আওয়ামি লীগের পরাজয় ও ‘সরকারের বিজয়’

– শামসুল আরেফিন খান

আকাশে কালো মেঘ জমলে মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক ! মেঘে মেঘে ঘর্ষনে বিদ্যুত চমকালে বুক কেঁপে ওঠে। তবে সব গর্জনে বর্ষণ হয়না । আকাশের কালো মেঘ সূর‌্যকে কিছু সময়ের জন্য আড়াল করতে পারলেও তার অস্তিত্ব বিলীন করতে পারেনা।এই সু্ক্ষ চেতনা দুস্থ মনে সাহস ফিরিয়ে দেয়। হতাশা কেটে যায়।আমিও হতাশ হইনি। কথাটা আমার মনে এসেছিল , কিন্তু মুখে আনা শোভন মনে করিনি।আশা ছিল পশ্চিম আকাশে ঈষৎ হেলে পড়া সেই অনির্বাণ অরুণরবি নিশ্চই ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রিয় পৃথিবীকে একথাল পূর্ণ চাঁদ উপহার দিয়ে যাবে ।সেই জোছনায় পথিক পথ খুঁজে পাবে। নাবিক বন্দর খুঁজে নেবে।মধুচন্দ্রিমা নতুন জীবনের অভ্যূদয়কে উজ্জীবিত করবে। আমি চিরকালই আশাবাদী।
আমার ভরসার প্রদীপ আমাকে আশাহত করেনি। খুব শান্ত মৃদু , মাঝ দরিয়ার মত গম্ভীর স্থিত কন্ঠ আমাকে আশ্বস্ত করলো । “আইনজীবী নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিতে হবে“।অল্প কিছু ভোটের ব্যাবধানে ঢাকা জজ কোট ও নিম্ন আদালতের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামি লীগ হেরে গিয়েছে।খোলা চোখে দেখা যায়না , আওয়ামি লীগ বিরাধী কোন শক্তির অস্তিত্ব। আমিতো দেখেছি প্রয়াত জাতীয নেতা জিল্লুর রহমানের স্নিগ্ধ সমীরে ঋদ্ধ ও শাহারা খাতুনের শান্ত সলীলে সিক্ত ঢাকা বারে মিত্র অনেক। বন্ধুও অগণিত। তারা বঙ্গবন্ধুর ভক্ত । মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্নাত। শেখ হাসিনার অন্ধ স্তাবক না। কিন্তু শুভাকাঙ্খী, যারা তাঁর সততাকে সমীহ করে, সাহসকে অভিভাদন জানায়। নিরাপত্তা সঙ্কট দেখে স্তম্ভিত হয় ।শঙ্কিত হয় । তারা স্বাধীনতা বিরেোধী তান্ডবকে ঘৃণা ও ধিক্কার জানায়।কিন্তু চলতি হাওয়ায় জার্সী বদলকরা “ইয়া আলী- জয়মাকালী“ জপ করা নব্য আওয়ামিদের আস্ফালন, দলবাজি, দলাদলি, স্তুতির স্থুল গুঞ্জন , স্তাবকতার অমার্জিত বচন, সেই মুক্তমনের সুধিজনের বিশ্বাসের বুকে শেল হানে। স্বাধীনতার সপক্ষের ঐক্য চিড় খায়। নির্বাচনের ভোটফল সেই সত্যেরই আভাস দিয়েছে।এই পরাজয়ে লোকসান যাই হোক লাভও কম না।শাপে বর ! চন্ডাল নেতারা বুঝবে দলের স্বার্থে তাদের উড়াল চুল ছেটে নখ কেটে দাঁত মেজে প্রকৃতিস্থ হওয়া দরকার । কর্মবীর সাধারণ সম্পাদক বুঝবেন হম্বিতম্বি চড় থাপ্পড় ছেড়ে জিল্লুর রহমান , আব্দুল জলিল ও সৈয়দ আশরাফুলের মত সাদা চোখে প্রেমের কবিতা লেখা উচিৎ ।তাতেই তৃষিত প্রেমিকরা নির্মল পিপাসার জল পেয়ে তৃপ্ত হবে।
আওয়ামি লীগের প্রথম সফল সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রণিধান করে তাঁর ঐতিহ্যেরপথে হাটলে তিনি নিজে যেমন সফল হবেন তেমনি দলও পায়ের নিচে শক্ত মাটি খুজে পাবে। লক্ষ্য করার বিষয় হোল এই যে,অওয়ামি লীগ ঢাকা বার , সুপ্রিম কোর্ট বার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে লড়েছে বিএনপি-জামাত-হেফাজত জোট ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে এককভাবে।

