বন্যার্তদের জন্য জরুরী করণীয়

।। সুব্রত বিশ্বাস ।।
বন্যা দুর্গত এলাকার জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ যথাসময়ে বিতরণ নিয়ে প্রতিবারই অবহেলা, দুর্নীতি, অযোগ্যতার নানা অভিযোগ উঠে। এবার আরো প্রবল ভাবে সে অভিযোগ লক্ষ্য করা গেছে।

সরকার বন্যার শুরুতেই তোতা পাখির মতো বলেছে পর্যাপ্ত খাদ্য মওজুদ আছে। কোন চিন্তার কারণ নেই। অথচ এক পর্যায়ে দেখা গেল খোদ খাদ্যমন্ত্রী বলে দিলেন খাদ্য ঘাট্তির কথা। এই ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে চাল আমদানী করতে হবে। মন্ত্রী একথা বলার আগে মজুদদাররা চাল মজুদ করেছে মন্ত্রী এ অভিযোগ করেছেন। খাদ্য ঘাটতির কথা শুনে নিশ্চয়ই তারা আরো সংকট সৃষ্টির চক্রান্ত করেছে এবং করবে। মন্ত্রীর কথায় একটি কথা পরিস্কার বুঝা গেছে যে, খাদ্য মজুদ সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী নিজেই ওয়াকিবহাল নন।

আসা যাক খাদ্য বিতরণ সম্পর্কে। দেশে বিভিন্ন সময় বন্যা সহ নানা জাতীয় ও আঞ্চলিক দুর্যোগ হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা হলো সরকারের পাশাপাশি দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মানুষ সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। আমরা যখন ছাত্র, বিভিন্ন সময় বন্যার্ত এলাকায় টিকা ও কলেরার প্রদুর্ভাব মুক্ত রাখতে ভেকসিন ও ইনজেকশন দিতে দল বেধে গিয়েছি। মানুষের মাঝে মানুষের প্রতি এই সহমর্মিতা ছিল। দুংখের বিষয় আজকে সেই সহমর্মিতার ক্ষেত্রে আমাদের চরম ব্যত্যয় ঘটেছে।

সরকার বা সরকারী দল কখনো নিরপেক্ষ এবং যথার্থ ভাবে ত্রাণ বিতরণ করতে পারেনা। তার কারণ সরকার প্রশাসন ও পার্টির লোকজনের ওপর নির্ভর করে। সাধারণ মানুষের মতো সরকারী কর্মকর্তারা আন্তরিক হয়না। অন্যদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে বিতরণে পক্ষপাতিত্ব করা হয়। দলীয় সমর্থকদের দিতে বেশি উদ্যোগী হয়। প্রতিপক্ষকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে যদি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বা ব্যক্তিরা মাঠে থাকেন তখন সরকার দলীয় লোকজন ও সরকারী কর্মকর্তারা অনেকটা সতর্ক থাকেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সে অবস্থা এখন দেশে নেই। অধিকন্তু কিছু গোষ্ঠীব বা বিরোধীদের উদ্যোগকে সরকার সহ্য করতে পারছে না। বলা হচ্ছে সকল ত্রাণ সরকারের প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ হতে হবে। ফলে সরকারই ত্রাণ বিতরণে বিভ্রাট সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের লোকদের কখনো সততার সাথে ত্রাণ বিতরণের উদাহরণ নেই। পাকিস্তান আমলে এমনকি স্বাধীনতার পর বিভিন্ন দুর্যোগকালে ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্রইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ যৌথ ভাবে রিলিফ কমিটি হয়েছে। আমি নিজেও এসবে কাজ করেছি। আওয়ামী লীগের লোকজন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে চুরি-চামারি করতে দেখা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি মেঘালয়। মেঘালয়ের বালাট ক্যাম্পে কলেরা মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। ন্যাপের পীর হবিবুর রহমান কলিকাতায় টেলিগ্রাম করে সেলাইন এনেছেন। আওয়ামী লীগের দায়িত্বে কিছু সেলাইন দেওয়া হয়। দেখা গেল সেই সেলাইনের একটি অংশ তারা বিক্রি করে ফেলেছে। এই হলো আওয়ামী লীগের চরিত্র। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে আর্মি নামিয়েছেন। ঐ রাতেই আমর বাসার বিপরীতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হবিবুর রহমান বাসার রিলিফের কাপড়, সাবান, দুধ,ঢেউ টিন পাশের এক পুকুরে ফেলে রেখে দেন। ঘুম থেকে উঠে আমরা এ দৃশ্য দেখেছি। পুলিশ এসে এসব তুলে নিয়ে গেছে। পরে দেখা গেছে শহরের বিভিন্ন জায়গায় এরূপ ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রামে পাহাড় ধ্বস, বৃষ্টি ও বন্যার সময় বলা হলো পর্যাপ্ত ত্রাণ তাদের হাতে আছে। অথচ পরে দেখা গেল পর্যান্ত ত্রান নেই। বিতরণেও দীর্ঘসূত্রিতা চলছে। নেতারা হেলিকপ্টার করে দল বেধে বৃষ্টি ও বন্যা উপভোগ করেছেন। কিন্তু কোথাও দেখা যায়নি দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার দিয়ে ত্রাণ বিতরণ করতে। দুর্গত মানুষের কাছে জ্জ দিন পরও ত্রাণ পৌছায়নি।

সামনে দুর্গত মানুষের জন্য আরো বেশি বিপদ আসছে। বন্যায় মানুষ ঘরবাড়ি, জিনিষপত্র, চাল-ডাল সব হারিয়েছে। পানি নেমে গেলে তাদের করার কিছু নেই। দেখা দিবে খাদ্য সংকট। পাশাপাশি দেখা দিবে নানা রোগের প্রাদুর্ভাব। এসব মোকাবিলা করার জন্য সরকারের উচিত সর্বস্তরের মানুষজন নিয়ে ত্রাণ কমিটি গঠন করা। এক্ষেতে সরকার সংকীর্ণতা পরিহার করে এগিয়ে না এলে সরকারকেই সমালোচনা ও বিপদের মুখে পড়তে হবে। দেশের মানুষকে রক্ষা করার প্রয়োজনে সরকার আন্তরিক হবে আশা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here