হিন্দুরাষ্ট্রের যোগী আদিত্যনাথের লক্ষ্য এবার রামমন্দির নির্মাণ

– সুব্রত বিশ্বাস

সুব্রত বিশ্বাস

কট্টর হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথকে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছে বি জে পি। মূখ্যমন্ত্রী মনোনয়নের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং জাতপাতের বিন্যাসের মধ্য দিয়েই বি জে পি জিতেছে উত্তর প্রদেশে। নির্বাচনে বি জে পি’র জয় যেমন দেশের পক্ষে বিপজ্জনক ঘটনা। এই জয়ের পরে আদিত্যনাথ যোগীকে মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া ভারতের মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।। তবে গুজরাট গণহত্যায় অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদী যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন তাহলে যোগীই বা উত্তর প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী হবেন না কেন? বি জে পি’র মধ্যে কট্টর হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে অসংখ্য অপরাধমূলক অভিযোগ। গোরখপুরের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক মামলায় তিনি অভিযুক্ত। দাঙ্গাবাজ এই গেরুয়াবসনধারী সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে জঘন্য মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন সময়ে। মহিলাদের সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করতে আটকায় না এই বি জে পি নেতার। এই ঘৃণ্য প্ররোচনামূলক প্রচার এবং সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণই যোগী আদিত্যনাথের মূখ্যমন্ত্রী পদে বসার গুণাবলী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ব্যক্তিকে মূখ্যমন্ত্রীর পদে বসানো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বি জে পি উত্তর প্রদেশকে হিন্দু রাষ্ট্রের গবেষণাগারে পরিণত করতে চাচ্ছে। নির্বাচনী

যোগী আদিত্যনাথ

প্রচারে নরেন্দ্র মোধীর শ্লোগান সব কা সাথ, সব কা বিকাশ যে সম্পূর্ণই ভূয়ো তাও প্রমাণতি হলো মূখ্যমন্ত্রী বাছাই থেকে। দেশজুড়ে আশঙ্কা, যোগী শাসনের শুরু থেকেই উত্তর প্রদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক এবং দলীয় আক্রমণ নামিয়ে আনা হবে। শুরু হতে পারে গ্রেফতার, পুলিশী হয়রানি। শুধুমাত্র আতঙ্ক সৃষ্টিতে কাজ না হলে হিংসাত্মক ঘটনাও ঘটবে। সংখ্যালঘুদের দমিয়ে রেখে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে একতরফা ফায়দা তোলার চেষ্টা করবে বি জে পি। সেই কাজে তাদের সেনাপতি হয়েছেন যোগী আদিত্যনাথ।

উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে মোদী এবং অমিত শাহ সাম্প্রদায়িক প্রচার চালিয়েছেন। মোদী নিজে কবরস্থান ও শ্মশানের কথা তুলেছেন। বি জে পি সভাপতি বিরোধীদের ’কবব’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। মোদী সরকার যে তার কোন সাফল্য তুলে ধরে নির্বাচনে এগোতে পারবে না তা বুঝতে পেরেছিল বি জে পি নেতৃত্ব। সেকারণেই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকেই ভোটে জেতার পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। সঙ্ঘ পরিবার চাচ্ছে, হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধানের পরিবর্তে হিন্দুরাষ্ট্রের কাঠামো চালু করতে। সেকারণেই উদগ্র হিন্দুত্বকে তাদের মুখ হিসেবে উত্তর প্রদেশে ব্যবহার করতে চেয়েছে সঙ্ঘ পরিবার। যোগী আদিত্যনাথ তার নির্বাচনী প্রচারে উগ্র সাম্প্রদায়িক মন্তব করেন। তিনি বলেছেন, ’সমাজবাদী পার্টি এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে। বি জে পি এলে অনেক রামমন্দির হবে। উত্তর প্রদেশের বর্তমান মূখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, ’শাহরুখ আর হাফিজ সাঈদ একই ভাষায় কথা বলছে। শাহরুখের পাকিস্তান চলে যাওয়া উচিত। যোগী আদিত্যনাথের বক্তব্য হলো, ’ওরা একটা হিন্দু মেয়ের ধর্ম বদলালে আমরা ১০০টা মেয়ের ধর্ম বদলে দেবো।’ তার হুমকি, প্রত্যেক মসজিদে গৌরী-গণেশের মূর্তি রাখবো। এই ধরনের চরম সাম্পদায়িক মন্তব্য যিনি প্রকাশ্যে করতে পারেন? এই মূখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসংখ্য ফৌজদারি মামলা রয়েছে। উত্তর প্রদেশের সংখ্যালঘু মানুষের কাছে যে ব্যক্তি ’ত্রাস’ বলে পরিচিত তাকে করা হয়েছে রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী। উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বি জে পি তাদের বিপুল অর্থ শক্তি ব্যবহার করেছে। মিডিয়া বি জে পি’র পক্ষে একটানা প্রচার করেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটানা বসেছিলেন উত্তর প্রদেশে। সশরীরে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তার সমস্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যবহার করেছেন দলের স্বার্থে। এই সঙ্গে ছিল সাম্প্রদায়িক মেরুকরণেরর পক্ষে প্রচার। নরেন্দ্র মোদী জানেন-দেশের মানুষের স্বার্থে উন্নয়নের কাজ তিনি করতে পারেননি। বরং বেকারি, কর্মচ্যুতি, জিনিসপত্রের দরবৃদ্ধি, কৃষক আত্মহত্যা সবকিছুই ঘটে চলেছে। এই সংকটকে আড়াল করার একমাত্র পথ সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তথা উগ্র হিন্দুত্বকে জাগিয়ে তোলা। সব রাজ্যেই এই অস্ত্র নিয়ে তৎপর সঙ্ঘ পরিবার। সঙ্ঘ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।

