চরের ও পরের জীবন-পরম্পরা

।। আহমেদ মূসা ।।
যখন হাঁটতে শিখি, আমার কোমরে একধরনের চর্মরোগ হয়েছিল। গ্রামের লোকে বলে ‘বিখাউজ’। কিছুদিন কষ্ট দিয়ে অনেকের

আহমেদ মূসা

বেলায় সেরে গেলেও আমারটা সারছিল না। এক গ্রাম্য কবিরাজ অদ্ভূত এক ‘প্রেসক্রিপশন’ দিলেন। সেটি শুনে এক সাহসী নারী ছুটলেন দূরের এক নদীর পারে। সেখানে চিংড়ি ধরার চাইয়ে মাঝে-মাঝে সাপও ঢোকে। জেলেরা ফেলে দেন। ফেলে দেওয়া একটি বিষহীন ঢোরা সাপ আঁচলে পেঁচিয়ে নিয়ে এলেন সেই নারী। বাড়িতে এসে আঁচল খুলে সেই সাপের ঘাড় ও লেজে শক্ত করে ধরলেন। সাপের শরীর আমার ক্ষতস্থানে ঘষে দিয়ে সাপটি ছেড়ে দেন তিনি। এই মহীয়সী নারী আমার মা। আমাদের সুখ-দুঃখের সংসারকে আজীবন আগলে রেখেছিলেন তিনি।
আমার বয়স যখন দেড়, মুখের ভেতর ঘা হয়েছিল। স্থানীয় ডাক্তার-কবিরাজরা ঘা সারাতে না পারায় আমার বাবা আমাকে কোলে করে নিয়ে গেলেন প্রায় ৭-৮ মাইল দূরে, কুমিল্লার হোমনা বাজারে। মা সাথে গেলেন না, যাতায়াতে হাঁটার গতি কমে যাবে বলে। বসে রইলেন চরের এক প্রান্তে। চৈত্র মাসের প্রচন্ড রোদ, পায়ের নিচে তপ্ত বালু উপেক্ষা করে বিশাল মেঘনা নদী পাড় হয়ে বাবার এই আসা-যাওয়ার কল্পচিত্র এখনো আমার চোখে ভাসে। আমার মা প্রায়ই আমাকে এই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। গহীন এক চরে বসেও আমার মা-বাবা আমাদের আলোকিত জীবনের স্বপ্ন দেখাতেন, নিজেরা স্বপ্ন দেখতেন।
আমার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার জেলার শেষ প্রান্তে, দুর্গম এক চরে। চারদিকে মেঘনা নদী, মাঝখানে চৌদ্দটি গ্রাম নিয়ে এই চরাঞ্চল, কালা পাহাড়িয়া ইউনিয়ন। মেঘনার পূর্বদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, দক্ষিণে কুমিল্লার হোমনা ও মেঘনা থানা, পশ্চিমে সোনারগাঁও এবং উত্তরে আমাদের আড়াইহাজার থানা। আমার গ্রামের নাম ইজারকান্দী।
চরের মানুষের সাহস বেশি, এটা শুধু কথার কথা নয়, বাস্তব সত্যি। নদীর উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই এবং বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয় বলে সাহস চরের মানুষের অস্তিত্বের অন্তর্গত। নতুন জেগে ওঠা চর নিয়ে প্রতিবেশি ইউনিয়ন বা আমাদের ইউনিয়নেরই এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের মারামারি দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। ভোরে রক্তাক্ত সংঘর্ষের কাজটি সেরে হাতের রক্ত ধুয়ে নির্বিকারভাবে পানি-পান্তা খেয়ে হাল-জাল বাইতে যেতেও দেখেছি অনেকবার। আমাদের এলাকার একজন সাধারণ মানুষও অন্য এলাকার দুর্ধর্ষ বলে পরিচিতদের চেয়ে বেশি সাহসী। তাই অন্য এলাকার চোর-ডাকাতদের উৎপাত থেকে এলাকা মুক্ত। ১৯৬৯ সালে একবার এলাকায় দক্ষিণদিকের বহিরাগত চোরদের উৎপাত শুরু হয়েছিল। তখন আমাদের এলাকার কিছু তরুণ কয়েকটি ডিঙ্গি নৌকায় বিশাল মেঘনা পাড়ি দিয়ে ওপারের বেশ কয়েকটি গ্রাম অতিক্রম করে কয়েকজন চোর ধরে নিয়ে এসেছিল। তাদের পুলিশের হাত তুলে দেওয়ার পর চুরি বন্ধ হয়ে যায়। তাদের যখন প্রচন্ড মার দেওয়া হচ্ছিল তখন শিউরে উঠেছিলাম। ওদের চিৎকার ও বিভিন্ন সংলাপ মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। চোর নিয়ে পরবর্তীকালে আমি একটি টিভি নাটকও লিখেছিলাম। অবশ্য এই চোরের চরিত্রটি ছিল ইতিবাচক।
