দু’টি বিলম্বিত প্রয়াসকে তাজা অভিনন্দন


।। আহমেদ মুসা ।।

প্রতিবছর ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের বিল পাশ হয়েছে জাতীয় সংসদে। সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন। একেবারে না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়াও উত্তম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির মতো এই দাবিটিও ছিল প্রাণের দাবি। রক্ত¯œাত দাবি। আমাদের জীবদ্দশায় এসব দাবি পূরণ হতে দেখে খুবই ভালো লাগছে। অতীতে এসব নিয়ে যথেষ্ট ষড়যন্ত্র এবং মশকরা হতে দেখে আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সংশ্লিষ্ট আন্দোলন সূচনার অন্যতম পুরোধা কাজী নূর উজ্জামান ও জাহানারা ইমামসহ আরো অনেকেই আন্দোলনের বিজয় দেখে যেতে পারলেন না। এদিক থেকে আমরা অনেক ভাগ্যবান। আন্তর্জাতিক ভাবেও এটি শিগগির পালন শুরু হবে বলে আশা করছি। হওয়া দরকারও। কারণ, মাত্র নয়মাসে এতো মানুষের হত্যাকান্ড ইতিহাসে বিরল।
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মূল নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদসহ কিছু সংগঠনের প্রয়াসে গড়ে উঠেছিল যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতা-বিরোধী ব্যক্তি এবং তাদের সংগঠন জামায়াত-শিবির প্রভৃতি বিরোধী আন্দোলন। জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ড ও এরশাদের ক্ষমতা দখলের কারণে আন্দোলনে সাময়িক বিরতি আসে। এরশাদ একই সাথে প্রকাশ্যে এবং গোপনে আন্দোলনের পিছনে ছুরিকাঘাত করে এখন অন্য সুরে গান গাইছেন। তিনি ক্ষমতা দখল করেই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী উল্লিখিত তিন সংগঠনের দুই নেতা কর্ণেল নূর উজ্জামান ও কর্ণেল শওকত আলীকে গ্রেফতার করেন, মেজর জিয়াউদ্দিন সুন্দরবনে পালিয়ে গিয়ে রক্ষা পান। পাশাপাশি নঈম জাহাঙ্গীরসহ আরো অনেককে গ্রেফতার করা হয় । আন্দোলনে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও সাদেক আহমদ খানসহ অনেকেই পালন করেন সাহসী ভূমিকা। অন্যদিকে কেউ কেউ এরশাদের তল্পীবাহক হয়েও কাজ করেছেন।
উল্লিখিত আন্দোলনে যাদের দলীয় পরিচয় প্রবল ছিল, তাদের ছাড়া পরবর্তীকালে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র। এখান থেকেই প্রকাশিত হয় আকরগ্রন্থ ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’সহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই, যেগুলির প্রধান প্রতিপাদ্য ও লক্ষ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং একাত্তরের গণহত্যাকে দেশে-বিদেশে সম্যক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা। তাই সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের কোনো বিজয় অর্জিত হলে ঘুরে-ফিরে আসে এই আকরগ্রন্থটির নাম। নাম চলে আসে মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের। দুর্দিনে এই সংগঠন ও এর প্রকাশিত গ্রন্থগুলি সাহস ও আলোর মশাল হয়ে পালন করেছে ঐতিহাসিক ভূমিকা।
মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরও নানা জায়গায় দৌড়াদৌড়ির কাজগুলিও আমাকে করতে হতো। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক ও পা-যুগল সমানভাবে কাজ করেছে। এর ফলে আমার অভিজ্ঞতার ভান্ডার অন্য অনেকের চেয়েই সমৃদ্ধ। এসব অভিজ্ঞতার কিছু কিছু অন্যত্র লিখেছি বলে পুনরাবৃত্তি করলাম না। ভবিষ্যতে আরো বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ইচ্ছে আছে। কারণ, আজকাল দেখতে পাচ্ছি, মাঝে-মাঝে নিজের ঢোল নিজে না পেটালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আজকাল আরো দেখতে পাচ্ছি, নিজের প্রবল অন্তর্মুখিতার কারণে সেই-সব ভূমিকার কথা অনেক ঘনিষ্ট বন্ধু বা কাছের জনেরও ভালোভাবে জানা নেই। সংশ্লিষ্ট সবাই নিজেকে তুলে ধরতে বা ঘটনা থেকে ফায়দা তুলতেই সদাব্যস্ত। অনেক বড়বড় মানুষেরও কিছু কিছু ক্ষুদ্রতার চেহারা কাছে না থাকলে দেখা যায় না।
