দ্য আমেরিকান ড্রিম- স্বপ্ন পূরণের সংগ্রাম

।। মোনায়েম চৌধুরী ।। 

দুর্দান্ত খাওয়া আর জমজমাট আড্ডা। ড্রিমের ভিতর নয়। নির্ভেজাল ‘রিয়েল’। চিতল মাছের কোপ্তার মন মাতানো চাহনি, মুখে দিলেই গলে যাওয়া চিংড়ী মাছের হাতছানি, ইলিশ মাছের মিষ্টি হাসির আপ্পায়ন, আর তার সাথে তাল মিলিয়ে কই, কেচকি, আর রুই মাছের আনা গোনা। আমি অবশ্য গোশত আর মিষ্টির ধার দিয়ে হাটিনা। তবে কিনা যাদের ওসব বালাই নেই তাদের পরিতৃপ্তিটা সেগুলোর যে কি অপূর্ব স্বাদ সেটা বেশ ভাল ভাবেই জানিয়ে দিচ্ছিলো। পরিশ্রম, নিপুণতা, আর আন্তরিকতা মিশিয়ে স্বাদের জোয়ারটা বইয়েছিলেন আমন্ত্রণকারীর স্নেহময়ী শাশুড়ি মা।

আড্ডার খোরাকে কিই বা ছিলোনা? আদিম কালের মানুষ থেকে সুরু। আমি তো ভয় পেয়ে প্রাণ বাঁচনোর জন্যে দিয়েছিলাম দৌড়। পরে সবাই যখন ‘মোজেজের’ সাথে ‘সাইনাই’ মরুভূমিতে তেলের খোঁজে হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছিল, আমি তখন ভিড়ে পড়লাম তাদের ভিতর। পরে বুদ্ধদেবের সাথে বসে কিছু ধ্যান ধারণা করে মোগল সাম্র্যায্যের ভিতর চলাফেরা করতে লাগলাম। বিরাট একটা লাফ দিয়ে ভারত বিভাগের আলোচনাতে যোগ দিয়ে স্বাধীনতা দেখে ফেললাম। স্বস্তি নেয়। বাংলাদেশে এসে হরতালের ভিতর ঘুরপাক খাওয়া। বেরিয়ে আসবার রাস্তা নেয়। যে দিকে তাকায় মৌলবাদ, ফতোয়াবাজ, তালিবান, আর সন্ত্রাসীদের ভিড়। যা হোক কোন রকমে নিস্তার পেয়ে মনটাকে সরস করে তুলবার জন্যে সিনেমা, সংগীত আর কাব্য জগতে ঢুকে পড়লাম।

সমাবেশটা নতুন বাড়ির উদ্বোধনে। মালিক ইমন নামেই বেশী পরিচিত। চাকরীটা বিশ্ববিখ্যাত এক কোম্পানিতে। প্রায়ই ব্রেকফাস্টটা সারেন চীন, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, স্পেন, আর স্কটল্যান্ডে। এই তো বছর কয়েক আগের কথা। তখন ছিলেন চাকুরীপ্রার্থী, এখন চাকুরীদাতা। সে সময় মাসে মাসে দিতেন বাড়ীর ভাড়াটা, আর এখন মাসে মাসে পান একাধিক বাড়ীর ভাড়াটা। এক সময় জড়িত ছিলেন সামরিক বাহিনীর সাথে। সেই সুবাদে ইরাক যুদ্ধ শুরু হতেই সোজা বাগদাদে। কাটিয়েছেন বেশ কয়েক মাস। ইরাকে আসার সময় কোন ক্যাপ্টেনকে দেখলে স্যালুট দিতেন আর ফেরার সময় স্যালুটটা নিতেন ক্যাপ্টেন হিসাবে। অফিসের চাপ, সংসারের ঝক্কি, এই সবের আবর্তনে আটকা পড়েও লেখাপড়াটা আঁকড়িয়ে ধরে থাকতে ভোলেন নি। কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরিয়ে চাকরীর ভিতর থেকে এম বি এ ডিগ্রিটা হাসিল করেছেন।

