স্বনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি বঙ্গবন্ধুর হাতেই

।। ড. এ কে আবদুল মোমেন ।।

কিশোরকালেই ব্যক্তিত্বের পূর্বাভাস ফুটে ওঠে মানবচরিত্রে। খোকাবাবু বা শেখ মুজিবের চরিত্রও ছিল তেমনই এক মানবিক অবয়ব। আদরের খোকাবাবু তখন কিশোর; থাকেন গোপালগঞ্জ জেলা শহরে। একবার স্কুলছুটিতে গ্রামে গেলেন। সে বছর বেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছিল। মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। গ্রামে গিয়ে তিনি গ্রামবাসী কৃষকদের বিপর্যস্ত অবস্থা দেখলেন। ছুটিতে গিয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল, ডাঙ্গুলি বা বদন খেলে সময় কাটাবেন, বনে-বাদাড়ে ঘুরে পাখির বাচ্চা দেখবেন, ফলমূল পেড়ে খাবেন। তা আর হলো কই। কৃষকদের ছেলেমেয়েদের অসহায় অবস্থা দেখে কচি মনটা কেঁদে উঠল। না খেয়ে তাদের মুখগুলো শুকনো হয়ে গেছে। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিলেন। পুরো গ্রাম ঘুরে একটা হিসাব কষলেন কত পরিবার অসহায়-বিপর্যস্ত। এরপর ছুটে গেলেন বাড়িতে। বিপত্তি বাধল, বাড়িতে বাবা নেই। চোখে তখনো ক্ষুধার্ত শিশুদের করুণ চাহনি। অপেক্ষা আর সইল না। তিনি বাড়ির গোলা থেকে ধান-চাল বের করলেন। বস্তা মাথায় নিয়ে ছুটলেন সেই ক্ষুধার্ত কৃষকের বাড়ি বাড়ি। চাল-ডাল বিতরণ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে এলেন। ততক্ষণে ফিরে এসেছেন বাবাও। সব শুনে বাবা কিছুই বললেন না, বরং উত্সাহ দিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের

ড. এ কে আবদুল মোমেন

কচি মনে কিশোর বয়সেই মানবপ্রেমের পূর্ণ পরস্ফুিটন ঘটেছিল।

পরবর্তী জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই ছিল কৃষকদের মুক্তি, সাধারণ মানুষের পেটপুরে ডাল-ভাত খাওয়া নিশ্চিতের আন্দোলন। দেশের স্বাবলম্বিতা আর অর্থনৈতিক মুক্তির জাগরণ। তিনি মনেপ্রাণে এ বিষয়গুলো ধারণ করতেন। তাঁর কর্মকাণ্ড, বক্তৃতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও প্রাধান্য পেয়েছে গণমানুষের অধিকার।

দেশ স্বাধীন হলো। দেশের মাঠে ফসল নেই। কৃষকরা গত নয় মাস বিপর্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। ফসল উৎপাদন নগণ্য। সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য দরকার। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তো আর এত ফসল উৎপাদন করা যায় না। কৃষকের অবস্থাও নেই ফসল উৎপাদনের। এত দিন সরাসরি যুুদ্ধে অংশগ্রহণ, ভারতে আশ্রয় গ্রহণ বা পালিয়ে বেড়ানোর ফলে কৃষকের সংসার ও মাঠ অগোছালো। এসব গুছিয়ে নিতে সময় দরকার। দরকার বীজ, চাষাবাদের গরু, হাল, লাঙল। এসব আবার নতুন করে গোছাতে কিছু প্রস্তুতি দরকার। বঙ্গবন্ধু তত্ক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন, অভাবগ্রস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠতে ৩০ লাখ টন খাদ্য আমদানি করতে হবে। আর অতিঅসহায় কৃষকদের বিনামূল্যে সার, সেচ, উন্নত বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। অন্যদের মাঝে এসব বিতরণ করতে হবে স্বল্পমূল্যে, যা এখন তাঁর মেয়ে করছেন। একই সঙ্গে সব কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ করে দেয়ার ঘোষণা দিলেন। সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিলেন। কৃষকদের মাঝে খাসজমি বিতরণ করলেন। আর ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা হলো। তিনি কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেন, উচ্চতর কৃষি গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধু এসব করলেন কৃষিনির্ভর সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য।

বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীন বাংলার দায়িত্ব নিলেন, সে সময়ে কৃষকদের স্বার্থ সবচেয়ে আগে বিবেচনা করলেন। আমার মনে পড়ে, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে প্রায় ৫০১ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। তার মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি টাকাই ছিল কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়নে, কৃষকদের স্বার্থে। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, কৃষকরা বাঁচলে স্বনির্ভর হবে দেশের অর্থনীতি।

ভঙ্গুর অর্থনীতিকে মজবুত করতে পারে সুচিন্তিত পরিকল্পনা। বঙ্গবন্ধু সেই সত্য বুঝতে পেরেছিলেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের নিয়ে তিনি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করলেন। তাদের দায়িত্ব দেয়া হলো, সদ্যস্বাধীন দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা গ্রহণের। তারা প্রণয়ন করেন দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭২-৭৬)। এটি নিছক একটি পরিকল্পনা দলিল ছিল না, ছিল স্বপ্নপূরণের পদক্ষেপ। এ পরিকল্পনার ভিত্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, যা ছুঁয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার পায় অবকাঠামো নির্মাণ। তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন পুনর্বাসন ও নির্মাণকেন্দ্র তৈরিতে। এ তালিকায় ছিল বন্দর, রাস্তাঘাট, কলকারখানা, সেতু, কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষা, পরিকল্পিত পরিবারসংবলিত জনসংখ্যা নীতি, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং আয় ও সুযোগবৈষম্য হ্রাসকরণেও বঙ্গবন্ধুর ছিল সজাগ দৃষ্টি।

বঙ্গবন্ধু বিকেন্দ্রীকরণ চেয়েছিলেন। কুড়িগ্রাম বা টেকনাফ থেকে প্রশাসনিক কাজের জন্য মানুষকে ঢাকায় আসতে হবে। সময় নষ্ট হবে। গুনতে হবে অতিরিক্ত খরচ। বঙ্গবন্ধু তা চাননি। তিনি জেলা পরিষদ গঠন করলেন। প্রশাসনে আমূল সংস্কার এনে জেলা গভর্নর পদ্ধতিতে সব প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বিকেন্দ্রীকরণের বিরাট পরিকল্পনার ঘোষণা করেন। তিনি জেলা গভর্নরদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করেন। জেলা পরিষদ শক্তিশালী হলে দেশও শক্তিশালী হবে। তৃণমূলের উন্নয়ন নিশ্চিতের মাধ্যমেই সম্ভব দেশের প্রকৃত উন্নয়ন— এ ভাবনাটা তিনি দৃঢ়ভাবে ধারণ করতেন।

বঙ্গবন্ধু দীর্ঘসময় আন্দোলন-সংগ্রামে কাটিয়েছেন। তাঁর প্রশাসনিক নেতৃত্বদানের অভিজ্ঞতা সময়ের হিসাবে হয়তো কম কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে অনেক বেশি। সদ্যস্বাধীন দেশে ফিরেই তিনি ভারতীয় সেনা দেশে পাঠিয়ে দিলেন। ফিলিপাইনে এখনো আমেরিকান সেনারা ঘোরাফেরা করে। কয়েক দশক পার হয়ে গেলেও বিদেশী সেনামুক্ত হতে পারেনি জাপান। অথচ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণরূপে বিদেশী সেনামুক্ত করার জন্য চরম সাহসের দরকার, যেটা ছিল বঙ্গবন্ধুর। তাঁর নেতৃত্বে সদ্যস্বাধীন দেশে বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। সশস্ত্র সংগ্রামে স্বাধীনতা অর্জিত অন্যান্য দেশের ন্যায় বিপুল প্রাণহানি এখানে ঘটেনি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি কার্যকর ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য শাসন ব্যবস্থায় নিয়ে আসেন জাতির জনক।