২০০৮ সালে ’৫৪,‘৭০ও ’৭৩ এর মত ব্যালট বিপ্লব হয়েছে মহাজোটের মহাঐক্যের অনুকূলে। তার ধারাবাহিকতায় ‘১৪ সালের সংকটকাল টা পার করেছে আওয়ামি লীগ মহাজোটকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। আওয়ামি লীগ দেশের সবচেয়ে প্রাচীণ , সবচেয়ে বড় দল।সেই অহমিকাটা রয়েছে তার অস্থি মজ্জায়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ এমনকি পুচকে নেতাদেরও বলতে শোনা যায় যে, অমুক ফালতু দলের তমুক নস্যি নেতা নৌকায় উঠেই জীবনের প্রথমবার এমপি মন্ত্রী ইত্যাদি হয়েছেন । নৌকা না পেলে তাদের জামানত থাকবে না।খুবই সত্যি কথা। কিন্তু কথা আছে , কেউ ধারে কাটে কেউ ভারে কাটে।কোন কোন জাগায় ভার দিয়ে ধারঠেকাতে অপারগ ডাকসাইটে ক্ষমতাধর নেতা পায়ের নিচে মাটি শক্ত করতে জামাত -হেফাজত – বিএনপির উচ্ছিষ্ট আবর্জনা গাজন দিয়ে সারা দেশে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি করে ফেলেছেন। খারাপ দৃষ্টান্তহলেও সেটাই অনুসরণ করেছেন সদরে অন্দরে বহু বরকন্দাজ। তরুণরা “বামাতি”বলে একটা নতুন শব্দচয়ন করেছে।হাইব্রিড বলছে কাদের আমি বুঝিনা। কথায় কথায় তারা কামান দেগে চলেছে ‘বামাতিবিরুদ্ধে। মাঝে মাঝে হাইব্রিডদেরও বেনামে তূলোধূনো করছে।তরুণদের দোষ দেব না। তারা চর্ম চক্ষে বাহির ভুবনটাই দেখতে পায়। অন্তরটা দেখার শক্তি ধৈর‌্য ইচ্ছা কোনটাই তাদের নেই। তারা দেখছে , একজন উটকো আত্মীয় দিনের পর দিন ‘গেষ্টরুমে’ শুয়ে বসে বাড়ির অন্ন ধ্বংস করছে, চর্বচোষ্যে ভাগ বসাচ্ছে”।শেকড়ের সন্ধান তাদের জানা নেই । সেজন্যে তাদেরকে দায়ী করবো না।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আওয়ামি লীগের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক মিত্র ছিল ‘বামাতি‘রা্ই। ১৯৪৮ সালে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাম সংগঠন ‘ছাত্র ফেডারেশনকে’ বন্ধু করেই ভাষা সংগ্রামের মশাল জ্বেলেছিলেন। ১৯৫২ সালে কেলেঙ্কারি ঠেকালেন জেল খানায় বসে আওয়ামি লীগের ‘যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক’ শেখ মুজিবুর রহমান ।ঈমানদার সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক আইনভঙ্গ করে ভাষা যুদ্ধ এগিয়ে নেয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। ডানবামের মিলন কেন্দ্র “যুবলীগ” ভাষা সংগ্রামকে বুকে ঠেলে এগিয়ে নিচ্ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান অনশন শুরু করলেন জেলের ভিতর রাষ্ট্রবাষা বাংলার দাবিতে। সে ভাবেই ঢামেক হাসপাতালে আসার সুযোগ পেলেন। আস্থায় নিলেন ‍যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তুখোড় বামাতি ইমাদুল্লাহকে। একুশের সকালে আমতলার ছাত্রসমাবেশে আওয়ামি মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও আওয়ামি লীগের নেতৃত্বে গড়া রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক কাজী গোলাম মাহবুব ১৪৪ ধারা ভাঙার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে টিকতে পারলেননা। শেখ মুজিবের অনুসারীরা তাঁর নির্দেশে বামাতিদের হাতে হাত রেখে রাজপথে নেমে না এলে আওয়ামি লীগের ললাটে কাপুরুষের অনপনেয় কলঙ্ক তিলক লেগে থাকতো। সেটা আর কেউ না জানলেও শেখ হাসিনা নিশ্চই জানেন। ইমাদুল্লাহ ভাইর অকাল প্রয়ান ঘটলো দুরারোগ্য গুটি বসন্তে ভুগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র বামাতি স্বদেশ বোসকে জীবন সাথী করলেন তাঁর বিধবা স্ত্রী । স্বদেশ বোসও প্রয়াত হয়েছেন। ইমাদুল্লাহ ভাষা সংগ্রামে যে মহান অবদান রেখেছিলেন তার স্বীকৃতিতেই হয়ত বিধবা নূরজাহান বোস একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। নায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইমাদুল্লার পরিবার থেকে তার ভাইপো সংগ্রামী মুজিব সৈনিক আল আমীন অনুযোগ করেছে। তার আবেগ দাবি করছে ইমাদুল্লার জন্যে মরণোত্তর একুশে পদক! সে যাইহোক, শেখ হাসিনা তাঁর মহান পিতার আদর্শ “মুজিববাদ“ তাত্বিকভাবে কতটা ধারণ করেন তা বুঝিনা । তবে এটা জানি, মুজিবের সংগ্রামী ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মন্ত্রিসভায় কৃষি , শিক্ষা , বিমান-পর‌্যটন , তথ্য , বিজ্ঞান গবেষণাপ্রভৃতি দফতর ‘বামাতি‘দের ওপর ন্যস্ত খেছেন।তাঁর সাফল্যের বড় ভাগটা এসেছে
সেই সব খাত থেকেই।সেখানে তাঁর আস্থা মার খায়নি ।

