” জেনারেল ওসমানীর উপমা ও আমার ভাবনা “

0
243

 আল আমিন বাবু

আজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি  ওসমানীর জন্মদিন ।১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার দয়ামীরে তার পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ।তিনি তার মাতা জোবেদা খাতুন ও পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমানের দুই ছেলে ও এক মায়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ।১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি আমাদের মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন । তার অধীনে মুক্তিবাহিনী ৯টি সেক্টরে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধ  পরিচালিত হয় । তিনি ছিলেন চিরকুমার।

সব সময় যা আমার নজর কাড়ে তা হলো ,জেনারেল ওসমানীকে উপস্থাপন করতে যেয়ে তার নামের  আগে  যে সব উপমা অলংকৃত হচ্ছে তা অনেকটা এমন ,”বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, গণতন্ত্রের আপোষহীন সৈনিক, আজীবন গণতন্ত্রী, সংকল্পে অটল, নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক, পরমত সহিষ্ণু, সততা, কর্মনিষ্ঠা ও সময়ানুবর্তিতার আদর্শ পুরুষ জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী । সেখানেই আমার কাছে  একটু  খটকা লাগে ।

জেনারেল ওসমানীর ব্যক্তি চরিত্র বা তার প্রতি সন্মানপ্রদান সূচক কোনো উপমাতেই আপত্তি দেখানোর মতো দৃষ্টতা আমি দেখাতে যাচ্ছি না যদিও, ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্টে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর সেদিনের অনেক আওয়ামীলীগের নেতা ও সামরিক বাহিনীর তৎকালীন  জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তাদের ভূমিকা আজ প্রজন্মের কাছে অনেকটাই  প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু তাকে যখন বলা হয় বা তার কবরের উপর যে এফিটাফটি রয়েছে তাতেও লেখা আছে তিনি “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক”  সেখানেই  খটকা আর এখানেই রয়েছে আমার ঘোর আপত্তি ।

বঙ্গবন্ধুর পূর্বের সংগ্রামের জীবনের আলোচনা যদি এখানে নাও করি,যদি ১৯৭১ এর ৭ই মার্চ থেকেই শুরু করি তবে দেখা যায়,বঙ্গবন্ধু যখন বললেন যে,

[{ “আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় – তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু – আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবেনা।”}]

আবার তিনি তার ভাষণের শেষ অংশে যা উচ্চারণ করলেন তা ছিল এমন ,

[{” কিন্তু যদি এ দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালীরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।  জয় বাংলা ।”}]

এর পর আমি কোনোভাবেই জেনারেল ওসমানীকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সর্বাধিনায়ক মেনে নিতে পারছিনা কারণ, এখানে ইতিহাস এক বিভ্রান্তির মধ্যে পরে যায়, যেভাবে পাকিস্তানের আই এস আই এর ফর্মুলায়  পাকিস্তানের জামাতের অগ্রবর্তী দল  বিএনপির জোট সরকারের আমলে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বানানো হয়েছিল।

যতদূর মনে পরে, ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় লন্ডনে  চিকিৎসায় থাকাকালীন  ১৯৮৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী মৃত্যু বরণ করেন এবং তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটে সমাহিত করা হয়।  অতপরঃ তাঁর স্মরণে ঢাকায় গড়ে উঠেছে ‘ওসমানী উদ্যান’ ও স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশ  সচিবালয়ের বিপরীতে ‘ওসমানী মেমোরিয়াল হল’। এছাড়া তাঁর সিলেটস্থ বাসভবনকে পরিণত করা হয়েছে জাদুঘরে।  সরকারি উদ্যোগে সিলেট শহরে তাঁর নামে একটি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে । সে সময়টা ছিল স্বৈরাচারী এরশাদের সময় ।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর  জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর  ১৯৭২ সালে রচনা করা বাংলাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে তার অবৈধ সামরিক শাসনের কলমের খোঁচায় কেটে দিয়েছিলেন | তারপর স্বৈরাচার এরশাদ আরো এক ধাপ এগিয়ে ওই সংবিধানে “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম” যুক্ত করেন, যা ছিল আমাদের স্বাধীনতার চেতনার মূল সংবিধানের সাথে চরম সাংঘর্ষিক।

এরপর পদ্মা মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে, সেই এরশাদ আমল থেকে আজও অবধি আমাদের দেশের রাজনৈতিক পটভূমি কিভাবে চক্রাবক্রা ভাবে এগিয়েছে তা আমরা সবাই জানি,আমি সে আলোচনায় ও  যাচ্চি না বা জেনারেল ওসমানীকে ইতিহাসের খলনায়ক বানানোর ও কোনো বিন্দুমাত্র দুরাশাও  আমার নেই । আমি শুধু এটাই জানাতে চাই, জেনারেল ওসমানীর জন্য সবচাইতে সম্মানের উপাধি হচ্ছে বাংলাদেশের  মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ধাপ স্বাধীনতা যুদ্ধের মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক যা, তিনি অর্জন করেছিলেন তৎকালীন প্রবাসী মুজিবনগর সরকার বা বাংলাদেশের প্রথম  সরকারের কাছ থেকে। তিনিই আমাদের মুক্তিবাহিনীকে ১১ টি সেক্টরে  ভাগ  করে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

