বিজয় নিশান উড়ছে ওই

– জীবন চৌধুরী

জীবন চৌধুরী

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে মহান মুক্তিযুদ্ধের যে বীজ অংকুরিত হয়েছিল তার পেছনে গানের প্রেরণা ও পরিচয় লক্ষ্য করা যায় একাত্তরের সেই ভয়াল দিনগুলোতে ‘ মোরা একটি ফুলকে বাঁচবো বলে যুদ্ধ করি’ এবং সেই যুদ্ধজয়ী গানের ভাষায় প্রাণের আহবান ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল/জোয়ার এসেছে জনসমুদ্রে’ কিংবা বিজয় নিশান উড়ছে ওই’। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ এবং স্বাধীনতা-উত্তরকালে গান পালন করছে সাংস্কৃতিক পরিম-ল ছাড়িয়েও ক্ষেত্রবিশেষ রাজনৈতিক ভূমিকা, যা সর্বজনগ্রাহ্য অর্থাৎ সার্বজনীন মতবাদের প্রতিধ্বনি হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে গণজাগরণমূলক এবং দেশাত্মবোধক গান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর দেশের মুক্তিকামী মানুষ শুনতে পেল-‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালোবাসি’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান- যেঙ গান পরবর্তীকালে পেল আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা। ওই গানটি তার পরদিন শুনেছি আমরা এবং আগে ও পরে বারবার মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে (তখন মেজর) স্বাধীনতার ঘোষণা, বিবৃতি-বক্তৃতা, যা প্রায় মৃত প্রাণে করেছিল নব প্রাণসঞ্চার। তারপর মুক্তিযুদ্ধের ধার অনেকটা বিসর্পিল পথ াতিক্রম করেছে। এ সঙ্গে নতুন নতুন গান রচিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে যেমন করেছে শাণিত, বজ্রকঠিন, তেমনি দেশের আপামর জনগণকে উজ্জীবিত করেছে দেশপ্রেমের মহামন্ত্রে।

সেই উত্তাল দিনগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, মৃত্যুকে পায়ে দলে শাহবাগস্থ জাতীয় প্রচার ভবন, রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে গানের টেপ বের করে নিয়ে এসেছিলেন আশফাকুর রহমান খান, শহীদুল ইসলাম, টিএইচ শিকদারের মতো সাহসী ক’জন শব্দ- সৈনিক এবং পরে তারা গানগুলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পাচার করে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সংগ্রামে যে দুঃসাহসও জন্মায় তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গানের টেপ পাচারের ঘটনা। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এসব শব্দ- সৈনিকদের নাম-নিশানা নেই বললেই চলে। তাছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতারের যেসব সংগঠক, শিল্পী, কলা-কুশলী দুর্জয় সাহসে পাক-সামরিক বাহিনী পরিবেষ্টিত দুর্গম এলাকায় গিয়ে, গান গেয়ে এবং বিভিন্নভাবে জনমত গঠন আর জনগণকে আলোর পথ দেখিয়েছেন, তাদের অনেকেই আজ অবহেলা-অনাদরে উপেক্ষিত। এরা পাননি তাদের যোগ্য অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি। এই অপারগতা কিংবা হীনমন্যতা আমরা ঢাকবো কী দিয়ে? আজ খুব মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং এর সঙ্গে জড়িত সাহসী সৈনিকদের ভূমিকা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর সেসব শব্দ সৈনিক রচিত, সুরারোপিত, াবিস্মরণীয় গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-প্রারম্ভিব ও সমাপ্তি অধিবেশনে সূচক ধ্বনি হিসেবে ব্যবহৃত গাজী মাজহারুল আনোয়ার রচিত ‘জয় বাংলার জয়’ (সিনোমার গান, গ্রামোফোন রেকর্ড), দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখা যায় ৩ এপ্রিল থেকে ২৫ মে সকালবেলা পর্যন্ত আগরতলা শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটারে প্রচারিত এই গানগুলো: আমার সোনার বাংলা (রবীন্দ্র সঙ্গীত, ঢাকার গ্রামোফোন রেকর্ড), কারার ওই লৌহ কপাট (নজরুল গীতি), দুর্গম গিরি কান্তার মরু, মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম (সব গ্রামোফোন রেকর্ড), কেঁদো না মাগো (চট্টগ্রাম বেতারের স্টুডিও রেকর্ড), তৃতীয় পর্যায় ২৫মে বিকাল থেকে ২ জানুয়ারি, ৭২’ পর্যন্ত ৫০ কিলোওয়াট, মিডিয়াম ওয়েভ কলকাতা, জনতার সংগ্রাম চলবেই চলবে আমাদের সংগ্রাম চলবে (সিকান্দার আবু জাফর), বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা (সলিল চৌধুরী), ঢাকা বেতার স্টুডিও থেকে সংগৃহীত- সোনা সোনা সোনা (কথা: আবদুল লতিফ, শিল্পী শাহনাজ রহমত উল্লাহ), সালাম সালাম হাজার সালাম (কথা: ফজল-এ-খোদা, শিল্পী মোঃ আবদুল জব্বার), মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রেকর্ডকৃত: কথা: গোবিন্দ হালদার, শিল্পী আপেল মাহমুদ) ইত্যাদি।

১৯৫২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ৫৫ বছরে গণজাগরণমূলক গান লেখা হয়েছে অসংখ্য, তার মবকিছুর বিচার-বিশ্লেষণ করা, এমনকি প্রতিটি গানের কলি উল্লেখ করতে সময় ও স্থান সংকুলনের রয়েছে প্রশ্ন। এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ পুস্তক লেখা ছাড়া ছোট্ট কোনো নিবন্ধে পূর্ণ চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমরা ‘৫১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রচিত সব জাগরণ ও উদ্দীপনামূলক গানের ওপর একটি ইতিহাস রচনার জোর তাগিদ অনুভব করছি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংগঠকদের প্রতি নিবেদন করছি গভীর শ্রদ্ধা, তাদের অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য। দেশে কত রকমেরই তো মেলা হয়, সরকার কি পারে না স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি মেলার আয়োজন করতে? বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পৃথক কোনো পদক-পুরস্কারের প্রচলনে উদ্যোগী হতে? ইতোমধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক গীতিকার, শিল্পী, সুরকার মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের অধিকাংশই থেকে গেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। এভাবে সময় পার করে দিলে মিলন- মেলার কোনো অবকাশ থাকবে কি? জীবদ্দশায় কোনো মূল্য তাদের না দিয়ে মরণের পর ফুল দিয়ে স্মরণ করার মতো মহিমার কী দরকার? পরিশেষে বলা প্রয়োজন, সংগ্রামী দিনের সঙ্গীত দেশ গঠনেও জনগণকে উদ্বুদ্ধ অনুপ্রাণিত করতে পারে, হতে পারে শক্ত হাতিয়ার। কারণ এখন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে, শোষণমুক্ত সমাজ গঠন গণতান্ত্রিক চেতনা জোরদার করতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনিবার্য প্রয়োজন সেই গান হতে পারে ঐতিহ্যের যোগ্য উত্তরাধিকার, অনুপ্রেরণা এবং নিখাদ দেশপ্রেমের উজ্জল উৎস। পরিশেষে বলা প্রয়োজন, বিজয় নিশান এখনো উড়ছে আবহমান বাংলার সুবজঘেরা জমিনের ওপর আকাশ স্পর্শ করে, যা স্মরণ করিয়ে দেয় সুখী-সুন্দর দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ ও অব্যাহত প্রচেষ্টা, যার মধ্য দিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারি হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি ভুলে গিয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here