সংস্কৃতিমনস্ক জাতি গঠনে করণীয়

।। হাবিবুর রহমান স্বপন ।।

হাবিবুর রহমান স্বপন

সংস্কৃতিমনস্ক জাতি গঠনে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শুরুর একটি খবর দেখলাম। সংস্কৃতি চেতনায় তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারী উদ্যোগে কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৮টি জেলায় ১০টি করে মোট ১৮০টি বিদ্যালয়ে শুরু হতে যাচ্ছে কার্যক্রম।
প্রকল্পটি নিঃসন্দেহে ভাল। তবে এ ধরনের কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। যা প্রকল্প আকারে বাস্তবায়ন করতে হয়, তাতে ‘প্রাণ’ বা স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে খুব কম। আর যা স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে হয়ে থাকে তা প্রাণ তো পায়ই, তা হয় প্রাণবন্ত এবং সেটা হয়ও দীর্ঘস্থায়ী। কেন বলছি তার ব্যাখ্যা পরে দিচ্ছি।
প্রাথমিকভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সর্বমোট এক কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই টাকায় সঙ্গীত বাদ্যযন্ত্র বিশেষ করে হারমোনিয়াম এবং তবলা কিনে দেয়া হবে প্রকল্পভুক্ত স্কুলগুলোকে। এছাড়াও সঙ্গীত নৃত্য প্রশিক্ষককে সম্মানী প্রদান করা হবে। স্কুল এবং প্রশিক্ষক নির্বাচন করবেন জেলা প্রশাসক এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি। এখানেই শুরু হতে পারে ঝামেলার। স্কুল নির্বাচন নিয়েও বাধবে গোল। জেলা সদর এবং উপজেলা সদরের স্কুলগুলোতে তো সঙ্গীতচর্চা হয় কম-বেশি। স্কুলের ব্যবস্থাপনায় না হলেও অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা পারিবারিক পরিবেশেই সংস্কৃতি চর্চা করে থাকে। কিছু স্কুল আছে যেগুলোর ফলফল ভাল। কিন্তু তাদের আর্থিক সঙ্গতি নেই। তাদের সহযোগিতা দরকার। এমন সহযোগিতা পেলে তারা ভাল করতে পারবে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
পৃথিবী সম্পর্কে যা উৎকৃষ্ট বলা বা চিন্তা করা হয়েছে তা জানাই হচ্ছে সংস্কৃতি বা কৃষ্টি। মনুষ্যত্ব তথা মানব ধর্মের সাধনাই সংস্কৃতি এবং একমাত্র সাধনাই জীবনকে করতে পারে সুন্দর সুষ্ঠু। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বিদ্যাকে যদি হীরার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তা হলে তাতে যে দ্যুতি ছড়িয়ে পড়বে, সেই হবে তার সংস্কৃতি।’
আগের দিনে (ষাট-সত্তরের দশকে) প্রতিটি স্কুল-কলেজে বছর শেষে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হতো। প্রাথমিক স্কুলেও হতো। একেবারে গ-গ্রামের স্কুলেও বছর শেষে অথবা বছরের শুরুতে স্কুল মাঠে অথবা পার্শ¦বর্তী কোন খোলা মাঠে ক্রীড়ানুষ্ঠান হতো। গ্রামের মুরব্বিরাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নিমন্ত্রণ করা হতো। খেলা শেষে হতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে যে যা বলতে পারত তাই করে দেখাত। আবৃত্তি, গান, নাটক, কৌতুক ইত্যাদি। গ্রাম ও এলাকাবাসীর ছোট্ট অনুষ্ঠান ছিল প্রাণবন্ত। এলাকার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতীরা অনুষ্ঠান উপভোগ করত। কি নির্মল আনন্দই না তারা উপভোগ করত।