১৯৭১ সালের ১১ই এপ্রিল  প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেয়া ভাষণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের কথা উল্লেখ করে  কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন।  ১৯৭১ এর ১০ই  এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারী ও বাংলাদেশ  সরকার গঠন হয় এবং ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে।  ১৭ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার যেখানে  কর্নেল ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। তখন ওসমানী’র নির্দেশনা অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এক একজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি  বিভিন্ন সেক্টর ও মুক্তিবাহিনীর মাঝে সমন্বয় সাধন করেন , রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা ও  অস্ত্রের যোগান নিশ্চিত করেন , গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন । ১২ এপ্রিল থেকে এম এ. জি. ওসমানী মন্ত্রীর সমমর্যাদায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। রণনীতির কৌশল হিসেবে তার পরামর্শেই সমগ্র বাংলাদেশকে ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনা করে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং তিনি বিচক্ষণতার সাথেই  সেক্টরগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীকে সফল নেতৃত্ব দেন । ১৯৭১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর তাঁকে বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সের জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়া হয় এবং  ১৯৭২ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন ।

এই ছিল জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীর বর্ণাঢ্য জীবনের স্বল্প আলোকপাত । তিনি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সফল সেনাপতি বা মুক্তিবাহিনীর  সফল সর্বাধিনায়ক।

কিন্তু তাকে যখন বলা হয় তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক তখনই মস্তিষ্কে এই শব্দগুলো খুব জোরেশোরেই হাতুড়ি পিটাতে থাকে।তবে কি এখানেও ষড়যন্ত্র ?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক উপমাটি শুধুই বঙ্গবন্ধুর সাথেই যেতে পারে অন্য কারো সাথে নয় ।কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু , স্বাধীনতা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ধাপ, আর  মুক্তিযুদ্ধ তার চলমান প্রক্রিয়া যা আজও চলছে । কথাটা হওয়া উচিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মুক্তিবাহিনীর  সর্বাধিনায়ক । তা না হলে ভবিষৎ প্রজন্ম ধোঁকার মধ্যে পড়বে । এটাও একটা সুক্ষ ষড়যন্ত্রের মধ্যেই গড়াবে একদিন, যেমন জিয়াউর রহমান  আজকে অনেকের কাছেই স্বাধীনতার ঘোষক । ১৯৭৫ এ ওসমানীর ভূমিকা, ভাসানীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে অনেক কিছুই দৃষ্টির গোচরে আসে। জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বানিয়েও যখন  বঙ্গবন্ধুকে থামানো যায়না ঠিক তখনই একদল মাঠে নাম মৌলানা ভাসানী নিয়ে । আমি নির্ঘাত বলতে পারি কর্নেল ওসমানীর কবরের উপরে লেখা এফিটাপ একদিন প্রজন্মকেই বিভক্ত করবে জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার মতো ।এটাও একটা সুক্ষ ষড়যন্ত্র ! জেনারেল ওসমানী বেঁচে থাকলে তিনিও হয়তো এতে খুশি হবার চাইতে লজ্জাই বেশি পেতেন। আর যদি লজ্জা না পেতেন তবে ধরে নিতাম তিনিও জিয়াউর রহমানের মতোই “বেনিফিট অফ ডাউট”এর সুবিধাভোগীদের একজন। যিনি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, যিনি মুক্তিযুদ্ধের দুটি ধাপ যথা বাঙালীর স্বাধীনতা ও সংবিধান দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান,তাই মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক শুধু তাকেই বলা যায়,অন্য কেউ নয়।

ভুলে গেলে চলবে না, জেনারেল ওসমানীর মৃত্যু হয়েছিল ১৯৮৪ সালে যখন চলছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা ও বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে দেবার স্বর্ণযুগ ।

পরিশেষে আমি দৃঢ় কণ্ঠে বলতে চাই, জেনারেল ওসমানীকে বাঙালী যে উপাধিতে ভূষিত করেছিল তা ছিল “বঙ্গবীর”, যা তাকে  এখনই ফিরিয়ে দেয়া হোক । অর্থাৎ ১৯৭১ এর স্বাধীনতাযুদ্ধের  মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের জন্য তা ছিল সর্বোচ্চ সন্মান যা , স্বৈরাচার এরশাদের সময় ছিনতাই করা হয় । সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সেনাপতিকে দেয়া বঙ্গবীর উপাধিটি কি কারণে ছিনতাই করে একজন আঞ্চলিক মুক্তিবাহিনীর  বাঘা বীরের  “বাঘা” উপাধিটি সরিয়ে তাকে দেয়া হলো ? কেন জেনারেল ওসমানীর বঙ্গবীর উপাধিটি সরিয়ে তাকে  মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক উপাধিতে ভূষিত করা হলো, সেই প্রশ্নটা না হয় আপনাদের ভাবনার জন্যই থাকলো ।আমি কিন্তু এর মধ্যে ভবিষ্যত প্রজন্মের মস্তিষ্কে জাতির পিতার অবদানকে খাটো করারই একটা সুক্ষ ষড়যন্তেরই গন্ধ পাই ।

আল আমিন বাবু, লস এঞ্জেলেস

৩০শে আগস্ট ২০১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here