বাড়ির মালিকা মণিকা। প্রাণ সঞ্চার করেন সব কিছুতে। জনপ্রিয় একটা গান আছে যার শুরু “আকাশের হাতে আছে এক রাশি নীল”। মণিকার সাথে কিছু আলাপ হলে নতুন একটা লাইন বাজতে শুরু করবেঃ “মণিকার মাঝে আছে এক কাড়ি গুণ”। মণিকা চলেন আল্লাহর এঁকে দেওয়া পথ দিয়ে। নামাজ, রোজা, জাকাত এসবের উপর ভর করে হাঁটেন। দৈনন্দিন জীবনে কোন ত্রুটি রাখেন না। স্নেহ, ভালবাসা, শ্রদ্ধা, যার যেটা প্রাপ্য দেন উপছিয়ে। পড়াশুনাতে ইতি দেননি বিয়ের পর। সংসারের সব কিছুর সাথে তাল মিলিয়ে আর অসাধারণ পরিশ্রমের ভিতর দিয়ে লেখাপড়ার শেষ ধাপটা পেরিয়েছেন। সাথে সাথে আবার নতুন জীবনকে আনতেও দেরী করেন নি। তাই ডক্টর মণিকা আর মা মণিকা প্রায় একই সাথে। ডক্টরেট ডিগ্রিটা প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গবেষণা করেছেন মলিকিউলার ব্যায়োলজির উপর। মাঝে মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন মলিকিউলের ভিতর। অবশ্য প্রোগ্রাম করা থাকে, আবার বেরিয়ে আসেন।

সেই জম জমাট আড্ডাটা এখনও সরগরম। অনেক কিছুর লোভ সামলানো যায়। কিন্তু আড্ডার? তাকে আর সংযমের বেড়ি পরানো যায় না। ভিড়ে গেলাম। আস্তে আস্তে বেলা গড়িয়ে পড়েছে। সময়টা আমার হাঁটার। অনেক কষ্টে নিজেকে টেনে তুললাম। ইমনের বাড়ির আশপাশটা প্রাকৃতিক সৌন্দয্যে ভরা। অগুণতি গাছের কোলাকুলিতে সবুজের ছাওনি। আঁকা বাঁকা ‘ক্রীক’ থেকে পানির প্রবাহের মৃদু শব্দ। সব মিলে মাতিয়ে তোলে মনকে। হাঁটতে হাঁটতে কখন পৌছিয়ে গিয়েছিলাম অতীতের অলিগলিতে। দেখা হল ইমনের সাথে। দুই যুগ আগের সেই ইমনকে। সে তখন বাংলাদেশে। বয়েসটা স্কুলে যাবার হলেও স্কুলের খাতায় ওর নামটা খুঁজে পাওয়া যায়না। খারিজ হয়ে গিয়েছে। তাতে কোন ক্ষোভ নেয় ইমনের। দিব্যি জমিয়ে ফেলেছে এক গ্যারাজে। অনেক চৌকষ বন্ধু বান্ধব জুটিয়েছে যাদের কারুর বর্তমান ঠিকানা শ্রীঘর। হটাত হোঁচট খেলাম। আর খুঁজে পেলাম না সেই ইমনকে। আজকের ইমন আর সেই ইমন। এতো বড়ো বিবর্তন দেখলে খোদ ডারউইন সাহেবও ঘাবড়িয়ে যেতেন।

হিলটন হোটেলের বিরাট হলঘরটাতে আর কোন জায়গা নেয়। দেশ বিদেশ     থেকে অনেকের আগমণ। ফ্রান্সও বাদ পড়েনি। উপলক্ষ সব চেয়ে ছোট বোন শেফালীর বিয়ে। দস্তানা ছবির “দেশী গার্ল” গানটা বাজছিলো। মিলে গিয়েছিলো পরিবেশের সাথে। লাখো লাখো অনুসন্ধান করার পরেই তো রুপ, গুণ আর সফলতা দিয়ে সাজানো শেফালীর মতো কনের সন্ধান পাওয়া যায়। শেফালীর বরের এটা ভালভাবেই উপলব্ধি করা ছিল; তাই শেফালী ফরেভার ব্রাইড হয়েই আছে।

শেফালীর বিয়েতে আরও একজন এসেছিলেন, তবে কিনা নীরবে। তৃপ্তির হাসি, হ্রদয়ভরা স্নেহ, আর মন জুড়ানো আশীর্বাদ দিয়ে যেমনি অজান্তে এসেছিলেন ঠিক তেমনিই আবার চলে গেলেন। শুধু শেফালীই দেখেছিলো। আর কারুর দেখবার কথাও নয়। তিনি পরকালের অধিবাসী মা নাজমা।

