যুক্তরাষ্ট্রে শ্রেণি সম্পর্ক, শৈশব, বন্ধুত্ব আর মাতৃত্ব

।। সায়েমা খাতুন ।।

কবে কখন বুঝেছি কে বড়লোক আর কে গরিব, জানি না। ভাবিনি কোনদিন। ভাবিনি কোনদিন, এক নিষ্পাপ মানবশিশু কীভাবে জানতে পারে সে গরিব অথবা ধনী, তখন সেই শিশুটির মনে কেমন লাগে। মনে আছে ‘পথের পাঁচালী’র অপু যখন বুঝতে পারে সে আর তার মা কত গরিব, সেই মুহূর্তটি। পাশের কোনো গ্রামে এক নারী তাকে মিষ্টি খেতে দেয়। তার মায়ের বানানো মিষ্টির সাথে এই মিষ্টির ভেদ থেকে সে টের পায়, আসলে তারা খুব গরিব। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় এই অংশটা অপুর মত আমারও চোখ খুলে দিয়েছিল। অপু যেন আমাদের চিরন্তন অমলিন শৈশব।
মনে পড়ে সুদুর শৈশবে এক ধনাঢ্য আত্মীয়ের বাড়িতে আমার বয়েসী এক বাচ্চা খেলতে গিয়ে বলেছিল, আমি এরকম পোশাক পরেছি কেন? তার জমকালো ফ্রকের তুলনায় আমার ফ্রক ছিল নেহায়েত সাদামাটা। সে বুঝতে পেরেছিল। আমিও বুঝেছিলাম। বন্ধুত্ব হারানোর একটা ভয় হয়েছিল। লজ্জিত হয়েছিলাম বন্ধুর চোখে ছোট হয়ে। সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, জমকালো ঢাকা শহরে চোখ-ধাঁধানো ধনীদের পাশে আমার পরিবার খুব সাদামাটা। ধনীদের সমাজে আমি অপাংক্তেয়। ঢাকা শহরের ধনী শিশুরা খুব দ্রুত জেনে যায় তাদের শ্রেণি অবস্থান, আর তুলনায় গরিবদের খুব দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে দেয় সমাজ থেকে।
ই পি থমসন ইংল্যান্ডের প্রথম যুগে শ্রমিক শ্রেণির সৃষ্টি হওয়া (১৭৮০-১৮৩২) সম্পর্কে তাঁর সুবিখ্যাত ‘মেকিং অব ইংলিশ ওয়ার্কিং ক্লাস’ (১৯৬৩) গ্রন্থে শ্রেণি বিশ্লেষণে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ভাবনা নিয়ে আসেন। প্রথাগত মার্কসীয় ধারা থেকে বেরিয়ে এসে দেখান যে, শ্রেণি কেবল কোনো অটল কাঠামো নয়, শ্রেণি একটা চলমান, ঘটমান বর্তমান। শ্রেণি দৈনিক অভিজ্ঞতার ব্যাপার। তাঁর খুব মূল্যবান একটি বক্তব্য হলো : ঈষধংং রং হড়ঃ ধ ঃযরহম, পষধংং রং যধঢ়ঢ়বহরহম. আমরা শ্রেণি অভিজ্ঞতা করি, এবং আমাদের নিজেদের চিন্তা ও কাজের মাধ্যমে শ্রেণি সম্পর্ক প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত সৃষ্টি করি। তার মানে আমরা শ্রেণি সম্পর্ক কায়েমে অংশগ্রহণ করি। শ্রেণি পরিচয়ের চিহ্ন বহন করি। সম্ভবত বেশির ভাগ সময় সে বিষয়ে সজাগ না থেকে।
এখন আমার ৮ বছরের কন্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খুব দ্রুত শ্রেণি বুঝে নিচ্ছে। বিলিয়নেয়ার প্রেসিডেন্টের অতি ধনী দেশে কত যে অতি দরিদ্র মানুষের পরিবার জীবনসংগ্রাম করছে, গ্ল্যামার আচ্ছন্ন মিডিয়া সেটা ঢেকে রেখেছে। এই আমেরিকায় জীবনযাপন করতে এসে আমেরিকারও যে একটা গরিব চেহারা আছে সেটা দেখতে পাই।
আমার মেয়ের থার্ড গ্রেডের ক্লাসে সুন্দর টুকটুকে একটি মেয়ে গ্রেস।
পরী বলে,
– মা ও কান্ট্রি গার্ল!
– সেটা কী মা?
– ও ফার্ম হাউসে ছিল। জানো কীভাবে কথা বলে? একসেন্ট এ রকম, বলে আমাকে গ্রেস কীভাবে কথা বলে, সেটা দেখায়, আমি সেই উচ্চারণ করতে পারি না, আমার বাঙালি জিভে সেই টান আসে না।
পরী এখন পাক্কা মধ্য-পশ্চিম আমারিকান উচ্চারণে কথা বলে।
