বিজেপি’র প্রশ্রয়েই বাড়বাড়ন্ত ধর্ষক গুরমীত

।। সুব্রত বিশ্বাস ।।

সুব্রত বিশ্বাস

যে হরিয়ানায় আগুন জ্বলিয়ে দিল গুরমিত সিং-এর অনুরাগীরা, সেই রাজ্যে বি জে পি-কে ক্ষমতায় আনতে যথাসাধ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন এই তথাকথিত ধর্মগুরু। হরিয়ানায় ২০১৪ সালের বিধানভা নির্বাচনে বি জে পি’র বিপুল জয়ের পেছনে এই ধর্মগুরুর অবদান কম ছিলো না। সেই নির্বাচনে সরাসরি বি জে পি’র হয়ে কাজ করেছিলেন ডেরা সাচা সৌদার এই ধর্মগুরু। সেজন্য সেদিন দলের ৪৪ জন প্রার্থীকে নিয়ে হরিয়ানায় বি জে পি’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কৈলাশ বিজয়বর্গীয় গিয়েছিলেন তার ডেরায়। কথিত ’পিতাজীর’ আশীর্বাদ চাইতে। এবং একা গিয়েছিলেন বি জে পি সভপাতি অমিত শাহ। সেই বৈঠকের পরে গুরু খোলাখুলি জানিয়ে দেন এই ভোটে বি জে পি-কেই ভোট দিতে হবে। ভোটের পরে পর্যবেক্ষকরা হিসেব কষে দেখিয়েছেন, তার প্রভাবের এলাকায় একচেটিয়া ভোট পেয়েছে বি জে পি।

ভোটের পরে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাম রহিমের প্রশংসা করে টুইট করেছিলেন। স্বচ্ছ ভারত অভিযানে তার ভূমিকার প্রশংসা করে সেই টুইট এবং জনসভায় গুরুর প্রশংসা রাম রহিমকে বাড়তি বৈধতা দিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে এই নয় যে মোদী অথবা বি জে পি অথবা বি জে পি নেতারা জানতেন না বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই ধর্মগুরু ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত। এবং মামলা তখন থেকেই চলছিল।

হরিয়ানা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় রমরমা বাড়বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে রাম রহিম। রাজ্যের তিন মন্ত্রী তাদের দপ্তর থেকে মোট ১ কোটি ১২ লক্ষ টাকা উপহার দিয়েছেন তাকে। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী রামবিলাস শর্মা বর্ণাঢ্য এক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি উপহার দিয়েছেন ৫১ লক্ষ টাকা। ১৫ই আগষ্ট রাম রহিমের জন্মদিনে ডেরার অতিথিশালাতেই ছিলেন শর্মা। শুক্রবারই তিনি রাম রহিমের সমর্থনে প্রকাশ্যে সওয়াল করেছেন। সিরসায় ডেরায় গিয়ে ৫১ লক্ষ টাকা দিয়ে এসেছেন হরিয়ানার ক্রীড়ামন্ত্রী অনিল ভিজ। চিরাচরিত ক্রীড়ায় রাম রহিমের নাকি বিরাট্ অবদান রয়েছে। সরকারি তহবিল থেকে টাকা দিয়ে ভিজ বলে এসেছিলেন, ডেরায় পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। ৫০ লক্ষেরও বেশি টাকা দিতেন যদি সেই অধিকার থাকত, এমন মন্তব্যও করেছিলেন ভিজ। এই ঘটনা ঘটে ২০১৬’র আগষ্টে। এই ভিজ কট্টর হিন্দুত্ববাদী, মহিলাদের বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্য করার কারণে কুখ্যাত। রাজ্যের আরেক রাষ্ট্রমন্ত্রী মণীশ গ্রোভার গিয়ে ফের সরাসরি তহবিল থেকে ১১ লক্ষ টাকা দিয়ে এসেছিলেন। রাম রহিমের আশির্বাদ তার মাথায় রয়েছে, সে কথা গর্ব করেই ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এ বছরের মে মাসে বি জে পি প্রভাবিত ভারতের যোগা ফেডারেশন প্রশিক্ষকদের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান ’দ্রোণাচার্য’ দেবার জন্য তার নাম সুপারিশ করেছিল।

