গন্তব্য: পুঠিয়া রাজবাড়ি

0
354
অসাধারণ কারুকার্যময় গোবিন্দ মন্দিরের সাথে মিল রয়েছে দিনাজপুরের কান্তজীও মন্দিরের। ছবি: সংগৃহীত।
অসাধারণ কারুকার্যময় গোবিন্দ মন্দিরের সাথে মিল রয়েছে দিনাজপুরের কান্তজীও মন্দিরের। ছবি: সংগৃহীত।

পুঠিয়া রাজবাড়ির অবস্থান রাজশাহী শহর হতে ত্রিশ কিলোমিটার পূর্বে এবং রাজশাহী-নাটোর মহসড়ক হতে মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিণে। রাজবাড়িটি দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এর নকশায় রয়েছে ভিন্নতা। নৃতাত্ত্বিক দিক থেকেও বাড়িটি এবং এর সংলগ্ন স্থাপনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

পুঠিয়া রাজবাড়ি। ছবি- সংগৃহীত
কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ে কিছুক্ষণ পরপরই। ন্যাশনাল, দেশ, হানিফ যেকোন বাসে যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে নন এসি ৪৫০ টাকা এবং এসি ১০০০ টাকা। যেতে সময় লাগে প্রায় ৭ ঘন্টা। ট্রেনেও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে পৌঁছে যাবেন আরও দ্রুত। তবে ৫ দিন আগে থেকে টিকেট ছাড়ে, তাই দ্রুতই নিজের টিকেট নিশ্চিত করতে হবে। ট্রেন থেকে নামতে হবে নাটোরে এবং সেখান থেকে লোকাল যানবাহনে পৌঁছে যাবেন পুঠিয়া। ট্রেনের ভাড়া এসি- নন এসি মিলিয়ে ৩৫০ থেকে ৬৫০ এর মধ্যে।

গোবিন্দ মন্দিরের কারুকাজ। ছবি- সংগৃহীত

কোথায় থাকবেন:

থাকার জন্য বেছে নিতে পারেন পুঠিয়া জেলা পরিষদের ডাক-বাংলো। জেলা পরিষদ থেকে ডাকবাংলোর কক্ষ বরাদ্দ নিতে হবে আগে থেকে। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের ফোন নং ০৭২১-৭৭৬৩৪৮। এছাড়া পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটি বেসরকারী আবাসিক হোটেল রয়েছে।

বড় শিব মন্দির। ছবি- সংগৃহীত

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:
মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে পুঠিয়া রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়কাল ১৫৫৬-১৬০৫ সাল। সে সময় পুঠিয়া লস্করপুর পরগনার অর্ন্তগত ছিল। ১৫৭৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবর এর সুবেদার মানসিংহ বাংলা দখল করার সময় পুঠিয়া এলাকার আফগান জায়গীরদার লস্কর খানের সাথে যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে পুঠিয়া রাজবংশের প্রথম পুরুষ বৎসাচার্য যিনি পুঠিয়ায় একটি আশ্রম পরিচালনা করতেন, তিনি মানসিংহকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করায় লস্কর খান পরাজিত হন। এ জন্য মানসিংহ বৎসাচার্যকে পুঠিয়া এলাকার জমিদারী দান করেন। বৎসাচার্য জমিদারী নিজ নামে না নিয়ে তার পুত্র পীতম্বর এর নামে বন্দোবস্ত নেন।