এই উচ্চারণ আমাকে যেমন গর্বিত মা করতে পারে, তেমনি আবার বিচ্ছিন্নও করে দেয়। আমার মেয়ের বাংলা উচ্চারণ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, বাংলাদেশের নাটকে ব্রিটিশ সাহেব চরিত্রের সংলাপের মত। আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই আমার মেয়ের জীবন থেকে। আমার ভাষা আর আমার সন্তানের ভাষা আলাদা হয়ে যায়। তার নিজের জীবনের পথে পৃথক বাঁকে এগিয়ে যাবে সে। আর আমি সব কাজ শেষে হবো ইতিহাস।
গ্রেস পরীর আর সব বন্ধুদের মত আমার স্নেহের পাত্রী।
– আজ তোমার লাঞ্চ কেমন হয়েছে আম্মি? ভালো লেগেছে?
– আমি চিকেন টেন্ডার খেয়েছি, মা। গ্রেস বলে ক্যাফেটেরিয়ার খাবার ডিসগাসটিং।
– কেন মা, ও পছন্দ করে না? তাহলে কোল্ড লাঞ্চ আনতে পারে বাড়ি থেকে?
– মা গ্রেস খুব পুওর। ওর মা খাবার পাঠাতে পারে না।
এখানকার কাজ করা মায়েরা তাদের বাচ্চাদের ঘরের রান্না করা খাবার খাওয়াতে পারে না। অনেক বাচ্চাকে ফ্রিজের ঠাণ্ডা খাবার মাইক্রোওয়েভ করে, জঘন্য জাঙ্ক ফুড খেয়ে দিনের পর দিন থাকতে হয়। এখানকার গরিব পপুলেশনের একটা দল হলো সিঙ্গেল মা। অনেক সিঙ্গেল মা বাচ্চাকে একা বাড়িতে রেখে কাজে যেতে বাধ্য হয়। এদের বলে ল্যাচ কী বাচ্চা, যারা স্কুলের পর একা বাড়িতে ফেরে। বিল মেটানোর প্রয়োজনে নাবালক বাচ্চাদের বাড়িতে অরক্ষিত একা রেখে বাবা-মা দুজনও কাজে যেতে বাধ্য হয়। এখানে মনে হয় বাচ্চাগুলোকে ঘরের গরম গরম খাবার খাওয়াতে পারাটা একটা প্রিভিলেজ। বাচ্চার অসুখে-বিসুখে তার সঙ্গে থাকতে পারাটাই পারিবারিক মানবিক অধিকার। এখানকার রোজগেরে মায়েদের সেই সৌভাগ্য হয় না। আমার সৌভাগ্য যে আমি আমার বাচ্চার প্রয়োজনে তার কাছে থাকতে পেরেছি, তাকে রান্না করা গরম গরম খাবার খাওয়াতে পারি, পছন্দ না হলে বদলাতে পারি, আমার চয়েস আছে। রোজগেরে মার্কিন মায়েদের সেই চয়েস নেই। বিশেষ করে যারা সর্বনিম্ন মজুরিতে ঘণ্টা দরে খাটে।
বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, আমেরিকা পৃথিবীর বিরলতম এক দেশ যেখানে সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি কিম্বা পারিবারিক ছুটির কোনো ধারণা নেই। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে কেবল এই সুবিধা চালু হয়েছে। শ্রমিক শ্রেণি, ব্লু কলার কর্মীদের পরিবারের ভেতরের যে কাজগুলো কর্মীদের পরেরদিন কাজের জন্য প্রস্তুত করতে আবশ্যক তার দায়িত্ব কে নেবে, মার্কিন সমাজের এ এক গভীর সংকট। রান্না-খাওয়া, বিশ্রাম, বাজারহাট, লন্ড্রি, শিশু ও বুড়োদের দেখভাল, অসুখে-বিসুখে যতœআত্তি, ঘর-গেরস্থালি-গাড়ির মেরামতি- যাকে বলে ‘কেয়ার ওয়ার্ক’, এর দায়িত্ব না রাষ্ট্র স্বীকার করে, না কর্পোরেট। মাতৃত্ব খুবই প্রাইভেটাইজড। সব দায়িত্ব মায়ের। শিশুদের বড় করবার জন্য বিরাট এক গ্রামের প্রয়োজন বলে আফ্রিকার জ্ঞানী মানুষেরা যে প্রবাদে উচ্চারণ করে গেছেন, সেই কমিউনিটি কোথাও নেই। মার্কিনী জীবনে সম্প্রদায়ের শক্তি দুর্বল। সামাজিক নিরাপত্তায় সমাজ কোনো শক্তি নয়। সামাজিক নিরাপত্তা দেয় রাষ্ট্র।
আমি মেয়ের কাছে জানতে চাই,
– গ্রেস কি শুক্রবারে কার্নিভালে আসবে?
– না মা, গ্রেস আসতে পারবে না। ওদের টাকা নেই। ওর গ্র্যান্ডপা ওদের গাড়ি বিক্রি করে দিচ্ছে, তিন হাজার ডলারে। সামনের এপ্রিলে ওরা গ্রামে চলে যাবে। ওদের ব্যাংকে মাত্র এত ডলার এত সেন্ট আছে।
তার মানে এত কথা বাচ্চারা জেনে গেছে। তারা গ্রেসকে তাই ছোট চোখে দেখছে!