এসব ছোট ছোট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনেক প্রতিভাবান শিল্পী উঠে এসেছে। তার অনেক প্রমাণ উপস্থিত করা যায়। বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক, নাটক-থিয়েটারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পী কলাকুশলী এভাবেই তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে এসেছেন। কথায় বলে কাঁটার মুখ ছোট সময় থেকেই চোখা কি ভোঁতা তা বোঝা যায়। প্রাথমিক স্কুল থেকে যারা সাংস্কৃতিকচর্চার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারা বড় হয়ে বড় স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। এটি অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি। ছোট সময়ে যারা ‘খেলাঘর’, ‘কচিকাঁচার মেলা’, ‘মুকুল ফৌজ’, ‘নজরুল সেনা’, ‘কিশোর কুঁড়ির মেলা’ ইত্যাদি শিশু-কিশোর সংগঠন এবং আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা আজ অনেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সংস্কৃতি কারও পৈত্রিক সম্পত্তি নয়, সংস্কৃতি নিয়ে কেউ জন্মায় না এবং কেউ তা পেতে পারে না উত্তরাধীকার সূত্রে। প্রতিদিন সচেতন সাধনার দ্বারা সংস্কৃতিকে আয়ত্ত করতে হয়।
সত্যিই চর্চার বিষয় সংস্কৃতি। আবৃত্তিকারের সন্তান আবৃত্তিকার হতে পারেন যদি তিনি চর্চা করেন, একইভাবে গায়কের সন্তান গায়ক হতে পারেন যদি তিনি গান চর্চা করেন। আর যদি তা না করেন তা হলে তো তার পক্ষে কোন কিছুই হওয়া সম্ভব না।
ষাটের দশক, সত্তরের দশক এমনকি আশির দশকেও গ্রাম-গঞ্জে, শহরে বেশ ছোট-বড় নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। সামাজিক অবক্ষয় নাকি রাজনৈতিক অবক্ষয়কে আমরা দোষারোপ করব এই সেক্টর নষ্ট হওয়ার জন্য, জানি না বা বুঝি না। তবে এটা বুঝি নব্বইয়ের দশকে গোড়া থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মরিচা পড়তে থাকে।
বাংলার সংস্কৃতি ধ্বংস করার অপচেষ্টা হয়ে আসছে সেই পাকিস্তান আমল থেকে। পাকিস্তানের সরকার বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা বন্ধ করে দিয়েছিল। বাঙালী তা মানেনি। অব্যাহত আছে এদেশ থেকে বাংলার সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র। তাই তো যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা ফাটানো হয়, রমনা বটমূলে বোমা মেরে স্তব্ধ করতে চায় বাঙালীর সংস্কৃতি চর্চা। এর আগে কায়দা-কানুন করে যাত্রাপালা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বাংলার মাটি থেকে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এ সংক্রান্ত এক সভায় বলেছেন, সংস্কৃতিচর্চাকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতেই এই সাংস্কৃতিকচর্চা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ভাল কথা, তবে তা কি এভাবে প্রকল্পের মাধ্যমে করলে ফলপ্রসূ হবে? বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
সাংস্কৃতিক চেতনা জাগ্রত করে দিতে হয়। এটি এমনি এমনি আসে না। যারা সঙ্গীতচর্চা করেন, তারা সবাই কি ভাল শিল্পী হন? না, হন না। তবে ভাল শ্রোতা হতে পারেন। যে আবৃত্তিকার আবৃত্তি করবেন, তিনি কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কবিতা রচনা করে কবি হতে পারেন। একজন অভিনয় শিল্পী ভাল নাট্যকার হতে পারেন। ভাল চিত্রশিল্পীও হতে পারেন কেউ কেউ। আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতিচর্চা যেন এক অনাবিল আনন্দের বিষয় হতে পারে। সুস্থ, সুন্দর সংস্কৃতিচর্চা করে প্রতিটি নাগরিক রুচিবোধ সম্পন্ন হয়ে উঠুক, এই প্রত্যাশা আমারও।
স্কুল থেকেই গড়ে তুলতে হবে সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। কারণ শিশুকালে বা ৭ থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত এক শিশু-কিশোর যা শেখে বা জানে তা সে সারাজীবন মনে রাখে। আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের পাঠ্যপুস্তকে ভাল কিছু শিক্ষা দিতে যদি না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণতির জন্য দায়ী থাকতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে নীতি কথা থাকতে হবে। শরীর গঠনের কৌশল