১৯৮৭ সালে একুশের বইমেলায় ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ প্রকাশের পর লোকজন লাইন দিয়ে বই কিনতে থাকে। সে কারণে পরবর্তীতে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার ছাপা হলেও বাংলাটির চাহিদা ছিল আরো বেশি। তাই হাজার হাজার নকল বইয়ে বাজার ছেয়ে যায়।
আমাদেরকে এরশাদ ও জামায়াতীদের যুগপৎ রোষানল এড়িয়ে কাজ করতে হয়েছে। নকল সমস্যা ছাড়াও বই প্রথম প্রকাশের পর আরো কিছু ‘বিচিত্র’ সমস্যা দেখা দেয়। এরমধ্যে দু’টি হচ্ছে ঃ ক. একটি পত্রিকা আমাদের কাজের প্রশংসার পাশপাশি বইটিকে ‘উড়োচিঠি’ বলে পরিহাস করে। কারণ প্রথম সংস্করণে সম্পাদক, সংকলক বা লেখক হিসেবে কারো নামই ছিলো না। অভিযোগ যথার্থ ছিল। তাই দ্রæত দ্বিতীয় সংস্করণ করে আরো অনেক তথ্য দিয়ে এর আমুল পরিবর্তন আনা হয়। সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয় ড. আহমদ শরীফ, কাজী নূর উজ্জামান ও শাহরিয়ার কবিরের নাম। দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় প্রথম সংস্করণ লেখার দায়িত্ব শফিক আহমদকে দেওয়া ও দ্বিতীয় সংস্করণের তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে শফিক আহমদ ও আমার নাম উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সংস্করণগুলিতে আরো অনেক তথ্য সন্নিবেশিত হয়ে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে বইটি।
খ. দ্বিতীয় অভিযোগটি ছিল আওয়ামী লীগের একজন মুক্তিযোদ্ধা নেতার। তিনি বলেন, গ্রন্থে ঘাতক-দালালদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগেরও কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। এই অভিযোগটিরও সারবত্তা আছে। সাধারণ ক্ষমা ও চিহ্নিত ঘাতক-দালালদের বিচারে গড়িমসির জন্য গ্রন্থে আওয়ামী লীগেরও ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। তবে ঐতিহাসিক এই সত্যকেও স্বীকার করতে হবে যে, ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ যখন প্রকাশিত হয় তখন আওয়ামী লীগের নেতারাও বিপদগ্রস্থ এবং দল অগোছালো। ১৯৭৫ সালে দল ও নেতৃবৃন্দের ওপর দিয়ে যে রক্তাক্ত বিভীষিকা গেছে তার রেশ তখনো চলছিল। অবশ্য দীর্ঘকাল পরে হলেও আকরগ্রন্থের সমালোচনার যথাযথ জবাব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা; ঘাতক-দালালদের বিচারে অনড় অবস্থান নিয়ে ও বাস্তবায়ন করে। শেখ হাসিনা ছাড়া এ বিচার সম্ভব ছিলো না, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও সম্ভব হতো না, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা না থাকলে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে এটাই ছিল সবচেয়ে দরকারী ও কঠিনতম কাজ। একই সঙ্গে গণহত্যার ভয়াবহতাকে দেশে-বিদেশে সর্বব্যাপী করে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েও তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখে গেলেন। ইতিহাস শেখ হাসিনাকে এ দু’টি কাজের জন্য অমর করে রাখবে সন্দেহ নেই। আবার একথাও ঠিক, এই লক্ষ্য-প্রত্যয় ঘোষণায় থাকায়ই আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা সহজতর হয়েছে এবং শেখ হাসিনা হয়েছেন শক্তিমান নেত্রী।