স্বাধীন দেশের পুনর্গঠনে বিদেশী অর্থের দরকার। বিশ্বব্যাংক এক্ষেত্রে এগিয়ে এলেও চিরাচরিত শর্তের বেড়াজাল থেকে বের হতে পারে না। বঙ্গবন্ধু বিশ্বব্যাংককে বলেন, বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে যে এইড কনসোর্টিয়াম হয়ে থাকে, তা ঢাকায় করতে হবে। বিশ্বব্যাংক পাল্টা শর্ত দেয় পাকিস্তানের দেনার ভার বাংলাদেশকে নেয়ার। বঙ্গবন্ধু পরিকল্পনা কমিশনের সহায়তা নেন। তিনি বিশ্বব্যাংককে বলেন, পাকিস্তান আগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিক, পরে না-হয় দেখা যাবে। ঋণ নয় কেবল, বাংলাদেশের সম্পদ ভাগাভাগির বিষয়টিও আলোচনা করা যাবে। যুক্তি-পাল্টা যুক্তি, এভাবে ’৭৩-এর এইড কনসোর্টিয়ামের সভা কিন্তু ঢাকাতেই অনুষ্ঠিত হয়।বঙ্গবন্ধু ঘরহীন মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। তিনি অনেক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেন। ঘরহীন লোকদের ঘরের ব্যবস্থা করেন। আমি তখন মুজিবনগর সরকারের আঞ্চলিক প্রশাসকের নির্দেশনায় ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর অনেককেই দেশে ফিরিয়ে আনার গুরুতর দায়িত্ব পালন করি। সে সময় খাদ্য, যাতায়াত ও বাসস্থান নিশ্চিত করা কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসেবা প্রদানও ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও সাহসিকতায় সেসব সমস্যার উত্তরণ সম্ভব হয়েছিল। সে সময় ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হোসেন আবেদ শার্লায় শরণার্থীদের ঘর বানানোর জন্য ভারত থেকে বাঁশ আমদানি করতে চান। তবে ভারত তাতে বাধা দিলে বঙ্গবন্ধু বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হন। বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে বিষয়টি ত্বরিত সমাধা হয়। আমরা সরকারি কর্মকর্তারা সে সময় দিন-রাত কাজ করতাম। আমাদের মাঝে অনন্ত কাজের প্রেরণা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। শিক্ষার প্রসারে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষককে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। সারা দেশে তীব্রগতিতে এগিয়ে চলে পুনর্গঠনের কাজ। ১১ হাজার স্কুল তৈরি করেন, বিধ্বস্ত সেতু, রাস্তা, রেল যোগাযোগ ইত্যাদি পুনরায় স্থাপন করেন। বাড়ির পাশে খোলা জায়গায় ফল, শাকসবজি চাষ করতে বললেন। পুকুরে মাছ চাষ করতে বললেন। আমরা অল্প কয়েক দিনেই নেতিবাচক থেকে ইতিবাচক ধারার উন্নয়নে চলে এলাম। জিনিসপত্রের দাম কমে যেতে শুরু করল।

একটি দেশের যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থা তত্ত্ব বা গাণিতিক হিসাব দিয়ে পরিসংখ্যান করা যায় না। বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে বঙ্গবন্ধু যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় বাস্তব কর্মসূচি হিসেবে দেদীপ্যমান। সে সময়ে তিনি বাস্তবতা উপলব্ধি করে অনেক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে দেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরিতে সহায়ক হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরপর ইংল্যান্ডে গেলাম সরকারি একটা কাজে। সে সময় লন্ডনপ্রবাসী সিলেটীরা দেশ পুনর্গঠনে অতি উত্সাহী। এরাই বাংলাদেশ বিমান চালু করেন, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেন। বিদেশী সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় এলে তারা জানালেন যে, সরকার যদি তাদের নিজ নিজ তহবিল দিয়ে দ্রব্যসামগ্রী আনতে অনুমতি দেয়, যেমন— শিশুদের জন্য গুঁড়ো দুধ, ব্লেডসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, তাহলে তারা তা আনতে পারবেন।

