মোদীর ইজরায়েল সফরের উদ্দেশ্য

।। সুব্রত বিশ্বাস ।।

সুব্রত বিশ্বাস

এই প্রথম একজন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েল সফরে যাচ্ছেন। দিনক্ষণ সরকারিভাবে ঘোষিত না হলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরসূচি পাকা করতে জুলাই মাসে মোদী জি-২০ বৈঠকে জার্মানির হামবুর্গে যাবেন। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি ইজরায়েল ঘুরে আসতে পারেন। এমনই ভাবনা-চিন্তা চলছে বিদেশমন্ত্রকে। ইতিমধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজি দোভাল একদফা ইজরায়েল ঘুরে এসছেন। ২১শে ফেব্রুয়ারী তিনি ইজরায়েল যান এবং ৩রা মার্চ দেশে ফেরেন। সেখানে তিনি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, ইজরায়েলের নিরাপত্তা এজেন্সি মোসাদের প্রধান ইয়ুসেক কোহেলের সঙ্গে মোদীর সফরসুচি নিয়ে কথা বলেছেন। বলা হচ্ছে এবছর ভারত-ইজরায়েল কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ২৫ বছর। এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে মোদী ইজরায়েল সফরে যেতে চান। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনায় ভারত-ইজরায়েল মৈত্রীকে আরও ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা দিতে তিনি ইচ্ছুক। তার জন্য কৃষি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে শুধু দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নয়, ইজরায়েল থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কেনার বরাতও থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, গোয়েন্দা বিমান। মোদীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদ্ষ্টো দোভাল এসব বিষয় নিয়েই ইজরায়েলের উচ্চ সরকারি মহলে কথাবার্তা সেরে এসেছেন। তবে, দু’দেশের নেতারাই ভারত-ইজরায়েলের মধ্যে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার প্রশ্নে কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। ২৫ বছরের কুটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতেই নতুন ধরনের প্রয়াস। তাই মোদীর প্রস্তাবিত সফর ঘিরে বিস্তৃত জল্পনা শুরু হয়েছে সরকারি মহলে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর সফরসুচিতে ইজরায়েলের প্রতিবেশী প্যালেস্তাইন যাবার কোনো কর্মসুচি থাকছে না। ভারতের কিদেশনীতির প্রশ্নে নজিরবিহীন পশ্চদপসরণ হিসেবে এই ঘটনাকে মনে করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে ভারতের যেসব নেতা প্যালেস্তাইন সফরে গেছেন, তারা পাশাপাশি ইজরায়েলও ঘুরে এসেছেন। ২০১৬ সালে বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও দু’দেশই একই সময়ে সফর করেছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখিার্জিও ২০১৫ সালে যথাক্রমে ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইন উভয় রাষ্ট্রই সফর করেন। ১৯৯২ সালের পর ভারতের একজন রাষ্ট্রপতি এই প্রথম দু’দেশ সফরে যান। মোদীর সফরে কিন্তু তার ব্যতিক্রম ঘটতে চলেছে। তিনি শুধু ইজরায়েলেই যাবেন, প্যালেস্তাইনে নয়। এটা শুধু নজিরবিহীন নয়, ভারতের কুটনৈতিক ইতিহাসে অঘটনই বলা চলে।

ভারত সরকারের অবস্থান থেকে এটা এখন পরিস্কার, প্যালেস্তাইনের সঙ্গ চেড়ে দিল্লি এখন ইজরাইলের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে চাচ্ছে। মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে বড় রকমের পরিবর্তন আনতে চলেছে-এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেশ কিছুদিন থেকেই এমন আশঙ্কা ক্রমশই দৃঢ় হচ্ছিল যে, সরকারের মধ্যপ্রাচ্যমূখী বিদেশনীতিতে ইজরায়েলই ক্রমশ অগ্রাধিকার পেতে চলেছে। এই ঘটনা বাস্তবে রূপ পেলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য রাষ্ট্রগুলো দিল্লিকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করবে। মনে রাখা দরকার, ভারতে হিন্দুত্ববাদের পথ প্রদর্শকরা বারে বারে হিটলারের প্রশংসা করেন। তারা ফ্যাসিস্ত হিটলারের গুণমুগ্ধ ছিলেন এবং হিটলারের কাজ, কর্মপ্রণালী অনুসরণ করে এসেছেন। সঙ্ঘ পরিবারের অভ্যন্তরে এই প্রবাহ দারুণভাবে বিদ্যমান। এখন শক্তি যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে পেরেছে, তখন তো ইজরায়েলের মতো দেশ যে তাদের আদর্শস্থানীয় হবে, তাতে সন্দেহ কি? সেজন্যই সঙ্ঘ কর্তাদের অনেকেই ইজরায়েলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা যায়। এমনকি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়তে ইজরায়েলকে অনুসরণের বার্তাও দেওয়া হয়। মোদী প্রধানমন্ত্রী হবার পর থেকেই বিদেশনীতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আমেরিকার জুনিয়র পার্টনার হিসাবে ভূমিকা পালনে উঠে পড়ে লেগেছেন মোদী। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এশিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বে যে জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তার অন্যতম শরিক হতে চাচ্ছে মোদীর ভারত। এই অবস্থান বদলের সুর ধরেই পরিবর্তন হতে চলেছে ভারতের প্যালেস্তাইন নীতি। এতদিন দু’দিকে তাল মিলিয়ে চললেও ভারসাম্য বদলাচ্ছে ইজরাইলের দিকে। এবার পুরোপুরি প্যালেস্তাইনকে ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও অনুগত রাষ্ট্র ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হতে চলেছে মোদীর ভারত। ভারতের এতদিনের প্রতিষ্ঠিত বিদেশ নীতি যেখানে বিশ^বাসীর প্রশংসা কুড়িয়ে এসেছে তাকেই জলাঞ্জলি দিতে চলেছেন মোদী। ইজরাইলের পাশে থাকতে চাচ্ছেন তিনি। মোদীর ইজরায়েল সফরে এই চিত্রই হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here