একদিন যে আওয়াজ কিছু লোকে তুলেছিলেন, সেই আওয়াজ অনেক আগেই পৌঁছে গেছে ঘরে-ঘরে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিও ছিল আগের প্রয়াসেরই সম্প্রসারণ। নির্মূল কমিটি প্রথমত গঠন করেন মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িতরা। পরে এটি আরো সম্প্রসারিত হয়। অন্তর্ভুক্ত হয় রাজনৈতিক দলও। আর, চূড়ান্তভাবে সবগুলি প্রয়াসের ইতিবাচক ফল ভোগ করেছে আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক ফসলও কম তোলে নি দলটি। নয়া প্রজন্মের আকাক্সক্ষার অনুবাদ তারা ঠিকই করতে পেরেছেন।
ফসল তোলার কম-বেশি অবকাশ বিএনপিরও ছিল, কিন্তু তারা ফসল তুলবেন কী; মুক্তিযুদ্ধের ময়দানটা ছেড়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগকে, যে ময়দানে দাঁড়িয়েই বিএনপির সংগ্রাম করার কথা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তারা মাথায় তুলে নিয়েছেন তাদেরকে, যারা বাংলাদেশটাই চায় নি এবং স্বাধীনতার সঙ্গে বেঈমানী করার পাশাপাশি যারা তাদের ভূমিকা নিয়ে দম্ভ করা বিদ্যমান রেখেছে।
ইতিহাসে কোনো কোনো ভুলের মাশুল খুবই চড়া। সে মাশুলই গুণতে হচ্ছে বিএনপিকে।
গণহত্যার ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার জন্য ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছিল ‘জেনোসাইড সেভেন্টি ওয়ান ঃ এ্যান একাউন্ট অব কিলার্স এ্যান্ড কলাবরেটরস’ নামে। প্রায় ত্রিশ বছর আগে। এতে সম্পাদক হিসেবে আরো যোগ হয় ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম। অনুবাদ করেছিলেন ড. নিয়াজ জামান। সম্ভবত সে কারণে এ বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি। এটি ছাপা হয়েছিল আমার নিজের প্রেস বর্ণবিন্যাসে। বাংলাটির পিডিএফ কপি থাকলেও ইংরেজিটির নেই। ইংরেজিটিরও এখন বহুল প্রচার দরকার।
১২ মার্চ ২০১৭ ঃ ওকলাহোমা, যুক্তরাষ্ট্র।
আহমেদ মূসা সাপ্তাহিক বর্ণমালার উপদেষ্টা সম্পাদক
দু’টি বিলম্বিত প্রয়াসকে তাজা অভিনন্দন
আহমেদ মূসা
প্রতিবছর ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের বিল পাশ হয়েছে জাতীয় সংসদে। সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন। একেবারে না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়াও উত্তম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির মতো এই দাবিটিও ছিল প্রাণের দাবি। রক্ত¯œাত দাবি। আমাদের জীবদ্দশায় এসব দাবি পূরণ হতে দেখে খুবই ভালো লাগছে। অতীতে এসব নিয়ে যথেষ্ট ষড়যন্ত্র এবং মশকরা হতে দেখে আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সংশ্লিষ্ট আন্দোলন সূচনার অন্যতম পুরোধা কাজী নূর উজ্জামান ও জাহানারা ইমামসহ আরো অনেকেই আন্দোলনের বিজয় দেখে যেতে পারলেন না। এদিক থেকে আমরা অনেক ভাগ্যবান। আন্তর্জাতিক ভাবেও এটি শিগগির পালন শুরু হবে বলে আশা করছি। হওয়া দরকারও। কারণ, মাত্র নয়মাসে এতো মানুষের হত্যাকান্ড ইতিহাসে বিরল।
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মূল নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদসহ কিছু সংগঠনের প্রয়াসে গড়ে উঠেছিল যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতা-বিরোধী ব্যক্তি এবং তাদের সংগঠন জামায়াত-শিবির প্রভৃতি বিরোধী আন্দোলন। জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ড ও এরশাদের ক্ষমতা দখলের কারণে আন্দোলনে সাময়িক বিরতি আসে। এরশাদ একই সাথে প্রকাশ্যে এবং গোপনে আন্দোলনের পিছনে ছুরিকাঘাত করে এখন অন্য সুরে গান গাইছেন। তিনি ক্ষমতা দখল করেই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী উল্লিখিত তিন সংগঠনের দুই নেতা কর্ণেল নূর উজ্জামান ও কর্ণেল শওকত আলীকে গ্রেফতার করেন, মেজর জিয়াউদ্দিন সুন্দরবনে পালিয়ে গিয়ে রক্ষা পান। পাশাপাশি নঈম জাহাঙ্গীরসহ আরো অনেককে গ্রেফতার করা হয় । আন্দোলনে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও সাদেক আহমদ খানসহ অনেকেই পালন করেন সাহসী ভূমিকা। অন্যদিকে কেউ কেউ এরশাদের তল্পীবাহক হয়েও কাজ করেছেন।