আমি দেশে ফিরে এসে বিষয়টি প্রস্তাব আকারে মাননীয় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান গাজীর মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাই। তবে তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এমআর সিদ্দিকী এবং ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরত সচিব জনাব নুরুল ইসলাম তা নাকচ করে দিলেন। প্রস্তাবনাটি আঁতুড়ঘরেই বিনষ্ট হয়ে গেল। বেশ কিছু সময় পার হয়ে গেল এরই মধ্যে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এলেন আবু হেনা কামরুজ্জামান। জনাব দেওয়ান ফরিদ গাজী ও হেনা ভাইয়ের ঘনিষ্ঠতা ছিল প্রবল। সেজন্য প্রস্তাবটি আবার নতুন করে পেশ করা হলো। এবারো সচিব সাহেব নাকচ করে দিলেন। সচিবের যুক্তি ছিল, প্রস্তাবনাটি গৃহীত হলে কেবল কয়েকজন সিলেটি প্রবাসীর উপকার হবে, তাদের বাণিজ্য হবে, দেশের কিছু হবে না। তার এমন অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে আমরা বেশ মর্মাহত হলাম। সে সময় প্রতি ছয় মাস পর বাণিজ্যনীতি ঘোষণা করা হতো।

একদিন দেওয়ান ফরিদ গাজীর অফিসে বসে আড্ডা হচ্ছে। সিলেট এলাকা থেকে অনেক নেতাকর্মী আসছেন দেখা করার জন্য। এদেরই একজন কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী, এমপি। তিনি বললেন, মোমেন, আপনার নেতাকে নিয়ে চলেন বড় নেতার কাছে যাই। যেই বলা, সেই কাজ। সবাই মিলে ছুটলাম নেতার কাছে। বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন, দেওয়ান সাহেব, কেন এসেছেন? দেওয়ান সাহেব বিস্তারিত বললেন, প্রবাসীদের নিজ বৈদেশিক মুদ্রায় পণ্য আমদানি ‘ওয়েজ আর্নার স্কিম’ নামে সমধিক পরিচিত। সে সময় ১ পাউন্ডে ১৮ টাকা হতো। আর ১ পাউন্ডে পাওয়া যেত ৭৫টি ব্লেডের প্যাকেট। প্রতি প্যাকেটে পাঁচটি ব্লেড থাকত, যা দেশে আনলে প্রতিটি ব্লেড বিক্রি হতো ৫ টাকায়। একইভাবে শিশুখাদ্য হিসেবে গুঁড়ো দুধও সস্তায় আমদানি সম্ভব হয়।

বিদেশী অর্থ সহযোগিতার পরিবর্তে প্রবাসীদের অর্থে শিশুখাদ্য আমদানির কথা শুনে আশ্চর্যান্বিত হলেন বঙ্গবন্ধু। বললেন, শিশুদের জন্য, আঃ! শিশুদের জন্য? এ তো অ্যালাও করা উচিত। পরে সংশ্লিষ্ট সেক্রেটারিদের ডেকে তিনি হুকুম দিয়ে দিলেন। শিশুদের জন্য বঙ্গবন্ধুর এমনই ছিল দরদভরা মন।

আরেকবার ভারতে গিয়েছি, ইসকাপ সম্মেলনে। বাংলাদেশ সেবার ইসকাপের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। সে সময়ে নাউরু রিপাবলিক নামে একটা দেশও সম্মেলনে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। আমার সে দেশ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। আমাদের ছিল অল্প কয়েকজনের প্রতিনিধি দল। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন দলের নেতা। প্রতিনিধি দলের উপদল নেতা অতিরিক্ত সচিব আশরাফুজ্জামান সাহেব আমাকে ডেকে বললেন নাউরু রিপাবলিকের সঙ্গে ভাব করতে। আর সময়মতো নেতার জন্য ভোটটা চাইতে হবে। এখনকার মতো গুগল ছিল না সে সময়। তাদের সম্পর্কে ধারণা নেই। সাদা চামড়ার নাউরুর অ্যাম্বাসেডরের সঙ্গে একটু কথা বলে এগোলেই তাদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পরিচয় হয়। লম্বা চেহারার প্রেসিডেন্ট। তবে দেখতে সাদা নয়, অদ্ভুত রকমের কালো। বেশ মোটাসোটা, বিরাট দেহ। তবে খুব হাসিখুশি মেজাজের। অল্পক্ষণেই আলাপ জমে উঠল।

