রোমান পোলানস্কি যেমন ধর্ষক, খান আতা তেমনিই স্বাধীনতা বিরোধী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন গোপনে নয়, প্রকাশ্যে

খান আতা(বাঁয়ে) ও  রোমান পোলানস্কি

।। রুবায়েত আহমেদ ।।

বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা রোমান পোলানস্কি একজন ধর্ষক। এই তথ্য যাঁরা জানেন না তাঁরা কি এখন আমাকে গালমন্দ করবেন? তাঁর ভক্তকুল কি এখন এই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবেন যে- আমি ১০০ বার জন্মালেও তাঁর মতো শিল্পী হতে পারবো না! এসব বললেও বিষয়টি মিথ্যে হয়ে যাবে না। অস্কারজয়ী এই চলচ্চিত্র নির্মাতা ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই অপরাধের কারণে আমরা কেউ-ই পোলানস্কির চলচ্চিত্রিক মেধা বা সক্ষমতাকে অস্বীকার করি না। তিনি নিঃসন্দেহে অনেক বড় ফিল্মমেকার। 

কয়েকদিন ধরে ফেইসবুকে এদেশের একজন মেধাবী চলচ্চিত্র নির্মাতার অতীত কর্মকাণ্ড পুনর্বার সামনে চলে আসাতে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বসলাম। একজন অভিনেতা, গুণী গীতিকার-সুরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা খান আতাউর রহমান। ইতিহাসের তথ্য আমাদের জানাচ্ছে- ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। আর তা কিন্তু গোপনে নয়, প্রকাশ্যে। তখনকার সবচে শক্তিশালী গণমাধ্যম রেডিওতে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি তাঁর মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়েছেন। যেসব কাজে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন সেসব কাজের সবগুলো মাধ্যমকেই ব্যবহার করেছেন পাকিস্তানিদের পক্ষে। রেডিওতে কথিকা প্রচার যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের দুষ্কৃতকারী আখ্যা দান, পাকিস্তানিদের পক্ষে গান রচনা ও সুর করে সম্প্রচার, এমন কী ১৯৭১ সালেই পাকিস্তানি পরিচালকের সহকারী হিসেবে ‘দি বিট্রেয়াল’ নামক চলচ্চিত্রও নির্মাণ। পরিস্থিতির চাপে তিনি এমন করেছেন সেটা মেনে নেয়া যেতো যদি না স্বাধীনতার পরপরই ‘আবার তোরা মানুষ হ’ নামক বিতর্কিত চলচ্চিত্র নির্মাণ না করতেন, যদি না ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দুপুর থেকেই খান আতার লেখা, সুর ও সংগীতায়োজনে রেডিওতে অবিরাম ‘আমরা এদেশ স্বাধীন করেছিলাম কাহাদের জন্য?’ শীর্ষক একটি গান না বাজতো। এই গানটি রচিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় উল্লাস প্রকাশ করে। এগুলো সবই ইতিহাসের সত্য। বিভিন্ন গ্রন্থে, বিভিন্নজনের স্মৃতিকথায় সেসবের উল্লেখ রয়েছে। বিষয়গুলো মীমাংসিতও বটে। কিন্তু তাই বলে কোনো কারণে তা পুনর্বার সামনে নিয়ে আসা যাবে না সে কেমন কথা? আর যিনি বলবেন তাঁকেই সহ্য করতে হবে অকথ্য-অশোভন গালমন্দ! যিনি এ দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন তাঁর সমালোচনা করায় ক্ষিপ্ত হয়ে গেছেন অনেকে। আর গালি দিচ্ছেন তাঁকেই যিনি একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা, একজন অতুলনীয় নাট্যনির্দেশক, খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক। কী অবাক!!!

রোমান পোলানস্কি তাঁর কৃতকর্ম স্বীকার করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন। যিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি ক্ষমাও করে দিয়েছেন। তাই বলে পোলানস্কির ধর্ষণের ঘটনা মুছে তো যাবে না। খান আতাউর রহমান কখনো ১৯৭১ ও ১৯৭৫ এর ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন কিনা জানা যায় না। তবে আমরা উদারচিত্তে এটি ভেবে দেখতে পারি, মৌখিকভাবে নিজের অনুতাপ প্রকাশ না করলেও পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর গান, চলচ্চিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে সেটি প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। তাই বলে জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময়পর্বে তিনি যে ভুল করেছিলেন তাতো মিথ্যে হয়ে যাবে না। পাশাপাশি এও স্মরণ করিয়ে দেই, প্রিয়মানুষের কোনো অন্ধকার থাকতে নেই এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন। যাঁকে ভালোবাসবেন তাকে আলো-অন্ধকার নিয়েই ভালোবাসতে শিখুন।

(রুবায়েত আহমেদ-র ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া)

– লেখক, শিক্ষক নাটক ও নাট্যবিদ্যা, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here