উল্লিখিত আন্দোলনে যাদের দলীয় পরিচয় প্রবল ছিল, তাদের ছাড়া পরবর্তীকালে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র। এখান থেকেই প্রকাশিত হয় আকরগ্রন্থ ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’সহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই, যেগুলির প্রধান প্রতিপাদ্য ও লক্ষ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং একাত্তরের গণহত্যাকে দেশে-বিদেশে সম্যক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা। তাই সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের কোনো বিজয় অর্জিত হলে ঘুরে-ফিরে আসে এই আকরগ্রন্থটির নাম। নাম চলে আসে মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের। দুর্দিনে এই সংগঠন ও এর প্রকাশিত গ্রন্থগুলি সাহস ও আলোর মশাল হয়ে পালন করেছে ঐতিহাসিক ভূমিকা।
মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরও নানা জায়গায় দৌড়াদৌড়ির কাজগুলিও আমাকে করতে হতো। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক ও পা-যুগল সমানভাবে কাজ করেছে। এর ফলে আমার অভিজ্ঞতার ভান্ডার অন্য অনেকের চেয়েই সমৃদ্ধ। এসব অভিজ্ঞতার কিছু কিছু অন্যত্র লিখেছি বলে পুনরাবৃত্তি করলাম না। ভবিষ্যতে আরো বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ইচ্ছে আছে। কারণ, আজকাল দেখতে পাচ্ছি, মাঝে-মাঝে নিজের ঢোল নিজে না পেটালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আজকাল আরো দেখতে পাচ্ছি, নিজের প্রবল অন্তর্মুখিতার কারণে সেই-সব ভূমিকার কথা অনেক ঘনিষ্ট বন্ধু বা কাছের জনেরও ভালোভাবে জানা নেই। সংশ্লিষ্ট সবাই নিজেকে তুলে ধরতে বা ঘটনা থেকে ফায়দা তুলতেই সদাব্যস্ত। অনেক বড়বড় মানুষেরও কিছু কিছু ক্ষুদ্রতার চেহারা কাছে না থাকলে দেখা যায় না।
১৯৮৭ সালে একুশের বইমেলায় ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ প্রকাশের পর লোকজন লাইন দিয়ে বই কিনতে থাকে। সে কারণে পরবর্তীতে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার ছাপা হলেও বাংলাটির চাহিদা ছিল আরো বেশি। তাই হাজার হাজার নকল বইয়ে বাজার ছেয়ে যায়।
আমাদেরকে এরশাদ ও জামায়াতীদের যুগপৎ রোষানল এড়িয়ে কাজ করতে হয়েছে। নকল সমস্যা ছাড়াও বই প্রথম প্রকাশের পর আরো কিছু ‘বিচিত্র’ সমস্যা দেখা দেয়। এরমধ্যে দু’টি হচ্ছে ঃ ক. একটি পত্রিকা আমাদের কাজের প্রশংসার পাশপাশি বইটিকে ‘উড়োচিঠি’ বলে পরিহাস করে। কারণ প্রথম সংস্করণে সম্পাদক, সংকলক বা লেখক হিসেবে কারো নামই ছিলো না। অভিযোগ যথার্থ ছিল। তাই দ্রæত দ্বিতীয় সংস্করণ করে আরো অনেক তথ্য দিয়ে এর আমুল পরিবর্তন আনা হয়। সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয় ড. আহমদ শরীফ, কাজী নূর উজ্জামান ও শাহরিয়ার কবিরের নাম। দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় প্রথম সংস্করণ লেখার দায়িত্ব শফিক আহমদকে দেওয়া ও দ্বিতীয় সংস্করণের তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে শফিক আহমদ ও আমার নাম উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সংস্করণগুলিতে আরো অনেক তথ্য সন্নিবেশিত হয়ে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে বইটি।