দেশে তখন বন্যা। ১৯৭৪ সাল। বড় বন্যা হয়েছে। সৌজন্যসূচক আলাপের পর কথায় কথায় দেশের প্রসঙ্গ ওঠালাম। দেশ কেবল স্বাধীন হয়েছে। আমরা এখনো গুছিয়ে উঠতে পারিনি। এর মধ্যেই শুরু হলো বড় আকারের বন্যা। প্রকৃতি যেন আমাদের ওপর বেশিই নাখোশ। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো অবস্থা। পারলে আমাদের কিছু সাহায্য দাও। বিদেশী সাহায্য গ্রহণের জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডার রয়েছে। তিনি সব শুনেটুনে দরদ দেখালেন। শেষে ঘোষণা দিলেন, তারা আমাদের দেড় মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার সাহায্য দেবেন। ইন্দোনেশিয়ার এডাম মালিকও ছিলেন একজন শক্তিশালী প্রার্থী, যাকে তার ভীষণ অপছন্দ। এই ফাঁকে আমি কিন্তু আমার নেতার জন্য ভোট চাওয়ার সুযোগটাও হাতছাড়া করিনি। উল্লেখ্য, ওই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়।

প্রেসিডেন্ট ড. হেমার ডি- রোবাটের অফার পেয়ে আমি তো মহাখুশি। পারি তো দৌড়াতে দৌড়াতে এসে আমাদের দলকে খুশির খবরটি জানিয়ে দিই। খবরটি শুনে সবাই খুশি। তবে সাহায্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরুর পর দেখা দিল বিপত্তি। দিল্লি মিশনের উপপ্রধান আতাউল করিম বেজায় মুশকিলে পড়লেন। দেখা গেল, তারা আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি। আমরাও দেইনি। স্বীকৃতি না হলে চেক নেই কীভাবে?

তখন পানিসম্পদমন্ত্রী সেরনিয়াবত সাহেবও ছিলেন একই হোটেলে। তার রুমে সবাই দলেবলে গেলাম। ল্যান্ড ফোনে কয়েকবার চেষ্টার পর বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া গেল। তিনি সব শুনলেন। খুশি হলেন। এরপর বললেন, যাও, আমি নাউরু রিপাবলিককে স্বীকৃতি দিয়ে দিলাম। ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে বিজ্ঞান ভবনে চেক হস্তান্তর হলো। মিলল কাঙ্ক্ষিত অস্ট্রেলিয়ান ডলার।

দেশে ফেরার কয়েক দিন পর মাননীয় মন্ত্রী গেলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। সঙ্গে আমাকে নিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন। আমাকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বিশালদেহী মানুষ ছিলেন। সেই তুলনায় তাঁর হাত ছিল অত্যন্ত নরম ও উষ্ণ। আমি এখনো সেই অনুভূতি উপলব্ধি করি। এরপর জিজ্ঞাসা করলেন, কোন ডলার বড়, অস্ট্রেলিয়ান না আমেরিকান? রুমের সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে এমন উপস্থিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেক। বিনিময়ে দেশ পেয়েছে সহযোগিতার খোলা দরজা।

আরেকটি ঘটনা। চীন ১৯৭১ সালে জাতিসংঘে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা পায়। ক্ষমতা পাওয়ার পরই তারা আমাদের সদস্যপদ না পাওয়ার জন্য পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে ভেটো দেয়। আঞ্চলিক রাজনীতিতে পাকিস্তানকে হাতে রাখা ছিল চীনের অন্যতম লক্ষ্য, এখনো আছে। পাকিস্তানকে খুশি করতে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রদানের ক্ষেত্রে চীন ভেটো দেয়। ব্যস, সদস্যপদ লাভে ঝুলে যায় বাংলাদেশের আবেদন। বঙ্গবন্ধু বিষয়টি বুঝলেন। তিনি দুটো কাজ হাঁকডাক না বাজিয়ে করলেন। প্রথমত. বাংলাদেশ তখন ভারত থেকে কয়লা আমদানি করত। তখনো চীনের কাছ থেকে আমাদের স্বীকৃতি মেলেনি। ভারত থেকে কয়লা আমদানি করলে সস্তা হবে, আর চীন থেকে আমদানি করলে দাম সামান্য বেশি পড়বে। সচিব তাই তা বাদ দিয়ে দিলেন। এর কিছুদিন আগে আমরা নয়াদিল্লিতে সম্মেলনে চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। এটাই ছিল বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাক্ষাৎ। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী তাই কয়লা আমদানির ফাইলটি বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু কোনো কথা জিজ্ঞেস না করেই ফাইলটি অনুমোদন করেন। তিনি সে সময় দৃঢ়গলায় বললেন, ‘ব্যবসা হলেই তো সম্পর্ক হবে।’

