জননেতা পীর হবিবের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্বাঞ্জলি

0
405

।। সুব্রত বিশ্বাস ।।
4444549763দুনিয়াব্যাপী সাম্যবাদ আর সমাজতন্ত্রের উত্তাল তরঙ্গ, বিশ্ব যুবসমাজ পরিবর্তনের উদ্বেল জোয়ারে আন্দোলিত। এমনই এক সন্ধিক্ষণে ১৯২৭ সালের ৯ই অক্টোবর সিলেট শহর থেকে মাইল ছয়েক দূরে বাগরখলা নামক গ্রামে এক সম্ম্রান্ত পীর বংশে পীর হবিবুর রহমান জন্মগ্রহন করেন। সেই পীর বংশেরই এক সদস্য জনাব মোহাম্মদ ইয়াহিয়া ছিলেন তাঁর পিতা। মাতার নাম হাসনা বানু। পিতার তিন ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে পীর হবিব ছিলেন বাবার জৈষ্ঠ্য সন্তান। শৈশবে পড়ালেখার জন্য ভর্তি করেছিলেন স্থানীয় জালালপুর জুনিয়র মাদ্রাসায়। জালালপুর মাদ্রাসা থেকে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে এম ই মাদ্রাসা ফাইনাল পরীক্ষায় আসাম প্রদেশের মধ্যে মেধাভিত্তিক ৪র্থ স্থান লাভ করেন। তারপর ভর্তি হন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্র্রাসায়। সেখান থেকে ১৯৪৬ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় আসাম প্রদেশে সপ্তম স্থান অধিকার করেন। বাবা-মা’র ইচ্ছা ছিল মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে ছেলে বড় আলেম হবে। কিন্তু পৃথিবীব্যাপী একদিকে সমাজতন্ত্রের জোয়ার অপরদিকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন। ইতিমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অসংখ্য মানুষের আত্মাহুতি। যুদ্ধের ভয়াবহতা তার কিশোর মনকে দারুনভাবে রেখাপাত করে। মাদ্রাসায় আর মন বসিয়ে রাখতে পারলেন না। আলিয়া পাশ করার পর আধুনিক শিক্ষার ব্রত নিয়ে ভর্তি হলেন সিলেট এমসি কলেজে। জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। ১৯৪৯ সালে এমসি কলেজ থেকে আই এ নির্বাচনী পরীক্ষায় যথারীতি উত্তীর্ণ হয়েও নন-কলেজিয়েট হওয়ার কারণে ফাইনাল পরীক্ষায় বসার সুযোগ পান নি। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার এখানেই সমাপ্তি।

রাজনীতিতে প্রথম জীবনে মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিমের প্রভাবে মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হন। ’৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক ঘটনা প্রবাহ এবং পরবর্তীতে বাঙালিদের প্রতি মুসলিম লীগের বিদ্বেষমূলক আচরণ তাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তখনই তিনি বিরোধী ভূমিকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সাতচল্লিশপূর্ব আসাম প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তাসাদ্দুক আহমদের হাত ধরে প্রগতিশীল রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা। আত্মগোপনকারী কমিউনিষ্টদের অনুপ্রেরণায় গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ৪৮ সালে ইয়থ লীগে যোগ দেন। খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হলে সমাজের আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য সেই লক্ষ্যে ব্রত নিলেন সাম্যবাদের। ১৯৪৮ সালে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য লাভ এবং পার্টির নির্দেশে ’৭৫ সাল পর্যন্ত-অন্য পার্টির মধ্যে কাজ করেন।

মুসলিম লীগ সহ প্রতিত্রিুয়াশীল দলগুলোর ধর্মাশ্রয়ী সাম্প্রদায়িক কর্মকান্ডের অনুসৃত নীতির বিরুদ্ধে নিজেকে একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বের প্রতিভুরূপে প্রতিষ্ঠিত করে তোলেন। ১৯৫০ সালে সমগ্র দেশব্যাপী মুসলিম লীগের গুন্ডাবাহিনী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তান্ডব লীলায় মেতে উঠেছে তখন সিলেটেও তার চরম উস্কানীর সৃষ্টি হয়। পীর হবিব অত্যন্ত দুঃসাহসিকভাবে ৪/৫জন সহকর্মী বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সেদিন সিলেটে মুসলিম লীগের গুন্ডাবাহিনীর দাঙ্গা প্রতিহত করেছিলেন। সমগ্র দেশব্যাপী দাঙ্গা হলেও সিলেটে সেদিন দাঙ্গা হয়নি। প্রথম জীবনের এরূপ দুঃসাহসিক ঘটনায় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিলেন।