দেশে বিদেশে কম্যুনিস্টরা ভাঙতে ভাঙতে অনুতে পরিণত হয়ে প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। একথা শতভাগ সত্যি হয়ত না ,তবে কাছাকাছি। সে কারণ অসংখ্য,অগনিত মুক্ত মনের মানুষ তাদের ওপর ভরসা রাখে না। তাই বলে সংখ্যায় ও গুনগতভাবে তারা কমেনি ।যুক্তরাষ্ট্রের মত পুজিবাদী দেশের মুক্তমনের তরুণরা “ অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট” আন্দোলন করে ২০১০ সালে বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ওবামাকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে তারা অনন্য ভুমিকা রেখেছে। ১৭ সালের নির্বাচনে তারা মনের মত প্রার্থী পায়নি । তবু ৭ মিলিয়ন মুক্তমনা তরুণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল তাদের একজন বাঞ্ছিত ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করার জন্যে।একটা ভুল ধারণা রয়েছে , সেটা নিরসন হওয়া দরকার। এ কথা ঠিক যে কম্যুনিস্টরা সবাই মার্কসবাদী। কিন্তু মার্কসবাদীরা সবাই কম্যুনিস্ট না। যে সব মার্কসবাদী কোন না কোন কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে সমাজ পরিবর্তনের জন্য নির্লোভ নির্মোহ হয়ে নিবেদিত থাকে তারাই কেবল কম্যুনিস্ট । আবার কম্যুনিস্ট মাত্রেই সমাজবাদী হলেও সব সমাজবাদী কম্যুনিস্ট এমনকি মার্কসবাদীও না।কার্লমার্কসের জন্মের আগেও শতবর্ষব্যাপী সাম্যবাদ ও সমাজবাদ নিয়ে অনেক গগনচারী কল্পনা ও গবেষণা ছিল।কার্লমার্কস বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছেন। ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে হাল ও পালের সমন্বয়ের তাৎপর‌্য তুলে ধরে কঠোর শৃঙ্খলার সবক দিয়েছেন। তার পরেও কম্যূনিস্টরা বার বার ভুল করেছে।