সুমি, ইমন, সুমনা, আর শেফালী –  এরাই রুহুল আ লম আর নাজমার ডালপা্লা। বড় হয়েছে বাংলাদেশে।  বাপ চাচারা মিলে তিন ভাইয়ের যৌথ পরিবারে। শহরটা কুষ্টিয়া। বাপ রুহুল আলম ভাইদের মধ্যে সব চেয়ে ছোট। তাই আদর পেতে হলে মা নয় ছিল বড়মার প্রশস্ত কো্ল। আর যখন যা কিছুর প্রয়োজন সেটা পেতে হলে দরবারটা বাবার কাছে নয়; বাপির কাছে যিনি ছিলেন ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। মায়ের পেটের বড় বোন সুমি, কিন্তু সে আর কোনদিন বড়বু ডাকটি শোনেনি। যৌথ পরিবারের হিসেব নিকেশে সে ছিল রাঙাবু। আমেরিকাতে দুই যুগ কাটানোর পরেও সে সেই রঙ মিশানো স্নেহ ভরা রাঙাবুবু হয়েই আছে।

রুহুল আলম নিজের পা্যের উপর ভর করে এগিয়ে চলেন ঠিকই, তবে শক্তির উৎসটা নাজমা। নাজমা বড় হয়েছে যশোহরের পানিসারা গ্রামে। লেখাপড়ায় বেশিদূর এগুতে পারেননি। তবে জীবনের পড়াশুনাতে অনেক আগে। রুহুল আলমের কর্ম জীবন কেটেছে ভাইদের ব্যাবসার ভিতরেই। নিজের উপর ভর  করে কোন আয় করেনি কোনদিন; আর এটা যে একটা প্রয়োজন এই রকম চিন্তাধারা মনের ভিতর উঁকি মারেনি। এখন ভাইদের ব্যবসায়ে মন্দা। সংসারে টানাটানি। যে চিন্তাটা এতদিন উঁকি মারেনি আজ সেটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।  কি করা যায় ভাবছে রুহুল আলম। ইতিমধ্যে আমেরিকা থেকে বেড়াতে এসেছে ছোটবোন। সে আবার আমেরিকার নাগরিক। সংসারের হাল হকিকত দেখে ভাইদেরকে আমেরিকাতে পাড়ি জমানোর কথা বললো। কথাটা সবার কানে গেলোনা। তবে লুফে নিলো রুহুল আলম।

যারা রুহুল আলমকে ভালভাবে চিনতো তাদের মুখরোচক আলাপ আলচনার পরিধিটা হটাত করে খুব বেড়ে গেল। আরে শুনেছিস আমাদের রুহুল আলম নাকি আমেরিকার দিকে পাড়ি দিচ্ছে। বলিস কি? কি করবে সেখানে? পেট চালাবে কেমন করে? এই নিয়ে তাদের চিন্তা ভাবনার আর শেষ নেয়। আস্তে আস্তে রুহুল আলম নামটা তাদের মন থেকে হারিয়ে গেলো। রাস্তায় চেহরাটা নজরে পড়লে বলাবলি করতো আরে দেখেছিস আমেরিকার সাহেব যাচ্ছে। তা না হয় হোল কিন্তু সাহেবের একটা নাম তো থাকতে হবে। এই নিয়ে আর ব্যস্ত হবার কি আছে? ক্যানো ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। আরে আমেরিকাতেই যখন যাচ্ছে তখন একটা রাজা গজা নাম না হলে মানাবে কি করে? রাজা গজা সে আবার কি করে সম্ভব। আমেরিকা তো ডেমোক্রাসির দেশ। তাতে কি। বারগার কিং আছে না সেই দেশে?

