ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতিতে মার্কিন অর্থনীতি আরো খারাপ হবে

0
121

115213TRUMP_BUSINESSআন্তর্জাতিক ডেস্ক: মুক্তবাজার নীতি থেকে সরে এসে রক্ষণশীল অর্থনীতি প্রণয়ন করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরির ওপর জোর দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন ও মার্কিন সীমান্তবর্তী মেক্সিকোর সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের আভাস দিয়েছে হোয়াইট হাউস।

তথ্যপ্রমাণ আর বিশ্লেষকদের মতামত বলছে, ট্রাম্পের এই বাণিজ্য যুদ্ধ মার্কিনিদের ভাগ্য বদলাবে না, বরং তা আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। বিশ্ব বাজারে ভয়াবহ টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। এতে বাস্তব সামরিক যুদ্ধের আশঙ্কা বেড়ে যাবে বলেও মনে করছেন কোনও কোনও বিশ্লেষক।

অভিষেক ভাষণে সংরক্ষণশীল নীতির মধ্য দিয়ে আমেরিকানদের ভাগ্য উন্নয়নের স্বপ্নকে সামনে নিয়ে এসেছেন ট্রাম্প। সমাজের ভয়াবহ হতাশাজনক অর্থনৈতিক চিত্রই ট্রাম্পের এই সংরক্ষণশীলতা প্রচারের জমিন তৈরি করেছে। সম্প্রতি হাফিংটন পোস্ট লিখেছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ওবামা তার সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ বলেছিলেন, অথচ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি তেমন কিছুই করেননি। প্রচারণা থেকে অভিষেক বক্তৃতা পর্যন্ত এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপন্নতাকেই পুঁজি করেছেন ট্রাম্প।

বার্কলের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এক হিসাব অনুযায়ী, গত আট বছরে ১ শতাংশ পরিবার এই সময়ে অর্জিত সব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ৫২ শতাংশের সুফল করায়ত্ত করেছে। ২০০৮ এর মন্দার কারণে বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষ যে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, এত দিনে তার দুই-তৃতীয়াংশের কম তা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছেন। সে মন্দার ঝড়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায় এক কোটি মানুষ বসতবাড়ির মালিকানা হারান। এমনকি ২০১৫ সালেও ১১ লাখ পরিবারের ঋণের কারণে বসতবাড়ি নিলামের মুখে ছিল।

শপথ গ্রহণের পর শুক্রবারের অভিষেক ভাষণে নতুন বাণিজ্য কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেন ট্রাম্প। মার্কিন নাগরিকদের চাকরির সুরক্ষার ওপর জোর দেন তিনি। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১২টি দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের সেই অভিষেক ভাষণের পর থেকেই উদ্বেগ শুরু হয় বিশ্ববাজারে। সোমবার বিশ্ববাজারে লেনদেন শুরুর পর থেকেই চীন-ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এর আগের সপ্তাহটি বিশ্ব পুঁজিবাজারের জন্য ছিল ভয়াবহ হতাশার। ব্রিটেনের এফটিএসই ১.২ শতাংশ দরপতন হয়। ডো জোনস-এর দর নেমে যায় ১.১ শতাংশ। নিকির দর ০.৮ এবং সেনস্যাক্স-এর দর ০.৭ শতাংশ নেমে যায়।
ট্রাম্পের বক্তৃতার ধারাবাহিকতায় ২১ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে একটি ‘শক্ত ও ন্যায্য চুক্তি’র কথা বলা হয়।

মার্কিন অর্থনীতির উন্নতি এবং লাখ লাখ মানুষের চাকরি ফিরে পেতে এই চুক্তিকে কাজে লাগাতে চান তিনি। ট্রাম্পের শপথের কিছু সময় পর দেওয়া হোয়াইট হাউসের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, যেসব দেশ বাণিজ্য চুক্তি ভঙ্গ করছে এবং আমেরিকান কর্মীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিষেক বক্তৃতা আর হোয়াইট হাউসের বিবৃতির পরপরই ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সাজুয্য রেখে মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে নাফটা চুক্তি পুনমূল্যায়ন-এর কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। এই প্রতিবেদন তৈরির সময় মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর খবর থেকে নাফটা পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওদিকে ঘোষিত বাণিজ্য নীতির বিপরীতে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে চীন। ট্রাম্পের শপথের আগেই তারো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে বলেছিল তাদের সঙ্গে থাকতে।

এদিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সঙ্গের আসন্ন বৈঠকে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা নিতে পারেন বলে আভাস দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। অন্যান্য ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমও ট্রাম্প-থেরেসা বৈঠককে ‘রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক পরিচালক এবং নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ মনে করেন, যদি বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, ট্রাম্প জিতেও যেতে পারেন! কেননা রফতানির জন্য চীন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যতটা নির্ভরশীল, অন্য কারও ওপর ততটা নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কিন্তু বাণিজ্য যুদ্ধে একজন যতটা জেতে, আরেকজন ততটা হারে না। এতে যুক্তরাষ্ট্রেরও হারানোর আশঙ্কা আছে। চীন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক ব্যথা দেওয়ার প্রতিশোধমূলক নীতিতে অধিক কার্যকর হবে। কথা হচ্ছে, পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে চীন যতটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে, যুক্তরাষ্ট্র ততটা সুবিধাজনক জায়গায় নেই। এটা কি যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে আমজনতা দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে; নাকি চীন, যারা সংকটময় সময় সত্ত্বেও ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে?

