গভীর শ্রদ্ধায় যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় শোক দিবস পালন

নিউইয়র্ক : এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠান থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চলমান উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত করার মধ্য দিয়ে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের সংকল্প গ্রহণ করা হয়। একইসাথে আদালত কর্তৃক মৃত্যুদন্ডপাপ্ত বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারকে আরো তৎপর হবার আহবান উচ্চারিত হয়।

এ উপলক্ষে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশন এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে ১৫ আগস্ট মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পৃথক ৩টি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গত ১২ বছরের মত এবারও জ্যাকসন হাইটস এলাকাবাসীর ব্যানারে সর্বস্তরের প্রবাসীদের মধ্যে খাদ্যের প্যাকেট বিতরণ করা হয় ‘তবারক’ হিসেবে। উল্লেখ্য, ১ আগস্ট থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগসহ মুজিব আদর্শে উজ্জীবিত বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আলোচনা, দোয়া-মাহফিল, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সারামাসই রয়েছে নানা কর্মসূচি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির আবহে।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাৎ বার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠান শুরু হয়।
সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে স্থায়ী মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার মাধ্যমে জাতীয় শোক দিবস পালনের কর্মসূচি শুরু করা হয়। এরপর ১৫ আগস্টের শহীদদের উদ্দেশ্যে মিশনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারি একমিনিট নিরবতা পালন করেন। শহীদদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করার মাধ্যমে সকালের সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানসূচি শেষ হয়।

বিকেলে ৬টা ৩০ মিনিটে মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান “আলোচনা পর্ব”। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতির পিতার জীবন ও কর্মের ওপর প্রণীত একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। এরপর দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়।

আলোচনা পর্বে অন্যান্যদের সাথে অংশগ্রহণ করেন যুক্তরাষ্ট্রে সফররত খুলনা-২ আসনের এমপি ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান, গাজীপুর-২ আসনের এমপি এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মো: জাহিদ আহসান রাসেল, হবিগঞ্জ-৩ আসনের এমপি এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য এডভোকেট মো: আবু জাহির এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো: আব্দুর রহমান।
আলোচনার আগে অডিটোরিয়ামে রক্ষিত জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সফররত তিন এমপিকে সাথে নিয়ে স্থায়ী প্রতিনিধি মিশনের পক্ষে জাতির পিতার প্রকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় মিশনের সকল স্তরের কর্মকর্তা কর্মচারিগণ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণে দেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, “১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বাংলায় যে ভাষণ দিয়েছিলেন তার মধ্যেই ২০১৫ সালে জাতিসংঘ গৃহীত এসডিজি’র ১৭টি অভীষ্টের অধিকাংশই প্রতিফলিত হয়েছে, যা বিস্ময়কর”।

রাষ্ট্রদূত মোমেন বলেন, “জাতির পিতার হত্যাকারীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ জাতির পিতার জীবন ও আদর্শকে ধারণ করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বিশ্বের বুকে সগৌরবে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ”।

এমপি মো: জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, “জাতির পিতা আমাদের দেখিয়ে গেছেন, কিভাবে দেশের জন্য, মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে হয়”। তিনি আরও বলেন, “জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ইতিহাস বিকৃতি ও বিচারহীনতার যে সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতা হত্যার বিচার ও ইতিহাস বিকৃতি রোধ করে সে কলঙ্ক থেকে জাতিকে মুক্ত করেছে”।

এডভোকেট মো: আবু জাহির এমপি জাতির পিতার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন ও জেল জুলুমের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, “পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তারা যে মহামানবকে হত্যা করতে সাহস পায়নি তাঁকে ৭৫-এর ঘাতকরা সপরিবারে নির্মমভাবে কাপুরুষের মতো হত্যা করেছিল, এমন হত্যাকান্ড এর আগে কখনই বিশ্ব দেখেনি”।
এমপি মিজানুর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতা হত্যার বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, “প্রবাসীরাও মুক্তিযুদ্ধসহ সকল সংকটে দেশের পাশে থেকেছেন। হৃদয়ে দেশপ্রেম নিয়ে মাতৃভূমির উন্নয়নে কাজ করেছেন”। তিনি জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ায় প্রবাসীদের আরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সকল এমপিগণই দেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আবারও আওয়ামী লীগ সরকারকে বিজয়ী করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় পলাতক জাতির পিতার খুনীদের দেশে ফিরিয়ে নিতে সকল প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রিতে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির হাতে নৃশংসভাবে নিহত জাতির পিতা এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে সকল সহকর্মীকে সাথে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করেন রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন। এরপর অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চলমান কার্যক্রমের আলোকপাত করেন।
জ্যাকসন হাইটসে পালকি পার্টি সেন্টারে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুদ্দিন আজাদ। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ আজাদের পরিচালনায় এতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাহিদ হাসান রাসেল এমপি, এডভোকেট আবু জাহির এমপি, মিজানুর রহমান এমপি, রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নিজাম চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক আইরিন পারভিন, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন দেওয়ান, আব্দুল হাসিব মামুন, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরী, নিউইয়র্ক স্টেট আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলমগীর হোসেন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য ও সহ-সভাপতিবৃন্দসহ মোট ৬৫ জন। গভীর রাত পর্যন্ত চলা এ সমাবেশে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর সমাগম ঘটে। বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের অবিলম্বে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার জন্যে মার্কিন প্রশাসনের আন্তরিকতাপূর্ণ সহায়তা প্রত্যাশা করেন। একইসাথে, এই আমেরিকায় যারা বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে তাদেরকে চিহ্নিত করার কথাও বলেন সকলে। বক্তারা বলেন, সামনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যদি পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে না পারে তাহলে গত ৮ বছরের সকল অর্জন ধুলিসাত হয়ে যাবে, আবারো জঙ্গিরাষ্ট্রের কালিমা লেপন করা হবে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশকে। এজন্যে সকলকে সজাগ থাকতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here