উত্তর প্রদেশের ভোটে জিতে চাঙা বি জে পি’র মুখে ’রাম নাম’ বেশ জোরালোভাবেই শোনা যাচ্ছে। ’সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর গল্প শুনিয়ে উত্তর প্রদেশে শুরু হয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর ভোটের প্রচার। কিন্তু যতদিন গেছে বিকাশের গল্প জনমনে দাগ কাটেনি। তখনই আনুষ্ঠানিকভাবে রামমন্দিরের নাম নিতে দেখা গেল বি জে পি সভাপতি অমিত শাহের মুখে। উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনে দলের ইশতেহার প্রকাশকালে অমিত শাহ জানিয়ে দেন, রামমন্দির বানাবে বি জে পি। ভোটে মন্দির বানাবার শ্লোগান দারুণভাবে কাজে লেগেছে। বিপুল আসনে জিতেছে বি জে পি। বি জে পি নেতাদের বিশ^াস, এই বিপুল জয়ের নেপথ্যে কাজ করেছে হিন্দুত্ববাদী শ্লোগান। তাই এক কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা যোগী আদিত্যনাথকে বসানো হয়েছে রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রিত্বে। যোগী সবে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু তার অনুগতরা এখনই লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। ’ইউ পি-মে রহেনা তো যোগী যোগী কহনে হোগা’। ’জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি এখন সর্বত্র। ’হিন্দু যুব বাহিনী’ নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন যোগী। এই সংগঠনের সদস্যরাই এখন যোগীর গুণগান এবং অযোধ্যায় রামমন্দির বানাবার দাবিতে তৎপর হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি আর এস এস, বি জে পি, ভি এইচ পি-র মতো সংগঠনগুলোও মন্দিরের দাবিতে এখনই সমগ্র উত্তর প্রদেশজুড়ে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বি জে পি নেতারা মনে করেন, হিন্দুত্বের ইস্যুতে উত্তর প্রদেশের মানুষ অকাতরে তাদের ভোট দিয়েছেন। এটা তাদের হিন্দুত্বের আদর্শের প্রতি ইতিবাচক দিক। মানুষের এই মনোভাবকে এখন রামমন্দির নির্মাণের দিকে নিয়ে যেতে হবে। ২০১৯ সালে লোকসভার নির্বাচনে। উত্তর প্রদেশে মোট লোকসভার আসন ৮০। এর অধিকাংশটাই কবজা করতে না পারলে নরেন্দ্র মোদীর দিল্লির তক্ত অক্ষত রাখা মুশকিল হয়ে উঠবে। সুতরাং ভোটের আগেই রামমন্দির নির্মাণের বিষয়টি ফয়সালা করে নিতে হবে। রাম নাম আর রামমন্দিরকে কেন্দ্র করে লোকসভা ভোটের আগেই আরও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিষয়টি পাকা করতে হবে। ভি এইচ পি নেতা প্রবীণ তোগাড়িয়া ইতিমধ্যেই হিন্দুত্ববাদী অনুগতদের আশ^স্ত করেছেন, শীঘ্রই অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের পথে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবো। এব্যাপারে দিল্লির সরকারের মনোভাব জানতে বিলম্ব হলে আমরা নিজেরাই মন্দির নির্মাণে উদ্যাগী হবো। নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী যে মনোভাব নিয়ে প্রচার করেছেন তাতে বৃহত্তর পরিধিতে মন্দির নির্মাণের আকুতিই প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাৎ হিন্দুত্ব ছাড়া বি জে পি’র আর কোনো আশ্রয় নেই। গুজরাট দাঙ্গায গণহত্যা, উত্তর পদেশে মুজফফরনগরে দাঙ্গা থেকে মানুষের অভিজ্ঞতা, মোদী-বি জে পি’র সর্বাঙ্গ সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত উপাদানে গড়া। তাই হিন্দুত্বের ধ্বনি তুলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের পথে গেছেন। রাজ্যের মানুষের মনে বিভাজন আনতে সক্ষম হয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে সফল হয়েছেন। কিন্তু বিপদের বার্তা হলো- আর এস এস-বি জে পি’র অভিসন্ধিতে উত্তর প্রদেশে শান্তি থাকবে তো? নাকি মন্দির ইস্যুতে ফের হানাহানির চ্রিত দেখা যাবে? ধর্মনিপেক্ষ ভারতবাসীর চিন্তা এখানেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here