এবং খাদ্য সম্পর্কেও জানাতে হবে শিশুকাল থেকেই। ছড়া, কবিতা এবং চিত্রাঙ্কনের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ বেশি থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বেশিরভাগ স্কুলেই আবৃত্তি হয় না। ছোট সময়ে ক্লাসের সকলে সুর করে নামতা মুখস্থ করতাম। নামতার মধ্যেই ছিল কবিতার ছন্দ এবং শিক্ষার বিষয়। ‘এক’-এ চন্দ্র, ‘দুই’-এ পক্ষ ইত্যাদি। স্যার আবার চন্দ্র মানে চাঁদ বলে দিতেন। পক্ষ মানে প্রতিমাসে দুটি পক্ষ বা ১৫ দিনে এক পক্ষ হয় শেখাতেন। দ্রুতই মুখস্থ হতো নামতা-শতকিয়া। একেই তো বলা হয় ‘আনন্দ পাঠ’।
প্রতিটি স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক করতে হবে বাৎসরিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। কারণ প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক তহবিলে চাঁদা নেয়া হয়ে থাকে। যেহেতু চাঁদা নেয়া হয়ে থাকে সেহেতু তার জন্য অনুষ্ঠানমালা করতে বাধ্য স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সুস্থ জাতি গঠন করতে হলে দরকার খেলাধূুলা। সংস্কৃতি মনের খোরাক জোগায়। যেমন, বাংলাদেশ যখন অন্য কোন দেশের সঙ্গে খেলার মাঠে জয়লাভ করে, তখন তো আমরা আনন্দ পাই, পেট ভরে না, কিন্তু মনে সুখ অনুভূত হয়। এটাই হচ্ছে মনের খোরাক।
কলেজ পর্যায়ে এক সময় কি জমজমাট ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। পাবনায় এডওয়ার্ড কলেজের বাৎসরিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো সপ্তাহব্যাপী। খেলার মাঠ ও মিলনায়তন সাজানো হতো রঙিন কাগজে ও ফুলে। ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবকরা ছাড়াও উপভোগ করতে জড়ো হতো কলেজ প্রাঙ্গণে হাজার হাজার দর্শক। এখন আর তেমনটি হয় না। আমাদের সময়ে (স্বাধীনতার পরে) সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি, গান, নাটক, কৌতুক, উপস্থিত বক্তৃতার প্রতিযোগিতা হয়েছে। মঞ্চস্থ হয়েছে বাংলা ও ইংরেজী নাটক। আশির দশকের পর থেকে সেসব বন্ধ।
স্কুল থেকে কলেজ এবং কলেজ থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে ভর্তির সময় ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সনদধারীদের ভর্তির কোটা থাকতে হবে। অতএব থানা ও জেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতা হওয়া আবশ্যক। সেখানে যে সনদপত্র দেয়া হবে তা ভর্তির সময় কাজে লাগবে। অবশ্য এই সনদপত্র শিল্পকলা একাডেমিও দিতে পারে। অনলাইনে সনদপত্রটি থাকলে তাতে আর নকলের কারসাজি কেউ করতে পারবে না।
দেশ বলতে বোঝায় মানুষ। এরাই সভ্যতার নিয়ন্তা-ইতিহাসের স্রষ্টা। এদের সংগ্রামী জীবনের অভিব্যক্তির রূপায়ণ বিধৃত হয় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে। তাই সংস্কৃতি জীবনের দর্পণ। এ কারণেই বোধ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘যতদিন বাংলার আকাশ থাকবে, যতদিন বাংলার বাতাস থাকবে, ততদিন বাংলার সংস্কৃতি থাকবে।’
হ্যাঁ, বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্য গর্ব করার মতো। আমাদের ভাটিয়ালী, জারি, সারি, পল্লী গান, মুর্শেদী, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, আধুনিক গান বিশ্বমানের। আমাদের গর্বকে খর্ব করার ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। কোন জাতিকে ধ্বংস বা বিনাশ করার জন্য তাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করার নীতি যারা করছে, তারা তৎপর। আমরা আমাদের গর্ব খর্ব হতে দেব না। বাংলা ও বাঙালীর মান আমরা আমাদের সংস্কৃতির মাধ্যমেই জাগ্রত রখব।

লেখক : সাংবাদিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here