আমি বলি,
– আমি তো গ্রেসকে কার্নিভালে আসতে স্পন্সর করতে পারতাম। আবার যখন কার্নিভ্যাল হবে আমাকে বলবে।
– ও গ্রামে চলে যাচ্ছে, তার আর কোনো সুযোগ পাবে না।আমি বলতে চাই, এটা শেষ কথা নয়। গ্রেসকে এমন করে দেখো না। ও চাইলে এমন কিছু নেই যে সে হতে পারে না, সে নিজেই তার টাকা বানাতে পারবে। তার যে কোনো কিছু করার ক্ষমতা আছে। গ্রেসের জন্য কোনো দরজা কখনও বন্ধ হবে না।

গ্রেসের জন্য আমার মন কেমন করতে থাকে। ইচ্ছা করে গরম গরম কিছু মজার খাবার গ্রেসের জন্য পাঠিয়ে দিই। এখানে বাচ্চারা একে অপরের খাবার খেতে পারে না। স্কুলে নিষেধ করা আছে। পর্ক, বিফ, পিনাট, ভেজি, নন-ভেজ, হারাম-হালাল- মেলা রকম ট্যাবু। ইচ্ছা করে গ্রেস যেন কখন জানতে না পারে সে গরিব। আর তার কোনো বন্ধুও যেন না, কেউ কখনও যেন কোনো বাচ্চাকে গরিব বলে না জানে। বাচ্চারা সব স্বর্গ থেকে এই পৃথিবীতে এসেছে আমাদের জীবনকে হাসি-খেলায়-গানে ভরে তুলতে। আমার চোখে এই পৃথিবী শিশুদের খেলাঘর।
পরিচয় : লেখক ও শিক্ষক।

-পরিবর্তন ডটকম থেকে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here