রুহুল আলম আর নাজমার নিজস্ব জীবন আর ঘর সংসার শুরু আমেরিকাতে এসে ফিলাডেলফিয়ার কাছে মিডিয়া শহরে উনিশসো নব্বই সালে। তাদের স্বপ্ন ছেলেমেয়েদেরকে ঘিরে। উজ্জল হতে হবে এদের ভবিষ্যত। এই স্বপ্নটা শুধু স্বপ্ন হয়েই থাকেনি, নেমে এসেছিলো বাস্তবে। কি করে ঘটলো? এই প্রসঙ্গে হিলেরী ক্লিনটনের একটা বই আছে ইট টেকস এ ভিলেজ। বইটার ভাবধারা অনুসরণ করে বলা চলে লাগে ফ্যামিলী, রেলেটিভস, আর কম্যুনিটি।

আমেরিকাতে  রুহুল আলমের ছেলেমেয়েদের বাপ মার পরে সব চেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন একজনই। ফুফু। বাইরের আবরণটা শুষ্ক। ভিতরটা কিন্তু মমতা দিয়ে গড়া আর স্নেহ দিয়ে ভরা। ফুফুর মেজাজটা বুনিয়াদি। সাথে সাথে বেশ ধারালোও। ফুফু ছিলেন তিনার ভাইদের সবার ছোট আর একটিই বোন। তাই ছোট বোন হয়েও সবার উপর বড় বোনের খবরদারী করবার কঠিন দায়িত্বটা পালন করবার বোঝা স্বইচ্ছায় আর পরমানন্দে নিজের মাথার উপর চাপিয়ে নিয়েছিলেন। বাইরে থেকে কারুরই বলবার উপায় ছিলোনা যে ফুফু সবার ছোট। তাই ওদের সমীহের মাত্রাটা কোন সময়েই একটু আধটু কমের দিকে গুঁড়ি মারতে সাহস করেনি।

ফুফু সরকারি চাকুরে। একটি ডিপার্টমেন্টের তদারকি করতেন। অফিসটা দুইটি প্রদেশ ডিঙ্গিয়ে মেরিল্যান্ড স্টেটে। ভিড়ের ভিতর দিয়ে লম্বা ড্রাইভ। দেশে থাকতে কোন মহিলার এতখানি তৎপ্ররতা ওদের চোখে পড়েনি। তাই ভক্তিটা খুবই জমাট। ফুফুর কড়া নজর ছিল ওদের লেখা পড়ার উপর। ফুফুর বাড়ী থেকে অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসবার পরেও সেই শ্যেন দৃষ্টি থেকে ওদের কোন নিস্তার ছিলনা। প্রতি সপ্তাহেই সবাইকে ফুফু তার নিজের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। ফুফুর হাতের অপূর্ব রান্না, আর তার সাথে পছন্দমতো আইসক্রীম, চকলেট, পিজা, চিকেন নাগেট আরও সব বাইরের লোভনীয় খাবারের পরে আসতো লেখা পড়ার নীরস হিসাব নিকাশটা। তবে সব কিছু মিলে সময়টা সরসের ভিতর দিয়েই কাটতো।

রুহুল আলম আর নাজমার আয়টা পর্যাপ্ত ছিলোনা। এদিকে আবার সংসারটা বড়ো। ছয় ছয়টি মুখ। অনেকেই পরামর্শ দিলো ফুডষ্ট্যাম্পের সাহার্য্য নিতে।  কথাটা তার বোনের কানে পৌঁছালো। সোশ্যাল সার্ভিস আর ওয়েলফেয়ার হোলো তার অফিসের কাজ। নিজের চোখে দেখেছে কি ভাবে একবার ওয়েলফেয়ারের ভিতর ঢুকে কতো পরিবার আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্পৃহাটাকে চিরদিনের জন্যে হারিয়ে ফেলেছে। ভাইয়ের উপর কড়া হুকুম। ফুডষ্ট্যাম্প, ওয়েলফেয়ার এসবের ধার মাড়াতে পারবেনা। সংসার যদি না চালাতে পারো তা হলে দেশে ফিরে যাও। এই রইলো তোমাদের সবার ফিরে যাবার টিকিটের পয়সা। আর কি করা; এই সব অফিস গুলো রুহুল আলমের কাছে অচেনাই থেকে গেলো। কে জানে এ সবের ভিতর ঢুকে পড়লে রুহুল আলমের আমেরিকার স্বপ্নটা হয়তো হয়ে যেতো একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।

