লস এঞ্জেলেসে গণহত্যা দিবসের অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরার আহবান

লস এঞ্জেলেস প্রতিনিধি: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সহযোগিতায় লস এঞ্জেলেসে নবগঠিত সংগঠন ক্রান্তির উদ্যোগে আয়োজিত গণহত্যা দিবসের আলোচনা সভায় বক্তারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার ভয়াবহতা দেশে-বিদেশে আরো ব্যাপকভাবে তুলে ধরার আহবান জানান। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ‘২৫শে মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস’ অনুমোদিত হওয়ার পরপরই ‘ক্রান্তি’ অভিবাসী নতুন প্রজন্মের সামনে একাত্তরের ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র তুলে ধরার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২৫ মার্চ শনিবার লস এঞ্জেলেসের একটি রেস্তোরাঁয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে পালিত হয় দিবসটি ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে লস এঞ্জেলেসের কনসাল জেনারেল প্রিয়তোষ সাহা বলেন, পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। আপনাদের মনে আছে কি না জানি না, ‘৭১ এর শেষ দিকে পাকিস্তানের পরাজয়ের আগ মুহূর্তে জাতিসংঘে রাশিয়া আমাদের পক্ষে ভেটো প্রয়োগ এবং পোলান্ডের সমর্থনের পর পাকিস্তানের প্রতিনিধি জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান চলে যায় যাক, পাকিস্তান হেরে যায় যাক কিন্তু আমরা হাজার বছর ধরে বাঙালীকে শায়েস্তা করে যাবো । আজ বাংলাদেশে যে জঙ্গী উত্থান হয়েছে তার মদদদাতা কে তা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না ।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি তখন ছোট। আমরা নেত্রকোনায় ছিলাম। আমরা দেখেছি, কি বীভৎস নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা।

তিনি প্রবাসের নতুন প্রজন্মের কাছে গণহত্যার ভয়াবহ ইতিহাস তুলে ধরার আহবান জানান।

বিশেষ অতিথির ভাষণের ড. কাজী নাসির উদ্দীন বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তির পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে গণহত্যার কথা তুলে ধরেন । তিনি বলেন, গণহত্যা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে নিরুপণ করা হয় না । বিশ্বে ১৭টি গণহত্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গিনিস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ৫টি দেশে ভয়াবহ গণহত্যা সংঘঠিত সে তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে ।

অনুষ্ঠানের মূলবক্তা লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার, ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ‘একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়’ গ্রন্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত আহমেদ মূসা বলেন, একাত্তরে এত অল্প সময়ে এত মানুষ গণহত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল । ২৫ মার্চ কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাপুরুষোচিত গণহত্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংঘটিত অন্য যে কোনো গণহত্যার চেয়ে ভয়াবহ ছিল। হিটলারের হাতে ৬০ লাখ ইহুদি গণহত্যার শিকার হয়েছিল ৫ বছরে । আর আমাদের দেশে ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছেন।

১৯৮০-৮১ সালে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনগুলির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, রাজাকার-আলবদরসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং একাত্তরের গণহত্যার ভয়াবহতা দেশে-বিদেশে তুলে ধরার দাবি নিয়ে আকরগ্রন্থ ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ প্রকাশ, নির্মূল কমিটি গঠন এবং গণআদালত সৃষ্টির প্রেক্ষাপট বর্ণণা করে আহমেদ মূসা বলেন, সেদিনের সেই ডাক ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারার কারণেই নতুন প্রজন্ম দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে, এ আন্দোলন সফল হতে চলেছে।

আহমেদ মূসা আরো বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং একাত্তরের গণহত্যার ভয়াবহতা দেশে-বিদেশে তুলে ধরা ও রাজাকার-আলবদরদের বিচারের দীর্ঘদিনের দাবী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাহাড়ের মতো অটল থেকে পূরণ করেছেন। এ কারণে তিনি ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন ।

ক্রান্তি আয়োজিত গণহত্যা দিবস পালনের এই অনুষ্ঠানের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ফাউন্ডার ট্রাস্টি জনাব মফিদুল হকের প্রেরিত ‘রিকগনিশন অব বাংলাদেশ জেনোসাইড’ লেখাটি পড়ে শোনায় তরুণ প্রজন্মের জিসান মাহমুদ ও তাঞ্জিনা হক ।

