সন্দ্বীপ সীমানা রক্ষা আন্দোলন নিউইয়র্কেও শক্তিশালী ভূমিকায়

বর্ণমালা নিউজ: বঙ্গোপসাগরে জলরাশির মধ্যে শত শত বছর ধরে টিকে থাকা ছোট্ট স্থলভূমি ‘সন্দীপ’-এর মানুষেরা নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম¥েলনে তাদের পিতৃপুরুষদের বাসস্থান সন্দীপের সীমানা রক্ষার জন্য আন্দোলনে নেমেছেন। বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের বসবাসরত: সন্দীপবাসীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের দাবী দাওয়া আদায়ে গঠন করেছেন ‘ সন্দ্বীপ সীমানা রক্ষা আন্দোলন কমিটি, যুক্তরাষ্ট্র’ । এই সংগঠনটি
আগামী ১১ মার্চ শনিবার ব্রুকলীনে আয়োজন করেছে মানববন্ধন কর্মসূচী। এর আগে ৯ মার্চ বৃহস্পাতিবার জ্যাকসন হাইটসের ইত্যাদি পার্টি সেন্টারে আযৈাজন করে এক সংবাদ সম্মেলনের। রাজনৈতিক ভোদাভেদ ও আঞ্চলিকতার রেশারেষি ভুলে সন্দীপের নামে পরিচারিত ২০ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ একই সুরে তাদের জন্মভূমি ‘সন্দীপ’এর সীমানা রক্ষার আন্দোলনে দৃঢ প্রত্যয় নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে যেগদানকারী নেতৃবৃন্দ হচ্ছেন: আবুল হাসান মহিউদ্দিন, এস এম ফেরদৌস, এমলাক ফয়সাল, মোহাম্মদ হামিদ, ইকবাল হায়দার, আবুল হাশেম, মিলাদ বারি, মাহফুজুল মাওরা নানউ, আব্দলি হান্নান পান্না, ফিরোজ আহমেদ, আবু তাহের, হেলাল উদ্দিন, আবু জাফর মাহমুদ, মো: হেরাল উদ্দিন, আবুল কাশেম, মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল, হুমায়ুন কবির, আজিমউদ্দিন অভি, বখতিয়ার উদ্দিন, নাসিম উদ্দিন, আবুল হাশেম শাদাদত, সাইফুল ইসলাম, মাকসুদুর রহমান, মনির উদ্দিন, শাহাব উদ্দিন, নূর ইসরাম, মোহাম্মদ আরমগীর, আবদুল মন্নান, কাউসার সর্দার ও কামাল উদ্দিন প্রমূখ।
সংবাদ সম্মেলনে সন্দ্বীপ সীমানা রক্ষা আন্দোলন কমিটি, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়- আমরা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সন্দ্বীপ বাসী অত্যান্ত উদ্বিগ্ন। আমাদের পরিবার, আত্মীয় স্বজন অধিকাংশ মানুষ প্রিয় জন্মস্থান সন্দ্বীপে বসবাস করে। আপনারা জানেন হাজারো বছরের পুরনো ইতিহাস এবং ঐতির্য্যে ভরা একটি দ্বীপ সন্দ্বীপ। বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার একটি উপজেলা। ইতিহাস বলে গত কয়েকশ বছরে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এবং পর্তুগীজরা ব্যবসা বানিজ্যের জন্য সাগর পথে এসে এই সন্দ্বীপকে বেছে নিয়েছিলো। ১৯৫৬ সালেও সন্দ্বীপ ছিল ৬০ মৌজা সস্বলিত, বিশেষ করে সন্দ্বীপের পশ্চিম, উত্তরপশ্চিম এবং দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ গত ৭০-৮০ বছর ধরে নদীর ভাঙ্গা- গড়ার সাথে সংগ্রাম করে বেচেঁ আছে। ইতিমধ্যে ২৫ টির মত মৌজা নদীগর্বে বিলীন হয়ে যায়। নদীর ভাঙ্গা গড়ার স্বাভাবিক নিয়মে নদীর পলি জমে এবং হিমালয় থেকে নদী বাহিত পলির প্রভাবে ১৫- ২০ বছর পর পর উপকুলে কোথাও না কোথাও নতুন ভাবে চর জেগে উঠে। তেমনি ভাবে ৮০ দশকে সন্দ্বীপের উত্তর পশ্চিম সীমানায় উরিরচর নামে চর জেগে উঠে। বর্তমানে যা সন্দ্বীপের একটি ইউনিয়ন। সন্দ্বীপের ভিটেমাটি হারা কিছু মানুষ জীবনের ঝুকি নিয়ে কোন প্রকার সরকারী এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীতা ছাড়া বসতি গড়ে তোলে । বাধ্য হয়ে অনিরাপদ ভাবে বসবাস করার কারণে ১৯৮৫ সালের ২৪ শে মে প্রলয়ংকারী জলোচ্ছাসে চরের অধিকাংশ মানুষ মৃত্যু বরন করে। গত ৭০-৮০ বছর ধরে নদী ভাঙ্গনের কারণে বাস্তুহারা মানুষ গুলো সন্দ্বীপের বিভিন্ন বেড়ীবাঁধ ও বসতি এলাকায় উদ্বাস্তুর মত মানবেতর জীবন যাপন করছে। এর পরিনতিতে বসতি এলাকায় কৃষি জমির পরিমান শুন্যের কোটায়। উল্লেখ্য ১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিল স্বরনকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে যে প্রাণ হানি ঘঠেছিল তার অধিকাংশই ছিল বেড়ীবাঁধে বসবাসকারী বাস্তুহারা মানুষ গুলো।