রুহুল আলম কাজ পেয়েছিলো একটা নার্সিং হোমে আর সেখান থেকেই  অবসর। নাজমার কর্ম জীবন শুরু বেবিসিটিং দিয়ে। ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিলেন ছেলেমেয়েদের ফুফু। খুব অল্প সময়ের ভিতরে নাজমা তার আলাপ পরিচয়ের পরিধিটাকে বাঙালী সমাজের শেষ প্রান্তে এনে ফেলেছিলেন। মিষ্টি হাসি, নির্ভেজাল আন্তরিকতা, আর প্রাণবন্ত অনুভূতি দিয়ে সবার মনটার ভিতর ঢুকে পড়া।     সামাজিকতার ভাবী থেকে আত্মীয়তার ভাবীর নাগাল পেয়েছিলেন। সবাই সাহায্য আর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ছিলেন। তবে দুজন পরিবারের- ডক্টর ফারুক সিদ্দিক আর ডাক্তার জিয়াউদ্দিন আহমেদের- দান অপরিসীম। নাজমার জীবনে  ঘরের বাইরের প্রথম আর শেষ কাজটা ছিল ডাইনিং রুমে মিল চেকারের; আর এই চাকরীটা পাইয়ে দিয়েছিলেন ফারুক সাহেব তিনার কলেজে।  যত দিন সবার    হেলথ ইনস্যুরেন্স ছিলোনা, ততো দিন সেই প্রয়োজনটা মিটিয়ে দিতেন জিয়াউদ্দিন সাহেব। নাজমার ইংরাজীর ভাণ্ডারটা স্বল্প হলেও সে আমেরিকানদের সাথে আলাপ জমাতে পিছুটান দেয়নি। খাতির জমিয়েছিল অনেকের সাথে। উঁচু স্তরেও ঢুকতে পেরেছিলো। নাজমার আগ্রহ আর প্রচেষ্টা দেখে একজন আমেরিকান মহিলা নাজমার বাড়ীতে এসে বিনা পয়সায় ইংরাজী শিখাতো।

রুহুল আলম আর নাজমার ছেলে মেয়েদের ভিতর সবার ছোট শেফালি, ইমন আর সুমনা জমজ ভাই বোন, আর সবার বড় হল মেয়ে সুমি। বাঙলা দেশ থেকে নিউইয়র্ক এয়ারপোর্টে নেমে সোজা ফুফার কাঁধে উঠেছিলো শেফালি। সেই যে উপরে বসে থাকা, সেখান থেকে আর কোনোদিন নীচে নেমে আসেনি। এদেশে লেখাপড়া শুরু প্রথম শ্রেণী থেকে। ইস্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছিলো একহাতে অভাবনীয় ফলাফলের কাগজ, আর এক হাতে শর্ত বিহীন নগদ দশ হাজার ডলার। ইস্কুলের ইতিহাসে এই প্রথম। ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরিয়ে এলো বাকনেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আর চাকরী থেকে গায়ে জড়াল এম বি এ ডিগ্রিটা।

দেশে থাকতে সবাই ধরে নিয়েছিলো যে সুমনার শেষ ডিগ্রীটা হবে “ইস্কুল  পড়ুয়া”। ইস্কুলকে টপকাবার কোন উপায়ই ছিলোনা। একটা নয়, দুটো নয়, তিন তিনটে প্রহরী -পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি- দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের মতো। সেই সুমনা কিনা খোদ আমেরিকাতে এসে তর তর করে হাই ইস্কুল ডিঙ্গিয়ে, কমুনিটি কলেজ পেরিয়ে, সবাইকে তাক লাগিয়ে টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট হয়ে বেরিয়ে এলো। অঙ্কের বেড়াটাকে উতরাতে পেরেছিলো প্রচেষ্টা,   উৎসাহ, আর সাহায্যের সমন্বয়ে। ফুফা প্রফেসর। যে টুকু অঙ্কের সম্পদ  তখনও অবশিষ্ট ছিল তার সবটুকু প্রয়োগ করা সুমনার উপর। ফুফুর একটিই কথা : আমি যদি রান্নাবান্না, গাড়ি চালানো, আর অফিস তদারকির ভিতর দিয়ে পোস্ট মাস্টার্স ডিগ্রীটা করে ফেলতে পারি, আর তুই কিনা খালি একটা বিষয়ের চাপটে মুখ থুবড়িয়ে পড়ে থাকবি? সুমনাও লেগে গেলো তার মন প্রাণ দিয়ে।

