বিচারপতির পলায়ন : কিছু স্বগতোক্তি

।। আহমেদ নূরে আলম ।।
প্রধান বিচারপতি সিনহা সৎ ও সাহসী, এমন একটা ইমেজ তিনি জনমনে তৈরী করেছিলেন। বিচারপতি কামাল ঊদ্দিনের পর

আহমেদ নূরে আলম

বিচারপতি হাবিবুর রহমান ছাড়া শক্ত মেরুদন্ডের আর তেমন কাউকে দেখিনি।
দেশে বিচারপতি মানে মনে করা হয়, তারা সরকারের বা সামরিক শাসকের অনুগত (পা চাটা — বলতে চাই না)। যেনো তারা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, উর্দি পরা একজন অকস্মাৎ গভীর রাতে বা সূর্যোদয়ের আগে এসে বলবে, “চলুন স্যার। আপনাকে শপথ নিতে হবে।”
বিচারপতি সিনহা নিস্তরঙ্গ পুকুরে (কুয়া বলাই বোধহয় সঠিক) অপ্রত্যাশিতভাবে দুর্বিনীত ঢেউ তুলেছিলেন। মনে হয়েছিলো এক সাহসীর আবির্ভাব ঘটেছে। মনে হয়েছিলো “৭২-এর সংবিধানে দেয়া (এবং “৭৫-এ ছিনিয়ে নেয়া) বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে যক্ষরূপী প্রশাসনের দুর্গ থেকে ফিরিয়ে আনতে এক যোদ্ধা উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যতটা অকুতোভয় মনে হচ্ছিলো তাকে, দেখা গেলো তিনি তা নন। লড়াইর ময়দানে তিনি এক নাজুক যোদ্ধা। লেজে-গোবরে করে ফেললেন নিজেকে। জাতিকে হতাশ ও বিভ্রান্ত করলেন শুধু।
শেষ পর্যন্ত ড্রামা ক্ষান্ত করে লেজ গুটিয়ে পালালেন। আর তাকে অসম্মানিত করে , দেশ ছাড়া করে সরকার যাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি করলো, তিনিও বিপজ্জনক সরকারের জন্য(বিচারপতি ওহাব মিয়া যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির বিপক্ষে রায় দিয়েছেন)।
যাক বিচারপতি সিনহা প্রসঙ্গেই থাকি। যদি ধরা হয়, তিনি সৎ — এটা প্রমাণ করার দায়িত্ব তাঁর ওপর। তা প্রমানে তার অনেক রাস্তা ছিলো। আর কিছু না পারলে তিনি স্বপ্রনোদিত উদ্যোগ নিতে পারতেন। কারণ, বিচারপতি ইচ্ছে করলে নিজেই বিচার করতে বা ব্যবস্থা নিতে পারেন। নিজেই তাঁকে ঘিরে মিথ্যা, কুৎসা, অপপ্রচার ও চরিত্র-হানির মুখোমুখি দাঁড়াতে পারতেন। সরকার বা আমচা-চামচা-দালালরা গায়ের জোর দেখাতে গেল নিজেরাই বিপদে পড়তো। জনগনের ক্রোধের এক ফুৎকারে এরা সব ছাইয়ের মত ঊড়ে যেতো। দেশের বিচার ব্যবস্থায় এক স্বর্নালী যুগের সুচনা হতো। অমর হয়ে থাকতেন।
তিনি সৎ — এ চ্যালেন্জ তিনি নিতে পারেননি। সৎ মানুষের এক অন্তর্গত শক্তি থাকে। তিনি কেন শক্তিহীনতা দেখালেন? কেন নিজের সমর্থনে কিছু করেননি? এটাই মূল রহস্য।
তাঁর জেল জুলুম নির্যাতনের ভয় ছিল? নিজের পক্ষে যদি দাঁড়াতেন, দেখতেন কি ঘটছে। উল্টো তিনি পরোক্ষে প্রমান করলেন, তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ সত্য। লেজ গুটিয়ে পালালেন।
দেশে-বিদেশে অনেকের কাছে এখন তিনি সরকারী নির্যাতনের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। এটাই তার এসময়ের পুঁজি।
দু:খিত প্রধান বিচারপতি।

– আহমেদ নূরে আলম, সাংবাদিক
মনরে ভ্যিালি, ক্যালিফোর্ণিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here