স্থায়ী মিশনের শোকসভা না আওয়ামী লীগের সভা

।। সুব্রত বিশ্বাস ।।

সুব্রত বিশ্বাস

মঙ্গলবার ১৫ই আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস। দিবসটি পালনের জন্য নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো আয়োজন ছিল। তারমধ্যে জাতিসংঘ স্থায়ী মিশনেও ছিল। যথারীতি আমন্ত্রণও পেয়েছি। কিন্তু ইদানিং কম যাই আওয়ামী লীগের দৌরাত্ব এবং মিশনের অতিমাত্রায় আওয়ামী তোষণের কারণে। সকাল থেকে ভাবছিলাম শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কোনও একটি সুবিধাজনক অনুষ্ঠানে যাওয়ার ব্যাপারে। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে অবশেষে মিশনের অনুষ্ঠানেই চলে যাই।

যথাসময়েই চলে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম এবারে তোষণের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। প্রথমেই লক্ষ্য করলাম, ইচ্ড়েপাকা অখ্যাত আওয়ামী লীগ ও কথিত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা সামনের সারিতে বসা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। কিছু ভদ্রলোক যারা সামনের সারিতে বসেছিলেন, আত্মসম্মানের কথা ভেবে নিজে থেকেই আসন ত্যাগ করে সরে গেলেন। ভাগ্যিস আমি, জাসদের সভাপতি আব্দুল মুসাব্বির, ওসমানী স্মৃতি পরিষদের সভাপতি নাজমুল ইসলাম চৌধুরী, ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন সভাপতি কামরুল আহসান খান ও লেখক সাংবাদিক হাসান ফেরদৌস আগে থেকেই মধ্যের একটি সারিতে বসায় রক্ষা পেয়ে যাই। অতিথি হিসেবে দেশ থেকে আগত তিন সাংসদ। দেশের মানুষ যখন বন্যায় ভাসছে তখন তাদের বিদেশ ভ্রশণ নিয়ে অনেকেই টিপ্পনি সমালোচনা করতে দেখা গেছে।

প্রথমে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সহ কয়েকটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। তারপর সঞ্চলক বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালনের পর মূল আলোচনার সূত্রপাত করেন। শুরুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দীর্ঘ চারটি শুভেচ্ছা বাণী পড়ে শোনান। বক্তৃতা পর্বের শুরুতে সঞ্চালক ঘোষণা করেন সাড়ে সাতটায় বাংলাদেশ কনসাল অফিসে আরো একটি অনুষ্ঠান আছে, তাই বক্তাদের দু’মিনিটের বেশি সময় দেওয়া যাবে না। এ নিয়ে অনেকে বলতে শোনা যায় কনসাল অফিসও স্থায়ী মিশন মিলে একত্রে মিলে কেন একটি অনুষ্ঠান করা হয়নি। তাতে খরচের সাশ্রয় হতো, অনুষ্ঠানে লোক জমায়েত বেশি হতো, তাড়াহুড়ারও তাগিদ থাকতো না।

শুরুতে বক্তব্য রাখেন মিশন প্রধান জনাব মোমেন। ১৫ আগষ্ট নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করে গতানুগতিক দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির ইতিহাস বিশ্লেষন করেন। বক্তব্যে ছিল না বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি, কারণ বা ইতিহাস সম্পর্কে কোন পর্যালোচনা। এমনকি অন্য কারোর বক্তব্যেও বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনা নিয়ে ছিল না কোন আলোচনা-পর্যালোচনা। অথচ ইহাই হওয়া উচিত ছিল আলোচনার মূখ্য বিষয়। তারপর বক্তব্য দিতে দেওয়া হয় কমিউনিটির বিতর্কিত কথিত এক মুক্তিযোদ্ধাকে। যাকে কখনো বিএনপি, কখনো আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের সাথে দেখা যায়। যার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা ও অপবাদ রয়েছে। তারপর একাধারে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা লীগ ও ছাত্রলীগের অখ্যাত ছিঁচ্কে নেতাদের বক্তৃতার পালা। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু হত্যা সম্পর্কে যাদের না আছে কোন জ্ঞান না আছে স্থায়ী মিশনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার যোগ্যতা।

এদিকে সঞ্চালক নির্ধারিত দু’মিনিট সময় রক্ষা করা নিয়ে পড়েন বেকায়দায়। সম্ভবত তাদের না দিলে মিশন প্রধানের বেকায়দা অবস্থা ছিল। অথবা সরকারী দল ও সরকারের প্রতি অতিভক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে তোষামোদ করেছেন। তারপর তিন সাংসদ ও গৃহনির্মান চেয়ারম্যান প্রত্যেকে ১০/১৫ মিনিট করে বক্তব্য রাখেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে এটি আওয়ামী লীগের উদ্যোগে কোনও অনুষ্ঠান। কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের অনেকে উপস্থিত থাকলেও তাদের প্রতি সম্মান বা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। মিশন প্রধানের এরূপ নতজানু ভূমিকা নিয়ে অনেককেই কানাঘুষা করতে দেখা যায়। অনেককে বলতে শোনা যায় সরকারী দলের প্রতি মিশন প্রধানের আনুগত্য বা দুর্বলতা থাকতেই পারে। কিন্তু একজন বিজ্ঞ শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে যেভাবে আওয়ামী তোষণ করেছেন তাতে তার নিজের এবং মিশনের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে। এমননি অবস্থার এক পর্যায়ে অনেকেই চলে যেতে থাকেন। আওয়ামী লীগের পাতি নেতারা বক্তৃতা দিয়ে দিয়েই চলে যান। কেউ কেউ আবার টেবিলে রাখা পেকেট খাবার হাতে নিয়ে চলে যেতে দেখা যায়।
এমনি এক পর্যায় আমি ও দেশ থেকে বেড়াতে আসা ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন সভাপতি কামরুল আহসান খান বেরিয়ে পড়ি। লিফটে উঠতে যেয়ে দেখি জাসদের সভাপতি মিঃ মুসব্বিরও। একসাথে বেরিয়ে পড়ি। জাসদ ১৪ দলের শরিক দল। মনে হয়েছে তাকে বক্তব্য দিতে না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ। বাহিরে এসেই দেখা আওয়ামী লীগের এক পাতি নেতার। তখনই ১৪ দলের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাকে ছেড়েই দেখা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারীর সাথে। তাকে দেখে তেড়ে গিয়ে এবার মুসব্বির সাহেব তীব্র আক্রমণ করে বসেন। উচ্চকণ্ঠে নোংরা ভাষার আক্রমণে সেক্রেটারী একেবারে কাপুকাত। হাতে-পায়ে ধরে বুঝাতে চেষ্টা করেও রক্ষা পাননি। মনে হয়েছে এবার বোধ হয় অনুষ্ঠানের ষোলকলা পূর্ণ হলো। এই ছিল ১৫ আগস্ট স্থায়ী মিশনের শোক দিবসের অনুষ্ঠান। শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর নমুনা। বঙ্গবন্ধু দলের সুবিধাভোগি, দলকানা, বধির, কালাদের দেখে বলেছিলেন, গরু-ছাগলের মাথা হাটে-বাজারে বিক্রি হয়, মানুষের নয়। সম্ভবত সেই বধির-কালাদেরই মেলা ছিল গতকাল স্থায়ী মিশনে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here