স্বাগত বক্তব্যে ক্রান্তি’র সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান খোকা বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছিল তা এখানকার বাঙালী প্রজন্মের অনেকে জানে না । বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস’ অনুমোদিত হওয়ায় আমরা প্রথমবারের মতো লস এঞ্জেলেসে শিশু-কিশোরদের নিয়ে অনুষ্ঠানটি করছি । এখানকার শিশুরা বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে না । কিন্তু তাদেরকে বোঝাতে হবে, তাদের পূর্বপুরুষদের আবাসস্থল বাংলাদেশে । সেটি তাদের শেকড় । তাকে অস্বীকার করা যায় না । আমেরিকার পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো তাদের হৃদয়ে ধারণ করা উচিৎ । ক্রান্তি সে লক্ষ্যে কাজ করে যাবে ।

উপস্থিত অভিভাবকদের তিনি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানান । উল্লেখ্য, আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে নবগঠিত সংগঠন, ‘ক্রান্তি’ (সেন্টার ফর বাংলাদেশ ডায়ালগ, ইউএসএ) বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ২১শে ফেব্রুয়ারি এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস শিশু-কিশোর, যুবক ও তরুণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ শুরু করেছে ।
মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান খোকা পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধেরও সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেন ।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ক্রান্তি’র সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা জাহেদুল মাহমুদ জামি ।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ৫০টি স্থিরচিত্র অনুষ্ঠানস্থলের ভেতরে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন ক্রান্তি’র যুগ্ম-নির্বাহী পরিচালক জনাব শওকত চৌধুরী । অনুষ্ঠানে ঢাকার খ্যাতনামা প্রকাশনী সংস্থা ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশত বই প্রদর্শন করে । দর্শক সারির প্রথম তিনটি আসনে শিশু-কিশোরদের বসার ব্যবস্থা করা হয় ।

শিশুশিল্পী ফারিয়ান আলম জামী ভায়োলিনে বাংলাদেশের ‘জাতীয় সঙ্গীত’ বাজায় । এ সময় সকলে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান । ক্রান্তি’র নির্বাহী পরিচালক শিলা মোস্তফার সঞ্চালনায় সন্ধ্যা ৭টায় আবৃত্তিকার মাহিদুল ইসলামের কণ্ঠে ধারণকৃত কবি শামসুর রাহমানের ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ কবিতাটি বাজিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয় ।

মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য চিত্রের সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ক্রান্তি’র পরিচালক আল-আমিন বাবু এবং রিয়া আনহার ।
যুদ্ধকালীন গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন, লুনা রহমান এবং শেলী আলম । স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন, আমিনুল হক, আহমেদ বশীর, ক্রান্তি’র পরিচালক শামীম রেজা এবং ক্রান্তি’র গণসংযোগ পরিচালক হানিফ সিদ্দিকী।

লস এঞ্জেলেসের অভিবাসী লেখক কাজী রহমানের একাত্তরের ভীতিকর অভিজ্ঞতা ‘সেই কিশোর চোখে পঁচিশে মার্চ’ পড়ে শোনান, ক্রান্তি’র সাহিত্য-বিষয়ক পরিচালক হাসিনা বানু ।

বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় লিখিত বই ‘১৯৭১ : ভয়াবহ অভিজ্ঞতা’, ‘১৯৭১ ঃ ড্রিডফুল এক্সপেরিয়েন্স’ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে আহরিত অংশ পাঠ করে শোনায় তাহশিয়ান খান, তারিনা খান, তাপসি নিলা, ফাতিমা দিনা, তাবরিজ খান, তন্বী নন্দী, সুধা নন্দী এবং আলভী আহমেদ।

ধন্যবাদ জ্ঞাপনে করে ক্রান্তি’র সাংগঠানিক পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সময়ের স্বল্পতার কারণে সব বাবা-মায়েদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি । তবে ভবিষ্যতে আমাদের অনুষ্ঠানে শতাধিক শিশু-কিশোর উপস্থিত থাকবে ।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে, বিদ্যাপ্রকাশের সৌজন্যে অংশগ্রহণকারী এবং উপস্থিত শিশু-কিশোরদের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা সম্বলিত টি-শার্ট বিতরণ করেন কনসাল জেনারেলের সহধর্মিনী স্নিগ্ধা সাহা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here