সাহস মানুষকে যেমন বীর করে তেমনি কাউকে কাউকে দস্যুও করে। আমাদের এলাকায় এক সময় কয়েকজন দুর্ধর্ষ ডাকাতও ছিল। তারা নিজের এলাকায় ডাকাতি না করলেও মানুষ জানতো যে তারা ডাকাত। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের নিকেশ করে দেয়। পরবর্তীকালেও কয়েক জনের নাম শোনা গেছে, যারা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে।
রাজনৈতিক স্লোগানের উৎস-ইতিহাসখুঁজে প্রতিবাদী ও প্রগতিশীল স্লোগানের পক্ষে এবং জোৎদার-মহাজনদের বিরুদ্ধে বিচিত্রায় ক্রমাগত কভার স্টোরি লেখা দিয়ে মূলত আমার লেখক-সাংবাদিক জীবনের শুরু। পরবর্তী কালে নাটক, ধারাবাহিক নাটক, গল্প, উপন্যাস প্রভৃতিতে ঘুরে-ফিরে এসেছে আমার বাল্যজীবন, চরের জীবন, চরের মানুষের জীবন।
আমাকে অনেকবার শুনতে হয়েছে, আমি ‘চউরা’। এই পরিচয়ে আমি মোটেও লজ্জিত নই, বরং গর্বিত। ব্যক্তি জীবনে আমি অন্তর্মুখী, নির্বিরোধ, কিন্তু সামাজিক বা বৃহৎ জীবনে তা নয়। বিবেক-শাসিত আমি যখন যেখানে প্রয়োজন মনে করেছি, সম্ভব মনে কিেছ, সাহস নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। এ জন্য পঞ্জিকায় দিন-তারিখ বা লগ্ন দেখতে যাই নি।প্রতিপক্ষ কতো শক্তিধর বা তারা ক্ষতি করার কতোটাক্ষমতা রাখে সেটা কখনো আমলে আনি নি। তাই আমার কোনো সাহসী বা ‘হটকারী’ কাজের জন্য বন্ধু-সুহৃদরা প্রথমে বিস্মিত হলেও আমার ‘চউরা’ অরিজিনের কথা জানতে পারলে আর অবাক হয় না।অবশ্য যেখানে একেবারে অসম্ভব দেখেছি, নিরবে হলেও ঘৃণা প্রকাশ করেছি। বহুবার বেনামী হুমকী এসেছে, বাংলা একাডেমির বইমেলায় আমার একটি বই না রাখতে শাসানো হয়েছে, প্রেস থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, কখনো বিচলিত বোধ করি নি।
চরের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা বাল্য জীবন আমার ভবিষ্যত জীবনের জন্যও সাহসের সোপান তৈরি করেছে। আমার জীবনে অনেক কিছুরই ঘাটতি আছে কিন্তু সাহসের ঘাটতি কখনো হয় নি। এ জন্য চরের কাছে আমার অনেক ঋণ। ভয় কিংবা ‘পাছে লোকে কিছু বলে’র দ্বিধা উপেক্ষা করে বহুবার বহুক্ষেত্রে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধার কাজটি করেছি।যে-কোনো হত্যাকান্ডেরই ঘৃণা ও বিরোধিতা আমি করি । হত্যাকান্ড হত্যাকান্ডই। সেটা যে-ই করুক, যখনই করুক। রাজনৈতিক হত্যাকান্ড আরো মর্মান্তিক। রাজনীতি মানুষের কল্যানের জন্য। সেই মানুষকেই হত্যা করে কিসের রাজনীতি? কোনো রাজনৈতিক চাদর দিয়েই রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের অপরাধ ঢাকা যাবে না। একজন মানুষ হিসেবে হত্যাকান্ডের বিরোধিতা বা বিচার চাওয়াই মানবিক সংস্কৃতি। এর থেকে সরে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না।