উঙ্খৃল ঘটনা ঘটার আগে হরিয়ানা এবং পাঞ্জাব সীমান্তে ডেরার অনুগামীরা দলে দলে গত কয়েদিন ধরেই জড় হচ্ছিল। ধর্ষণের মামলার রায় তার বিরুদ্ধে গেলে বড় গন্ডগোল বাধানো হবে, একথা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট ছিল। কিন্তু কোন ব্যবস্থাই নেয়নি হরিয়ানা সরকার। অথচ পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দেয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে শক্তিপ্রয়োগ করে হিংসার চেষ্টা থামাতে হবে। তারপর ডিমেঢামে পায়ে এগোয় রাজ্য প্রশাসন। ততক্ষণে আগুন জ¦লে গেছে, প্রাণহানি ঘটে গেছে। রাম রহিমকে অবশ্য নিরাপদেই আদালত থেকে হেলিকপ্টারে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সি বি আই আদালত ধর্ষণের দায়ে রাম রহিমকে অভিযুক্ত করার পরে খোলাখুলি তার হয়ে সওয়াল শুরু করেন বি জে পি সাংসদ। ধর্ষিতাকেই দায়ী করে বলেন, একা একজন রাম রহিমের বিরুদ্ধে, কোটি কোটি লোক তার পক্ষে। আদালতের সে কথা ভাবা উচিত ছিলো নাকি? সাক্ষীর হুমকি, আরো বড় গন্ডগোল হলে আদালতকেই দায় নিতে হবে। সাম্প্রদায়িক মন্তব্যও করেন সাক্ষী। তিনি বলেন জামা মসজিদের ইমামের বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ আছে। তিনি কি আদালতের আত্মীয়? সাক্ষী মহারাজকে দিয়ে বি জে পি’র শীর্ষ নেতৃত্বই একথা বলিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
হরিয়ানায় ধর্ষক গুরুর ভক্তদের তান্ডবের পর গোটা দেশ নিন্দায়, প্রতিবাদে মূখর হলেও নীরবতা পালন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। হিং¯্রবাহিনীর ধ্বংসলীলা হবার দু’দিন পর তার মুখে বুলি দেখা গেছে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত কড়া মন্তব্য করেছে। সর্বোচ্চ আদালত মোদীকে স্বরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে তিনি বি জে পি’র প্রধানমন্ত্রী নন, দেশের প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ তার আচরণ কখনোই দলীয় স্বার্থকে ঘিরে হবে না, হবে দেশের সামগ্রিক স্বার্থকে ঘিরে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো একজন দায়িত্বশীল ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিকে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করার এমন ঘটনা অতীতে ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রীর পদ একটি সক্রিয় কার্যকরী পদ। মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কাজ চান, ভাষণ নয়। গত তিন বছরে শুধুমাত্র বিম্বাসের ওপর নির্ভর করে আর এস এস মদতপুষ্ট হিন্দুত্ববাদী দুস্কৃতিকারীদের গুন্ডামীর অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। তাতে শতাধিক মানুষকে বর্বরভাবে খুন করা হয়েছে। আহত ও পঙ্গ হয়েছে অনেকে। আক্রান্তদের সকলেই প্রায় মুসলিম বা দলিত। মোদী যে হিন্দুত্ববাদে বিশ^াস করেন এবং যে হিন্দুত্ববাদী শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রী, তাদের এমন বেপরোয়া হিং¯্র তান্ডব ও আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কোথাও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং হিন্দুত্ববাদী গুন্ডাদের আড়াল করারই চেষ্টা হয়েছে। তাদের অপরাধ ছোট করে দেখিয়ে সাজা শিথিল করা হয়েছে। গত তিন বছরে মোদীর জ্ঞান বিতরনের পর হিন্দুত্ববাদীদের হিং¯্র ও বর্বর বিশ^াসের প্রতিফলন বেড়েছে। অসহিঞ্চু বেড়েছে। গুজব রটিয়ে, জিগির তুলে মুসলিম ও দলিতদের ওপর আক্রমণ তীব্র হয়েছে। হরিয়ানায় যা ঘটেছে সেটাও হরিয়ানা ও কেন্দ্রীয় সরকার চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখেছে। শুধু দেখেনি গুরমীতকে সর্বতো পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসেছে। যখন ঘর, বাড়ি, গাড়ি, সরকারি সম্পত্তি পুড়ছে, মানুষ খুন হচ্ছেন তখন প্রশ্ন উঠেছে মোদীর এই নীরবতা কার স্বার্থে। তাছাড়া ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত সাধুবাবার সঙ্গেও মোদীর ঘনিষ্ঠতা ছিল। স্বচ্ছ ভারত অভিযানে গুরমিতকে সঙ্গে নিয়ে ভোটের প্রচার চালিয়েছেন। গুরমিতের প্রশংসায় সব সময় পঞ্চমুখ ছিলেন। এমনও বলেছেন গুরমিত ও তার ভক্তদের সহায়তায় স্বচ্ছ অভিযান সফল হবে। হরিয়ানার ভোটের আগে অমিত শাহ থেকে শুরু করে বি জে পি-র সব নেতা গুরমিতের আশ্রমে ধর্ণা দিয়েছেন। তারপর গুরমিত ভোটে বি জে পিকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন এবং সব ভক্তদের নির্দেশ দেন বি জে পিকে ভোট দিতে। বস্তুত গুরমিতের সমর্থনের জেরেই হরিয়ানায় প্রথম বি জে পি সরকার গঠন নিশ্চিত হয়। এমন এক গুরু ও তার ভক্তদের প্রতি মোদীদের দুর্বলতা ও দায়বদ্ধতা থাকবে এটাইতো স্বাভাবিক।
– নিউইয়র্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here