দেশে বরাবরই ফাস্ট হওয়া ছাত্রী সুমি। এর সাথে আবার জৌলুস। মুখের চেহারার বিরাট অংশটা কেড়ে নেওয়া বিপাশা বসুর আর বাকীটাতে ভাগ বসানো দীপিকা পাডুকোণের। এদেশে এসে শুরুটা কলেজ থেকে। লেখাপড়ার সাথে সাথে আবার ডিজাইন করা বর। পরিচয়টা কম্পিউটার পড়তে। টিউটর ডেভিড আর ছাত্রী সুমি। কখন এক সময় প্রোগ্রামের ভিতর থেকে সব ইকুয়েশনগুলো নীরস অঙ্কের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে প্রেমের সরস বেড়াজালে আটকা পড়ে গিয়েছিলো। সুমির মনের রঙ দিয়ে গড়া প্রোগ্রামের মায়াজাল থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি ডেভিড। প্রেমের রঙটা আবার মনের কোন থেকে বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়ে ছিল সুমির সারা দেহেও। কিছু দিন পর পরই মাথার চুলের আলাদা আলাদা চটকদারী রঙ।

ছাত্র থাকা কালীন সুমি, ইমন, সুমনা সবাই কাজ করেছে। মা, বাপ, ভাই, বোন সবায়ের ছিল একটা করে কাজ। আর সুমি? করেছে তিন তিনটে কাজ। বাকি সবার উপায়ের সবটাই খরচ হয়ে যেতো ওদের পিছনে। যেটা জমতো সেটা আসতো সুমির অক্লান্ত পরিশ্রম থেকে। মাসের শেষে সঞ্চয়ের পয়সাগুলো      ব্যাংকের খাতার ভিতর হাজিরা না দিয়ে জমা পড়তো খোদ ফুফুর কাছে। কে জানে ব্যাংক থেকে যদি হাওয়া হয়ে যায়।

এবার ছেলেমেয়েদের সংসার জীবন শুরু হবার কথা। চাকরীর ব্যাপারে সুমির সমস্যা একটাই, কোন চাকরীটা নেবে; যেখানেই ইন্টারভিউ দিয়েছে সেখানেই সিলেক্ট হয়েছে। সমস্যাটা কিন্তু কঠিন হয়ে দাঁড়ালো ডেভিডকে জীবন সঙ্গী বেছে নেওয়াতে। একে জাত আলাদা বাঙালী না হয়ে আমেরিকান, তার পরে আবার ধর্মও আলাদা মুসলমান না হয়ে খৃস্টান। মা বাবা দুজনেই বেঁকে বসলো। সুমির আবার বাপ অন্ত প্রাণ। টানটা অনেক আগে থেকে। একাত্তরের দুর্যোগে সুমি তখন কোলের শিশু। রুহুল আলম কোন দিকে না তাকিয়ে শুধু সুমিকে কোলে করে বেরিয়ে পড়েছিলো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। যা হোক সমাধানে এগিয়ে এলো ফুফু। শেষ মেষ দাঁড়ালো যে ডেভিডকে মুসলমান হতে হবে। খুব এক কনজারভেটিভ পরিবারের ছেলে ডেভিড। ভাই পাদরী। কিন্তু প্রেমের টান বড়ই টান। জীবনটা মিশাতে চেলো সুমির আবেগ ভরা হৃদয়ের সাথে। তাই কালমা পড়তে দেরী করলোনা ডেভিড। সবাই বললো দুই এক মাস পরে বসন্তের হাওয়াতে বিয়েটা হোক। বাধ সাধলো ফুফু। বিয়েটা এখনই হোক। বলা যায়না হাওয়াটা যদি অন্য দিকে বইতে শুরু করে। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি জায়গা পাওয়া যাবে কোথায়। ও সব কোন কথায় কান দিলোনা ফুফু। এক সপ্তাহের ভিতর আমার বাড়ীতেই হবে। হয়েছিলও তাই।