দ্বিতীয়ত. পাকিস্তানের সঙ্গে চিরায়ত দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বঙ্গবন্ধু সে দেশে অনুষ্ঠিত ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। যদিও প্রতিবেশী দেশ এতে মনঃক্ষুণ্ন হয়েছিল। এতে পাকিস্তান আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলো, আমাদের স্বীকৃতি দিল। পরে স্বীকৃতি মিলল চীনের কাছ থেকেও। সে বছর আর জাতিসংঘে সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে চীনের কাছ থেকে আপত্তি আসেনি। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হয়ে গেল।

আরেকটি ঘটনা। ১৯৬৯ সাল। উত্তাল জনসমুদ্রের চাপে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আরটিসি বা গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। আমি তখন রাওয়ালপিন্ডিতে ২৪ ঘণ্টাই তাঁর সঙ্গে সঙ্গে। সেই সম্মেলনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর শখ হলো, তিনি সাদ্দাদের বেহেশত দেখবেন! ঘুরে দেখবেন ইসলামাবাদ শহর। তবে তিনি পাকিস্তানের সরকারি টিকটিকির গাড়ি দিয়ে যাবেন না। বঙ্গবন্ধু বললেন, মোমেন, আমি টিকটিকির গাড়িতে করে ইসলামাবাদ দেখতে যেতে পারব না। তুমি গাড়ি ম্যানেজ করো। আমি দ্রুতগতিতে গাড়ি ম্যানেজ করলাম। কিন্তু তিনি নির্দেশ প্রদানের পরই ব্যস্ত হয়ে গেলেন। এই মিটিং তো সেই সিটিং। তাঁর আর ব্যস্ততা শেষ হয় না। গাড়ি ম্যানেজের পর আমি তাঁর পেছন পেছন ঘুরি। ফাঁক পেলেই বলে উঠি, নেতা, যাবেন নাকি? তাঁর আর ব্যস্ততা শেষ হয় না। অবশেষে ঢাকায় ফিরে গেলেন। ইসলামাবাদের পিন্ডিতে সেই সফরে অনেকের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মোল্লা জালাল উদ্দিন, শামীম ওসমানের পিতা গোলাম সারওয়ার, তরুণ ব্যারিস্টার কামাল হোসেন আর মওদুদ আহমদ।

পিন্ডি থেকে ফিরে একদিন বত্রিশ নম্বরে যাই। অনেকের সামনে ডেকে বললেন, মোমেন, এই দিকে এসো, বসো। এরপর সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন, মোমেন আমারে ইসলামাবাদ দেখায়নি। তাঁর মধ্যে রসিকতাও ছিল প্রচুর। দেশের স্বার্থে এ রকম হাজারো ইচ্ছা জলাঞ্জলি দেয়ার ঘটনা আছে বঙ্গবন্ধুর জীবনজুড়ে।

দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববাসীকে অবাক করে লাল সবুজের দেশটি আজ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে। এর সবই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনকের পদাঙ্ক ও অর্থনীতির রূপরেখা অনুসরণ করেই সফলতার পথে অগ্রসর হচ্ছেন। সে সময়ে সবাইকে নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু দেশের সবার অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ঘোষণা করেন। বর্তমানে জাতিসংঘ উন্নয়নের টেকসই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এবং সেই লক্ষ্য পূরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজ করে চলেছেন। কাজ করছেন প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ ও দেশের মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে, সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়ে। অগ্রগতির যে অবস্থাই হোক, এর ভিত্তিটা কিন্তু রচিত হয়েছিল একাত্তর-পরবর্তীতেই, বঙ্গবন্ধুর হাতেই।

 

লেখক: জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি; সভাপতি, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here