বাংলাদেশের জন্মশত্রু ঘাতক-দালালদের বিরুদ্ধে প্রথম সংগ্রাম, গ্রন্থ রচনা, বা সংগঠন করা; আওয়ামী লীগের প্রথম আমলে রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বইসহ বিভিন্ন লেখা, বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দের হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে লেখা, সেক্টর কমান্ডারসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকরার বিরুদ্ধে লেখা, জিয়াউর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত অনেকগুলি ক্যু নিয়ে ধারাবাহিক লেখা, এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লাগাতার লেখা, বিএনপির সঙ্গে একসময় সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকা সত্ত্বেও তার জামায়াত-তোষণ বা একতরফা নির্বাচনের চেষ্টাসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কাজের বিরুদ্ধে লেখা বা বর্তমান সরকারের একতরফা নির্বাচনসহ অনেক কর্মকান্ডের সমালোচনা আমি করেছি, করছি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা করেও তার আধিপত্যবাদী নীতির বিরোধিতা উচিত বলে আমি মনে করি এবং লিখি। ভারতের অনেক কাজের সমালোচনার অবকাশ যেমন আছে, তেমনি ভারতের কাছে অনেক কিছু শেখারও আছে; বিশেষ করে যে-কোনো অবস্থায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সব দলের ঐক্য, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, আমলাতন্ত্রের নগ্ন দলীয়করণথেকে বিরত থাকা, শিক্ষা ও চিকিৎসার মানসহ অনেক ক্ষেত্রেইভারত অনুসরণযোগ্য। অসংখ্য বাজারী ছবি-সিরিয়ালের পাশাপাশি সেখানে নির্মিত হয় অনেক আন্তর্জাতিক মানের ধ্রুপদী ছবি-নাটকও। কিন্তু বাংলাদেশের বহুলোক ওদের খারাপটাই নেন, ভালোটা অনুসরণ করেন না। আমি ভারতের দাদাগিরির প্রতিবাদের পাশাপাশি ওদের ইতিবাচক কাজের প্রশংসা করতে কখনো পিছ পা হই নি। যে-সব লেখক মনে করেন, ভারতের কোনো কাজের সমালোচনা করলে, ফারাক্কা-তিস্তা-ফালানী ইস্যুতে প্রতিবাদ করলে বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিরোধিতা করলেই ‘প্রগতিশীলতার’ কাতার থেকে নাম কাটা যাবে, আমি তাদের দলে নেই।
আমি বিশ্বাস করি কওমী মাদ্রাসা ও তার শিক্ষার্থীদের মূলধারায় নিয়ে আসা উচিত। অনেকের মতো আমি এই বিশ্বাসকে নিজের মনে চেপে রাখি নি। এ নিয়ে চার বছর আগেই, ২০১৩ সালের মে মাসে ‘মাদ্রাসা শিক্ষা ঃ দায়-দরদ বনাম ধিক্কার-বিদ্রুপের কথা’ শিরোনামের কলামে লিখেছিলাম, বাংলাদেশে কওমী-শিক্ষার্থীদের মূলধারায় আনার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা কয়েকবার হলেও সেগুলি ছিল অসম্পূর্ণ। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কওমীদের প্রতিনিধিত্ব সেখানে রাখা হয়নি। তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব রেখে আধুনিকায়নের চেষ্টা করা হলে ইতিবাচক সাড়া দেবে তাতে সন্দেহ নেই। এটি তখন কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশের পাশাপাশি আমার গ্রন্থ ‘যেমন দেখেছি ওয়ান ইলেভেন’- সন্নিবেসিত রয়েছে। লেখা প্রকাশের পর কেউ কেউ বিরূপতা প্রদর্শন করেছেন। সম্প্রতি নতুন সংযোজনসহ এটি আবার প্রকাশিত হয়েছে অনেক পত্রিকায়। এখন দেখা যাচ্ছে, কওমীদের মূলধারায় আনতে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ আরো অনেকেইউঠে-পড়ে লেগেছেন।