কিন্তু ট্রাম্প এক ভিন্ন, অন্তর্মুখী যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলেন, যার একমাত্র লক্ষ্য হবে অভ্যন্তরীণ, বৈদেশিক নীতিসহ সব প্রশ্নে জাতীয় স্বার্থকে তুলে ধরা। অভিষেক ভাষণে ট্রাম্প তাদের কথা মাথায় রেখেই প্রতিশ্রুতি দেন, এত দিন রাজনীতিবিদেরা যাদের ভুলে থেকেছেন এবং উপেক্ষা করেছেন, তারা আর উপেক্ষিত থাকবে না। তবে আসলেই কি তাই হবে?

ট্রাম্পের প্রশাসনে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় তা বলে না। জনগণের কাছে ক্ষমতার দায়বদ্ধতা স্বীকার করে জনমুখী শাসনব্যবস্থার ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প। তবে ইন্টারসেপ্টের অসমর্থিত সূত্রের খবর, মনোনীত অর্থমন্ত্রীসহ ট্রাম্প প্রশাসনের অনন্ত ছয়জন ব্যক্তি ডেমোক্র্যাট ঘনিষ্ঠ গোল্ডম্যান সাসেক্স থেকে নিয়োগ পেয়েছেন। স্বভাবতই ক্ষমতাওয়ালারা ছাড়া অন্য কারও প্রতি নজর থাকবে না তাদের।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার অর্থমন্ত্রী হিসেবে স্টিভেন মুচিন-এর স্পষ্ট অগ্রাধিকারগুলোর একটি হচ্ছে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে বিনিয়োগ রয়েছে তাদের ওপর থেকে ট্যাক্স কমিয়ে আনা। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এর ফলে যেন তারা নিজেদের মুনাফা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনে। দৃশ্যত, এর মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের চাকরির সুযোগ তৈরিতে সেখানে বিনিয়োগের জন্য ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু কর্পোরেশনগুলো এরইমধ্যে তাদের বিনিয়োগকারীদের বলেছে, নিজেদের অভাবনীয় মুনাফাকে তারা লভ্যাংশ বাড়ানোর উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। আরও মার্কিন নাগরিকদের চাকরি দিতে তারা আগ্রহী নয়।

পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস, ভারতের প্রধান নির্বাহী অজয় বোদ একে শুভঙ্করের ফাঁকি বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে এই জিত জিত খেলা চলতে থাকলে তা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াতে পারে। ’ ইটিএলমার্কেট.কম নামের সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত ও অন্যান্য মৌলিক শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী দল অ্যালায়েন্স ফর আমেরিকান ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের প্রেসিডেন্ট স্কট পলও মনে করেন, এ পরিস্থিতিকে সহজেই বাণিজ্য যুদ্ধ বলা চলে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ মনের করেন, “ট্রাম্প উন্নত মানের অবকাঠামো নির্মাণ, প্রতিরক্ষা খাতে উচ্চ শুল্কছাড় এবং উচ্চ মাত্রায় বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাকে জাদুবিদ্যার অর্থনীতিই বলতে হবে। ” স্টিগলিৎজের মতে, ট্রাম্প রিগ্যান আমলের পশ্চাৎপদ অর্থনীতিকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন। তবে ট্রাম্প তার অর্থনীতিতে আরও দুটি মারাত্মক অস্ত্র যুক্ত করেছেন – চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ছিনিয়ে নেওয়া। স্টিগলিৎজের দাবি, ট্রাম্প যে ক্ষুব্ধ মার্কিনিদের ভোটে জয়ী হয়েছেন, তারাও তার ওই আগ্রাসী অর্থনীতির শিকার হবেন। ট্রাম্প ওই ভোটারদের ক্ষোভকে ব্যবহার করেছেন বলে উল্লেখ করেন এই খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ।

এমআইটি’র সিমন জনসন-ও স্টিগলিৎজের মতো একই উপসংহার টেনেছেন। ট্রাম্পের অর্থনীতির প্রতিফলন দেখা গেছে তার গঠিত মন্ত্রিপরিষদে। এ প্রসঙ্গে জনসন বলেন, এটা বিস্ময়করভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে ওলিগারকি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শাসনের দিকে। যেখানে রাষ্ট্র ও জনগণের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করে শক্তিশালী রক্ষণশীল অর্থনীতির ফলে উচ্চ বেতনের ব্যক্তিদের চাকরি হারানো সংখ্যাটাও মাত্রাতিরিক্ত বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন জনসন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here