বর্ষায় অতিবন্যা এবং শুকনো মওসূমে পানিশুন্যতা – ভারসাম্যহীন নদীব্যবস্থাপনার পরিনাম

বর্ণমালা নিউজ, ঢাকা: বাংলাদেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি নিউইয়র্ক ও বাংলাদেশ চ্রাপ্টার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনের সভাপতি আতিকুর রহমান সালু সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি বাস্তবায়নে অবলম্বে ভারতকে বাংলাদেশর সাথে বসার আহ্বান জানান। সালু আরো বলেন, তিস্তা অবকাহিকার পানি অন্য অববাহিকায় প্রবাহের যে বেআইনী উদ্যোগ নিয়েছে ভারত তা থেকে তাদের বিরত রাখতে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন ভাইস-চেয়ারম্যান আওলাদ হোসেন খান, বাংলাদেশ চ্রাপ্টারের সভাপতি অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমাদ ও সাধারন সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারী এবং আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি সমন্বয়ক মোস্তফা কামাল মজুমদার।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, টানা বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ৩০টি জেলা মারাত্মক বন্যকবলিত হয়েছে। দক্ষিনপূর্ব মৌসূমী প্রবাহের সর্বশেষ মাস আগষ্টে এই বন্যা বাংলাদেশে উপদ্রুত অঞ্চলের কৃষি, বানিজ্যিক সবজি, ফল ও মৎস খামারের বিনাশ সাধনের পাশাপাশি, শিল্প-কলকারখানা, মানুষের বসতভিটাসহ রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ধংস করেছে। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে বন্যার ৯২ভাগ পানিই আসে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর উজানের অববাহিকা থেকে। বাদ বাকী ৮ শতাংশ স্থানীয়ভাবে বৃষ্টিপাত পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার পানি থেকে শুমার হয়। বন্যার প্রকোপ আরো বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আইএফসি) বিগত দুই দশকের বেশী সময়ধরে বলে আসছে, টেকসই ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবে গঙ্গা, ব্রহ্মপূত্র ও মেঘনা নদীর অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে শুষ্ক মৌসূমে পানির স্বল্পতা এবং বর্ষাকালে বন্যা অহরহ দেখা যাচ্ছে। এই নদীগুলোর উজানের অববাহিকায়, যথেচ্ছ ডাম ও ব্যারাজ নির্মানের ফলে উপমহাদেশের অনেক নদী মরতে শুরু করেছে। একমাত্র বাংলাদেশের গঙ্গাবিধৌত অঞ্চলেই ৩০টি নদীর অকাল মৃত্যু ঘটেছে। শুকনো মৌসূমে এই নদীগুলোতে কোন প্রবাহ থাকেনা। অন্যদিকে বড়নদীগুলো পানির পর্যাপ্ত না পাবার ফলে নাব্যতা হারাচ্ছে। নতুন নতুন চর ভেসে উঠায় বর্ষাকালে যথেষ্ট পানি সাগরে বয়ে নিতে পারছে না। বর্ষার পানি নদীর তীর উপছিয়ে বন্যার সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের মানুষ জানেন, গঙ্গা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহের অভাবে, কৃষি, শিল্প, মৎস উৎপাদন ও বানিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার পাশাপাশি এক মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিং করেও গঙ্গার প্রধান শাখা গোড়াই নদীর প্রবাহ বজায় রাখা যাচ্ছেনা। অন্যদিকে বহু আলোচিত তিস্তা পানিবন্টন চুক্তিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কারন প্রতিশ্রুতি স্বত্বেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবংগ সরকারের অসহযোগিতার কারনে এই চুক্তি সম্পাদন করতে পারছে না। অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বানার্জি বলেছেন তিস্তা নদীর পানি বাংলাদেশকে দেয়া যাবে না। গজলডোবা ব্যারেজ থেকে প্রত্যাহৃত এই নদীর সবটুকু পানিই তার রাজ্যের লাগবে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার জানিয়েছেন, তিস্তার পানিটুকু বাংলাদেশের লাগবে। নাহলে উত্তরাঞ্চলের মরুকরন প্রক্রিয়া ঠেকানো যাবে না।

প্রবাহ অনিশ্চিত এমন অবস্থায় বাংলাদেশে আরেকটি গঙ্গা ব্যারেজ নির্মানের উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রধানঅমন্ত্রী দুরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। সেজন্য আইএফসির পক্ষ থেকে আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাই। বর্তমান শাসন আমলে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সাথে বহু বন্ধুত্বপূর্ন বিষয়ের সুরাহা হয়েছে। দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে। এই সুসম্পর্কের সূত্র ধরে আমিমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান হবে বলে এদেশের মানুষ আশা করে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘের প্রভাবশালী পানিবিষয়ক কমিটির সদস্য। আমরা আশা করব তিনি তাঁর প্রভাব খাটিয়ে তিস্তা অবকাহিকার পানি অন্য অববাহিকায় প্রবাহের বেআইনী উদ্যোগ বন্ধ করবেন। এক অববাহিকার পানি অন্য অববাহিকায় প্রবাহিত করা আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। তিস্তার পানি এখন বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারের ওপাড়ে মহানন্দা এবং গঙ্গা নদী দিয়ে আরো দক্ষিনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিস্তা নদীকে তার বাংলাদেশ অংশে মেরে ফেলা কি লাভজনক হবে? পানিবঞ্চিত বাংলাদেশের মানুষ তা কিভাবে মেনে নেবে?

তিস্তা, ব্রহ্মপূত্রের উপনদী যার পুরো প্রবাহ সুদূর অতীতকাল থেকে বাংলাদেশের ভেতরে এসে ব্রহ্মপূত্রে মিশেছে। এখন তা বাধাগ্রস্ত। অর্থাৎ এর সূরাহা না হলে সীমান্তের ওপারে তিস্তার উপর নির্মিত গজলডোবা ব্যারাজ, ফারাক্কা ব্যারাজের মতই মরন ফাঁদে পরিনত হবে। ব্রহ্মপূত্রের পানি প্রবাহ তার স্বাভাবিক গতিপথ থেকে সরিয়ে নেয়া ভারতের আন্তনদী সংযোগ মহাপরিকল্পনার অংশ। বাংলাদেশের মানুষ এই আন্তনদী সংযোগ মহাপরিকল্পনার বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন করেছে। কারন এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আর নদীমাতৃক দেশ থাকবে না। ভারতের পানিবিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবিদ্গন এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন। তাঁরা চান বাংলাদেশের মানুষ এব্যাপারে স্বোচ্চার থাকুন। কারন এই উদ্যোগ হিমালয়ের নদীগুলোর অপমৃত্যু ডেকে আনবে যা হবে উপমহাদেশের ১৫০ কোটি মানুষের জন্য এক পরিবেশগত মহাবিপর্যয়।

এব্যাপারে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে আবার স্বোচ্চার হবার আহবান জানাচ্ছি। আসুন সবাই মিলে আওয়াজ তুলি – সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত যৌথ নদীর অববাহিকা ভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে হিমালয় থেকে বয়ে আসা নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা হোক, যেন নদীতীরবর্তি সবাই এই অমূল্য প্রকৃতিক সম্পদের সেবা নিতে পারে। বর্তমানের ভারসাম্যহীন ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখলে নদীগুলোর মৃত্যু অনিবার্য। যা কারোজন্যই মঙ্গলকর হবেনা।
পরিশেষে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য যার যার সাধ্য অনুযায়ী সবাইকে জানাই সাহায্যের হাত প্রসারিত করার উতাত্ত আহবান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here