায়। তাহলে তিনি কি কেবল দলের এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রধানমন্ত্রী?

গত সপ্তাহে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলাম, শেখ হাসিনা এখন গরবাচভ ও ইয়েলথসিনের ভূমিকা পালন করছেন। অর্থাৎ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মুখোশ পরে জামাত ও হেফাজতের কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছেন। তাই তার এরূপ একমূখীন ভূমিকা। বলাবাহুল্য, তিনি যে দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রী সে দলের একটি দায়বদ্ধতা আছে। সেটা হলো মুক্তিযুদ্ধের দায়বদ্ধতা। তিনি সে দায়বদ্ধতার বরখেলাপ করছেন। কিছু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে চাপে পড়ে। ৭২-এর সংবিধান, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, বিসমিল্লাহ যাতে যথাযথ অবস্থায় থাকে সেপথ আরো পাকাপোক্ত করেছেন। আগামী প্রজন্ম ৫০ বছরেও তার পরিবর্তন করতে পারবেনা। রাষ্ট্রধর্ম ও জামাত নিষিদ্ধ করার কোন ইচ্ছে নেই একথা দলের সেক্রেটারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। এই দাবিগুলো বাস্তবায়ন করবেন এই ওয়াদা করেইতো ক্ষমতায় এসেছিলেন। দাবিগুলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বাংলাদেশের জনগণের দাবি। প্রধানমন্ত্রী তা করেননি। উপরন্তু দাবিগুলো যাতে বাস্তবায়ন বা পুনর্বহাল না হয় তার সকল ব্যবস্থা ঠিকই করেছেন। যদি তাই হয় জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ার মাঝে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার পার্থক্য কোথায়? তারপরও শেখ হাসিনা আগামীতে দাবিগুলো পূরণ করবেন এমন আশা বা আস্থা স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির রাখার কোন যুক্তি আছে? ৯৬ সালে দাবিগুলো যখন উত্থাপিত হয়েছে, বলা হয়েছে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে সরকার গঠিত। সরকারের ক্ষমতা সীমিত। ২০০৮ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এবারতো ৯৬ সালের অজুহাত ধুপে টেকে না। সুতরাং আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রতি স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির আর দুর্বলতা রাখার কারণ আছে কি? এখনও যাদের দুর্বলতা রয়েছে, তরা হয় অন্ধ, স্বার্থপর অথবা মুক্তিযুদ্ধের নীতি আদর্শচ্যুত। শেখ হাসিনা এখন মুক্তিযুদ্ধের নীতি আদর্শচ্যুতি ঢাকতে উন্নয়নের ডামাঢোল দিয়ে ছাপিয়ে রাখতে অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। সে উন্নয়নও ক্ষমতা ধরে রাখার সংকীর্ণ স্বার্থে লুটেরাদের প্রয়োজনে। প্রতিটি প্রকল্পে যেভাবে পুকুর নয় সাগরচুরি হচ্ছে একেবারে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের পরিপন্থী।