আবার যারা মনে করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সমুন্নত রাখার প্রত্যয় প্রকাশ করলে, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে বললে বা জঙ্গিবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে লিখলে কিংবা জাহানারা ইমামকে সম্মান জানালে ‘জাতীয়তাবাদীর’ কাতার থেকে নাম কাটা যাবে, আমি তাদের দলেও নেই। এমন যারা মনে করেন তাদের দুইপক্ষকেই আমি খুব তুচ্ছ জ্ঞান করি, যদিও পদকগুলি ওরাই পেয়ে থাকেন। এক দশক ধরে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও যুক্ত নই। ‘র’ বা ‘আইএসআই’ কারোই শিষ্য হতে আমি রাজি নই, কারো খামেরও প্রয়োজন অনুভব করি না। আমি না ভারত-পন্থী, না পাকিস্তান-পন্থী। আমি বাংলাদেশ-পন্থী। তবে, মানুষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও রাজনীতির বাইরে সে যেতে পারে না। মানুষ নির্দলীয় হতে পারে, কিন্তু নিরপেক্ষ বা অরাজনৈতিক কোনোভাবেই নয়। মনীষীদের অনুসরণ-উল্লেখ করে, আমিও মনে করি,যেখানে দ্বন্দ্ব রয়েছে সত্যের সঙ্গে মিথ্যার, ভালোর সাথে মন্দের, ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের, শুভর সঙ্গে অশুভের এবং প্রগতির সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীলতার, সেখানে একজন মানুষ কখনো নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। তার কর্ম ও বক্তব্য কারো না কারো পক্ষে যাবেই। এমন কি কোনো ইস্যুতে সে যদি নিষ্কর্ম অবস্থায় এবং নিঃশব্দেও বসে থাকে, তখনো তার নিষ্ক্রিয়তা ও নৈঃশব্দ কারো না কারো কিংবা কোনো না কেনো পক্ষে যাবে। সেই সূত্রেইনিন্দনীয় ও সমালোচনারযোগ্য সবকিছুর বিরুদ্ধেই কমবেশি লিখছি, লিখেছি; অন্তত একটি ছড়া হলেও লিখেছি।
আমি শেখ হাসিনার অনেক কাজের সমালোচক। আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বহুবার তার ভূয়সী প্রশংসা করেও লিখেছি। কারণ, আমি মনে করি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও কঠিনতম কর্তব্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এই বিচারের জন্য শেখ হাসিনা ইতিহাসে অবশ্যই অমর হয়ে থাকবেন। আমাদের কালে এ দায়িত্ব আর কারো পক্ষে পালন সম্ভব ছিলো না। নিজের সাহসী ভূমিকা দিয়েই নিজেকে তিনি বিকল্পহীন করে তুলেছেন। এ সত্য স্বীকার না করলে খুব ভুল হবে। বিচারের পেছনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক লাভালাভের প্রশ্ন অবশ্যই আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই লাভের কাজটা অন্যরা কেন করতে পারলেন না? তাই, বাংলাদেশে এই বিচারের পেছনে রাজনীতি খোঁজার প্রয়োজন সাধারণ মানুষের নেই? স্মরণীয়-বরণীয়রা বলে গেছেন, বিড়াল কালো কি সাদা সেটা ব্যাপার নয়, কথা হচ্ছে বিড়াল ইদুর ধরে কী না। বিচারের আশা তো আমরা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম । এ অবস্থায় এই বিচার অনেক বড় পাওনা। এ কাজটির প্রশংসা করছি বলেআমার কিছু জানাশোনা লোক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাতে আমি কর্ণপাত করি নি। কারণ, এই দাবি প্রথম উঠেছিল ১৯৮০ সালে। শেখ হাসিনা তখন দেশেই ছিলেন না। তিনি ফিরেছেন আরো বছরখানেক পরে। আর, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বে তোলা এই দাবির পক্ষে যারা নানাভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন আমিও ছিলাম তাদের একজন। তারপর ড.আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কর্নেল নূর উজ্জামান, জাহানারা ইমাম ,বিনোদদাশ গুপ্ত, শাহরিয়ার কবির প্রমুখের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির তৎকালীন বাস্তব ফসল ছিল একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় আকরগ্রন্থ এবং পরবর্তী কালের নির্মূল কমিটি। সবগুলিতেই ছিল আমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এখন এই দাবি বাস্তবায়নকালে একে সমর্থন না দেওয়াটাই আমার জন্য স্ববিরোধিতা। স্বাধীনতার সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিতে একাত্তরে আগরতলা গিয়েও বয়সের স্বল্পতা (১৪ বছর) ও ভগ্নস্বাস্থ্যেও কারণে অংশ নিতে দেওয়া হয় নি। কিন্তু চেষ্টাটাও কম কথা নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখা ও অবাধ-ভবিষ্যতের পথ রচনা করার কাজ এখনো অনেক বাকী। এ-কাজ বাংলাদেশ-পন্থী নতুন প্রজন্মের। আলোচনা তাজা রাখতে হবে নতুন প্রজন্মকে, সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। নিজ দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে। আবার একাত্তর যারা সচক্ষে দেখেছেন, জামায়াতি প্রপাগান্ডায় তাদের অনেককেও বিভ্রান্ত হতে দেখি, নতুনরা তো বিভ্রান্ত হবেই। তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে প্রকৃত ঘটনা। এ সংগ্রাম চালাতে হবে বিরামহীন ভাবে। কারো কারো মধ্যে পাকিস্তানী দাসত্বের হ্যাংওভার চলছে এখনো । মেধাবীদের সাড়াসী আক্রমণই তাদের কোনঠাসা করতে পারে। নির্ভয়ে চালিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশ-পন্থী প্রচারণা। এ লড়ায়ের শর্টকাট কোনো রাস্তা নেই, সুলভ কোনো বিজয় নেই। আবার এটাও স্মরণে রাখতে হবে যে, ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধ কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মকে তাদের স্ব স্ব জায়গায় সম্মানের সঙ্গে অধিষ্ঠান রেখেই রাজনীতিকে তার স্বাভাবিক গতিপথে এগিয়ে নেওয়া যায়। দুটো প্রত্যয়ের সঙ্গেই যেহেতু গণমানুষের আবেগ জড়িত, তাই খুব সতর্কতার সঙ্গে আগাতে হবে। অনেক দেরি হয়ে গেছে, কিন্তু সময় একেবারে শেষ হয়ে যায়নি । বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, আইনের শাসন-সমৃদ্ধ কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করাই আজকের যুগের দাবি।
আহমেদ মূসা: উপদেষ্ঠা সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা, নিউইয়র্ক, লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার
(প্রথম প্রকাশ, ১৪ মে, ২০১৭, নারায়ণগঞ্জ জেলা সমিতি উত্তর আমেরিকা‘র নতুন কমিটির অভিষেক উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায়)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here