মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকেই বলছি

– সুব্রত বিশ্বাস

সুব্রত বিশ্বাস

দেশটাকে কোথায় নিয়ে চলেছেন? অর্থনৈতিক উন্নতি আর শিক্ষার উন্নতিতে দেশ নাকি ভাসিয়ে দিয়েছেন। উন্নতি হচ্ছে না একথা বলবো না, কিন্তু উন্নতিটা করা হচ্ছে। কার এবং কাদের উন্নতিতে আপনি আত্মনিয়োগ করেছেন। পাকিস্তান আমলে আমরা হাতে গুনা কয়েকজন কোটিপতির কথা শুনতাম। এখন দেশে নাকি ৪০ হাজার কোটিপতি। এর পেছনে আপনার আশির্বাদ ও অবদান অস্বীকার করার নয়। তাইতো শেয়ার বাজার কেলঙ্কারীর ফসল সলমান এফ রহমান দেশের সেরা ধনী। দেশবিদেশে খ্যাতি ছড়িয়েছে। সাথে আপনারও। কারণ সলমান এফ রহমান আপনার উপদেষ্টা।

দলের নেতাকর্মীরা সরকার ও দেশের মানুষের পকেট কেটে ব্যাংক বীমার মালিক হয়েছে। এদের অনেকেরই মালিক হওয়ার আগে কানাকড়ির মালিকও ছিলনা। দলীয় সাঙ্ঘাতদের খুশী করতে নানা সুযোগ করে দিয়েছেন। আইয়ূব খান দেশে খাদ্যের বিনিময়ে কাজের সৃষ্টি করেছিল। এর মধ্যে মাটি কাটা ছিল অন্যতম। মাটি কাটা হতো বর্ষার শুরুতে, যাতে কত মাটি কাটা হয়েছে তার চিহ্ন বর্ষার পানিতে ডুবে যায়। এজন্য কোন ওডিটও হতো না। বিভিন্ন উন্নয়নের প্রজেক্টের কাজ চলছে। মধ্যখানে সেগুলোর নির্ধারিত বাজেট দ্বিগুন, তিনগুন হয়ে যাচ্ছে। আপনার আশির্বাদ থাকায় তাদেরকে দেখভালের কোন সুযোগ নেই।

ছাত্রলীগ সরকারের অনুমোদিত একটি ঠেঙ্গালবাহিনী। এদেরকে দেশগড়ার কারিগর হয়ে ওঠার পরামর্শ দেওয়া হয়। গণতান্ত্রিক উপায়ে এদের নেতা নির্বাচিত হয়না। টেন্ডারবাজি, খুনখারাবিতে যারা পারদর্শী সে গুণাগুনের ওপর রাজনৈতিক গুরুরাই নেতানেত্রী ঠিক করে দেন। বিগত কয়েক বছরে এই সাঙ্ঘাতরা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে ৬০জন খুন হয়েছে। খুনীরা ধরা পড়লে শোরগুল ওঠে ওরা তাদের কেউ নয়। অথচ দিন কয়েক পরে পুনরায় তাদের সভাসমিতি কিংবা মিছিলে যথারীতি দেখা যায়। এরা কখনো শিক্ষার দাবি নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করেনা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনিই বলেছেন, আগে উন্নতি পরে গণতন্ত্র। গণতন্ত্র এখন বাক্সবন্দী করে রেখে দিয়েছেন। তাই গ্যাসের দাম বাড়লে, তেলের দাম বাড়লে মানুষ রাস্তায় নামলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের পিঠের চামড়া তুলে নিতে চায়। জলকামান ব্যবহার করা হয়। আপনার কথায়, কতকগুলো লোক আছে যারা উন্নতি চায় না তারাই এসব করছে।

আক্ষেপ করে নাকি বিলাপ করে বলেছেন, কিভাবে ছাত্ররা এমনকি মেয়েরাও সন্ত্রাসী হয়ে যায়। পীরিত করবেন হেফাজতের সাথে, একটার পর একটা মাদ্রাসার অনুমোদন দেবেন সন্ত্রাসী হবে না তো কি হবে? বানিয়ে রেখেছেন সন্ত্রাসী তৈরির কারিগরের প্রতিষ্ঠান, সন্ত্রাসী হবেইতো। শিক্ষার উন্নতির নামে শিক্ষার মান তলানিতে নিয়ে গেছেন। মানুষের মূল্যবোধ ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাইতো নারী শিশুদের অসভ্যরা পেটায়, আর মানুষ দেখে উপভোগ করে। বার বার একই বস্তিতে আগুন লাগে। অভিযোগকারীরা বলে অবৈধ গ্যাস ও ইলেকট্রিক লাইন থেকে এসব ঘটে। কখনো কোন প্রতিকার হয়না। তার চেয়ে বড় কথা এসব ক্ষতিগ্রস্থদের সরকার ও মানুষ কেউই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেনা। আপনি ও আপনার সরকার মানুষের এই মূল্যবোধটুকুরও অবশিষ্ট রাখেননি।