ডেভিড কালমাটা খালি বিয়ের জন্যে আওড়ালেও, আস্তে আস্তে অজান্তে গেঁথে গিয়েছিলো মর্মে। একামত দেয়, নামায পড়ে আর ছেলেদেরকেও শিখিয়েছে নামায। হজটা সেরে আসবার কথা ভাবছে। কখনোও টেলিভিশনের সামনে বসলে সোপ, সিরিয়াল, সিনেমা, রাজনৈতিক আলচনা, এসব উধাও হয়ে ভেসে আসে শুধু একটি বিশেষ চ্যানেলের ইসলামিক প্রোগ্রাম। শাশুড়ির অন্তিম সময়ের দিনগুলিতে হাসপাতাল বেডের পাশে সারারাত ধরে ইংরাজীতে অনুবাদ করা কোরান শরীফ পড়েছে। লম্বা ছিপছিপে সুপুরুষ ডেভিড। যেভাবে সবার সাহায্যে এগিয়ে আসে আর ধর্মের পথ দিয়ে হেঁটে চলে, তাই কেও ডেভিডকে বলে রক্তমাংসের ফেরেশতা।

বিয়েতে সিনিয়র সুমনা। বর সাগীর। বাপমায়ের পছন্দ করা বাঙলাদেশের ছেলে। মানুষ হিসাবে অনেক উঁচু মানের। অন্তরঙ্গতা আর সহানুভুতিতে ভরা। ধৈর্য্যের আবরণটা অনেক পুরু। সাগীর যখন এদেশে পৌঁছালো তখন শাশুড়ি  নাজমার অসুখটা সারবার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে। বছর ধরে দিনের পর দিন ক্লান্তির কাছ থেকে ছুটি নিয়ে সেবা করেছে শাশুড়ির। চলে গিয়েছেন তিনি। নিঃসঙ্গ জীবন শ্বশুরের। ছেলের মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সাগীর। আজও আছে সেভাবে।

বেচে থাকতে নাজমার ইচ্ছে ছিল ডাক্তার জামায়ের। সেটা পূরণ করেছিল শেফালী। জীবনের পথে চলতে সঙ্গী হিসাবে বেছে নিয়েছিল ডাক্তার ফজলেকে। বিভন্ন গুণের সংমিশ্রণে সে গড়া। নিপুণ রাঁধুনি আবার সরস রসিকও। শ্বশুর বাড়ী এলে বেমালুম ভুলে যায় যে সে জামাই। মনের ভিতর ঘুরপাক খায় একটা কথা : আচ্ছা আমার শ্বশুর তিনিও তো একদিন জামাই ছিলেন। তাহলে অবস্থানটা অদল বদল করলে কেমন হয়। আর কোন কথা আছে। লেগে পড়ে রোস্ট, হালিম, তেহরী, চপ, চিকেন বিরিয়ানির দিকে। আরও কত কিছু সব উঁচু মানের রান্না। বেচারী শ্বশুর আবার নতুন করে জামাই হয়ে পড়ে। শ্বশুর রুহুল আলমের কয়েকটা আদরের বিড়াল। বাইরে থেকে পাওয়া আর থাকেও বাইরে বাড়ীর চত্বরের ভিতর। কি বরফ, কি বৃষ্টি, কি ঝড়, ওদের প্রয়োজনে সব সময় রুহুল আলম। হটাত করে রুহুল আলমের স্ট্রোক। যা হোক স্বুস্থ হয়ে ফিরে এলে আলোচনা হচ্ছিলো কি ভাবে ভালো হলো। নানান মত। চট করে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারা, ডাক্তারের পারদর্শিতা, ঠিকমত সেবা যত্ন। ডাক্তার ফজলের একটাই মত : বিড়ালের দোওয়া।

নকশা করে বানানো বিরাট একটা বাড়ী সুমির। সবার আগে এঁকেছিল বাপ মায়ের থাকবার আর নামাজ পড়বার ঘর। নিজের বাড়ী শুরু করবার আগে বাপ মায়ের মিডিয়ার বাড়ীটাকে ঋণমুক্ত করেছিলো। কিনবার সময় সিংহভাগ পয়সাটা ওরই দেওয়া। এখন মায়ের হাতের লাগানো গাছগুলির সাথে প্রায়ই কথা বলে; মাঝে মধ্যে ভেসে আসে মায়ের সেই প্রিয় ডাকটা।