জার্মানির কম্যুনিস্ট পার্টি মস্কোর বৃষ্টিতে বার্লিনে ছাতা ধরে সমূলে নির্বংশ হোলো।স্যোশাল ডেমোক্রাটদের সাথে তৃতীয় রাইখে ঐক্য করলোনা । চরম দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একলা লড়তে যেয়ে হিটলারের নাৎসী ‘এসএস‘বাহিনীর হাতে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হোলো কয়েক লক্ষ কম্যূনিস্ট নেতা কর্মী।স্যোশাল ডেমোক্রাটরাও হয় মরলো না হয় দেশ ছেড়ে পালালো। সেই একই উন্নাসিকতার খেসারত দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক হিংসায় জর্জরিত ভারত উপমহাদেশের বিভাজিত হিন্দু মুসলমান। ইরাকের কম্যুনিস্টরা নাসের –সাদ্দামের সেক্যুলার ঐক্যের আহবান প্রত্যাখ্যান করায় সেখানে আজ শরীয়াবাদী আইসিস এর বিষবৃক্ষ পল্লবিত হয়ে মানব সভ্যতাকে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে ফেলছে।প্রগতির মর্মমূলে শেল বিদ্ধ করে চলেছে।তবুও বিশ্বের প্রথম বাঙালিরাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কম্যুনিস্টদের ওপর ভরসা রেখেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মরণ যুদ্ধে নেমেছিলেন।

বাঙলির ভাষা সংগ্রামকে হিন্দু ষড়যন্ত্র বলে বলি দেয়ার জোর প্রচেষ্টার সেই সঙ্কটকালে জ্ঞান তাপস ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন “দাড়িটুপি দিয়ে মুসলমান চেনা যায়, টিকি পৈতা দিয়ে বামন চেনা যায় , আর ভাষা দিয়ে বাঙালি চেনা যায়“।যে দাড়ি মুখমন্ডলে শোভা পায় তা দিয়ে কার্লমার্কস , আইস্টাইন , রবীন্দ্রনাথ ও মওলানা ভাসানী , মওদুদি গোলাম আজম ও শফি মওলানাদের আলাদা করে চেনা যায়। কিন্তু দাড়ি যাদের মুশতাক , জিয়া , শাহ আজীজ ওসমানি খন্দকারদের মত পেটের ভিতর গজায় তাদের চেনা ভার। বাঙলাদেশে ইদানিংকালে পেটে দাড়ির জঙ্গল বেড়েছে। ভয়টা সেখানেই।তারা চাপাতি মেরে মুক্তমনের মানুষগুলোর মনে অনাস্থা ও অবিশ্বাসের মেঘ জমিয়ে দিয়েছে। আওয়ামি বুর্জোয়াদের ওপর তারা ভরসা হারাতে বসেছে। কিন্তু যাবে কোথায় সেও তো কথা।সাঁঝ বেলায় গলা ধাক্কা খাওয়া “কেষ্ট বেটা চোর“ ভোর সকালে আবার হাসিমুখে বাবুর তামুক সেজে দেবে। এক সময় সেটাই ছিল সতঃসিদ্ধ।কিন্তু এখন বাতাস কেবল উত্তর দক্ষিণ করে না। চতুরঙ্গে ঘুরপাক খেয়ে অহরহ তান্ডব ঘটায়।একথাটা বাংলাদেশের ভালোমানুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভালোকরে বুঝলেই ভালো হয়।তাঁকে বুঝতে হবে ৪৯/৫১ ভোটের অংকটা বেশ জটিল্। সেটা এবার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডাম হিলারি ক্লিনটন খানিকটা বুঝেছেন। মুক্তমনারা অভিমান ছেড়ে তাঁর সাথে কাঠালের আঠার মত লেগে থাকলে ইতিহাস হয়ত অন্যভাবে লেখা হোতো। যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন বার্তা সংস্থা সিএনএন সত্যি কথাটা বলতে ছাড়েনি। ব্লগার হত্যা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সবরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্সাৎকার প্রচারকালে সিএনএন যে মন্তব্য করেছে সেটা প্রণিধানযোগ্য এবং চক্ষুউন্মীলক। -“সভ্য বিশ্বের আশা সরকার তার দেশের মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলবে।আর এই ধরণের ধর্মবিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করবে।কিন্তু যা ঘটেছে এটা তা নয়।বরং খুনিদের নিন্দা করার চেয়ে নিহতদের ওপরই যেন বেশি বিরক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান“।মন্তব্যটা বেদনাদায়ক।