গত ১০-১৫ বছর ধরে সন্দ্বীপের পশ্চিম এবং দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে সন্দ্বীপের সীমানায় অনেকগুলো নতুন চর জেগে উঠেছে। তাদের মধ্যে স্বর্ণদ্বীপ ( সাবেক নিউ সন্দ্বীপ/ জাহাজ্জারচর), ঠ্যাংগারচর (সন্দ্বীপের সাবেক ন্যামস্তি ইউনিয়ন) এবং জালিয়ার চর অন্যতম। যখনি এই অঞ্চলের অসহায় মানুষগুলো এক বুক আসা নিয়ে পূর্বপুরুষের হারানো ভিটে মাটি ও কৃষি জমিতে নতুন করে বসতি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে ঠিক তখনি কিছু মহল সরকারী প্রশাসনকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা প্রচার করে সন্দ্বীপের বাস্তুহারা মানুষকে বঞ্চিত করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে।
১৮২২ সালে নোয়াখালী জেলা গঠিত হলে সন্দ্বীপকে চট্টগ্রাম জেলা থেকে নোয়াখালী জেলার অর্šÍভুক্ত করা হয়। যোগাযোগের চরম অসুবিধার কারণে ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে পুনরায় সন্দ্বীপকে চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর পর থেকে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া, সুধারাম, কোম্পানীগঞ্জ ও বর্তমান ফেনী জেলার সোনাগাজীর সাথে সীমানা অমিমাংসিত থেকে যায়। সন্দ্বীপের সর্বস্তরের মানুষ তাদের প্রিয় মাতৃভুমি সন্দ্বীপের সীমানায় জেগে উঠা চরের মালিকানা নিয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ববাদী কর্মকান্ডে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে সন্দ্বীপবাসী সন্দ্বীপের সীমানা নির্ধারণ ও জেগে উঠা নতুন চরে বসবাসের সুযোগ পেতে দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে এবং প্রবাসে বিভিন্ন শহরে সাংবাদিক সম্মেলন, সমাবেশ, স্বারকলিপি প্রদান ও মানব বন্দন সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।
৩০ শে জানুয়ারী
১৯৭০ ইং তারিখে বিভাগীয় কমিশনার এর আদালত, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলা প্রশাসককে আন্তজেলার সীমানা নির্ধারণের নির্দেশ প্রদান করেন। বিগত ১৫ ই জানুয়ারী ১৯৯৮ ইং তারিখে মহাপরিচালক, জরীপ অধিদপ্তর এর সভাপতিত্বে ১৯১৩- ১৯১৬ সালে সি. এস. ম্যাপ এর উপর ভিত্তি করে সীমানা নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যাতে করে নতুন করে জেগে উঠা চর নিয়ে ভবিষ্যতে কোন মামলা, হামলা, দখল, বেদখলের তথা কোন বিতর্ক সৃষ্টির সম্ভাবনা না থাকে।
বিগত ২০০৮ সালে মাননীয় বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম মহাপরিচালক, জরীপ অধিদপ্তর কে আন্ত:জেলা সীমানা নির্ধারণের জন্য পত্র দেন। ১ ডিসেম্বর ২০০৯ ইং তারিখে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম আন্ত:জেলা সীমানা নিধারণ করার জন্য মাননীয় সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগকেও পত্র দেন। অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় উল্লেখিত কোন নির্দেশনা/সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
অত:পর বিগত ৩ মার্চ ২০১৬ ইং তারিখে মাননীয় মন্ত্রী, ভুমি মন্ত্রানালয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ভূমি প্রতি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী (জাবেদ) এর উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম নোয়াখালী আন্ত:জেলা সীমানা ১৯১৩-১৯১৬ সালে প্রস্তুতকৃত সি. এস. জরিপ এর ম্যাপ এর উপর ভিত্তি করে দু’মাসের মধ্যে ভূমি রেকর্ড ও জরীপ অধিদপ্তর, বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম কার্যালয়, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলা প্রশাসন কে যৌথভাবে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ নেন নাই/গ্রহণ করেন নাই। উল্লেখ্য ১৯৫৬ সালে সন্দ্বীপ চট্টগ্রাম জেলায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর আর কোন জরিপ হয়নি এবং কোন সংশোধিত ম্যাপও ছাপানো হয়নি।