ছেলে মেয়ে সবারই ভালো চাকরী। ঝলমলে জীবন। নাজমা আর রুহুল আলমের এখন আনন্দের জোয়ার। হটাত করে নেমে এলো বিষাদের ঘন ছায়া। নাজমার ক্যান্সার। আর সেটা শেষ পয্যায়ে। অল্প দিনের যাত্রী। ইতিমধ্যে যুদ্ধ শুরু ইরাকে। একমাত্র ছেলে ইমনকে ডেকে নিয়েছে বাগদাদে। সেখান থেকে কি আর  সে ফিরবে। আর ফিরলেও ততদিন কি নাজমা বেঁচে থাকবে। রেড ক্রসের মাধ্যমে চেষ্টা করে দুই এক দিন ছুটি নিয়ে মাকে দেখে আসা তো দুরের ব্যাপার, মায়ের সাথে টেলিফোনে কয়েক মিনিট কথা বলবার সুযোগও পাওয়া  গেলোনা। মুষড়ে পড়লো নাজমা। তখন তার আমেরিকান বন্ধুরা প্রভাবশালী কংগ্রেসম্যান কার্ট ওয়েলডেনের কাছে জোরালো আর্জি পেশ করলো। এক সপ্তাহের ভিতরেই সশরীরে ইমন এসে হাজির। শুধু তাই নয়। পোস্টিংটা বাগদাদ থেকে নিউজার্সিতে, সাময়িক ভাবে নয় পাকাপোক্ত যাতে মার সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে।

শেষের যে কয়েকমাস নাজমা নিজের পায়ের উপর ভর করে হেঁটে বেড়াতে পারতো সেই দিনগুলিকে ভরিয়ে দিয়েছিলো সুমি মায়ের একান্ত বান্ধবী হয়ে। শপিংমলে, রেস্টুরেন্টে, আড্ডাতে, পাড়াবেড়াতে, কখন যে দিনের আলো নিভে যেতো তার কোন খোঁজই থাকতোনা। নাজমার শূন্যতাকে সামলিয়ে নিতে পারেনি ছোট মেয়ে শেফালী, সেদিন মা হয়ে পাশে দাড়িয়েছিলো সুমি। এতদিনের শক্ত বাঁধনটা বিলীন হয়ে যাওয়াতে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল রুহুল আলম। তবে সেটা ক্ষণিকের জন্যে। নতুন রূপে পেলো বড়ো মেয়ে সুমিকে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গেলেও হিসেবের জ্ঞানটা টনটনে রুহুল আলমের। আপনার সংসারটা কতো বড়ো এই প্রশ্ন করলে মাথাটা একটু  ঘুরিয়ে আর একগাল রহস্যময়ী হাসি ছড়িয়ে বলেনঃ তেমন কিছু বড় নয়, চার ছেলে আর চার মেয়ে। অবশ্য একটু পরেই আবার একগাল প্রাণভরা হাসি দিয়ে বলেন আমার আর নাজমার বিয়ের ফসল কিন্তু তিন মেয়ে আর এক ছেলে। তা হলে হিসেবটা কি করে মেলে? আরে জানেন আমার তিন  মেয়ের জন্যে তিন জামাই কিন্তু আসেনি। এসেছে তিন তিনটি প্রানবন্ত নিজেরই ছেলে। আর সনাতন বৌমায়ের দেখাও তো পায়নি। পেয়েছি একটি মায়া ভরা মেয়ে।

রুহুল আলমের অভ্যেস আছে একটু আধটু হাঁটার। মাঝে মধ্যে নাতিকে কাঁধে নেন। কচি হাত জড়িয়ে ধরে থাকে গোটা মাথাটাকে। অপূর্ব শিহরণ জাগে। হাঁটতে হাঁটতে কখন এক সময় ফিরে আসেন অনেক পিছনের সেই সব দুর্দিনের দিনগুলিতে। তবে সেটা মুহূর্তের জন্যে; নিমিষের মধেই ভিড় করে দাঁড়ায় সাফল্যে ভরা আজকের ঝলমলে দিনগুলি। ভালো করে তাকিয়ে দেখেন; হটাৎ একটা ঝটকা আসে। ভাবেন এসব কি স্বপ্ন? স্বপ্ন ঠিকই। তবে কিনা আমেরিকান ড্রিম। সাধারন স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। আর আমেরিকান ড্রিম?  শ্রম আর সাধনার সমাবেশ দেখলে মাঝে মধ্যে স্বপ্ন জগতটাকে ডিঙ্গিয়ে নেমে আসে বাস্তবে।

– লেখক : গল্পকার ও অধ্যাপক, চেনী ইউনিভার্সিটি, পেনসিলভানিয়া

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here