কুমিল্লার ব্যাপারে আমার আবেগটা একটু অন্যরকম। সেটা প্রাঞ্জল করতে আমাকে পাঠকের ধৈরর‌্যচ্যূতি ঘটিয়েও একটা ছোট্ট গল্প বলতে হবে।২০০৪ সালের কথা। আগরতলা মামলারঅভিযুক্ত শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের প্রয়ান দিবসে “আগরতলা অভিযুক্ত পরিষেদের “ সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. খুলশিদ উদ্দীন আহমদ কবর জিয়ারত শেষে আমাকে নিয়ে গেলেন কর্ণেল (অব) শওকত আলীর বাড়িতে। থাওয়ার টেবিলে পরিচিত হলাম গৃহকর্ত্রীর সাথে।শওকত ভাবী আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, একটা সত্যি কথা বলবো ভাই, “আপনাকে কিন্তু সার্ট প্যান্টের চাইতে সেই খদ্দরেরপাঞ্জাবি আর টায়ার সোলের চটিতেই চমৎকার মানাতো। আমি সপ্রিতিভ হলাম। খুরশিদ ভাই মওকা বুঝে ফোড়ন কাটলেন তাঁর মাতৃভাষায়,“কী ব্যাপার আপনেগো মাঝে কুনো লাইন জাইন আছিলো নাকি !“ ভাবি সাদা কথায় জবাব দিলেন তা যা বলেছেন ভাই,সেই জমানায় অমন বৃন্দাবনের হিরোকে অমি একা কেন আরও অনেকেই মনে ধরে রেখেছিল“।ডা. খুরশিদের দশ বছরের ছোট ভাই আমার স্কুলের সহপাঠী ছিল। সেজন্যে আমি আর মুখ খুললামনা।

আমার সেই প্রিয় পোষাকের জন্মস্থান ছিল কুমিল্লার খাদিঘর। মহাত্মা গান্ধীর পদস্পর্ষধন্য খাদি প্রতিষ্ঠান ছিল দেশপ্রেমীদের অনুশীলনকেন্দ্র। আমি গিয়েছি সেখানে । তার শীর্ণ অবস্থা দেখেছি প্রয়াণের আগে। ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গের পর মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব সলিমুল্লাহ নিজে কুমিল্লায় যেয়ে তার “লাল ইশতেহারের“মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন।হিন্দুমুসলিম সখ্যের শতাব্দি প্রাচীন উঠোন ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় রক্তাক্ত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই কুমিল্লার মাটি রক্তাক্ত হোল ভাষা সংগ্রামের ওপেনিং ব্যাটসম্যান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের শহীদ শনিতে। সেই পবিত্র মাটিই ছিল আবার বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মুশতাক -জহুরুল কাইউম- তাহের ঠাকুরদের সড়যন্ত্রের লীলাভূমি।৭৫ এর পনের আগস্টের পর আওয়ামিলীগ নেতা এডভোকেট আফজাল সব প্রতিকূলতা ঠেলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুঁজি করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন ঘোর দুর্দিনে। আজ সেখানে শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী আফজালকন্যার পরাজয়কে “সরকারের জয় আওয়ামি লীগের পরাজয়“ বলে বগল বাজাতে যেমন রাজি নই । ঝড়ে বক মরলো । আর “আমি শত্রু শিবিরের
আস্থা অর্জন করতে সফল হলাম“ বলে নতুন নির্বাচন কমিশনার তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন। তেমন ফকিরের কেরামতিকেও আমি সাধুবাদ জানাতেও প্রস্তুতনা। বিএনপি জামাত হেফাজত ও তাদের রসুনের মত মিত্র জোট মিত্রবর্জিত আওয়ামি লীগের বিরুদ্ধে জয় পেলো কুমিল্লা পৌর নির্বাচনে। তাতে আগামীতে জাতির জন্যে কোন সোনালী ফসলের সম্ভাবনাও দেখিনা।আওয়ামি লীগ যদি মনে করে মিত্রদের কোন অভিমনের কারণে নয়, দলের “অন্তর্কলহে“ হয়েছে ‘হার মানা হার‘। তাহলে বুঝতে হবে মুশতাকের প্রেতাত্মারা নব্যধনীদের হাতে তামুক খেয়ে তরতাজা হয়ে উঠেছে।
সেটাও খুবই দুর্ভাগ্যজনক। হতাশাব্যাঞ্জকও বটে।

লেখক; ভাষা সঙগ্রামী,বঙ্গবন্ধুর সাবেক তথ্য সমন্বয়ক, মুক্তিয়োদ্ধা কলামিস্ট

e-mail: arefeen 0404@gmail.com,ভার্জিনিয়া,৩ এপ্রিল ২০১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here