গোবিন্দ মন্দিরের একাংশ। ছবি- সংগৃহীত

এরপর এই জমিদারী চলতে থাকে সগর্বে বংশপরম্পরা বজায় রেখে। ১৭৪৪ সালে অনুপ নারায়ণের চারপুত্র (নরেন্দ্র, মেদ নারায়ণ, রূপ নারায়ণ ও প্রাণ নারায়ণ) এর মধ্যে রাজ স্টেট বিভক্ত হয়। বড় ভাই নরেন্দ্র নারায়ণের অংশে পাঁচ আনা এবং ছোট তিন ভাই এর অংশে সাড়ে তিন আনা নির্ধারিত হয়। বড় ভাই নরেন্দ্র নারায়ণের অংশ পাঁচ আনি এস্টেট এবং রুপ নারায়ণের অংশ চার আনি এস্টেট নামে পরিচিত। নরেন্দ্র নারায়ণের জ্যেষ্ঠ পুত্র ভুবেন্দ্রনাথ ১৮০৯ সালে রাজা বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। ভুবেন্দ্রনারায়ণের একমাত্র পুত্র জগন্নারায়ণ রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী ভুবনময়ী হরেন্দ্রনারায়ণকে দত্তক নেন। রাজা হরেন্দ্রনারায়নের পুত্র যোগেন্দ্রনারায়ণ মৃত্যুর পূর্বে সকল সম্পত্তি স্ত্রী শরৎসুন্দরীর নামে দিয়ে যান। শরৎসুন্দরী ১৮৬৬ সালে রাজশাহীর গুনাইপাড়ার কেশবকান্ত চক্রবর্তীর পুত্র রজনীকান্তকে দত্তক নিয়ে নাম দেন যতীন্দ্রনারায়ণ। শরৎসুন্দরী শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে প্রচুর দান করতেন। তার অজস্র দান ও নিঃস্বার্থ জনসেবায় মুগ্ধ হয়ে ১৮৭৪ সালে বৃটিশ সরকার তাকে “রাণী” উপাধিতে এবং পরবর্তিতে ১৮৭৭ সালে “মহারাণী” উপাধিতে ভূষিত করেন।
পাঁচ আনি জমিদার বাড়ির একাংশ। ছবি- সংগৃহীত
কুমার যতীন্দ্রনারায়ণ ১৮৮০ সালে ঢাকা জেলার ভূবনমোহন রায়ের কন্যা হেমন্তকুমারী দেবীকে বিয়ে করেন। হেমন্তকুমারী দেবী ১৫ বছর বয়সে ৬ মাসের সন্তান গর্ভে নিয়ে বিধবা হন। তিনি পুঠিয়ার বিরাট রাজ প্রাসাদটি নির্মাণকরে শাশুড়ী মহারানী শরৎসুন্দরী দেবীর শ্রদ্ধায় উৎসর্গ করেন। হেমন্তকুমারী দেবীও
বহুসংখ্যক সৎকাজের জন্য লর্ড কার্জন কর্তৃক ১৯০১ সালে “রাণী” এবং ১৯২০ সালে লর্ড আরউইনের আমলে “মহারাণী” উপাধিতে ভূষিত হন। তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সারাদেশে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে গণজাগরণ ঘটলে ক্রমান্বয়ে পুঠিয়া রাজবংশেরও বিলোপ ঘটে।
দোল মন্দির। ছবি- সংগৃহীত
কী কী দেখবেন:
পুঠিয়া জমিদার বংশ তাদের প্রশাসনিক এবং ধর্মীয় কার্য পরিচালনার জন্য বিভিন্ন স্থাপত্য কাঠামো এবং মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এর প্রতিটিই নির্মাণ শৈলীর দিক থেকে চমৎকার এবং নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। পুঠিয়ায় অবস্থিত অধিকাংশ মন্দিরে পোড়ামাটির ফলক স্থাপিত আছে। এখানকার পুরাকীর্তির মধ্যে পাঁচ আনি রাজবাড়ি বা পুঠিয়া রাজবাড়ি, চার আনি রাজবাড়ি, গোবিন্দ মন্দির, ছোট আহ্নিক মন্দির, ছোট শিব মন্দির, বড় শিব মন্দির, দোল মন্দির, গোপাল মন্দিরসহ মোট ১৩টি মন্দির রয়েছে। পুঠিয়ার প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে ১৪টি স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করেছে। এগুলো একই এলাকার মাঝে কাছাকাছি অবস্থিত। তাই সহজেই ঘুরে ঘুরে দেখতে পারবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here