সুপ্রীম কোর্টের সামনে থেকে মুর্তি (ভাস্কর্য) সরিয়ে নিতে হেফাজত ও ফুরফুরার পীরজাদা দাবি তুেলছে। এর সাথে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ওলামা লীগও রয়েছে। ওদিকে কলকাতায় বেকার হোস্টেল থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সরিয়ে নিতে সেখানকার মৌলবাদীরা দাবি তুলেছে। হেফাজতের সাথে সখ্যতা থাকায় এবং ওলামা লীগ নিজের অঙ্গদল হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সরানোর ব্যাপারে আপনাকে নীরব থাকতে হচ্ছে। আসলে আপনি ফাটাবাসের মধ্যে আটকে আছেন। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে আরো আটকানোর সম্ভাবনা যে অপেক্ষা করছেন নিশ্চিত করে বলা যায়।

এমাসটি স্বাধীনতার মাস। আর দু’তিন দিন পরেই স্বাধীনতা দিবস। বলে থাকেন বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি করে এবং করছে। তারা করে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক একথা প্রতিষ্ঠিত করে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পেতে চায়। যদিও জিয়া জীবিত থাকাকালে কখনো এসব বলেননি। আপনি এবং আপনার দল এর প্রতিবাদ করে। আমি এতে একমত। প্রশ্ন হলো-বিএনপি ইতিহাস বিকৃতি করছে অস্বীকার করার নয়। কিন্তু আপনি আপনার পিতা তথা আমাদের জাতির পিতা ও দলকে একচ্ছত্র মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্বত্তাধিকারী করার অপচেষ্টা করছেন একথা কি অস্বীকার করা যাবে? ন্যাপ-ছাত্রইউনিয়ন-সিপিবি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অংশগ্রহনকারী দল। তাদের ২২ হাজার গেরিলা মুক্তিযুদ্ধে প্রবল যুদ্ধ করেছে। অনেকে শহীদ হয়েছে। দেশের আপামর মানুষ জানে। আপনি চক্রান্ত করছেন অন্য কাউকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্বীকৃতি না দিতে। তাই ২০১৩ সালে তাদের ২৩০০জন মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করে দেন। কোর্টে মামলা করে আদায় করতে হয়। আপনি জীবিতকালে বাদবাকীরা আদৌ সনদ পাবে এমন আশা করা কঠিন। মোজাফফর আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী দল ন্যাপের সভাপতি। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ৫ উপদেষ্টার অন্যতম উপদেষ্টা। তিনিই এখন একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। উচিত ছিল একমাত্র জীবিত ব্যক্তি হিসেবে স্বাধীনতা দিবসে কিংবা বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্মান জানানো। আপনি তাকে সে সম্মান জানাতে পারেননি। আপনি জিয়া কর্তৃক সাধারণের জন্য প্রচলিত স্বাধীনতা পদক দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে আপনি তাকে অপমান করেছেন। আপনি সম্মান জানাতে অপরাগ তাতে যায় আসে না। কিন্তু তাকে অপমান করার অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি। ধন্যবাদ জানাই অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে,পদক নিতে অস্বীকার করায়।

সংকীর্ণতার এখানেই শেষ নয়। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে সবার উর্ধে। কারো সাথে তার তুলনা চলে না। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনে মুক্তিযুদ্ধের সফল ও প্রধান নেতৃত্বদানকারী নেতা তাজউদ্দিন আহমদ। তাজউদ্দিন ছাড়া দেশ স্বাধীন হতো কিনা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অথচ স্বাধীনতা দিবসে কেবল বঙ্গবন্ধুরই গুণ-গান-কীর্তন করা হয়। কখনো তাজউদ্দিন আহমদের মূল্যায়ন করা হয়না। বরং বলা চলে তা না করার জন্য আওয়ামী লীগের কাছে অবহেলিত এবং উপেক্ষিত রাখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নামকরণ হয়েছে। তার নামে হবে, হওয়া উচিত তাতের কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু আপনার নিজের নামে, মা-ভাই সকলের নামে একের পর এক নামকরণ করে চলেছেন। অথচ তাজউদ্দিনের নামে কিছুই করবেন না, আপনি সত্যিই চরম সংকীর্ণ ও স্বার্থপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আপনি ইতিহাস কুক্ষিগত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত সেটাই প্রমাণিত সত্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here