এখানেই শেষ নয় ইতিমধ্যে বিগত বছরগুলোতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছেন। কার্যকর করেছেন। আরো অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে। হলি আর্টিজানের ঘটনার পর অভিযোগ উঠেছে দেশে বাঙালি কৃষ্টি-সংস্কৃতির অনুপস্থিতিতে এসব ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দাবি উঠেছে স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় সর্বত্র সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি করার। প্রধানমন্ত্রী তা না করে ঘোষণা দিয়েছেন, প্রতিটি জেলা উপজেলায় একটি করে ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্র ও আধুনিক মসজিদ নির্মিত হবে। মাদ্রাসাগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ানো হয়না। জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়না। জাতীয় পতাকা উত্তোলন হয়না। বরং শেখানো হয় জাতীয় সংগীত হিন্দুর লেখা। গান গাওয়া হারাম। সেখানে মওদুদী ও সাঈদীর বই পড়ানো হয়। এসব বন্ধ করার দাবি সত্বে সরকার কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়না। অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মৌলবাদী ধ্যান-ধারণার প্রসার বন্ধে পরিকল্পিত সুসষ্ক চক্রান্ত চলছে। এবারের নতুন বইয়ে তার প্রতিফলন স্পষ্ট দেখা গেছে। পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যবই থেকে হুমায়ূন আহমদের একটি কবিতা বাদ দেওয়া হয়েছে মৌলবাদীদের প্রতিবাদের কারণে। অষ্টম শ্রেণীর বই থেকে রামায়ণ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ বাদ দেওয়া হয়েছে হিন্দু ধর্মের এবং সংস্কৃত ভাষার অজুহাত তুলে। প্রশ্ন আসে সংস্কৃত ভাষার অজুহাতে যদি রামায়নের একটি প্রবন্ধ বাদ দিতে হয় তবে বাংলাতো সংস্কৃত ভাষা থেকে আসা। তাহলে বাংলা ভাষাওতো বাদ দিতে হয়। আসলে পাকিস্তান আমলের ন্যায় অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সর্বত্র স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একাজগুলো চলছে। সরকার তার পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে অত্যন্ত সুকৌশলে।

এবার সরকার থারটিফাস্ট নাইট উদ্যাপন করতে দেয়নি। গতবছর থেকে নববর্ষ পালনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। গ্রামেগঞ্জে কোথাও অনুষ্ঠান করতে এমনকি বিজয় দিবস পালনের ক্ষেত্রেও সরকারের অনুমতি নিতে হয়। গানবাজনা, যাত্রা, নাটক, পালাগান এসবতো বন্ধ। এ সপ্তাহে সিলেট দুর্গাকুমার পাঠশালায় নতুন বই বিতরণে গান-বাজনা করায় মৌলবাদীরা আক্রমণ করেছে। একই ঘটনা ঘটেছে উত্তরবঙ্গেও। সরকার এসব ব্যাপারে অনুমতি দেয়না আইনশৃৃঙ্খলার অজুহাত দেখিয়ে। অথচ মৌলবাদীরা ঠিকই তাদের সমাবেশ করে চলেছে। এখনও গ্রামেগঞ্জে মওদুদী ও সাঈদীর ওয়াজ প্রচার হয়। রাস্তাঘাট ও লাইব্রেরীতে তাদের বই পাওয় যায়। এক সময় ঢাকার কাকরাইলে তবলিক জামাতের আস্তানা ছিল। তবলিক জামাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা পাকিস্তান ও আমেকিরার স্বার্থ রক্ষা করে। এখন বাংলাদেশর বিশ^ ইশতেমা বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জমায়েত। সেটি আরো সম্প্রসারিত করে এখন জেলায় জেলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক লিখেছিলেন, মৌলবাদীরা সোয়াত স্টাইলে বাংলাদেশের গ্রাম দখলের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। সে লক্ষ্যে গতবছর তারা ৪০০ গ্রামে তাফসির মাহফিল করেছে। এবছর তাদের টার্গেট ২০ হাজার গ্রামে করার। এসবে সরকারের নিয়ন্ত্রণের কোন আগ্রহ দেখা যায়না। বরং এড়িয়ে থেকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

এমনি অবস্থায় অত্যন্ত স্পষ্ট সরকার স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের প্রতি বিশ^াসঘাতকতা করছে। আরো স্পষ্ট করে বললে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত কাজগুলোই করে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা অত্যন্ত জরুরী। এই অবস্থা থেকে বর্তমান সরকার ও ও প্রধানমন্ত্রীকে যদি নিরস্ত্র না করা যায় ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের সকল ব্যাপারগুলো সীমিত হয়ে আসাবে। এবং এক পর্যায় আমাদের তথা স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যেতে বাধ্য। এই মুহূর্তে উচিত স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির ঐক্যবদ্ধ একটি প্লেটফরম গড়ে তোলা। সেখান থেকে হারানো অর্জনগুলো পুনর্বহালের জোরালো দাবি তোলা। সরকার দাবি না মানলে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র করা। এব্যাপারে যত বিলম্ব হবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তরান্বিত হবে।

– নিউইয়র্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here