খ. দ্বিতীয় অভিযোগটি ছিল আওয়ামী লীগের একজন মুক্তিযোদ্ধা নেতার। তিনি বলেন, গ্রন্থে ঘাতক-দালালদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগেরও কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। এই অভিযোগটিরও সারবত্তা আছে। সাধারণ ক্ষমা ও চিহ্নিত ঘাতক-দালালদের বিচারে গড়িমসির জন্য গ্রন্থে আওয়ামী লীগেরও ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। তবে ঐতিহাসিক এই সত্যকেও স্বীকার করতে হবে যে, ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ যখন প্রকাশিত হয় তখন আওয়ামী লীগের নেতারাও বিপদগ্রস্থ এবং দল অগোছালো। ১৯৭৫ সালে দল ও নেতৃবৃন্দের ওপর দিয়ে যে রক্তাক্ত বিভীষিকা গেছে তার রেশ তখনো চলছিল। অবশ্য দীর্ঘকাল পরে হলেও আকরগ্রন্থের সমালোচনার যথাযথ জবাব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা; ঘাতক-দালালদের বিচারে অনড় অবস্থান নিয়ে ও বাস্তবায়ন করে। শেখ হাসিনা ছাড়া এ বিচার সম্ভব ছিলো না, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও সম্ভব হতো না, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা না থাকলে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে এটাই ছিল সবচেয়ে দরকারী ও কঠিনতম কাজ। একই সঙ্গে গণহত্যার ভয়াবহতাকে দেশে-বিদেশে সর্বব্যাপী করে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েও তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখে গেলেন। ইতিহাস শেখ হাসিনাকে এ দু’টি কাজের জন্য অমর করে রাখবে সন্দেহ নেই। আবার একথাও ঠিক, এই লক্ষ্য-প্রত্যয় ঘোষণায় থাকায়ই আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা সহজতর হয়েছে এবং শেখ হাসিনা হয়েছেন শক্তিমান নেত্রী।
একদিন যে আওয়াজ কিছু লোকে তুলেছিলেন, সেই আওয়াজ অনেক আগেই পৌঁছে গেছে ঘরে-ঘরে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিও ছিল আগের প্রয়াসেরই সম্প্রসারণ। নির্মূল কমিটি প্রথমত গঠন করেন মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িতরা। পরে এটি আরো সম্প্রসারিত হয়। অন্তর্ভুক্ত হয় রাজনৈতিক দলও। আর, চূড়ান্তভাবে সবগুলি প্রয়াসের ইতিবাচক ফল ভোগ করেছে আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক ফসলও কম তোলে নি দলটি। নয়া প্রজন্মের আকাক্সক্ষার অনুবাদ তারা ঠিকই করতে পেরেছেন।
ফসল তোলার কম-বেশি অবকাশ বিএনপিরও ছিল, কিন্তু তারা ফসল তুলবেন কী; মুক্তিযুদ্ধের ময়দানটা ছেড়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগকে, যে ময়দানে দাঁড়িয়েই বিএনপির সংগ্রাম করার কথা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তারা মাথায় তুলে নিয়েছেন তাদেরকে, যারা বাংলাদেশটাই চায় নি এবং স্বাধীনতার সঙ্গে বেঈমানী করার পাশাপাশি যারা তাদের ভূমিকা নিয়ে দম্ভ করা বিদ্যমান রেখেছে।
ইতিহাসে কোনো কোনো ভুলের মাশুল খুবই চড়া। সে মাশুলই গুণতে হচ্ছে বিএনপিকে।
গণহত্যার ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার জন্য ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছিল ‘জেনোসাইড সেভেন্টি ওয়ান ঃ এ্যান একাউন্ট অব কিলার্স এ্যান্ড কলাবরেটরস’ নামে। প্রায় ত্রিশ বছর আগে। এতে সম্পাদক হিসেবে আরো যোগ হয় ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম। অনুবাদ করেছিলেন ড. নিয়াজ জামান। সম্ভবত সে কারণে এ বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি। এটি ছাপা হয়েছিল আমার নিজের প্রেস বর্ণবিন্যাসে। বাংলাটির পিডিএফ কপি থাকলেও ইংরেজিটির নেই। ইংরেজিটিরও এখন বহুল প্রচার দরকার।
১২ মার্চ ২০১৭ ঃ ওকলাহোমা, যুক্তরাষ্ট্র।
আহমেদ মূসা সাপ্তাহিক বর্ণমালার উপদেষ্টা সম্পাদক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here