উপেেরাক্ত সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়ন না করে জেলা প্রশাসন, নোয়াখালী একতরফা ভাবে সন্দ্বীপ উপজেলার সীমানার মধ্যে জেগে উঠা স্বর্ণদ্বীপ (জাহাজ্জার চর), ঠ্যাংগার চর, জালিয়ার চর সহ সংলগ্ন সকল চর সমূহে একতরফা ভাবে জরীপ কার্যক্রম ও সাইনবোর্ড স্থাপন করে চলেছে এবং উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট মিথ্যা, বানোয়াট ও ভুল তথ্য প্রেরণ করছে। যাহা ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া যাচাই বাচাই ছাড়া প্রচার করছে। যা সম্পূর্ন একতরফা ও বেআইনি।
বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে সন্দ্বীপবাসী জানতে পারে সন্দ্বীপের সাবেক ন্যামস্তি ইউনিয়নে জেগে উঠা ঠ্যাংগার চরে শরনার্থীদেরকে সরকার অস্থায়ীভাবে পূর্নবাসনের চিন্তা ভাবনা করছে। আমরা এবং অভিজ্ঞমহল মনে করে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে সম্পূর্নরুপে ভিন্ন দেশী উদ্বাস্তুদের পুনঃবাসন করা হলে তা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকির কারণ হতে পারে। সাময়িকভাবে ২০-৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসিত করা হলেও সময়ের ব্যবধানে এই সুযোগের অপব্যবহার করে অগণিত রোহিঙ্গা সরনার্থী আসতে শুরু করবে যাহা কোনমতে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। ফলশ্রুতিতে এই দ্বীপের সম্প্রসারিত নতুনভাবে জেগে উঠা ভূমিতেও তাদের বসতি গড়ে উঠবে। আমরা আরও শঙ্খাবোধ করি সময়ের ব্যবধানে এই দ্বীপে কোন অস্থিতীশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিরি সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্বীপের নিরাপত্তা গ্রহন করতে চাইবে। এরই ধারাবাহিকতায় সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অভিপ্রায়ে বিচ্ছিন্নবাদের উস্কানি দিতে পারে।
মানবিক বিবেচনায় আমরা সন্দ্বীপবাসী নির্যাতিত রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে বিরোধী নই। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট দ্বীপে পুনর্বাসন না করে সন্দ্বীপের সীমানায় জেগে উঠা স্বর্ণদ্বীপে (জাহাজ্জার চর), সন্দ্বীপসহ উপকুলীয় অঞ্চলের বাস্তু হারা মানুষের সাথে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের চিন্তা করা যেতে পারে।
ইতিমধ্যে জাহাজ্জার চরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষন কেন্দ্র স্থাপন করায় আমরা স্বাগত জানাই। এই দ্বীপের নাম সন্দ্বীপের প্রাচীন নাম গুলির একটি স্বর্নদ্বীপ নামকরণ করায় বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। এরই মধ্যে সেনাবাহিনীর অবস্থানের কারণে এতদঞ্চলে জলদস্যুদের অপতৎপরতা অনেক অংশে হ্রাস পেয়েছে।

এমতাবস্তায়, ৩০ জানুয়ারী ১৯৭০ ইং তারিখে বিভাগীয় কমিশনার আদালতে ১৯১৩-১৯১৬ সালের সি.এস. ম্যাপের উপর ভিত্তি করে বিভাগীয় কমিশনার আদালত চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার প্রশাসককে আন্তঃ জেলার সীমানা নির্ধারণের যে নির্দেশ প্রদান করেন তা বাস্তবায়ন এবং ঠ্যাংগার চরে সন্দ্বীপের বাস্তুহারাদেরকে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানাই।
সংবাদ শেসে নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকেদর বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here