১৯৫১ সালে যুবলীগ গঠনে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৫১ সালে প্রশাসনের তীব্র দমননীতির মুখেও দেশের প্রথম অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫১ সালে সিলেট্ থেকে প্রকাশিত সাড়া জাগানো প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মাসিক ’নিশানা’ সম্পাদনা করেন। নিশানার পাতায় তিনি কখনও স্বনামে, কখনো ’নেগাবান’ ছদ্মনামে ’চলতি পথে’, ’ঘটনা¯্রােত’ প্রভৃতি কলামে সমসাময়িক রাজনীতি ও ঘটনার ওপর কলাম লিখতেন। ’নিশানায়’ গল্পও লিখতেন।

১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে সিলেটে ভাষা-আন্দোলনের সূচনা ও পরিচালনায় দায়িত্বশীল সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ৪৮-এর ১১ মার্চ সিলেটে রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও সংগঠক। ১৯৫২ সালে সিলেটের ভাষা-আন্দোলনের সর্বদলীয় কর্ম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। বলাবাহুল্য, পীর হবিবুর রহমানের নেতৃত্বেই সিলেটে ভাষা আন্দোলনের সূচনা ও আন্দোলন গড়ে ওঠে। আজকে অনেকেই ভাষা সৈনিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, সংবর্ধিতও হয়েছেন। অথচ যার হাত ধরে সিলেটে ভাষা আন্দোলনের সূচনা ও পরিপূর্ণতা পেল সেই নির্ভীক প্রচারবিমূখ মানুষটি সম্পর্কে সমাজ ও রাষ্ট্রের সংকীর্ণ ভূমিকা বড়ই লজ্জাস্কর।
সিলেটে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে পীর হবিব ছিলেন অন্যতম। ১৯৫৪’র ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে সিলেটের নির্বাচন পরিচালনা-সাব কমিটির আহ্বায়ক এবং নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। এই সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। জেল থেকে মুক্তিলাভের পর ’৫৬ সালে সিলেট সদর আসনের যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ( এম, পি, এ) নির্বাচিত হন। ’৫৬ সালে তৎকালীন বৃহত্তর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫৪, ১৯৫৮ ও ৬০-এর দশকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাবরণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মগোপন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষক খেতমজুর ও জনগণের মধ্যে কাজ করেন। তারই এক পর্যায় আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ১৯৫৭ সালে কাগমারীতে মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগদান করেন। কাগমারী সম্মেলনের পর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকায় চলে যান। সেই থেকে বেশির ভাগ সময় ঢাকায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

’৬৫ সালে আইয়ূব খানের বিরুদ্ধে ফাতেমা জিন্নাহ’র পক্ষে বিরোধী দলের ডাক গঠিত হলে ডাক-এর আহ্বানে দেশব্যাপী নির্বাচনী কাজে পীর হবিব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

’৬৭ সালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপের পূর্ব পাকিস্তান শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ওই বছরই সিলেট্ জেলা ন্যাপ সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের পর ন্যাপ কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এবং ’৭৭ সালে ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৮ সালে উদীচীর প্রতিষ্ঠালগ্নে অন্যতম উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক।

১৯৬৮ সালে ন্যাপের মাধ্যমে আইয়ূব বিরোধী মোর্চা গঠনে ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে ধৈর্যশীল ও অগ্রণী ভূমিকা পালন এবং সফলতা অর্জন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে দিনরাত শ্রম দিয়েছেন।

১৯৮৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-৩ আসন থেকে আটদলীয় প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (হারুন) ও একতা পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করণে প্রধান উদ্যোক্তা, এন এ পি বা ঐক্য ন্যাপ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন এবং অন্যতম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।

১৯৮৭ সালে এন এ পি’র (ঐক্য-ন্যাপ) সাথে ন্যাপ মোজাফফর) ঐক্য সম্মেলনে ন্যাপকে পুনর্গঠনে মূখ্য ভূমিকা পালন এবং সভাপতিমন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯০ সালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সৎ ও দেশপ্রেমিকদের একটি বিকল্প পার্টি গড়ার লক্ষ্যে গণতন্ত্রী পার্টি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন এবং পরে সভপতি নির্বাচিত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য ঐক্য প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখেন। এ সময় অসুস্থ শরীর নিয়েও বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরী, ভারত প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন।

২০০৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী সোমবার সিলেট শহরে মৃত্যুমুখে পতিত হন।

  • নিউইয়র্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here